somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১৭

০৭ ই মে, ২০০৭ রাত ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৭.১

শোয়ার ঘরে আলো জ্বেলে বিজু দেখে, পরিপাটি বিছানা। বেডকভার আর কম্ফর্টার আজই পাল্টানো হয়েছে বলে মনে হয়। নাকি এটাই সে দেখে গিয়েছিলো বস্টনে যাওয়ার আগে? মনে করতে পারে না। নিজের বেলায় যতো অমনোযোগী হোক, বাড়িঘর ছিমছাম পরিপাটি রাখতে ক্লান্তি নেই রানুর।

বিশেষ করে বাসায় কারো আসার কথা থাকলে সে বুলডোজারের নির্দয়তায় বিজুর কাগজপত্র, ফুলটুসের খেলনা-বই-ক্রেয়ন সব সরিয়ে ফেলতে থাকে। বাসায় একটা বাচ্চা আছে, এখানে-ওখানে তার দু'একটা খেলনা পড়ে থাকতেই পারে, অতিথিরাও নিশ্চয়ই বুঝবে - এই যুক্তি রানুর কাছে একেবারে অচল। অতিথি এসে যেন সবকিছু ছবির মতো সাজানো দেখে।

কোথায় একটা গবেষণায় দেখা গেছে, এক নজরে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি খুঁটিনাটি দেখে ফেলতে পারে। ফলে, যে ঘরটি একজন পুরুষের কাছে দিব্যি পরিপাটি সাজানো মনে হচ্ছে, একজন মেয়ে তার মধ্যে থেকেই দশটা খুঁত খুঁজে পাবে অনায়াসে। আর কোনো গবেষণা বিজুর এমন সর্বাত্মক সমর্থন পায়নি। তবু আজ একটু অতিরিক্ত যত্ন আছে বলে তার ধারণা হয়। এমনও হতে পারে, বিজুর সেরকম ভাবতে ইচ্ছে করছে। রানুর শাড়ি পরা, সামান্য সাজও হয়তো কোনো ধারণা দিয়ে থাকবে।

ঘরের পোশাক পরে গোসল করার কথা ভাবে। কিন্ত তার আগে ফুলটুসকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। দেরিতে ঘুমালে মেয়ে সকালে উঠতে বড্ড ঝামেলা করে। হাতমুখটা অবশ্য এখনই না ধুয়ে নিলেই নয়। শরীরে ধুলোময়লা নিয়ে মেয়ের ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না।

মনে আছে, ফুলটুস হওয়ার পর প্রথম প্রথম সিগারেট খেয়ে ওর কাছাকাছি যেতে বিজুর অস্বস্তি হতো খুব। নিজেকে ভারি অপরিচ্ছন্ন লাগতো, মনে হতো সিগারেটের গন্ধে ফুলটুসের তুলতুলে কচি শরীরের টাটকা গন্ধটা ঢাকা পড়ে যাবে। দাঁত মেজে মুখহাত ভালো করে ধুয়ে নিতো আগে।

নতুন বারবিকে নিয়ে বিছানায় যায় ফুলটুস। ঘুমিয়েও পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে। ঘরে নাইট লাইট জ্বালিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান চালু করে দিলে এক্কেবারে কথা বন্ধ। অভ্যাসটা করাতে অনেক সময় লেগেছে। আগে বিছানায় শুলে মেয়ের রাজ্যের কথা মনে পড়ে যেতো, এক প্রশ্নের লেজ ধরে আরেকটা, তারপর আরেকটা, আরো একটা - চলতেই থাকতো।

ফুলটুসের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বিজু। রানু সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে টিভি দেখছে। পায়ের শব্দে ফিরে তাকায়। বলে, খাবার কি এখন দিয়ে দেবো?

নিজে থেকে খাবার দেবে কিনা জিজ্ঞেস করছে! হলো কী রানুর? বিজু বললো, নাঃ, আগে গোসল করতে হবে। তুমি খেয়ে নিয়েছো?

এতো দেরি করে আমি কবে খাই?

তা-ও ঠিক। ফুলটুস হওয়ার পর সামান্য ওজন বেড়ে গিয়েছিলো রানুর, বহু কষ্টে হেলথ ক্লাবে মাস তিনেক নিয়মিত হাজিরা দিয়ে বাড়তি পাউন্ডগুলো ঝরাতে পেরেছে। এখনো মাঝেমধ্যে যায়, সপ্তাহে দু'তিনবার। এখন অফিস থেকে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে নেয় সে, সন্ধ্যার পর আর কিছু খায় না।

বিজু ভেবে প্রশ্ন করেনি। কথার কথাও মানুষ বলে, নাকি বলে না! সে কি আশা করেছিলো, রানু তার জন্যে না খেয়ে বসে থাকবে? অন্তত আজকের জন্যে? উচিত হয়নি। কী এমন রাজ্যজয় করে এলো সে যে, আজ নিয়ম-টিয়ম সব উল্টে যাবে?

তবু কেন যেন মনে হচ্ছিলো। 'তার পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর...।' মাতাল হাওয়ার ঝলকের মতো সুগন্ধি-সুবাস!
সোফার পাশে রাখা হাতব্যাগ খুলে কাগজে মোড়া জিনিসটা বের করে বিজু।

রানুর পাশে বসতে বসতে হাত বাড়িয়ে তুলে দেয়। রানু উঠে বসে। বলে, কী এটা?

শহরের বাইরে কোথাও গেলে বিজু খালি হাতে ফেরে না, রানুর জন্যে কিছু না কিছু একটা আনে। স্যুভেনির জাতীয় কিছু।

বিজু বলে, খুলে দেখো।

রানু কাগজের মোড়ক খুলতে বেরিয়ে আসে একটা কফি কাপ আকৃতির পেন হোল্ডার। সামনের দিকটা বড়োসড়ো কাপের মতো দেখতে, কিন্তু পেছনে একেবারে চ্যাপ্টা। মনে হবে ভার্টিক্যাল একটা কোপ মেরে কাপটাকে আধখানা করে ফেলা হয়েছে। ওপর থেকে দেখলে কাপের মুখটা ইংরেজি ডি অক্ষরের মতো দেখায়। তার গায়ে লেখা: বস্টন ওয়াজ সো এক্সপেনসিভ দ্যাট আই ক্যুড অ্যাফোর্ড অনলি হাফ আ কাপ।

খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে একটা স্নিগ্ধ হাসি ফোটায় রানু। বলে, খুব মজার তো!

এক মুহূর্তের জন্যে বুয়েটের সময়টা ফিরে এলো বলে মনে হয় বিজুর। বলে, আমার মনে হলো, তোমার পছন্দ হবে।

খুব সুন্দর কিন্তু। মেয়ের জন্যে বারবি পুতুল, আমার জন্যে আধখানা কাপ, তোমার জন্যে কী?

বিজু কবিতা পড়তে ভালোবাসে, বলা উচিত একসময় ভালোবাসতো, ছন্দটন্দ তেমন বোঝে না। তবু রানুর শেষের কথাটা কবিতার লাইনের মতো শোনায় - মেয়ের জন্যে বারবি পুতুল, আমার জন্যে আধখানা কাপ, তোমার জন্যে কী? বাঃ, বেশ তো!

আমার জন্যে আবার কী?

রানু উঠে গিয়ে পেন হোল্ডারটা রাখে কিচেন কাউন্টারের ওপরে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা কলম তুলে নিয়ে রাখে তার ভেতরে। ফিরে এসে বিজুর পাশে বসে। ইচ্ছে করলে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায়। ইচ্ছেটাকে আবার শাসন করে বিজু, সতর্ক হওয়া উচিত।
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:০০

আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?



বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীল গ্রহের শেষ প্রেম // কেয়া এবং আমি।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৪ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



আমি ভেসে আছি মহাশূন্যে।
আমার শরীরে রূপালী স্পেসস্যুট।
চারপাশে অসীম অন্ধকার।
আর আমার সামনে দূরে জ্বলছে এক নীলাভ-সবুজ গ্রহ—
Earth-666।
এই গ্রহেই আমার জন্ম।
এই গ্রহেই আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম।
আর এই গ্রহই আমার কাছ থেকে সবকিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×