৭.২
টিভিতে কী একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো, বিজু লক্ষ্য করেনি। রানু রিমোট টিপে চ্যানেল বদলে দেয়। সিএনএন। রানু খবর-টবর বিশেষ দেখে না, টিভিতে তার পছন্দের জিনিস হলো মুভি। খুঁজে খুঁজে সে নতুন-পুরনো, রঙিন-সাদাকালো সব ছবিই দেখে। এখন চ্যানেল পাল্টায় সম্ভবত বিজুর জন্যে।
বিজু টিভির সামনে বিশেষ বসে না, সকালের কফি খেতে খেতে খবরের শিরোনামগুলো দেখে নেয়। এখন তর্ক চলছে ইরাকে সাদ্দামের ছেলেদের খুন করার পর তাদের ছবি টিভিতে দেখানো উচিত হয়েছে কি না তাই নিয়ে। খুন করাটা জায়েজ ছিলো কিনা তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। পৃথিবীতে কতো যে উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন আছে! কেউ কেয়ার করে?
রানু টিভির পর্দায় চোখ রেখে বলে, তোমার জন্যে নয় কেন?
নিজের জন্যে কেনা যায়? বিজুর চোখও টিভিতে।
কিনলেই কেনা যায়।
বিজু বলে, তুমি জানো নিজের জন্যে কী কেনা যায় তাই খুঁজে পাই না।
কথাটা ঠিক। টুকটাকি জিনিস ছাড়া নিজের জন্যে কিছু সে কিনতে পারে না, জানেও না। কোনো একটা শার্ট কাউকে পরতে দেখে হয়তো খুব পছন্দ হয়ে গেলো, নিজে দোকানে গিয়ে ওই ধরনের কিছু খুঁজেও পায় না। যা সামনে দেখে, কোনোটাই পছন্দের মনে হয় না। জামাকাপড় থেকে শুরু করে বিজুর প্রায় সব কেনাকাটা রানুর।
রানু আচমকা জানায়, সিগারেট তো নিজেই কেনো!
এবার রানু তার দিকে মুখ ফিরিয়েছে টের পায় বিজু।
প্যালেস্টাইনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি আলোচনার সময়ও দুই পক্ষের মধ্যে খুনোখুনির খবর এখন টিভিতে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোকরা কীসব বলছে, বিজুর মাথায় ঢোকে না। শুনলে না ঢুকবে! তার এখন উপস্থিত সংকট, সে বুঝতে পারছে না রানু ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে। শান্তির পায়রার দিকে তাক করা বন্দুক।
বিপদের গন্ধ পাচ্ছে বিজু, পিঁপড়েরা যেমন বৃষ্টির গন্ধ পায়। উঠে দাঁড়ায় বিজু। তাড়াতাড়ি বলে, বরং খেয়েই নিই এখন।
এই না বললে গোসল করে খাবে।
তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে, আগে খেয়ে নিই। গোসল পরে।
খিদে পাওয়ার কথাটা মিথ্যা নয়, অজুহাতও নয়। বস্টন থেকেই খিদে বয়ে নিয়ে এসেছে সে। তবু এখন এই সময়ে সেটাকে কাজে লাগাতে পেরে নিজের ওপরে খুশি হয়ে ওঠে বিজু।
রানু বলে, পাঁচটা মিনিট সময় দাও, খাবারগুলো গরম করে দিই।
তোমাকে কিছু করতে হবে না, আমি করে নিতে পারবো।
কেন, আমি করলে খাওয়া যাবে না?
আমি কিন্তু তা বলিনি, শুধু বলেছি নিজেই করে নিতে পারতাম।
মাছ তখনই বড়শিতে ধরা পড়ে যখন সে মুখ খোলে। মহাজনদের বাক্যি। চুপ করে থাকার অভ্যাস করা দরকার, বিশেষ করে যখন কথা না বললেও চলে। বিজু কিছু ভেবে বলেনি, খাবার গরম না করলেও ক্ষতি কিছু নেই। একেবারে সদ্য ফ্রিজ থেকে বের করা না হলে ঠাণ্ডা খাবার সে দিব্যি খেয়ে ফেলতে পারে। গরম করার দরকার হলে নিজে করে নেওয়া যায়, মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে দিলেই হলো।
সেটা যে তাকে আদৌ কখনো করতে হয় না, তা-ও নয়। রানু কথাটা একটু সুন্দর করে বলতে পারতো। চাই কি একটা কপট ধমক দেওয়ারও সুযোগ ছিলো। সেটাই কি উপযুক্ত হতো না!
রানু খাবার গরম করে টেবিলে সাজিয়ে দেয়। ভাজা ইলিশ আর কষানো গরুর মাংসের সঙ্গে খিচুড়ি। খেতে ভালোবাসে বিজু, খিচুড়ি-গোমাংস তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। এই দুই পদ না থাকলে বেহেশত-দোজখ কোনোখানেই তার আগ্রহ নেই।
আলুভর্তা, ছোটো মাছের চচ্চড়ি নিয়ে বাঙালি বড়ো বেশি আদিখ্যেতা করে, সেসবে খুব আসক্তি নেই তার। ভাজাভুজি হলে সবজিও চলে, কিন্তু সালাদকে সে গরু-ছাগলের খাদ্য মনে করে। নিজেকে সে মাংসাশী প্রাণী বলে পরিচয় দেয়।
শরীর ঠিক রাখার অজুহাতে খাবার নিয়ে কতো রকমের এক্সপেরিমেন্ট আজকাল, রানু নিজেও সে আন্দোলনের নির্ভীক সৈনিক। মেদহীন ছিপছিপে শরীরের মালিক বিজুর এসব না ভাবলেও চলে। কখনো যদি সেরকম সময় আসে, তখন দেখা যাবে।
আজ হঠাৎ হলো কী রানুর? না বলতেই বাসায় শাড়ি পরার মতো একটা দুর্লভ ঘটনা ঘটিয়েছে। যত্ন করে একটু সাজগোজও করেছে। টেবিলে বিজুর পছন্দের খিচুড়ি-গোমাংস। এমন নয় যে, এসব তার ভালো লাগছে না। খুবই ভালো লাগছে। কিন্তু নিজে থেকে সে আর এসব আশা করে না আজকাল। আশা না করাটা অভ্যাস হয়ে গেছে।
আরো বড়ো সমস্যা, এই যে ভালো লাগছে, বলা যাবে কেমন করে? সে কি বলবে, রানু, তোমাকে সুন্দর লাগছে! বড্ড ফাঁপা। আর কীভাবে বলা যায়? ভয়ও আছে, বললে আবার যদি উল্টো মানে হয়ে যায়? রানুর আগের কথাগুলো খাঁজকাটা ছুরির খোঁচার মতো বিঁধছে এখনো!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




