৭.১
শোয়ার ঘরে আলো জ্বেলে বিজু দেখে, পরিপাটি বিছানা। বেডকভার আর কম্ফর্টার আজই পাল্টানো হয়েছে বলে মনে হয়। নাকি এটাই সে দেখে গিয়েছিলো বস্টনে যাওয়ার আগে? মনে করতে পারে না। নিজের বেলায় যতো অমনোযোগী হোক, বাড়িঘর ছিমছাম পরিপাটি রাখতে ক্লান্তি নেই রানুর।
বিশেষ করে বাসায় কারো আসার কথা থাকলে সে বুলডোজারের নির্দয়তায় বিজুর কাগজপত্র, ফুলটুসের খেলনা-বই-ক্রেয়ন সব সরিয়ে ফেলতে থাকে। বাসায় একটা বাচ্চা আছে, এখানে-ওখানে তার দু'একটা খেলনা পড়ে থাকতেই পারে, অতিথিরাও নিশ্চয়ই বুঝবে - এই যুক্তি রানুর কাছে একেবারে অচল। অতিথি এসে যেন সবকিছু ছবির মতো সাজানো দেখে।
কোথায় একটা গবেষণায় দেখা গেছে, এক নজরে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি খুঁটিনাটি দেখে ফেলতে পারে। ফলে, যে ঘরটি একজন পুরুষের কাছে দিব্যি পরিপাটি সাজানো মনে হচ্ছে, একজন মেয়ে তার মধ্যে থেকেই দশটা খুঁত খুঁজে পাবে অনায়াসে। আর কোনো গবেষণা বিজুর এমন সর্বাত্মক সমর্থন পায়নি। তবু আজ একটু অতিরিক্ত যত্ন আছে বলে তার ধারণা হয়। এমনও হতে পারে, বিজুর সেরকম ভাবতে ইচ্ছে করছে। রানুর শাড়ি পরা, সামান্য সাজও হয়তো কোনো ধারণা দিয়ে থাকবে।
ঘরের পোশাক পরে গোসল করার কথা ভাবে। কিন্ত তার আগে ফুলটুসকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। দেরিতে ঘুমালে মেয়ে সকালে উঠতে বড্ড ঝামেলা করে। হাতমুখটা অবশ্য এখনই না ধুয়ে নিলেই নয়। শরীরে ধুলোময়লা নিয়ে মেয়ের ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না।
মনে আছে, ফুলটুস হওয়ার পর প্রথম প্রথম সিগারেট খেয়ে ওর কাছাকাছি যেতে বিজুর অস্বস্তি হতো খুব। নিজেকে ভারি অপরিচ্ছন্ন লাগতো, মনে হতো সিগারেটের গন্ধে ফুলটুসের তুলতুলে কচি শরীরের টাটকা গন্ধটা ঢাকা পড়ে যাবে। দাঁত মেজে মুখহাত ভালো করে ধুয়ে নিতো আগে।
নতুন বারবিকে নিয়ে বিছানায় যায় ফুলটুস। ঘুমিয়েও পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে। ঘরে নাইট লাইট জ্বালিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান চালু করে দিলে এক্কেবারে কথা বন্ধ। অভ্যাসটা করাতে অনেক সময় লেগেছে। আগে বিছানায় শুলে মেয়ের রাজ্যের কথা মনে পড়ে যেতো, এক প্রশ্নের লেজ ধরে আরেকটা, তারপর আরেকটা, আরো একটা - চলতেই থাকতো।
ফুলটুসের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বিজু। রানু সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে টিভি দেখছে। পায়ের শব্দে ফিরে তাকায়। বলে, খাবার কি এখন দিয়ে দেবো?
নিজে থেকে খাবার দেবে কিনা জিজ্ঞেস করছে! হলো কী রানুর? বিজু বললো, নাঃ, আগে গোসল করতে হবে। তুমি খেয়ে নিয়েছো?
এতো দেরি করে আমি কবে খাই?
তা-ও ঠিক। ফুলটুস হওয়ার পর সামান্য ওজন বেড়ে গিয়েছিলো রানুর, বহু কষ্টে হেলথ ক্লাবে মাস তিনেক নিয়মিত হাজিরা দিয়ে বাড়তি পাউন্ডগুলো ঝরাতে পেরেছে। এখনো মাঝেমধ্যে যায়, সপ্তাহে দু'তিনবার। এখন অফিস থেকে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে নেয় সে, সন্ধ্যার পর আর কিছু খায় না।
বিজু ভেবে প্রশ্ন করেনি। কথার কথাও মানুষ বলে, নাকি বলে না! সে কি আশা করেছিলো, রানু তার জন্যে না খেয়ে বসে থাকবে? অন্তত আজকের জন্যে? উচিত হয়নি। কী এমন রাজ্যজয় করে এলো সে যে, আজ নিয়ম-টিয়ম সব উল্টে যাবে?
তবু কেন যেন মনে হচ্ছিলো। 'তার পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর...।' মাতাল হাওয়ার ঝলকের মতো সুগন্ধি-সুবাস!
সোফার পাশে রাখা হাতব্যাগ খুলে কাগজে মোড়া জিনিসটা বের করে বিজু।
রানুর পাশে বসতে বসতে হাত বাড়িয়ে তুলে দেয়। রানু উঠে বসে। বলে, কী এটা?
শহরের বাইরে কোথাও গেলে বিজু খালি হাতে ফেরে না, রানুর জন্যে কিছু না কিছু একটা আনে। স্যুভেনির জাতীয় কিছু।
বিজু বলে, খুলে দেখো।
রানু কাগজের মোড়ক খুলতে বেরিয়ে আসে একটা কফি কাপ আকৃতির পেন হোল্ডার। সামনের দিকটা বড়োসড়ো কাপের মতো দেখতে, কিন্তু পেছনে একেবারে চ্যাপ্টা। মনে হবে ভার্টিক্যাল একটা কোপ মেরে কাপটাকে আধখানা করে ফেলা হয়েছে। ওপর থেকে দেখলে কাপের মুখটা ইংরেজি ডি অক্ষরের মতো দেখায়। তার গায়ে লেখা: বস্টন ওয়াজ সো এক্সপেনসিভ দ্যাট আই ক্যুড অ্যাফোর্ড অনলি হাফ আ কাপ।
খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে একটা স্নিগ্ধ হাসি ফোটায় রানু। বলে, খুব মজার তো!
এক মুহূর্তের জন্যে বুয়েটের সময়টা ফিরে এলো বলে মনে হয় বিজুর। বলে, আমার মনে হলো, তোমার পছন্দ হবে।
খুব সুন্দর কিন্তু। মেয়ের জন্যে বারবি পুতুল, আমার জন্যে আধখানা কাপ, তোমার জন্যে কী?
বিজু কবিতা পড়তে ভালোবাসে, বলা উচিত একসময় ভালোবাসতো, ছন্দটন্দ তেমন বোঝে না। তবু রানুর শেষের কথাটা কবিতার লাইনের মতো শোনায় - মেয়ের জন্যে বারবি পুতুল, আমার জন্যে আধখানা কাপ, তোমার জন্যে কী? বাঃ, বেশ তো!
আমার জন্যে আবার কী?
রানু উঠে গিয়ে পেন হোল্ডারটা রাখে কিচেন কাউন্টারের ওপরে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা কলম তুলে নিয়ে রাখে তার ভেতরে। ফিরে এসে বিজুর পাশে বসে। ইচ্ছে করলে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায়। ইচ্ছেটাকে আবার শাসন করে বিজু, সতর্ক হওয়া উচিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




