আজ থেকে ১০০ বছর আগে চিকিৎসা বিজ্ঞানে সঙ্গীতকে রোগী চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার উপযোগিতার কথা বলেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তিনি নার্সদের জন্য লেখা তার প্রাথমিক গাইড বইয়ে তখন রোগী চিকিৎসায় সঙ্গীত ব্যবহারের কার্যকারিতার কথা তুলে ধরেন। কারণ, হৃদয় মাতানো গান অথবা যন্ত্রসঙ্গীত মানুষের শরীর এবং মনকে প্রশান্তি দেয়, চাঙ্গা করে তোলে। বিষন্নতা, দৈহিক অবসাদ ও মানসিক বৈকল্যতায় ভোগা রোগীদের সুস্থ-সতেজ করে তুলতে সঙ্গীত এক উত্তম ওষুধ।
সঙ্গীত আমাদের মনকে আনন্দ দেয়। এই আনন্দ পাওয়াটা মূলত মানসিক কোন ব্যাপার নয়, প্রকৃতপক্ষে এটা একটা জৈবিক ব্যাপারই বটে। বিজ্ঞানিরা জানাচ্ছেন, এই জৈবিক ব্যাপারটা শুরু হয় আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ ক্ষরণের মাধ্যমে। ‘ডোপামিন’ ক্ষরণ হলেই আমাদের চিত্ত আনন্দ ও প্রশান্তিতে ভরে উঠে। আর সেজন্যই সঙ্গীত এত দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জীবনের এক অঙ্গ হয়ে আছে।
‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত এক গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, মানবজাতির অস্তিত্ত্ব রক্ষার প্রশ্নে সঙ্গীতের নিজস্ব কোন গুরুত্ব না থাকলেও মানব সমাজের সর্বত্রই সব যুগে ও সবকালে সঙ্গীতের সুবিশাল কদর লক্ষ্য করা যায় এর আনন্দদায়ক ভূমিকার জন্য এবং সে কারণেই এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
আমাদের দেশে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের আশ্রয় নেন। একটি শিশুর যখন দৃশ্যত মন খারাপ বলে মনে হয় কিংবা শিশু যখন ঘুমাতে চায় না, তখন একটি সহজ উদ্দীপনা যেমন, সঙ্গীত ক্ষণকালের জন্য তার মনকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়৷ এভাবে শিশু সঙ্গীতকে প্রশান্তি ও ঘুমিয়ে পড়ার অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিতে শেখে৷ অনেক উন্নত দেশে তাই এখন ‘মিউজিক-থেরাপি’ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে৷
আজকের কলেজ পড়–য়া তরুণ তরূণীরাও নানান ধরণের অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে খুঁজে সঙ্গীতের আশ্রয়। সঙ্গীতের মধ্যেই তারা ডুবসাঁতারে হারিয়ে যেতে চায়। বাস্তব জীবনের যান্ত্রিকতা, হতাশা, না পাওয়ার বেদনা ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে সঙ্গীতই হতে পারে আদর্শ নিয়ামক।
মানুষ কখনো কখনো কথা বলে মনের ইমোশনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়৷ কিন্তু অনেক সময় নির্বাক মুহুর্তের প্রয়োজন হয়৷ অনেক সময় অঝোরে অশ্রু ঝরিয়ে আবেগ মথিত হৃদয়ের ভাব প্রকাশ করে৷ আবার কখনো নিজের মনের কথাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করে। মানুষ সঙ্গীতকে ভালোবাসে, সঙ্গীতের মূর্ছনায় সাঁতার দেয়৷ এতে সাড়া দেওয়ার জন্য বাড়তি কিছুর প্রয়োজন হয়না। সঙ্গীত দেয় শিথিলতা, সন্তুষ্টি ও আরাম৷
প্রায় সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময় মনের প্রশান্তির জন্য অথবা উদ্দীপিত হওয়ার জন্য সঙ্গীতের আশ্রয় নেয়৷ কিন্তু সঙ্গীত হতে পারে দাওয়াই, বিষন্নতাকে মোকাবেলা করার, মনের অজানা ভয়কে দূর করার এবং মনকে প্রশান্তি দেয়ার।
সেই কতকাল থেকেই তো সঙ্গীত আমাদের অতিবিশ্বস্ত সুহৃদ এবং সহচর। সঙ্গীত এক বহতা নদী যেটার আবেদন কখনো শেষ হয় না। সঙ্গীত সর্বকালেই মানুষের কথা বলে, জীবনের প্রয়োজনের কথা বলে, মানুষের চাওয়া পাওয়ার কথা বলে। সঙ্গীত বন্ধ হলে যে মানব সভ্যতাই স্তব্ধ হয়ে যাবে। সঙ্গীত মাধুর্যের, সঙ্গীত নান্দনিকতারও বটে। সঙ্গীত একজন অপবিত্র কলুষিত মানুষের মনকে শুদ্ধতায় ভরিয়ে তুলতে পারে। সঙ্গীত প্রকাশ করতে পারে একটি জনপদের আবেগ, আকাঙক্ষা, প্রেম আর বিজয়কে। সঙ্গীত মানুষের সহজ বোধগম্য ভাষা, এ ভাষা সকল দেশের সকলজাতির সার্বজনীন ভাষা। সঙ্গীতের কোন বিকল্প নেই, সঙ্গীতের বিকল্প কেবলই সঙ্গীত।
বাংলা সঙ্গীতের ঐতিহ্য হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলা সঙ্গীত বিশ্বের সঙ্গীতাঙ্গণে তার স্বতন্ত্র প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করে রেখেছে।
এছাড়া সঙ্গীত সব সময়ই এদেশের মানুষের জীবন চর্চার তথা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সিংহভাগের দাবীদার। ###

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

