.

১। বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু
এ বইটি এ বছরে পড়া সেরা দু'তিনটি বইয়ের একটি। বিভক্ত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহললাল নেহরু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দায়ে জেলে থাকা অবস্থায় নিজের কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৩১ সাল থেকে নিয়ে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যে ১৯৬ টি চিঠি লেখেন, সে চিঠিগুলোর সংকলন এ বই। পৃষ্ঠা সঙ্খ্যা ১০০৯। আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশনা।
এই ইতিহাস বইটির বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে নিয়ে ধারাবাহিক বর্ণনায় তিনি ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এসে পৌঁছান। তবে এই বর্ণনা এমন যে, ধরুন, খৃষ্টপূর্ব ৩০০ শতকে সারা পৃথিবীর কি অবস্থা ছিল, সে ব্যাপারে একটা অভারঅল ধারনা তিনি দেন পরপর পাঁচটি চিঠিতে। এমন নয় যে প্রথমে ভারতবর্ষের দুহাজার বছরের ইতিহাস লিখলেন, তারপর চীনের ইতিহাস, তারপর ইউরোপের, তারপর আরবের। একই সঙ্গে একটা শতক জুড়ে কি চলছে গোটা পৃথিবীতে তার একটা সামগ্রিক বর্ণনা এই বইয়ের বিশেষত্ব।
.
বাঙ্গালী মুসলমান পরিবারের সন্তান আমি। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলতে পারি, নেহরু এই ইতিহাসের বইয়ে বায়াজড মতামত দেন নি। তার ক্ষোভ ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে, আর দুরন্ত আকর্ষণ ছিল সোভিয়েত বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের প্রতি। এ দুটো বিষয় তার অবস্থান বরাবর স্পষ্ট ছিল। ইদানীংকার জেনোফোবিক ইতিহাসের বর্ণনা তার বইয়ে নেই। বরং তাকে আফসোস করতে দেখেছি, মুসলিম শাসনের অধীনে ভারত যদি এলোই, তবে সেটা তুর্কী মুসলিমদের অধীনে কেন হল। তুর্কীদের বদলে যেই আরবরা ইউরোপের রেনেসাঁকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেছে, তাদের সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার পরিচয় হলে তা উভয় জাতির জন্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের জন্যে একটা সুবর্ণ সুযোগ হত।
.
১০০০ পৃষ্ঠার বইয়ের এর চে সংক্ষেপে রিভিউ লেখা সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে চোখ বোলানোর জন্যে দারুণ এক বই এটি।

২। রামকৃষ্ণের জীবনী - রোমো র্যোলা
.
এ বছর একটা বড় সময় আমার কেটেছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অধ্যায়নে। নিজের ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্ম, এবং তাদের ধর্ম প্রচারকদের জীবন নিয়ে পড়েছি একটা লম্বা সময় ধরে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কমিয়ে আনতে আমাদের পারস্পারিক এ বোঝাপড়া আমি জরুরী বলে মনে করি।
.
রোমো র্যোলা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, এবং তার শ্রেষ্ঠ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে ফরাসী ভাষায় দুটো জীবনী লেখেন। সেটার প্রথমটির বঙ্গানুবাদ পড়েছি এ মাসে। বঙ্গঅঞ্চল গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদের সূতিকাগার হলেও এখানে বামাচারী, শাক্তের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিল না। রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্ম - বেড়ে ওঠা - ভারতের বিবিধ অঞ্চলের হিন্দুধর্মের বড়বড় সংস্কারক, আদি ব্রাহ্ম সমাজের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্মসমাজের আর এক সেক্টের প্রধান কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে মতাদর্শের আদান প্রদান, ছাত্র নরেনের তার সংস্পর্শে এসে স্বামী বিবেকানন্দে পরিণত হওয়া ইত্যাদি বেশ চিত্তাকর্ষক গল্পের আকারে লেখা বইটিতে।
.
একই সময়ে ভারতে দেওবন্দী মুভমেন্ট চলছিল। ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকেদের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের যদি সাক্ষাতের কোন ঘটনা থেকে থাকে তার বর্ণনা মিস করেছি এই বইয়ে। অথবা, ইসলামের ইস্যুটিকেও বা তিনি কিভাবে ডিল করেছেন, তার সরাসরি কোন বর্ণনা নেই, যা থাকা প্রাসঙ্গিক ছিল। কেননা, আমাদের হিন্দু বলি , বা মুসলিম, বা বৌদ্ধ - আমাদের ধর্মীয় আইডেন্টিটির অনেকাংশই গড়ে উঠেছে একে অপরের ঘাতে প্রতিঘাতে। বাংলা অনুবাদকের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়ও প্রায়ই মূর্ত হয়ে ওঠে বইটির অনুবাদে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী দারুণ লেগেছে সব মিলিয়ে। ওনার গভীরতা, মেটাফোর ব্যবহার করে জীবনকে বোঝানোর সক্ষমতা ছিল দারুণ।

৩। মুইনুদ্দিন চিশতী - মেহরু জাফর
.
নেক নিয়তে ভুল কায়দায় লেখা একটি বইয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ বই।
.
মেহরু জাফর পেশায় একজন সাংবাদিক, এবং তার এ বই লেখার পেছনে ইচ্ছে মূলত এটা ছিল যে - খাজা মুইনুদ্দিন চিশতী রাহিমাহুমুল্লাহ কিভাবে তুর্কী আক্রমণের সময়েও ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন, এটা দেখানো। দিল্লী ও আজমিরের সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহানকে মহান করে দেখানোর একটা প্রচেষ্টা এই বইয়ে আছে, যা আমি চেষ্টা করেছি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবার। কারন, আমাদের ধর্মীয় ন্যারেটিভের যে বইই পড়ি না কেন, অধিকাংশতেই জেনোফোবিয়ার চর্চা দেখা যায়। মানে, মুসলিম ইতিহাসবিদ লিখছেন মানেই সেন - বর্মণ সব বাদশাহরাই অত্যাচারী। আবার হিন্দু ইতিহাসবিদরা লিখছেন তো, মুসলমানেরা এসেছে কেবল মন্দির ধ্বংস করতে, তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে। এই তো আমাদের টিপিক্যাল বর্ণনা। কিন্তু হিন্দু হোক বা মুসলিম, সম্রাট সবাই যে দোষেগুনেই মানুষ, সবারই কিছু গুণ, কিছু দোষ ছিল - এটা মেনে নিয়ে ইতিহাস পাঠের প্রবণতা থেকে আমরা দূরে। অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা, যে সবাইকে নিজ নিজ কন্টেক্সট থেকে বোঝার প্রচেষ্টা, হয়তো আমাদের মধ্যে হানাহানি, বিবাদ আর একটু কমিয়ে আনত।
.
কিন্তু সমস্যা বাঝে, যখন লেখিকা উপন্যাস রচনার মত গল্প তৈরি করা শুরু করেন। দেখান যে তুর্কী সেনাপতিরা এসে মইনুদ্দিন চিশতী রঃ এর মত একজন বড়মাপের সন্ন্যাসী - বুজুর্গকে মেরে আধমরা করে ফেলে রাখেন। একজন রাজপুত নারী এসে খাজাসাহেবকে উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে ভাবভালোবাসার উদয় হয়। তারপর তারা পরিনয় বন্ধনে আবদ্ধ হন। খাজা সাহেব নাকি কখনো তার স্ত্রীকে ধর্ম পরিবর্তন করতে বলেন নি। দেখানো হয়, খাজাসাহেব শিয়া অরিজিনের বুজুর্গ।
.
লেখিকা মাঝেমাঝেই মইনুদ্দিন চিশতী রঃ এর হয়ে চিন্তা করার, সংলাপ তৈরি করার চেষ্টা করেন, যেটা আমার কাছে এই বুজুর্গকে অসম্মান করা মনে হয়েছে। আমার মত হল এই যে, যেকোনো ধর্মীয় মহাপুরুষ, যারা কালোত্তীর্ণ, তাদের মননে - মস্তিষ্কে ঢোকার মত মেধা আমার - আমাদের নেই। তাদের হয়ে সংলাপ রচনা করবার চেষ্টাটাও, যদি কোন ঐতিহাসিক সত্যের উপর ভিত্তি করে না হয়ে থাকে, তবে তা কেবল ধৃষ্টতাই।
.
খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, মইনুদ্দিন চিশতী রঃ আধ্যাত্মিক কি বাণী এই বইয়ে লেখিকা উল্লেখ করেন। হতাশ হতে হয়েছে। রেজা আসলান, বা তারেক রামাদানের নাম আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুনে থাকবেন। লেখিকা রেজা আসলান, তারেক রামাদানের বিবিধ বই থেকে সূফীবাদের নানা ব্যাখ্যা হাজির করে পরে এটা জুড়ে দিয়ে দায় সেরেছেন যে - মইনুদ্দিন চিশতীরো নিশ্চয়ই ধারণা অনুরূপ কিছুই ছিল। রেজা আসলান, আর তারিক রামাদানের মতবাদ যদি আমি জানতে চাই, তাহলে তা তাদের বই সরাসরি পড়েই শেখা সম্ভব। এভাবে কেন?
.
কোরআন, বা রাসুল সঃ সংক্রান্ত মইনুদ্দিন চিশতী রঃ এর কোন মতামত, কোন ব্যাখ্যা এই বইয়ে নেই। বইয়ের শেষে দেয়া রেফারেন্সের ৯৯% ইংরেজ লেখকদের ইতিহাস ভিত্তিক বই। ভারত - ইরান - আফগানিস্তান - তুর্কী - আরব কোন লেখকের বইয়ের রেফারেন্স এই বই লেখার সময় ব্যবহার করা হয় নি।
.
এই বই পড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ইসলাম/সুফিজম সংক্রান্ত ইংরেজিতে লেখা কোন বই আর কখনোই কিনব না, যদি না তা প্রথাসিদ্ধ স্কলারের লেখা বই, বা তার অনুবাদ না হয়ে থাকে।

.
৪। আহমদ ছফা উপন্যাস সমগ্র - মাওলা ব্রাদার্স
.
আহমদ ছফার এ বইয়ে ওনার ৮ টি উপন্যাসই আছে, আমি পড়ে সারতে পেরেছি ৭ টি। ওনার ওঙ্কার, গাভী বিত্তান্ত - ইত্যাদি উপন্যাস তো বিখ্যাত, সবাই তার নাম জানে। একই সঙ্গে পড়লাম ওনার একজন আলী কেনান, মরণ বিলাস, অলাতচক্র, এবং পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পূরাণ। আমার বরং সবচে পছন্দ হয়েছে ওনার লেখা একদম প্রথম উপন্যাস - সূর্য তুমি সাথী। কারন ছফার বাকি সবগুলি উপন্যাসে ছফা প্রায় সশরীরে হাজির। সূর্য তুমি সাথী উপন্যাসের কাহিনীই খানিকটা কাল্পনিক। ফিকশনাল। অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরীটা এখনো পড়া হয় নি। এই উপন্যাস পড়েই ছফাকে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নারী বিদ্বেষী বলেছিলেন।
.
ছফার ফেমিনিজম নিয়ে নয়, বরং এই বাংলায় নারীবাদের চর্চা যেভাবে হয়েছে, যে এলিট ক্লাস নারীবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের নিয়েই মনে হয় আপত্তি ছিল। এছাড়াও ছফা সাংঘাতিক রাজনীতি সচেতন লেখক ছিলেন, এতে তো কোন সন্দেহ নেই। এরশাদ, বা বিএনপি সরকারের আমলে তিনি আওয়ামী লীগ, বা বঙ্গবন্ধুর এমন সব সমালোচনা করেছেন, তার উপন্যাসগুলিতেই (একজন আলী কেনান, বা অলাতচক্র), যেটা তিনি পরবর্তীতে করলে সম্ভাবনা ছিল তাকে দেশদ্রোহী ঘোষণা দেবার। ছফার উপন্যাসগুলো অতোটা আলোচনায় নেই, যতটা তার বাঙ্গালী মুসলমানের মন, বা বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসের মত প্রবন্ধসমূহের আছে, এটা একদিক থেকে ছফার জন্যে ভালোই।
.
ছফার উপন্যাস আমার ভালো লাগে নি, এই কারনে যে, এগুলো পড়লে মনে হয় ছফার ডায়রি পড়ছি। যেভাবে প্লট তৈরি করে জমিয়ে গল্প বলেন ইলিয়াস, বা হাসান আজিজুল হক, অথবা শহিদুল জহির - তার কোন প্রচেষ্টা ছফার মধ্যে দেখা যায় না। ছফা তার প্রবন্ধেই অনন্য, ক্ষুরধার, মননশীল।
.

৫। হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতি - গোলাম মুরশিদ
.
স্রেফ বাঙ্গালী জাতির ইতিবৃত্ত পড়বার জন্যেই বইটি কেনা, এবং একটু একটু করে পড়ে চলা। ৫২০ পৃষ্ঠার এ বইয়ের ৪/৫ অংশ পড়ে শেষ করেছি। শেষ দুটো চ্যাপ্টার এখন বাকি। প্রথমা পুরস্কারে ভূষিত বইটার সমস্যা বলুন, আর গুণ বলুন, সেটা এটাই যে - এত এত তথ্য এতে ঠেসে পোরা, দাগিয়ে - নোট নিয়ে পড়তে পড়তে মাথা ঘুলিয়ে যায়। নীহাররঞ্জন, বা দীনেশচন্দ্র সেনের ইতিহাস বইয়ের সঙ্গে এই বইয়ের একটা তফাৎ হল - মুরশিদ সাহেব এখানে ধারাবাহিক ইতিহাসের বর্ণনায় না গিয়ে বাঙ্গালী সংস্কৃতির এক একটি অনুষঙ্গ তুলে ধরে তার ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেমন বাঙ্গালীর ভাষা, বাঙ্গালীর পোশাক, বাঙ্গালীর ধর্ম, বাঙ্গালির পালা পার্বণ, বাঙ্গালীর খাবার, বাঙ্গালীর প্রেম ও বিয়ে - এরকম।
.
সংগ্রহে রাখা, এবং একটু একটু করে নিয়মিত পড়ে চলার মত একটি বই। পশ্চিমবঙ্গে মুরশেদ সাহেবের প্রতিষ্ঠা আছে বলে বাংলাদেশে ফরহাদ মজহার, বা সলিমুল্লাহ খান সাহেব মুরশেদ সাহেবের ওপর বেশ বেজার। ফরহাদ মজহারের ভাবান্দোলন বইটি পড়েছি এ বছর। এ বইটির প্রথম ৬০ পাতা নিয়ে যে সূচনা - তার একটা বড় অংশ মুরশেদ সাহেব, আর তার এ বইয়ের সমালোচনা করে। হাজার বছর পূর্বে বাঙ্গালী জাতির অস্তিত্ব ছিল কিনা, বাংলা ভাষা বলতে আজ যা বোঝায়, তার অস্তিত্ব ছিল কিনা এ ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে বারবার। আগ্রহী পাঠককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুদিকের বয়ান পড়েই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

