somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আনিসুল হক এর অসাধারণ উপন্যাস

১৩ ই জুন, ২০০৭ রাত ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দোহার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলী হোসেন এসেছিলেন আজাদের মায়ের জানাজায়। সম্পর্কে আজাদের চাচা হন তিনি। ইউনুস চৌধুরীর খালাতো ভাই। আজাদের মা মারা গেছেন শুনে ছুটে এসেছেন। গোরের পাশে যখন তিনি দাঁড়িয়ে, নানা স্মৃতির ভিড়ে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তাঁর মনের ভেতরে বইতে থাকে রোদনধারা। ভাবি আকারে ছিলেন ছোটখাটো, কিন্তু তাঁর হৃদয়টা ছিল অনেক বড়। ইস্কাটনের বাড়িতে আলী হোসেনও থাকতেন। এ রকম আশ্রিত বা অতিথি আরো অনেকেই থাকত বাসায়। আজাদ আর ভাবির সঙ্গে তিনি বহুদিন ক্যারমও খেলেছেন। পরহেজগার মহিলা ছিলেন আজাদের মা। নামাজ-রোজা ঠিকভাবে করতেন। দান-খয়রাত করতেন দু হাতে। বাড়ির সব আত্মীয়স্বজন অনাত্মীয় আশ্রিত প্রতিটা লোকেরই আতিথেয়তা করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে।
আলী হোসেনের বন্ধুবান্ধবরা খুব একটা এ বাড়িতে আসত না। কিন্তু আলী হোসেনের শখ বন্ধুদের বাড়িটায় আনেন, বাড়িটা বন্ধুরা ঘুরেফিরে দেখুক। এই সুবিশাল আর জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িটা তো বাইরের কত লোক শুধু দেখতেই আসে। এই বাড়িতে তিনি থাকেন, সেটা বন্ধুবান্ধবদের একটিবার দেখাতে কি সাধ হয় না! বন্ধুরা বাড়িটাও দেখুক, আর তাঁর ভাবির হাতের রান্না একটু ভালোমন্দ খেয়ে যাক। ওরা তো হলে থাকে, কী খায় না খায় কে জানে!
কথাটা তিনি পাড়েন সাফিয়া বেগমের কাছে, 'ভাবি, আমার বন্ধুরা তো জানতে চায় আমি কোথায় থাকি, বললাম, ইস্কাটনে ইউনুস চৌধুরীর বাড়িতে, শুনে ওরা বিশ্বাসই করতে চায় না, বলে গুলগাপ্পি বাদ দাও তো ভায়া... কী করি বলেন তো!'
ভাবি বলেন, 'একদিন নিয়ে আসেন তাদের। কবে আনবেন, আগে থেকে জানাবেন।' আলী হোসেন বন্ধুদের সাঙ্গে আলাপ করে দিনক্ষণ ঠিক করেন। ভাবিকে জানান। ভাবি রান্না করতে পছন্দ করেন খুব। আলীর বন্ধুরা আসবে, এ উপলক্ষ পেয়ে লেগে যান রাঁধতে। কত পদের কত রান্নাই না রাঁধেন। বন্ধুরা আসে। তখন আলী সাফিয়া বেগমকে বলেন, 'ভাবি, আপনি কি ওদের সামনে একটু আসবেন?'
সাফিয়া বেগম হেসে বলেন, 'আমি তো আপনার বন্ধুদের চিনিও না, তাদের সাথে আমার পরিচয়ও হয়নি, কিন্তু আপনি যখন বলছেন, আমি নিশ্চয় তাদের সামনে যাব। আর তা ছাড়া তাদের খাওয়ার তদারকিটাও তো করতে হবে। তুলে না দিলে মেহমানরা কী খাবে না খাবে কে জানে! আমি তাদের তুলে খাওয়াব।'
ভাবি সামনে আসেন আলী হোসেনের বন্ধুদের। হেসে হেসে কথা বলেন। বন্ধুরা সহজেই আপন হয়ে যায় তাঁর। তিনি খুব যত্ন করে দেবরের বন্ধুদের পাতে খাবার তুলে তুলে দেন। বন্ধুরা ফিরে যায় মোহিত হয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে মোহিত হন গাজী আলী হোসেন নিজে, যখন আরেক দিন সাফিয়া বেগম বলেন, 'বাচ্চু ভাই (আলী হোসেনের ডাকনাম), আপনার বন্ধুদের মাঝে মধ্যে আনবেন। হলে থাকে। বাবা-মার কাছ থেকে কত দূরে। এদের খাওয়াতে পারলে দিলের মধ্যে একটা শান্তি লাগে।'
গোরের পাশ থেকে ফিরতে ফিরতে আরো কত কথাই না মনে পড়ে আলী হোসেনের। ইস্কাটনের বাসায় অনেক ফালতু মেহমানও থাকত আশ্রিতের মতো। এদের সবাইকে যে সাফিয়া বেগমের পছন্দ হতে হবে, এমন তো নয়। সবাই পছন্দের ছিলও না হয়তো। আলী হোসেন ছিলেন দেবর, তাঁর ভাবি হিসাবে সাফিয়া বেগম নানা আবদার অত্যাচার সহ্য করতেন। কিন্তু আলী হোসেনের একজন মামা ছিলেন, কাদের, যাঁকে সাফিয়া বেগম ঠিক পছন্দ করতেন না। এটা কাদেরও বুঝতেন, সাফিয়াও যেন বোঝাতে চাইতেন। একদিন আলী হোসেন আর কাদের একসঙ্গে বসেছেন সকালের নাশতা করতে, সাফিয়া বেগম আলী হোসেনের পাতে দুটো ডিমের অমলেট দিলেন, তারপর কাদেরের পাতেও দিলেন দুটো ডিমেরই অমলেট। পরে কাদের বলেন, 'বুঝলে ভাগ্নে, তোমার ভাবির মনটা অনেক বড়। ছোটলোকি ব্যাপারটাই তার মধ্যে নাই।'
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৪৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘স্বর্ণামতি সেতু’ থেকে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ৩০ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯



আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। তার একটা আদুরে নাম আছে, ‘স্বর্ণামতি’। কে, কবে, কেন নদীটির এ নাম দিয়েছে, তা আমার অজানা। তবে নামটি আমার খুবই প্রিয়। এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষড়যন্ত্রঋতু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২৯

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সারাবছরই ঐক্যের ঋতু, এখানে রাজনীতিতে শত্রু না থাকলে মিত্র টেকে না। যতদিন হাসিনা ছিল, স্বাধীনতাবিরোধীরা ছিল একটি সুখী পরিবার। বাম জানত ডানকে ঘৃণা করতে হয়, কিন্তু আপাতত স্থগিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×