৩.৫
বিজু মেয়ের লম্বা ঘন চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বলে, তুই খেয়েছিস রে, ফুলটুস? নাকি, আমার সঙ্গে খাবি?
বলে বুঝতে পারে, খুব বাজে শট খেলে একখানা মোক্ষম ক্যাচ সে তুলে দিয়েছে। হয়তো এক্ষুণি শুনবে, হ্যাঁ, তুমি না থাকলে তোমার মেয়েকে আর কে খাওয়াবে!
সেরকম কোনোকিছু অবশ্য শোনা যায় না, একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বিজু। ফিল্ডারের অমনোযোগের সুযোগে লাইফ পাওয়া আর কি!
ফুলটুস বলে, হ্যাঁ, খেয়েছি।
কি খেলি আজ রাতে?
ভুলে গেছি।
বিজু বুঝলো, খাওয়ার সময় ও একমনে কার্টুন দেখছিলো। রানু খাইয়ে দিয়েছে। কার্টুন দেখার সময় কী মুখে যাচ্ছে, কে খেয়াল করে! চোখ ফেরালেই কিছু একটা মিস হয়ে যেতে পারে।
তুই যে বললি, বাবার সঙ্গে কী কথা আছে!
বাবা, আমার ছোটোবেলার কথা বলো।
তোর আবার ছোটোবেলা বড়োবেলা কীসের! তুই তো এখনো ছোটোই।
না, এখনকার কথা নয়, যখন আরো ছোটো ছিলাম।
বিজু হাসতে হাসতে বলে, শুধু অ্যাঁ অ্যাঁ করে কান্না করতি, কথা তো আর বলতে শিখিসনি তখন।
না, তখনকার কথা নয়। ওই যে হামটি-ডামটির গল্পটা বলো।
ফুলটুসের তখন ভালো করে কথাও ফোটেনি, ক্যাসেটে শুনে শুনে হামটি-ডামটি শিখেছিলো। হামটি-ডামটি বলতে পারতো না, বলতো ঠামটি-ঠামটি। আর পুট টুগেদার এগেন লাইনটা বুঝতে না পেরে তার কানে যেরকম পৌঁছতো সেভাবেই বলতো, পুটুরেগেন। বিজু জিজ্ঞেস করতো, পুটুরেগেন মানে কি রে? বললেই রেগে যেতো ফুলটুস। সেই কাহিনী তার বারবার শোনা চাই, আর শুনে প্রতিবার হাসিতে গড়াগড়ি।
হামটি-ডামটি পর্ব শেষ হলে ফুলটুসের নতুন বায়না, এবার স্নো হোয়াইটের কথা বলো, বাবা।
ফুলটুসকে ডিজনির স্নো হোয়াইট ভিডিও কিনে দিয়েছিলো বিজু, ওর তখন তিনও হয়নি। সেই ভিডিও সে সারাদিনমান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতো। আসলে গিলতো। রানীর প্ররোচনায় স্নো হোয়াইটকে বনের ভেতরে নিয়ে গিয়ে জল্লাদের ছুরি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য এলেই ফুলটুস চোখ বুঁজে চিৎকার করে উঠতো, মারবে না, মারবে না। ডাইনিরূপী রানীর হাত থেকে স্নো হোয়াইট বিষাক্ত আপেল নিয়ে মুখে তুলছে দেখলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে ফুলটুস, না, খাবে না, খাবে না।
বিজু জানে, গল্পের রশি এখুনি না গোটালে ফুলটুস টেনে টেনে সেটাকে লম্বা করতেই থাকবে। রানুর তাগাদা আবার জারি হওয়ার আগেই উঠে পড়া দরকার। সে বলে, এখন যে ঘুমাতে হবে তোকে।
আমার একটুও ঘুম পাচ্ছে না।
না পেলেও ঘুমাতে হবে। কাল স্কুল আছে না!
ফুলটুস বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, আজ আমি তোমার সঙ্গে ঘুমাতে যাবো।
এই বায়নাটা মাঝে মাঝে করে সে। নিজের ঘরেই ঘুমায় ফুলটুস, কোনো কোনো রাতে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত মাকে অথবা বাবাকে তার সঙ্গে গিয়ে শুয়ে থাকতে হয়।
বিজু কিছু বলার আগেই রানু সামনে এসে দাঁড়ায়। বিজু লক্ষ্য করে তার অনুমান ঠিক, রানু হালকা করে লিপস্টিক মেখেছে। কী একটা সুগন্ধিরও সুবাস পাওয়া যায়। নিজের বউ বলে নয়, সত্যিই খুব সুন্দর লাগছে ওকে।
বছরখানেক হলো রানু চশমা নিয়েছে, চশমায় ওকে খুব মানায়। আলাদা এক ধরনের ব্যক্তিত্ব ফোটে। হয়তো আরেকখানা মুখোশ।
রানুকে হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে চুমু খাওয়ার একটা তীব্র ইচ্ছেকে শাসন করে সে। ফুলটুস উপস্থিত আছে বলে নয়, বাসার আবহাওয়া ফুরফুরে থাকলে চুমুটুমু পর্যন্ত ওর সামনেই চলতে পারে। রানু দু'চারবার আপত্তি তুলেছে, মেয়ে বড়ো হচ্ছে না! বিজু তখন বলেছে, টিভিতে ও সারাক্ষণই তো দেখছে, এমনকি কার্টুনেও। আমার মনে হয়, বাবা-মা ওর সামনেই চুমু খেলে মোটেই অস্বাভাবিক লাগবে না।
রানু ফুলটুসকে বলে, বাবা এখন কাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসবে। তুমি তোমার ঘরে গিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো, যাও।
ফুলটুস বিজুর গলা আরো শক্ত করে ধরে বলে, না, আমি বাবাকে চাই।
বিজু বলে, বেশ তো, চল। কিন্তু তার আগে আমাকে একটুখানি সময় দিতে হবে। তুই দাঁত ব্রাশ করে নে, আমি জামাকাপড়টা বদলে আসছি।
ফুলটুসকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ায় বিজু। শোয়ার ঘরের দিকে যেতে যেতে রানুকে বলতে শুনলো, এইসব আহ্লাদ পেয়ে পেয়ে তো মেয়ে মাথায় উঠছে!
একটা কানেই দিব্যি শোনা যায়, তবু মানুষের দুটো কান থাকে কেন? উত্তর হলো, ভালো ভালো কথাগুলো যাতে এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে!
বিজু শিখে গেছে, সব কথা শুনতে নেই, জবাবও দিতে নেই। রানুর এই কথাটাও শুনতে পায়নি ধরে নেয় সে। দুটো কানই মাঝে মাঝে ব্যবহার করতে হয় যে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




