৮.
আমার ভালো কিছু একটা হোক, তুমি চাও না। তাই না?
ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষায় খুবই ভালো রেজাল্ট করেছিলো রানু। পড়াশোনায় সে বিজুর চেয়েও ভালো ছিলো, কিন্তু শেষ পরীক্ষার ফল সম্ভবত রানুর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। পরীক্ষার বেশ আগে থেকেই সে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলোতে লেখালেখি শুরু করেছিলো, বিজু জানতো। বিশেষ পাত্তা দেয়নি।
দিতে হলো রেজাল্টের মাস তিনেক পরে টেক্সাসের একটা ইউনিভার্সিটি থেকে রানুর মাস্টার্স করার জন্যে স্কলারশীপের ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেলে। বিজু চাকরিতে ঢুকেছিলো বিয়ের পরপরই। রানু স্কলারশীপের জন্যে লেখালেখির পাশাপাশি নিজেও চাকরির চেষ্টা করছিলো। কাগজপত্র আসতেই তা বন্ধ হয়ে যায়।
বিজু যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করে, ওভাবে না দেখে ভালো করে ভাবো। তুমি আরো পড়াশোনা করতে বাইরেই যদি যাবে, আমরা বিয়ে পরেও করতে পারতাম। তুমি আমেরিকায় যাবে, আমি এখানে - কেমন হচ্ছে ব্যাপারটা?
কথা হচ্ছিলো রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। বিজু দু'হাত ভাঁজ করে মাথার নিচে দিয়ে চিৎ হয়ে শোয়া। রানু ডান কাত হয়ে, বিজুর দিকে মুখ।
আমি তো তোমাকেও সঙ্গে যেতে বলছি।
ওরা স্কলারশীপ তোমাকে দিয়েছে, আমাকে নয়।
রানু বলে, গিয়ে চেষ্টা করলে তোমার পড়াশোনারও একটা ব্যবস্থা করা যাবে, আমি ঠিক জানি।
তোমার জানাটা ভুলও হতে পারে, রানু।
যদি লেখাপড়ার ব্যবস্থা না হয়, তোমার নিজের লাইনে কাজকর্ম খুঁজে নিতে পারবে।
বিজু মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বলে, আমার জন্যে কি ওরা চাকরি নিয়ে বসে আছে?
রানু হাসে না, তুমি আগে থেকেই এরকম কথা বললে কী করে হবে? গিয়ে চেষ্টা তো করা যায়।
রানু, তুমি কি বুঝতে পারছো, এটা ঠিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের মতো ব্যাপার নয়? আমাকে যেতে হলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানকার পাট গুটিয়ে যেতে হবে। আমি বলছি না যে, এই চাকরি আমার জীবনের মোক্ষ। কিন্তু এটা আমার ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িত। তোমার লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর ফিরে এসে আবার নতুন করে আমাকে শুরু করতে হবে, তা ভেবে দেখেছো?
না-ও ফিরতে পারি। একেবারে চলে গেলে ক্ষতি কী?
এই ভাবনার সঙ্গে বিজুর পরিচয় ছিলো না। বন্ধুরা অনেকে বিদেশে চলে গেছে, কেউ কেউ চেষ্টায় আছে। কিন্তু নিজে দেশের বাইরে কোথাও স্থায়ীভাবে চলে যাবে এমন কোনোদিন সে ভাবেইনি।
বলে, লাভ-ক্ষতির কথা জানি না, তবে এতে আমার সায় নেই।
ছেলেভোলানোর কায়দায় রানু হঠাৎ বিজুর গলা জড়িয়ে ধরে খুব মিষ্টি গলায় বলে, আমি বললেও না?
রানু, তুমি বোঝার চেষ্টা করো। ঝোঁকের মাথায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
ঝোঁকের মাথায় বলছি না। চিঠি লেখালেখির শুরু থেকেই জানি, আমি এ দেশে থাকবো না।
কিন্তু এর মধ্যে এখন আর শুধু আমি বলে কিছু নেই, আমরা বা আমাদের।
রানু হাল ছাড়ে না। গাঢ় গলায় বলে, আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?
নিজেকে আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে নেয় বিজু। বলে, তার মানে আমি না গেলেও তুমি যাচ্ছো, এই তো?
হ্যাঁ। তুমি যেতে চাও কিনা, সেটা তোমার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।
আমি যদি যেতে না চাই তাহলে আমাদের সম্পর্কটা কোথায় যাচ্ছে ভেবে দেখেছো?
রানু স্পষ্ট গলায় জানায়, তোমাকে ছেড়ে একা যাওয়ার কথা কিন্তু আমি একবারও ভাবিনি, বলিওনি। যা কিছু ভেবেছি, দু'জনকে নিয়ে। এখন তুমি যদি আমাকে একা ছেড়ে দাও, তার জন্যে আমি দায়ী হতে যাবো কেন?
ছোটোবেলায় একবার নানাবাড়ির ঘাটে বাঁধা নৌকায় বসে একা একা বৈঠা নিয়ে খেলা করছিলো বিজু। ঘাটে আর কেউ ছিলো না। হঠাৎ হাত ফসকে বৈঠা পানিতে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ে তুলতে গিয়ে নিজে পানিতে পড়ে গিয়েছিলো সে। সাঁতার তখনো জানে না বিজু। কেউ একজন ঘাটে আসছিলো তখন, দেখতে পেয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটা তাকে তুলে এনেছিলো।
কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার, কিন্তু নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে যেতে সে টের পেয়েছিলো, দম বন্ধ হয়ে আসা জিনিসটা কী। এখন রানুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেই অনুভূতিটা স্পষ্ট মনে আসে বিজুর।
বিজু শ্বাস ফেলে বলে, কিন্তু যাওয়ার সিদ্ধান্তের দায়িত্বটা তোমার। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো তুমি একাই। কথা বলে দু'জনে ভালোমন্দ যাচাই করে ঠিক করা যেতো।
আমার পড়াশোনার ব্যাপারে একটা সুযোগ এসেছে, আমাদের ভবিষ্যৎ ভেবেই সেটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। তোমাকে নিয়েই যেতে চেয়েছি। তুমি না কোরো না, প্লিজ। সময় আছে হাতে, ভেবে দেখো।
রানু এগিয়ে এসে বিজুর বুকে মাথা রাখে। বিজু টের পায়, একটা চোরা স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছে। অসহায় একটা বোধ তাকে অবশ করে দিচ্ছে।
মুরুব্বিরা সবাই এক গলায় বলে, সুযোগটা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এরকম সুযোগ প্রতিদিন আসে না, আর পায়ই বা ক'জন? একবার গেলে বিজু নিজেও লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে পারবে।
বিজুর আর পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু রানু একা চলে যাবে তা-ও ঠিক মনে হয় না। দাম্পত্য বিচ্ছিন্ন থাকার জন্যে নয়, একত্রে বসবাসের বাসনা থেকে মানুষ বিয়ে করে।
বিয়ের আগে এই স্কলারশীপের ব্যাপারটা ঘটলে কী হতো? বিয়ে স্থগিত হয়ে যেতো? অপেক্ষার সময়টা দীর্ঘ হতো শুধু?
বিজু জানে, কোনোকিছুই পাল্টাতো না, বিয়েটা অনিবার্য ছিলো। তখন রানু যাওয়ার আগে বিয়ে সেরে ফেলতে চাইতো তারা দু'জনেই এবং ফলাফল এখন যা হতে যাচ্ছে তাই হতো। আমেরিকা যাত্রায় রানুর সঙ্গী না হয়ে বিজুর উপায় কী?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




