
তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। নভেম্বর মাসের শেষের দিকের কথা। ক্লাসে যাবার পথে একটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পড়তো পথে। সেই বিদ্যালয়ের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। রাস্তায় আসা যাওয়ার সময় রোজ দেখা হতো। তবে কথা হতো না তেমন। আমি আগে আগে যেতাম আর মেয়েটি যেত পেছনে পেছনে। এতো আস্তে হাটতাম তবুও আমার থেকে পেছনে পরে যেত। জীবনের প্রথম প্রেমপত্র দিয়েছিলাম সেই মেয়েকে। সরাসরি নয়, দিয়েছিলাম ক্লাসে পুরষ্কার হিসেবে পাওয়া কলমের ভেতরে ভরে। কি লিখেছিলাম মনে নেয়, তবে দু-চার লাইন ছন্দ যে ছিলো তা বেশ মনে আছে। এই যেমন, "গাছটা হইলো সবুজ বন্ধু ফুলটা হইলো লাল, তোমার আমার ভালোবাসা থাকবে চিরকাল।" "দুধ থেকে ছানা হয় ছানা থেকে মিষ্টি, ভালোবাসা থেকে হয় প্রেমের সৃষ্টি।" "ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখো, দিও তোমার মালাখানি বাউলের এই মনটারে........" এই টাইপের পাঁচমিশালি ছন্দ। কিন্তু চিঠির উত্তরে যা লিখলো তাতে দেখলাম আমার থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে মেয়েটি। কি লিখেছিলো সেটা না হয় নাই বললাম!
প্রেমের পর্ব বেশ ভালোই চলছিলো। মাঝখানে শীতের ছুটিতে তার সাথে দেখা নেই অনেক দিন। ২০০৬ সালের কথা। তখনো মোবাইল এতো এভেইলেবল হয়নি। না হলে কি হবে, টিভি সিনেমা দেখে দেখে প্রেমের বিভিন্ন কলাকৌশল রপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের প্রেম কাহিনী মানুষের মুখে-মুখে। ইউসুফ-জুলেখার প্রণয় কাহিনীও তখন বেশ জনপ্রিয় মুখরোচক গল্প। বড়দের কাছে শুনতাম জীবনে কোনদিন দাঁড়ি না কাটলে নাকি শিরি-ফরহাদের বিয়ে খাওয়া যাবে। সিনমাগুলোতে একটা ডায়লগ শুনে শুনে প্রেম করার প্রতি আগ্রহ জন্মে। বড় লোকের মেয়েকে গরীব ঘরের ছেলেকে ভালোবেসে যখন তাদের ভালোবাসা কেউ মেনে নিতে চান না তখন তারা বলে " বাবা, ভালোবাসা আসে স্বর্গ থেকে, ভালোবাসা তো কোন অন্যায় নয়!" মনে শুধু একটা প্রশ্নই জাগতো, "আচ্ছা প্রেম ভালোবাসা যদি অন্যায় না হয়ে থাকে তাহলে সবার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কেন প্রেম করতে হবে?" কিন্তু কাউকে প্রশ্ন করিনি কোন দিন। তাই বলে আমি আবার প্রকাশ্যে প্রেম করতে যাইনি।
শীতের ছুটিতে এতো দিন তো আর না দেখে থাকা যায় না, একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। পাশের বাসার এক মেয়ে আমাদের চিঠি আদান-প্রদানে সাহায্য করতো ছুটির দিনগুলোতে। রোমান্টিক কথার মিশেলে চিঠি হয়ে উঠতো রোমান্টিকতার উপসাগর। মেয়ের বড় ভাইয়ের একটা নোকিয়া বাটন ফোন ছিলো। একদিন ফোন নাম্বার দিয়ে বলে সকাল ১০ টায় ফোন দিতে। আচ্ছা বিপদ, আমি কল করবো কোথা থেকে! আমার তো আর ফোন নেই যে চাইলেই কল করতে পারবো। কিন্তু কথা বলার লোভও সামলাতে পারছি না। বাজার গিয়ে মোবাইলের দোকানে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন ১০ টা বাজে। ২ টাকা প্রতি মিনিট হিসেবে বিল দিতে হবে, এই চুক্তিতে দোকান থেকে কল করেছিলাম। পকেটে ১০ টাকা আছে। টিফিনের টাকা থেকে রেখেছি। কিন্তু কথা বলবো আর কি, হাত-পা কাপাকাপি শুরু হয়েছে কি বলবো এই ভেবে। অবশেষে ৫ মিনিট কথা বললাম। কথা বলা শেষে দেখি গায়ের জামা ভিজে গেছে। হায়রে সাহসী আমি!!
এসএসসি পাশ করে শহরে চলে আসি। যোগাযোগে ভাটা পরে। আমার কাছে মোবাইল ফোন না থাকাতে যোগাযোগ করা আর হয়ে উঠেনি। আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ার তখন ওর বিয়ে হয়ে যায়। কেন জানি মোটেই কষ্ট লাগেনি। বিয়ের প্রায় এক বছর পর আবার কথা হয় মেয়েটির সাথে। ইন্টারমিডিয়েট টেস্ট পরিক্ষার পর ছোট মামার দেয়া মোবাইল ফোনের সুবাদে। মেয়েটির কথা আর আহ্লাদের ধরন সেই আগের মতোই দেখলাম। তার পর থেকে প্রায়ই কথা হতো। আমাকে খুব করে বলতো বিয়ে করতে। কেন বলতো জানিনা। তবে এইটুকু বলতে পারি, মনে হয় আমার মন পরীক্ষার জন্য বিয়ে করতে বলতো। আমার বিয়ের খবর যখন শুনে তারপর থেকে কেমন যেন কথার সুর পাল্টাতে থাকে। আগের মতো আর কথা বলে না। শুধু বলতো, "বিয়ে করেছো এখন আর আমার হক নাই। এখন তুমি অন্য কারো।" দেখা হলে শুধু মুচকি হাসে।
এখন প্রায় পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে ওর। গ্রামে গেলে দেখা হয় অনেক সময়। এখন কথা বলতে পারি। এখন আর কাউকে দেখে ভয় পাই না।
আগে থেকে ওর মা আমাকে বাবাজি বলে ডাকতো। এখনো তেমনই কথা বলে। একদির রাস্তায় থামিয়ে বলে, "আমার রুবিকে তুমি পছন্দ করতে তা যদি আগে জানতাম তাহলে কি তোমাকে হাত ছাড়া করতাম! বোকা রুবিও বলেনি কোনদিন!" কথা শুনে আমি তো অবাক। শুধু লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে হাসি দেয়া ছাড়া কোন উত্তর দেইনি সেদিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



