
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ারকে। বিশেষ করে Logan ছবিটার কথা।
একজন বৃদ্ধ মানুষ। স্মৃতি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। অথচ এই মানুষটাই একসময় অসংখ্য মানুষের মনে পৌঁছে যেতে পারতেন। মানুষের ভেতরের অন্ধকার দেখেও যিনি বিশ্বাস করতেন, কোথাও না কোথাও একটু আলো এখনো বেঁচে আছে।
লোগানের ভেতরেও।
লোগান মানুষটাকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর কাছে তার আর কিছু চাওয়ার নেই। রাগ, ক্লান্তি আর একাকিত্বের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে সে। অথচ চার্লস তাকে অন্যভাবে দেখেন। লোগান নিজেকে যতই শেষ হয়ে যাওয়া একজন মানুষ ভাবুক, বৃদ্ধ প্রফেসর তাঁর মধ্যে এখনো সম্ভাবনা দেখতে পান।
এই সম্পর্কটার মধ্যে কী অদ্ভুত একটা মায়া আছে!
চার্লস লোগানকে শুধু উপদেশ দেন না। তিনি তার পাশে থাকতে চান। তার সঙ্গে কথা বলতে চান। কখনো লোগানের বিরক্তি সহ্য করেন, কখনো তার রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকু বুঝতে চেষ্টা করেন।
আর লোগান?
সে হয়তো মুখে কিছুই প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু মানুষটার জন্য তার যে টান, সেটা অস্বীকার করারও উপায় নেই।
Logan দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়েছে, চার্লসের সঙ্গে লোগানের আরও কিছুটা সময় পাওয়া উচিত ছিল। আরও কিছু কথা, আরও কিছু একসঙ্গে বসে থাকা। কোনো বিপদ নেই, কোনো তাড়া নেই। শুধু একজন বৃদ্ধ কথা বলছেন, আর একজন ক্লান্ত মানুষ বিরক্ত মুখে শুনছে।
অথচ সে উঠে চলে যাচ্ছে না।
চার্লস হয়তো একদিন তাকে বলতেন—
— লোগান, তুমি কি কখনো ভেবেছ, সব সময় শক্ত থাকারও তো একটা ক্লান্তি আছে?
লোগান হয়তো মুখ ফিরিয়ে বলত—
— আপনি আবার শুরু করলেন, প্রফেসর।
— তোমাকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়।
— আমার জন্য চিন্তা করা বন্ধ করুন।
চার্লস হয়তো মৃদু হাসতেন।
— চেষ্টা করেছি, লোগান। পারিনি।
কথাগুলো সিনেমার সংলাপ নয়। তবু তাঁদের সম্পর্কের কথা ভাবলে এমন কথাই মনে আসে।
কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছ থেকে আমরা পালিয়ে বেড়াই, অথচ তাদের কাছেই ফিরে আসতে ইচ্ছে করে। তারা আমাদের দুর্বলতা জানে, আমাদের ব্যর্থতা জানে, আমাদের সমস্ত রাগের কারণ জানে। তবু তারা আমাদের ছেড়ে দেয় না।
চার্লস লোগানের কাছে তেমনই একজন মানুষ ছিলেন।
তাই ছবিটার শেষের দিকে এসে শুধু একজন বৃদ্ধের অসহায়তা মনে পড়ে না। মনে হয়, লোগানের কত কথা বলা বাকি থেকে গেল। কত কথা হয়তো সে কোনো দিন বলতেই পারবে না।
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, প্রিয় মানুষগুলো তো আছেনই। আজ না হয় কথা হলো না, কাল হবে। আজ না হয় পাশে বসা হলো না, আরেক দিন বসব।
তারপর একদিন সেই আরেক দিনটা আর আসে না।
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে মনে পড়লে আমার তাই শুধু একজন অসাধারণ অভিনেতার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে তাঁর কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে ওঠা সেই বৃদ্ধ মানুষটাকে, যিনি নিজের সমস্ত অসহায়তার মধ্যেও লোগানের জন্য মায়া বুকে ধরে রেখেছিলেন।
মনে হয়, চার্লসকে আরও কিছু কথা বলার ছিল।
হয়তো লোগানেরও।
কল্পনা করি, কোনো এক নিরিবিলি বিকেলে দুজন আবার পাশাপাশি বসে আছেন। চার্লস কথা বলছেন। লোগান চুপ করে শুনছে। আজ তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।
চার্লস একবার তার দিকে তাকালেন।
— লোগান, তুমি থাকবে তো?
লোগান উত্তর দিল না।
শুধু বৃদ্ধ মানুষটার পাশে বসে রইল।
আমি জানি, এ দৃশ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। সিনেমার পর্দায় তাঁদের আর নতুন করে ফিরে পাওয়া যাবে না। তবু মনে মনে চাই, চার্লসের জন্য এমন একটা বিকেল থাকুক, যেখানে তাঁকে আর কোনো কষ্ট সহ্য করতে হবে না। আর লোগানের জন্য থাকুক এমন কিছু সময়, যখন তাকে কাউকে হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে না।
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে ধন্যবাদ, প্রফেসর জেভিয়ারকে আমাদের এতটা আপন করে দেওয়ার জন্য।
কিছু চরিত্রকে আমরা শুধু ভালোবাসি না। তাদের গল্পের ভেতরে নিজেদেরও কোথাও খুঁজে পাই। তাদের বিদায়ের সময় তাই কষ্টটা ঠিক কোথায়, তা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারি না।
চার্লস, তোমাকে আরও কিছু কথা বলার ছিল।
আর লোগান যদি কোনো দিন আবার তোমার পাশে বসে, তাকে আর কিছু বলতে হবে না।
তুমি তো জানোই, সে তোমাকে কতটা আপন করে রেখেছিল।
কারণ কল্পনায় আমিও লোগান ছিলাম।
পর্দা অন্ধকার হয়ে গেছে, চার্লস।
এবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না।
— স্বপ্নবাজ সৌরভ
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




