somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপ্রতিমের মৃত্যু: দায় শুধু রাষ্ট্রের, নাকি আমাদেরও কিছু প্রশ্ন আছে?

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি বরাবরই একটু স্পষ্টবাদী। যা সত্য মনে হয়, তা সরাসরি বলতে পছন্দ করি। এজন্য কেউ আমাকে পছন্দ করেন, অনেকেই করেন না! হয়তো মুখের ওপর সত্য কথা শুনতে সবার ভালো লাগে না। তবে কোনো বিষয়ে হুট করে মন্তব্য করা আমার স্বভাব নয়। আগে জানি, বুঝি, যতটা সম্ভব ভেতরে ঢুকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। তারপর কথা বলি।




১৩ বছরের অপ্রতিমের নির্মম মৃত্যু নিয়েও তাই আবেগের পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্ন সামনে আনতে চাই।

এই শিশুটির বাবা-মায়ের কান্না আমরা দেখেছি। একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ দেখেছি। সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে একজন মা যখন বলেন, “আমার ছেলে হারিয়ে যাওয়ার মতো নয়, তাকে কেউ নিয়ে গেছে”— তখন সেই মায়ের অসহায়ত্বের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো ভাষাই যথেষ্ট নয়।

অবশেষে অপ্রতিমকে পাওয়া গেল—তবে জীবিত নয়। একটি ছোট্ট, মায়াবী মুখ। যে বয়সে শিশুর মাঠে দৌড়ানোর কথা, মায়ের কাছে বায়না ধরার কথা, বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর কথা—সেই বয়সে তাকে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে হলো!

অপরাধী যে-ই হোক, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও দ্রুত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে জীবিত উদ্ধার করতে না পারলে সেই ব্যর্থতার জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে।

কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও কিছু প্রশ্ন করতে হবে।

আমরা কি আমাদের সন্তানদের যথেষ্ট চিনি?

১৩ বছর বয়সটা বড় অদ্ভুত বয়স। শরীর শিশুর, কিন্তু মন ধীরে ধীরে কৈশোরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। স্বাধীনতা চাইবে, বন্ধু বানাবে, নিজের একটা জগৎ তৈরি করবে। কিন্তু স্বাধীনতা আর নজরদারিহীনতা এক কথা নয়।

সন্তান কার সঙ্গে মিশছে? কোথায় যাচ্ছে? কার সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছে? তার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না? কোনো বড় বয়সী মানুষের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে কি না?—এসব জানার দায়িত্ব মা-বাবারও।

বিশেষ করে আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে নারী, শিশু কিংবা বৃদ্ধ—কেউই সবসময় নিরাপদ নয়। এই বাস্তবতা জেনেও একটি অল্পবয়সী সন্তানকে সম্পূর্ণ নজরদারির বাইরে রেখে দেওয়ার বিলাসিতা আমাদের আছে কি?

চাকরিজীবী মা-বাবাদের কথাও বলতে হয়। এটি কাউকে দোষারোপ করার কথা নয়। বরং বাস্তবতার কথা। কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানের সঙ্গে সময় কমে যেতে পারে। কিন্তু সন্তানকে সময় দেওয়া মানে শুধু পাশে বসে থাকা নয়। তার কথা শোনা, তার বন্ধুদের চেনা, তার পছন্দ-অপছন্দ বোঝা, তার অনলাইন জগৎ সম্পর্কে ধারণা রাখা—এসবও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব।

তবে একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই—অভিভাবকের কোনো ভুল বা অসতর্কতা কখনোই অপরাধীর অপরাধকে ছোট করে না। একটি শিশু ভুল করতেই পারে। ভুল মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে। ভুল জায়গায় যেতে পারে। সে তো শিশু! তার ভুলের শাস্তি মৃত্যু হতে পারে না।

অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের সবার জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

আমরা রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাই। অপরাধীর কঠোর শাস্তি চাই। চাই তদন্তে কোনো গাফিলতি না থাকুক। বিচার যেন নিভৃতে না কাঁদে। কারণ অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে হয়তো পরেরবার অপরাধ করার আগে কেউ অন্তত একবার থমকে দাঁড়াবে।

আর মা-বাবাদের বলি—সন্তানকে শুধু ভালোবাসবেন না, তাকে চিনুন। তার পৃথিবীর ভেতরে ঢুকুন। তার বন্ধুদের চিনুন। তার নীরবতাও পড়তে শিখুন।

কারণ সন্তান হারানোর পর তার ছবি বুকে নিয়ে কাঁদার চেয়ে, সন্তান পাশে থাকতেই তাকে একটু বেশি সময় দেওয়া—অনেক বেশি জরুরি।

অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যু যদি আমাদের সতর্ক করে, যদি আর একটি শিশুকেও নিরাপদে রাখা যায়—তাহলেই হয়তো এই কান্নার ভেতর থেকে সামান্য হলেও একটি শিক্ষা উঠে আসবে।

আল্লাহ অপ্রতিমকে জান্নাত নসিব করুন। তার মা-বাবাকে এই অসহনীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন।
আর আমাদের সন্তানদের হেফাজত করুন। আমিন।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×