(কৃতজ্ঞতা স্বীকার- শিরোনামটি নেয়া হয়েছে একটি মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপনে সোহেল খানের সংলাপ থেকে)
কথা বলার মতা মানুষকে প্রাণীকূলের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজন অবস্থান পেতে সাহায্য করেছে। কথা খুবই শক্তিশালী হাতিয়ার। সৈয়দ শামসুল হকের ’পরাণের গহীন ভিতর’ কাব্যে একটি মোক্ষম লাইন আছে- ”কথাই আপন করে, সেই কথা করে পর”। এবার বুঝুন কথার কতো শক্তি। কারো কান কথা শুনে কেউ কেউ আপনার শত্র“ও হয়ে যেতে পারেন। আবার কেউ কথা দিলে আমাদের জীবন ছবির চেয়েও সুন্দর হয়ে যায়।
কথার এই জাদুকরি শক্তির জন্যই গুণীরা কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, কথাবার্তা যেন হিসাব করে বলা হয়। কারণ কথার গোলমালে জীবনটাই গোলমেলে হয়ে যেতে পারে। আমাদের কালে আরেকটা কারণে কথা হিসাব করে বলা দরকার। মোবাইলে কথা বলতে টাকা খরচ হয়। তাই খরচ বাঁচাবার জন্যও কথা কম বলা দরকার।
বাস্তবে সেটা হচ্ছে কই ? ঘরে বাইরে যেখানে যাবেন সেখানেই দেখবেন কানের ওপর একটা মোবাইল সেঁটে আছে। কেউ দেখা যায় একজনকে মোবাইলে অপেক্ষায় রেখে আরেক মোবাইলে কথা বলছেন। এ পর্যন্তও না হয় দরকারের খাতিরে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি কাজের ক্ষতি করে কথা বলতে থাকেন সেটা কি মানা যায় ?
মোবাইলে কথা বলা আজকাল মহাবিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। কারণ কাজ করতে করতেও মানুষ মোবাইলে কথা বলতে আরম্ভ করেছেন। এটা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। গাড়ি বা বাইক চালাবার সময় যখন চালক কথা বলেন তখন সেটা চালকের নিজের বা অন্য মানুষের জীবন বিপন্ন করে। কয়েকদিন আগে দুই বাসের মাঝে চাপাপড়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণের করুণ মৃত্যু হয়েছে। কারণ বাসচালক মোবাইলে কথা বলতে বলতে বাস চালাচ্ছিলেন বলে পথচারী তরুণের উপস্থিতি টের পাননি। যখন টের পেলেন তখন যা হবার তা হয়ে গেছে। বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার পর দেখা গেছে চালক মোবাইলে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
দোষ যে শুধু চালকের তা-ও বলা কঠিন। কারণ আমরা রাস্তা পার হবার সময়ও মোবাইলে কথা বলতে থাকি। ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার করলে না হয় হতো। সেটাও করি না। কিন্তু কথা বলি। এটা কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য অনেক দায়ী। অনেকে সরাসরি মোবাইল ব্যবহার না করে হেডফোন ব্যবহার করেন। সেটা আরো বিপজ্জনক। কারণ দুই কানই বন্ধ থাকে। হেডফোনে গান শুনতে শুনতে রেল লাইন পার হবার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাবার খবরও পত্রিকায় পড়েছি।
বিপদ থেকে বাঁচার জন্য পথচলার সময় কথা বলার দরকার হলে নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা সেরে নিলেই হয়। তখন কথা সংক্ষিপ্ত হওয়া সবার জন্যই মঙ্গলজনক। যানবাহনে চলার সময় হেডফোনে গান শুনলে সমস্যা নেই। সমস্যা হয় পায়ে চলার সময় শুনলে। নিজের জীবনের স্বার্থেই আমরা কি পথচলার সময় হেডফোন ব্যবহার বন্ধ করতে পারি না ?
এ সব বিপদের একটা বড়ো কারণ বেশি কথা বলার প্রতি আমাদের আসক্তি। বেশি কথার খারাপ দিক হচ্ছে বেশি কথা বললে কথার লাগাম থাকে না। ভুল কথা, আকথা, বাজে কথা বলার ঝুঁকি বাড়ে। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, তাঁর জিহ্বাই তাঁর বড়ো শত্র“ হয়ে উঠেছিলো অনেকবার।
কথা বলতে আরম্ভ করলে কথা কমিয়ে আনা খুব কঠিন। তবু কথা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে দোষ কি ? যেটা করা সহজ সেটা সেটা হচ্ছে, কথাটা সংপ্তিভাবে বলা। সংক্ষিপ্তভাবে কথা না বলার স্বভাব নিয়ে শরৎচন্দ্রও ’শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে ব্যাঙ্গ করে লিখেছিলেন,” মেঝদা সংক্ষেপে কহিলেন, দি রয়েল বেঙ্গল টাইগার।” এর বদলে শুধু ’বাঘ’ বললেই চলতো। তাই জীবন বাঁচাবার স্বার্থেই না হয় হিসাব করে কথা বলি। কম কথা বলার প্রসঙ্গ না হয় না-ই তুললাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


