রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য মিডিয়া সবসময় একটা পরিসর হিসেবে কাজ করে। অতীতে যখন মিডিয়া ছিল না তখন জনসাধারণ একটা জায়গায় মিলিত হতো এবং সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে বিতর্কে মেতে উঠতো। আর তাদের এই আলোচনা-সমালোচনা রাষ্ট্রের হর্তা-কর্তাদের প্রভাবিত করতো। কিন্তু মিডিয়ার এই ব্যাপক প্রচারণার যুগে গণমাধ্যম পাবলিক স্ফিয়ার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ জনগণের কাঙ্খিত সেই পাবলিক স্ফিয়ার তথা জনপরিসর ক্রমেই সংকোচিত হয়ে আসছে। মিডিয়া, সিটিজেনশীপ এবং পাবলিক স্ফিয়ারের মধ্যে সম্পর্কের মাত্রা অনুসন্ধানের মাধ্যমে তা আরো ভালোভাবে বোঝা যাবে।
ঐতিহাসিকভাবে, প্রাচীন গ্রীক রাষ্ট্র থেকেই সিটিজেনশীপের আবির্ভাব ঘটে। একে প্রথাগত একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হতো যেখানে জনগণের অধিকার রয়েছে এবং তাদের উপর দায়িত্ব অর্পন করা হয়। নাগরিকত্ব শব্দটির সাথে জড়িত আছে অধিকার ও বাধ্যবাধকতা যেখানে আইনের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রিত হয়। এই নাগরিকত্ব নিয়ে দুই ধরণের মতবাদ পরিলক্ষিত হয়। সনাতন ও উত্তরাধুনিক মতবাদ।
সনাতন মতবাদে সিটিজেনশীপকে দেখা হয় রাষ্ট্র প্রদত্ত্ব কোন অধিকার ও বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে। অর্থাৎ এই মতবাদে নাগরিকত্ব হলো তৈরি করে নেওয়ার বিষয়। সনাতন মতবাদে বিশ্বাসী পন্ডিতরা প্রাচীন গ্রীক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে সিটিজেনশীপকে বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে রাষ্ট্রকে দেখা হয় ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে বেষ্টিত কোন এলাকা হিসেবে আর এই এলাকায় যারা বসবাস করবে তারাই ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক বলে গণ্য হবে। সুতরাং, রাষ্ট্রই তাদের বিভিন্ন অধিকার প্রদান করবে, বাধ্যবাধকতা আরোপ করবে এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবে। আমাদের দেশে রাষ্ট্র আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা, কর দেওয়া বাধ্যথামূলক করা, ভোট প্রদানকে একটি নাগরিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা প্রভৃতি রাষ্ট্র নিশ্চিত করে। নির্দিষ্ট ভূখন্ডে যারা বসবাস করবে তারাই একমাত্র এই সব অধিকার ভোগ করতে পারবে এবং তাদেরকে রাষ্ট্র প্রদত্ত্ব এসব বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। নির্দিষ্ট ভূখন্ডে যারা বসবাস করবে তারাই একমাত্র এসব অধিকার ভোগ করতে পারবে। সনাতন মতবাদীদের মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্শালের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, সিটিজেনশীপের সাথে তিনটি অধিকার জড়িত। সেগুলো হচ্ছে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার। এ অধিকারগুলো রাষ্ট্র নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে প্রদান করে থাকে।
অন্যদিকে উত্তরাধুনিক মতবাদে বিশ্বাসী পন্ডিতরা বলতে চান, সিটিজেনশীপ হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া যার কোন শুরু কিংবা শেষ নেই। একে নির্দিষ্ট পরিচয়ে আবদ্ধ করা যায় না। এই মতবাদ অনুযায়ী, সিটিজেনশীপ যদি প্রদত্ত কোন বিষয় হতো তাহলে নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারী সবাই এই অধিকার ভোগ করতে পারতো। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। ধনী, দরিদ্র, সংখ্যাগরিষ্ট, সংখ্যালঘিষ্ট সবাই সমানভাবে রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার ভোগ করতে পারে না। অর্থাৎ সবাই সিটিজেনশীপকে সমানভাবে চর্চা করে না। সনাতন মতবাদে নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিষয়টি উত্তরাধুনিক মতবাদে অসাড় হয়ে যায়। কেননা, প্রাযুক্তিক উন্নয়নের সাথে সাথে সারাবিশ্বের মানুষ একে অপরের সাথে মুহুর্তেই যোগাযোগ করতে পারছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি কারণে মানুষ নিজস্ব ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে অন্য দেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করছে। তাই, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় জাতি রাষ্ট্র অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় আন্তুর্জাতিকভাবে কিছু আইন রয়েছে যা প্রতিটি রাষ্টকে মেনে চলতে হয়। মানবাধিকার, নারীর অধিকার, শিশু শ্রম প্রভৃতি বিষয় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি রাষ্ট্রকে মেনে চলতে হয়। বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াও একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একজন মানুষকে বিভিন্নভাবে বিবেচনা করা যায়। যেমন, একজন মানুষের এলাকা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে হয় তাহলে তাকে আদিবাসীদের নিয়মানুযায়ী তাকে চলতে হবে। আবার যে এলাকায় ফতুয়ার প্রভাব রয়েছে স্থানীয় জনগণকে এসব মেনে চলতে হয়।
জার্মান দার্শনিক যার্গন হ্যাবারমাস পাবলিক স্ফিয়ারের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে সিটিজেনশীপকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তিনি ১৯৬২ সালে তার ‘দ্যা ট্রান্সফরমেশন অব দ্য পাবলিক স্ফিয়ার’ বইতে প্রথম পাবলিক স্ফিয়ার শব্দটি ব্যবহার করেন। এখানে বলা হচ্ছে, সিটিজেনশীপ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে অধিকারসমূহের সামাজিক সমন্বয় ঘটবে এবং অধিকার সম্পর্কে সামাজিক ঐক্যমত গড়ে উঠবে। আর পাবলিক স্ফিয়ার হচ্ছে সমাজ জীবনের এমন একটি স্থান যেখানে মানুষ একত্রিত হয়, সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করে এবং মুক্ত আলোচনা করে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন নীতি প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করে। হ্যাবারমাস বলতে চান, মানুষ একটি জায়গায় একত্রিত হয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবে যার লক্ষ্য হবে সাম্য প্রতিষ্ঠা। হ্যাবারমাস ইতিহাস ঘেটে আমাদের জানাচ্ছেন, আঠারো শতকে ইউরোপে সেলুন ও কফি হাউসে নিয়মিত আড্ডা হতো, যেখানে সমবেত লোকজন রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা ও কার্যকলাপ নিয়ে মুক্ত আলোচনা করতেন। এখানে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও জার্নাল পড়া হতো, আড্ডার এজেন্ডা নির্ধারণে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। বাধাহীনভাবে সমাজের তাবৎ বিষয় নিয়ে মুখোমুখি কথা বলার ক্ষেত্রে এসব জায়গা ছিল আদর্শ ফোরাম, যাকে তিনি বলেছেন ‘বুর্জোয়া পাবলিক স্ফিয়ার’। এ ধরণের পাবলিক স্ফিয়ার চার্চ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে এসব পরিসর সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এসব জায়গা এমনকি অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী শ্রেণীর সম্পর্ক পাল্টে দিতেও ভূমিকা রেখেছে। মানুষ এভাবে যুক্তির মাধ্যমে সমাজে সমতার ডিসকোর্স সৃষ্টি করবে। এই ক্ষেত্রে সকল মানুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে, নিজস্ব মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং মানুষ পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হয়ে যুক্তির মধ্য দিয়ে সমঝোতায় পৌছাবে। সুতরাং বলাই বাহুল্য, যার্গন হ্যাবারমাসের সমাজে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ প্রভৃতি বিষয় সৃষ্টি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মিডিয়া পাবলিক স্ফেয়ার হিসেবে অনন্য ভূমিকা পালন করে। কারণ হ্যাবারমাস তার তত্ত্বে দুটি বিষয়ের কথা বলেছেন। এক আদর্শগতভাবে যোগাযোগ করা এবং যৌক্তিকভাবে যোগাযোগ করা। আর এই যোগাযোগের কাজটি মিডিয়ার সাহায্যে খুব ভালভাবেই করা সম্ভব। তাই মিডিয়া সাধারণ জনসাধারণের যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম। এখানে মানুষ নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে এবং এর মধ্য দিয়ে তারা একটি ঐকমত্যে পৌছাবে। সুতরাং হ্যাবারমাসের মতে, মিডিয়া হবে মানুষের মতামত প্রকাশের মাধ্যম; সত্যিকার অর্থে একটি পাবলিক স্ফেয়ার। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকার যখন আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর বানানোর জন্য পরিকল্পনা করে তখন মিডিয়া জনগণের কথা তুলে ধরে। ফলে সরকার জনগণের কথার মূল্য দিতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তীতে তারা বিমানবন্দর বানানোর পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে।
কিন্তু হ্যাবারমাসের এই তত্ত্ব পরবর্তীতে নানান কারণে সমালোচিত হয়। পরবর্তীতে হ্যাবারমাস নিজেই আক্ষেপ করে বলেছেন, সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো বিজ্ঞাপন ও পণ্য বাণিজ্যের খপ্পরে পড়ে যায়; গণভোক্তা ও বন্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলে; ফলে জনগণের স্বার্থে সত্যিকার ইস্যু নিয়ে আলোচনার এজন্ডা যোগাতে ব্যর্থ হয়; তারা বরং যেকোন প্রকারে কাটতি বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে যায় এবং তাদের আধেয় নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞাপনদাতা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ভূমিকা রাখতে থাকে। এভাবে পাবলিক স্ফেয়ার সংকুচিত হতে থাকে।
মিডিয়া ইডিয়োলজ্যিক্যাল স্ট্যাট অ্যাপারেটাস হিসেবে শাসক শ্রেণীর পক্ষে মতাদর্শ উৎপাদন করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা (সব বুদ্ধিজীবী নয়) বড় দুই দলের লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত। আওয়ামী লীগ-বিএনপির যে মতাদর্শ তা এসব বুদ্ধিজীবীদের কথা বার্তায় ফলে মিডিয়া চাইলেও আর জনসাধারনের স্ফিয়ার সৃষ্টি করতে পারছে না।
সরকার বিভিন্ন সেন্সর আরোপের মাধ্যমে মিডিয়ার পাবলিক স্ফেয়ার সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করছে। এমনকি বিরোধী দলীয় নেতার জনসমাবেশের বক্তব্য কতটুকু প্রচার করা হবে, অনুষ্ঠানে আগত দর্শকদের দেখানো হবে কিনা সে ব্যাপারেও নির্দেশণা দেওয়া হচ্ছে। ফলে হ্যাবারমাসের কাক্সিক্ষত সেই পাবলিক স্ফেয়ার আর থাকছে না।
এর চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে মিডিয়া কনগ্লোমারেশন। অধিক লাভের আশায় একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে গিলে খাচ্ছে; আবার কখনো দুই প্রতিষ্ঠান একটিতে লীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগে যেখানে বহুত্ববাদের কথা উঠে আসতো এখন সেখানে একটি চোখ দিয়ে সারা বিশ্বকে দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে। বহুত্ববাদের জায়গা করে নিচ্ছে কতিপয় লোক। পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে এই চোখ দিয়েই এখন বিশ্বকে দেখা হচ্ছে। ফলে সংকোচিত হচ্ছে পাবলিক স্ফেয়ার।
##
দোহাই: লেখাটি বার্ট ক্যামেরট্সের (২০০৯) ‘সিটিজেনশীপ, দ্য পাবলিক স্ফেয়ার, অ্যান্ড মিডিয়া’ নামক লেখার মূলভাব বলা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লিখতে গিয়ে এটি অনুবাদ কর্ম না হয়ে শেষ পর্যন্ত একটি স্বতন্ত্র লেখা হিসেবে দাড়িঁয়ে গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

