
- ক’টা বাজলো ?
- কয়টা দরকার আপনার ?
- নাহ..... আমার তেমন দরকার নেই শুধু পৃথিবীটা কদ্দুর বুড়ো হলো এটা জানা যেতো একটু। সাথে আমি আপনি......
- পৃথিবীটা কদ্দুর বুড়ো হলো মানে ? আপনার কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে? ঘড়িতে কয়টা বাজে এটা জানতে চায় মানুষ সময় জানতে। আপনি তো অদ্ভুত.....
- কি বললেন, অদ্ভুত? অ....মানে বলতে চাইছেন, অদ্ভুত একটা কথা বলে ফেলেছি এইতো? নাকি পাগল কিসিমের ?
- হুমমমম...... অদ্ভুত না তো কি! পাগল কিনা, দেখেতো মনে হয়না!
-কি করবো ভাইসাব? অদ্ভুত তো আমরা সবাই-ই। এই যেমন আপনি আমার প্রশ্নের জবাবে মশকরা করে বললেন, আমার কয়টা বাজার দরকার। এটাও অদ্ভুত না? এক সময় আমরা মানুষেরাই তো ঘড়ি বানিয়েছিলাম আর এখন সে ঘড়িই আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই যে সাত সকালে আপনি ছুটছেন, ছুটছি আমিও। আর সেটা ঘড়ি দেখেই তো? ঘড়ির তালে তালে। ঐশ্বরিয়ার তাল ছবিটা দেখেছেন ? তাল সে তাল মিলাও......
-কেন ? ছবির সাথে আপনার কথার কি সম্পর্ক? এইমাত্র আপনিই না বললেন, আপনার নাকি কয়টা বাজলো তা জানার তেমন দরকার নেই? তাহলে জানতে চাইলেন কেন ? মনে হচ্ছে, আপনি বোধহয় তাল ছাড়া বেকার.....
-অনেকটা ঠিকই ধরেছেন। বেকার না হয়ে উপায় কি? বেকার হওয়া বাধ্যতামূলক। ঐ যে, কাগজের নোটের উপরে লেখা থাকেনা - চাহিবামাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে; তেমনি এ দেশে জন্মগ্রহন করিলেই বাধ্যতামূলক বেকার থাকিতে হইবে.....
- হা.....হা... হা...... বাধ্যতামূলক বেকার.......................
- হাসলেন ? ভালো ! নির্মল হাসি কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কিন্তু হাসবেন কোথায় বসে ? নির্মল একটা হাসি দেয়ার মতো কোনও নির্মল জায়গা আছে দেশে ? তা, বাংলাদেশের এইটুকুন জায়গায় কতো লোক, জানেন ? প্রতি বর্গমাইলে দুই হাযার আটশো নব্বই জন। ভাবতে পারেন ? এতো লোকের চাকরী দেবেন কোত্থেকে? চাকরীর জায়গাই বা কই? একটা সরকারী পোস্টের জন্য যেখানে সাতশো লোকে দরখাস্ত দেয় সেখানে চাকরী কই!
দেশটা তো আবার কৃষি প্রধান। তা কৃষির জমিই কি আর আছে? সব তো বসতবাড়ীতে শেষ। সব যদি কৃষিজমি হয় তা হলে লোকে থাকবেই বা কই? বাকী যা আছে তা দখলটখল করে তো আপনারা আবার ইটভাটা, স্বপ্নের আবাসিক এলাকা, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ মাদ্রাসা ঐসব কি কি যেন বানিয়ে কৃষিজমির বারোটা বাজিয়েছেন।
-বাহ.... আপনি তো দেখছি ভাইজান আউলা-ঝাউলা টাইপের লোক। রাজনীতি-টিতি করেন টরেন নাকি! না কি অন্য কোনও ধান্ধা আছে?
-ছি...ছি..ছি... আপনি রাজনীতিবিদদের মতো আমাকেও ধান্ধাবাজ ভাবলেন? তেনারা তো স্বপ্ন বিক্রী করার ধান্ধা করেন আর বেকর্মা পাবলিক সেই স্বপ্ন কেনে .... আমিও ভাবছি কিছু স্বপ্ন কিনবো...
- ধুর মিয়া! খালি বেহুদা কথা!
-আমার কথাগুলোকে আপনি বেহুদা কথা বললেন ? ছোটবেলা স্কুলে পড়েন নাই - যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পেলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন? কি পড়েন নাই ? পড়েছেন ....পড়েছেন। এখন হয়তো মনে নাই। এগুলো এখন বেহুদা কথা মনে হলেও একদিন এইগুলোই অমূল্য রতনের মতো মনে হয়েছিলো, তাইনা? পরীক্ষার খাতায় ব্যাখ্যা লিখে পাশও করতে হয়েছিলো, ঠিক কিনা ?
- আরে...... রাখেন মিয়া যতো ফাইজলামি !
- কেন ভাইজান! এতে ফাইজলামির কি দেখলেন? আপনি কি কখনও স্বপ্ন দেখেন নাই ? একটা রাজপ্রাসাদের মতো সুন্দর বাড়ী, নুসরাত ফারিয়ার মতো সুন্দরী স্ত্রী, একখানা প্রাডো গাড়ী, দুপুরের লাঞ্চ রেডিসনে, রাত্তিরে গুলশানের কোনও হটস্পটে, ক্যাসিনোতে জুয়ার আড্ডায় লাখ লাখ টাকার কড়কড়ে নোট পকেটে, সর্দি হলেই সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথে........... কি দেখেন নাই?
সারা জীবনটাই তো নয়টা-পাঁচটা করে কাটিয়ে দিলেন, একটু স্বপ্নটপ্নও তো দেখা চাই। না কি দেখতে নাই? অবশ্য আপনি এসব কথা আমাকে বলবেন না। কেইবা বলে বলেন! এসব স্বপ্ন বুকের মধ্যে একলা একলা ঘাঁই মারে মাছের মতো। মনের সুখ তখন ঘাঁইয়ের জলের মতো একটু ঘুরপাক খায়। এটা লুকিয়ে রাখার জিনিষ। আমাদের মতো পাবলিকের, যাদের কিছুই করার নেই, লবন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের এইরকম স্বপ্ন দেখতেই সুখ...
- তা একদম খারাপ কিছু বলেন নি! তা আপনিও তো মনে হয় আরও ভালো স্বপ্ন দেখেন..
- তা তো রোজই দেখি । একেক দিন একেক রকম। ভালো কি মন্দ জানিনা। একদিন দেখি এরকম - সম্পূর্ণ আলাদা বন্য-নিয়মহীন- আলোহীন-পথহীন- গাঁথুনিহীন এক পৃথিবীর মাঝে আমি হেটে যাচ্ছি! হেটে যাচ্ছি রাজার বেশে, সাইকেল-রিক্সা-ভ্যান-ঠেলাগাড়ি-বাস-ট্রাকের সাথে পথচারীদের মতো গুতোগুতি করে। হেটে যাচ্ছি প্রধান ডাকঘরের দিকে। একটা চিঠি পোষ্ট করতে হবে -ভগবান ঈশ্বরচন্দ্রের ঠিকানায়। সমস্যাটা হলো তিনি আবার আমার আপনার মতো সাধারন ভিখারী পাবলিকের চিঠি খুলে পড়েন না। তার চাই জমকালো রাজা-বাদশাহদের চিঠি। তাহলেই তেনার দিলখোশ। সে কারনেই রাজার বেশে হেটে যাবার স্বপ্ন দেখি।
আবার আরেকদিন দেখি-আলাদিনের যাদুই চেরাগের এক ঘসাতেই, না...না একটা ঘসা না, মনে হয় তিন চার বার ঘসা দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছি। রসাতলে যাওয়া বন্য দেশটাকে সোজা করতে ঘোষনা দিয়েছি -যে কোনও ধরনের আইন-শৃঙ্খলা ভাঙার সর্বনিম্ন শাস্তি মৃত্যুদন্ড.... তা আপনি ফুটওভার ব্রীজের নীচ দিয়ে পথ পারাপার করলেই বা কি আর মানুষ খুন করলেই বা কি। নিম্নতম শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কোনও তদন্ত ফদন্ত নাই, স্বাক্ষপ্রমানের দরকার নাই ....
-কন কি ভাইজান ! সর্বনিম্ন শাস্তি মৃত্যুদন্ড হয় কি করে ? মৃত্যুদন্ডের চেয়ে বড় শাস্তি কি ? পাগল হলেন নাকি ?
-আরে........ হয় হয়। স্বপ্নে কতো কিছুই তো হয়। ব্রাশফায়ারে সরাসরি ফুট্টুস আর ফাঁসির দড়িতে খাসির মতো ঝুলিয়ে মারলে আইন ভঙ্গকারী ব্যাটা টেরই পায়না যন্ত্রনা কি জিনিষ। ঐ যে খবরের কাগজে, টেলিভিষনে দেখেন নাই, টেষ্ট ক্রিকেটের মতো টি-ব্রেক, লাঞ্চ ব্রেক দিয়ে ধীরে সুস্থ্যে আয়েশ করে বল পেটানোর মতো করে পিটিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারতে? অপরাধের ধরন বুঝে তেমন তেমন যন্ত্রনা দিয়েই তিলে তিলে মেরে ফেলা হবে বড় শাস্তি, যাতে আর কেউ কোন ধরনের অপরাধ করতে সাহস না পায় জিন্দেগীতে।
- বুঝলাম না ঠিক!
-এটাও বুঝলেন না? দাঁড়ান, বোঝাই। ধরুন, কেউ নদী ভরাট করে জায়গা দখল করলো। স্বপ্নে দেখলাম তাকে আর তার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে সহ সবাইকে বেঁধে এনে ঐ ভরাট জায়গাটকে আবার আগের মতো করে রাখার জন্যে হাতে শাবল-কোদাল ধরিয়ে দিয়েছি। একটু থামলেই পাছায় বেতের মার যতোক্ষন পর্যন্ত না নদী আবার আগের মতো হয় । যাতে তারা বুঝতে পারে, কি অপরাধ তারা করেছে। দিন রাত্তির চব্বিশ ঘন্টা এভাবে মাটি সরাতে সরাতে যদি তারা মরে যায়, বেঁচে গেলো নইলে কাজ শেষ হলে তাদের সবার হাতেপায়ে দড়ি আর ছয়খানা ইট তাতে বেঁধে নদীর ঐ জায়গাটাতেই ডুবিয়ে দিলাম। হাযার হোক, ঐ জায়গাতো তারাই দখল করতে বেছে নিয়েছিলো। এটা তো তাদের প্রাপ্য, তাইনা? মৃত্যুর স্বাদ কেমন তা হাড়ে হাড়ে এভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে ঐ সব বেজন্মাদের।
আর ফুটওভার ব্রীজের নীচ দিয়ে রাস্তা পারাপার করলে কাপড়চোপড় খুলে, হাতে দড়ি বেঁধে ওভারব্রীজের রেলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখতে হবে যতোক্ষন না হাত বা দড়ি ছিঁড়ে রাস্তার মাঝখানে ঝপাৎ করে পড়ে বাসের চাকায় মাথাটা ফট্টাৎ করে ফেটে না যায়।
-মিয়াভাই তো জব্ববর কইছেন।
-হ্যা...... এসব তরিকা হলো মৃত্যুদন্ডের সর্বোচ্চ ষ্টাইল, তিলে তিলে যন্ত্রনা দিয়ে মৃত্যু। আমার স্বপ্নে অবশ্য আরো কিছু তরিকা আছে............
-তা ভাইসাহেব আপনার মাথাটাথা ঠিক আছে তো ?
-কেন থাকবেনা ? মাথাটা ঠিক আছে বলেই তো হাতের কিছুটা সময় আপনার সাথে কথা বলে কাটালাম। আমার বন্ধু ইকবালের এখানে আসার কথা ছিলো সকাল নয়টায়। হারামজাদা লেট করছে, সময় মতো আসছেনা বলেই তো আপনাকে ধরে রাখা। একা একা চুপচাপ অপেক্ষায় থাকা কি কারো ভালো লাগে ?
- অহ....... আ.......আপ........আপনি আমাকে বেহুদা কথা শুনিয়ে এতোক্ষন আটকে রাখলেন ? আপনি নিজেই তো তাহলে বড় একটা হারামজাদা।
-জ্বী ভাইজান, আমরা সবাই এক একটা হারামজাদা, কেউ বড় কেউ ছোট, নইলে সব কিছু দেখেশুনেও এমন চুপচাপ থাকি? ঐ যে পত্রিকাওয়ালারা বড় বড় হেডলাইনে লিখছেনা - চাঞ্চল্যকর তথ্য- রিমান্ডে নেয়া অমুকের জবানবন্দিতে রাঘব বোয়ালদের নাম ফাঁস ? লিখছে তো ? কিন্তু রাঘব বোয়ালদের নাম কোনও পত্রিকাতে ছাপা হতে দেখেছেন ? বাটি চালান দিয়েও তাদের নাম পাবেননা। জবানবন্দির দাড়ি-কমা-সেমিকোলন সহ সব কথা ছাপানো দেখবেন শুধু নামগুলো বাদে। এখন আপনিই বলেন, বড় হারামজাদা কারা!
-আরে তাইতো! রাঘব বোয়ালদের নাম যদি ফাঁসই হয় তবে সে কথা তারা লেখেনা কেন!
-ভাইজান! সব কথা কি সব সময় বলতে হয়, না জানান দিতে হয় ? বুঝে নিতে হয়। এই যে আমি আপনাকে আসল কথা কিছু না বলেই এতোক্ষন আটকে রাখলাম বেহুদা ফ্যাদরা প্যাঁচাল পেড়ে, আসল কথা বললে তো আপনাকে আটকাতেই পারতামনা। যদি বলতাম , আমার দোস্তের আসতে দেরী হচ্ছে, কখন আসবে জানিনা, ভাইজান আসেন আপনার সাথে একটু কথা বলে সময় কাটাই; তা হলে আপনি নিশ্চয়ই আমাকে দু’চারটে গালি দিয়ে ফুটে পড়তেন। ঠিক কিনা?
যাকগে ..... ঐ যে..... হারামজাদা ইকবাল আসছে, ঐ যে। সেই প্রতিবারের মতো ফুটওভার ব্রীজ থাকতেও নীচ দিয়েই রাস্তা পার হয়ে আসছে। দেখতে পাচ্ছেন নীল জিন্স আর হলুদ সার্ট গায়ে? বুঝলেন কিছু। আমার দোস্ত হয়েও সে ফুটওভার ব্রীজের নীচ দিয়েই আসছে। আজকে হারামজাদাকে “ কোনও ছাড় দেয়া হবেনা ”।
-মানে ?
-এটাও বুঝলেননা ভাইজান ? কিছু হলেই মন্ত্রী-মিনিষ্টার, পুলিশ্, র্যাব, দুদক ইত্যাদি সহ তামাম মহারথীরা যে বলেন - “ কাউকেই কোনও ছাড় দেয়া হবেনা ”? আমিও তাই বললাম- দোস্তকে কোনও ছাড় দেয়া হবেনা.................................
(ছবি - নেট থেকে নিয়ে পরিবর্ধিত)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১৯ রাত ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


