![]()
না এর গহনা
সৌন্দর্য্যের প্রতি আকর্ষন মানুষের চিরন্তন। বিশেষ করে যুবতী তরুনীরা যুগে যুগে নিজেদের সাজিয়ে/আকর্ষনীয় করে তুলতে সাহায্য নিয়েছে বিভিন্ন উপাদানের। কেউবা ফুল,লতাপাতা বেটে রঙ্গিন করে তুলেছে করপুট। পান খেয়ে কেউ রঙ্গিন করেছে ঠোট। কেশদাম সাজিয়েছে নানান ফুলের মালায়।কোন কোন আদিবাসী মুখ আর অঙ্গে এঁকেছে খড়িমাটি দিয়ে নানান রকম নকশা। কিন্ত এসবেও যেন মন ভরেনি নারীকূলের।
আর তাইতো সৃষ্টি হয়েছে স্বর্ন- রৌপ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাতু,কড়ি ঝিনুক বা পুঁতির নানা রকম অঙ্গাভরণ।যার চাহিদা সেই প্রাচীন কাল থেকে আজও চলেছে বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন আঙ্গিকে। প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষেও আজও মেলে নানানরকম নকশা করা পোড়ামাটির বা বিভিন্ন ধাতুর তৈরী পুঁতির মালা, চুড়ি, কানের দুল, পায়ের মল আরো কত শত জিনিস।
![]()
সুতোয় বোনা পুঁতি
কোন কোন সম্প্রদায়ে নারী পুরুষ উভয়েই এসব গহনা ব্যাবহার করতো।এখনো অনেক দেশের আদিবাসীদের মধ্যে এর প্রচলন রয়েছে।এমনকি আগের দিনের রাজা বাদশারাও পিছিয়ে নেই গহনার ব্যাবহারে।সহজ উদাহরন সবার পরিচিত মুঘল সম্রাটদের কথা ভেবে নিন এই ফাঁকে।
![]()
না এর তৈরী সুতো আর কড়ির মালা
যাক এসব তত্ব কথা। আজ আপনাদের সামনে হাজির করবোে এমন একজনকে যিনি শুধু নিজেই এসব গহনা প্রস্তত করেন না, বিভিন্ন দেশে গিয়েও শিখিয়ে আসেন কি করে সাদা সুতোয় লাল পুঁতির মালা গাথতে হয়। তবে যা কি না অবশ্যই হতে হবে দৃষ্টি নন্দন আর আধুনিক ফ্যাশনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ন।
থাইল্যান্ডের পুরনো এয়ারপোর্ট ডন মুয়াং থেকে ২০ কিমি উত্তরে ব্যাংককের উপশহর রাংসিত। বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি যাবার পথে পড়ে।ব্যক্তিগত কারনে আমাকে একাধিক বার সেখানে যেতে হয়েছিল। আশে পাশে হাট বাজার শপিং মল সহ সবরকম সুব্যাবস্থার জন্য এই রাংসিত এলাকায় আমাকে থাকতে হয়েছিল বেশ অনেকদিন করে একাধিকবার।
![]()
সোনার হাতে পুতির কাঁকন কে কার অলংকার
আমাদের এপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকেই ছিল প্রাচীন এবং সুবিখ্যাত রাংসিত মার্কেট। দিনের অবসর সময়টুকু কাটতো আমার এই রাংসিত মার্কেটে। এখানে স্থায়ীভাবে বসতো কাঁচা বাজার, পাইকারী বাজার, খাবারের রেষ্টুরেন্ট। আর সামনে যে তিনতালা গাড়ী পার্কিংভবনটি আছে, তার নীচ তালায় নিয়ম করে একদিন পার্কিং, তার পরদিন বরাদ্দ জামা কাপড়, জুতা স্যন্ডে্ল, কসমেটিক্স ইত্যাদি ঘর সংসারের জিনিসপত্র বিক্রয়ের জন্য।
![]()
শ্যাম্পু সাবান সহ নানা রকম ঘর গৃহস্থালীর জিনিস
আবার পরদিন বসতো ধর্মীয় জিনিসপত্র; যেমন বুদ্ধের খোদাই করা বিভিন্ন তাবিজ, কবচ, প্রাচীন স্থাপনা থেকে খুলে আনা ছোট ছোট বুদ্ধের মুর্তি অথবা তার রেপ্লিকা, ইত্যাদি।
![]()
বিশেষ করে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ব্যাবহার্য্য
যেদিন জামা-জুতা অর্থাৎ ঘরসংসারের জিনিস পত্র বিক্রি হতো তখন এই বিশাল পার্কিং ভবনের পাশেই সার বাধা কিছু স্থায়ী দোকান ছিল সেগুলোও খুলে যেতো। আর সেখানেই পরিচয় হলো আমার এই লেখার নায়িকার সাথে। কাঁচ ঘেরা লাল রঙের চারকোনা দোকানটি ঝলমল করছিল নানান রকম পুঁতি, পাথর আর ধাতুর তৈরী গহনায়, যা প্রথমেই আমার দৃষ্টিকে টেনে নিয়ে গেল তাঁর দোরগোড়ায়।
![]()
পুঁতির মালা আর ব্রেসলেট
চেয়ে দেখি দেয়াল ঘেষে সারি সারি কাঁচের তাকে সাজানো বিভিন্ন পুঁতি, কড়ি আর ধাতুর মিশেলে তৈরী ব্যতিক্রমি ডিজাইনের সব গহনার সারি। সতরঞ্জি বিছানো মেঝেতে এক মহিলা নিপুন হাতে সুই সুতা আর তার দিয়ে মগ্ন চিত্তে বানিয়ে চলেছে মালা দুল হয়তো বা ব্রেসলেট। সামনে সাজিয়ে রাখা অনেকগুলো বাক্সে বিভিন্ন ডিজাইনের বিভিন্ন সাইজের পুঁতি আর রঙ্গিন পাথরের গুটি।
![]()
ছোট ছোট বাক্স ভরা মালা গাঁথার উপকরণ
আমি দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিতেই একগাল হেসে থাই ভাষায় আহবান জানালো।আমি স্যান্ডেল খুলে প্রবেশ করলাম তার রাজত্বে।সেই গহনা দেখার এক ফাঁকে তার সাথে শুরু হলো টুকটাক আলাপ।
![]()
না এর প্রশিক্ষন কর্মসুচী চলছে
সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজীতে কথা বলছে, আমিও তারই মত করে ইংরেজীর সাথে দুই একটা থাই শব্দ মিশিয়ে ভাবের আদান প্রদানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঘাটতি টুকু দুজনেই পুষিয়ে নিচ্ছি হাসি দিয়ে।আমার নাম শুনে সে খুব খুশি হলো মনে হয়, কারন উচ্চারনে কোন সমস্যা হলোনা।
আমিও জিজ্ঞেশ করলাম ‘কি নাম তোমার’? ,
বল্লো ‘না’।
![]()
না
আমি এক গাল হেসে বললাম ‘জানো আমাদের ভাষায় না মানে ‘না’।
থাই সংস্কৃতিতে সরাসরি না বলাটা খুবই রূঢ়। তারা ‘না’ এর বদলে বলে ‘আমি চাই না’। থাই ভাষায় ‘মায়’ বা 'মে' অর্থ হলো চাই না, কিন্ত এর সাথে বিনয়/নম্রতা প্রকাশের জন্য মেয়ে হলে বলে ‘মায় খা’, ছেলে হলে বলবে ‘মায় খ্রাপ’। যার অর্থ ‘আমি চাই না, ধন্যবাদ’।
ওরা অবশ্য প্রতিটি কথার শেষেই এই ‘খা’ আর ‘খ্রাপ’ বলে থাকে। আপনি এটা থাই এর ফ্লাইটে ওঠার সাথে সাথেই প্লেনের দোরগোড়ায় অভ্যর্থনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা হাস্যোজ্জ্বল ফ্লাইট এটেনডেন্টসদের মুখে শুনতে পাবেন ‘সোয়াদিখা’ অর্থাৎ স্বাগতম সাথে ধন্যবাদ।
যাক না নিয়ে অনেক কথা হলো এখন অন্য কথায় আসি।
![]()
না এর তৈরী গহনা
‘না’ এর দোকানটি যেদিন খোলা থাকতো সেদিন আমি এক বার হলেও যেতাম। টুকটাক কেনাকাটা তার সাথে বসে বসে গল্প। সেও আমার সান্যিধ্য খুব পছন্দ করতো। দ্বিতীয়বার যখন আমি ঐ এলাকায় গিয়েছিলাম তখন না তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজীতে জানালো, খুব শীঘ্রই সে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি যাচ্ছে। সেখানকার কোন এক আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীকে হাল ফ্যাশনের পুঁতির গহনা তৈরীর প্রশিক্ষন দিতে।
![]()
প্রশিক্ষন দানরত না
যদিও তারা যুগ যুগ ধরে তারা পুঁতির গহনা ব্যাবহার করে আসছে তারপর ও তা কি করে বিক্রয়যোগ্য এবং ফ্যাশনদুরস্ত করা যাবে তার প্রশিক্ষন।
![]()
ব্যাংককেও না বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষ এমনকি প্রতিবন্ধীদেরও আয়ের পথ সৃষ্টি করার উদ্দ্যেশ্যে এই গহনা তৈরীর প্রশিক্ষন দিয়ে থাকে।
![]()
ভাষা দিয়ে বুঝাতে পারলোনা তবে তার ছবি দেখে মনে হলো সে কোন কারিগরী প্রশিক্ষন সংস্থার প্রধান।
![]()
হাতে কলমে শুধুই নয় দেখে মনে হচ্ছে মাতৃত্বের স্নেহ আর ভালোবাসার পরশ দিয়ে শিখিয়ে চলেছে না প্রতিবন্ধী এই ছেলেটিকে
![]()
ব্যাংককের বিখ্যাত শপিং মলঃ সেন্ট্রাল,সিয়াম প্যারাগন, টার্মিনাল ২০ এর ব্র্যান্ডেড দোকানের আইটেম জামা কাপড়ের সাথে ম্যাচিং করে সাজিয়ে রাখা আছে ‘না’ এর গহনা।
![]()
ব্যাংককের উত্তর প্রান্তের শেষ স্কাই ট্রেন ষ্টেশন মোচিটে তার আসল দোকানটি রয়েছে বলে জানালো। এবার দেখুন না আর তাঁর তৈরী “না হ্যান্ডমেইড জুয়েলারীর” কিছু নিদর্শন।
![]()
নকল মুক্তো দিয়ে বানানো না এর মালা
![]()
ড্রেস এর সাথে ম্যাচিং না এর নান্দনিক এক গলার হার
![]()
অপুর্ব কারুকার্য্যময় না এর গহনা
![]()
মাদার অভ পার্লের তৈরী ব্রেসলেট আর মালা
![]()
পুঁতি আর ধাতু
![]()
হাল ফ্যাশনের মালা
![]()
ফিরোজা পাথরের রকমারি পুঁতির গহনা
![]()
![]()
কালো পুতিতে রঙ্গিন লকেট।
![]()
পশমী সুতোয় পুঁতির ঝালর মালা।
অনেক দেশেই কানের দুলের প্রচলন খুব একটা দেখা যায় না । না এর গহনা বাড়ীতেও তার ব্যাতিক্রম না। তারপর কিছু আছে ।
![]()
সুতো আর পুঁতির মিশেলে আকর্ষনীয় ডিজাইনের দুল
![]()
কোন প্রানীর শিং দিয়ে তৈরী দৃষ্টিকাড়া অভিনব দুল।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



