
জানো?
আজ তোমাকে দেখেছিলাম।
নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর ভিড়ে।
তুমি হয়তো আমাকে দেখোনি, অথবা দেখেও চিনতে পারোনি।
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলাম।
তোমার হাতে তখন একটা বই।
মাঝে মাঝে পাতাগুলো উল্টাচ্ছিলে, আর দোকানের ওপর ঝুলে থাকা হলুদ আলোটা তোমার মুখের ওপর এসে পড়ছিল।
অদ্ভুত ব্যাপার জানো? সেদিন নীলক্ষেতে যত বই ছিল, আমার চোখ আটকে ছিল শুধু তোমার ওপর।
আমি কাছে যেতে চেয়েছিলাম। ভীষণ।
মনে হচ্ছিল, আর কয়েকটা পা এগোলেই তোমার পাশে দাঁড়াতে পারব।
হয়তো বলব, “এই বইটা কি ভালো?”
তারপর তুমি হয়তো বইটার প্রচ্ছদ দেখিয়ে বলবে, “জানি না, পড়িনি এখনও।”
ব্যস, সেখান থেকেই হয়তো একটা গল্প শুরু হয়ে যেত।
কিন্তু আমি এগোইনি। কেন জানো?
কিছু মুহূর্তকে খুব কাছে গেলে হয়তো নষ্ট হয়ে যায়।
তোমাকে দূর থেকে দেখে যে অনুভূতিটা হচ্ছিল, সেটা এত সুন্দর ছিল যে সাহস হলো না তার মধ্যে বাস্তবতার শব্দ ঢুকিয়ে দিতে।
তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তোমাকে দেখছিলাম।
তুমি বই দেখছিলে, আমি তোমাকে।
তুমি হয়তো কোনো গল্প খুঁজছিলে, আর আমি সেই মুহূর্তটার ভেতর আমার একটা গল্প খুঁজে পেলাম।
জানো, নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোতে একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে।
পুরোনো কাগজের গন্ধ।
সেই গন্ধের সঙ্গে সেদিন তোমার চুলের একটা অচেনা সুবাস মিশে গিয়েছিল।
আজও মনে হচ্ছে, পৃথিবীর কোনো বইয়ে সেই গন্ধটা লেখা নেই।
তুমি যখন দোকান থেকে বেরিয়ে গেলে, আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তোমার চলে যাওয়ার দিকটায় তাকিয়ে।
ইচ্ছে করছিল দৌড়ে যাই, ডাকি, বলতে চাই—
“শোনো, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা ছিল।”
কিন্তু কী কথা ছিল, সেটা তখনও জানতাম না, আজও জানি না।
হয়তো কোনো কথা ছিলই না।
হয়তো শুধু বলতে চেয়েছিলাম— তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছিল।
হয়তো বলতে চেয়েছিলাম— তোমাকে দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীটা এখনও পুরোপুরি সুন্দর হয়ে যায়নি।
হয়তো বলতে চেয়েছিলাম— একদিন কি আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বই কিনতে পারি?
তুমি তোমার পছন্দের বইটা নেবে, আমি আমারটা।
তারপর দুজনেই দোকান থেকে বেরিয়ে বুঝব— আমরা দুজন আসলে একই বই কিনেছি।
শুধু শেষ পাতাটা কেউ পড়েনি।
আজ ভাবছি, সেদিন যদি কাছে যেতাম?
যদি কথা বলতাম? যদি তুমি হাসতে? যদি আমিও হাসতাম?
যদি সেই ছোট্ট কথোপকথনটা সত্যিই কোনো গল্পের প্রথম লাইন হয়ে যেত?
জানি না।
জীবনে কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় খুব অদ্ভুতভাবে।
তারা আসে, একটু দাঁড়ায়, আমাদের ভেতরে একটা দরজা খুলে দেয়—তারপর চলে যায়।
আমরা সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। ভেতরে ঢুকতে পারি না, বেরিয়েও আসতে পারি না।
আজ রাতে তাই একটা অদ্ভুত আফসোস হচ্ছে।
তোমার সঙ্গে কথা না বলার জন্য নয়, তোমার কাছে না যাওয়ার জন্যও নয়।
আফসোসটা অন্যরকম।
আফসোস হচ্ছে—
নীলক্ষেতের সেই বিকেলে,
আমি জানতাম না যে তোমাকে দেখাটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ অসম্পূর্ণ একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে।
তাই চিঠিটা লিখে রাখলাম।
যদি কোনোদিন আবার নীলক্ষেতের কোনো বইয়ের দোকানে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়,
এবার আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকব না।
কাছে যাব।
শুধু একটা কথা বলব—
“সেদিনও তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
তুমি হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, “কী কথা?”
আমি তখন একটু হেসে বলব—
“মনে নেই।”
তারপর তোমার সঙ্গে একটা বই কিনতে যাব।
কারণ কিছু গল্প পড়ে শেষ করার জন্য নয়,
কিছু গল্প... শুরু করার জন্য
— স্বপ্নবাজ সৌরভ
চিঠি ০২ : নীলক্ষেতের চিঠি
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


