somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বিদেশ ভ্রমন - ৫ - কুয়েত ২

১০ ই আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৩:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বিদেশ ভ্রমন - ৪ - কুয়েত

..সে প্রায় ১৬-১৭ বছর আগেকার কথা। লেখি লেখি করেও আর লেখা হয়নি। তো আজ ভাবলাম - লেখা শুরু করি, দেখি কতদূর যাওয়া যায়...

কুয়েত কেন জীবনে কোনদিন বাংলাদেশের বাইরে কোথাও পা দেয়া হয়নি। তাই প্রথমবার দেশের বাইরে দেশ - ব্যাপারটা খুব অদ্ভূত লাগছিল। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আমি আর আমার ছোট ভাই বিল্ডিং-এর সামনে সিড়িতে বসে রাস্তার গাড়ী চলাচল করা দেখছিলাম। দুপুরের দিকে রোদে মনে হচ্ছিল গা পুড়ে যাবে, কিন্তু সন্ধার পর তাপমাত্রা দেখলাম অনেক কমে এসেছে।

বাসার পাশেই একটা রেস্তোরা। খুব জমকালো কিছু না, আমাদের স্টার কাবাব বা কস্তুরীর মতো। জীবনে প্রথম শর্মা খেলাম - মনে হয় যেন এখনও সেরকম মজার শর্মা আর খাইনি। সেখানে আপনি পাবেন চিকেন শর্মা আর দুম্বার (ভেড়া) শর্মা। ওরা দুম্বা অনেক পছন্দ করে, কিন্তু দুম্বা তে এত গন্ধ! এক কামড়ের পর আপনার ক্ষিদে গায়েব হয়ে যাবে!

শর্মার দাম রাখল ২৫০ পয়সা। ওখানে ১০০০ পয়সা = ১ টাকা। আমাদের যেমন ১০০ পয়সায় ১ টাকা হয়। ওখানের পয়সাকে বলে 'ফিলস'। টাকাকে বলে কে.ডি. (কুয়েতী দিনার)। তো ১০০০ ফিলস = ১ কেডি। আর ১ কেডি = ১৬৫ টাকা। এখন সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে ১ কেডি = ২৭৫ টাকা। তাহলে বুঝতেই পারছেন কারো পকেটে কুয়েতী ৫০ টাকা থাকা মানে বাংলাদেশী প্রায় ১৪০০০ টাকা! সেইরকম পার্থক্য।



আমাকে একটা নতুন মানিব্যাগ দেয়া হলো, আর তাতে চকচকে ১০কেডি, সেটা দেখে আমার চোখও চকচকে - এই ১০ কেডি দিয়ে কি কি করতে পারতাম - ১০০০ টা পেপসি কিনতে পারব। অর্থাৎ ২ টা বিয়ের মানুষ খাওয়ানোর কোক-পেপসি-স্প্রাইট কিনতে পারব :P । অথবা প্রায় ২০০ টা রুটি কিনতে পারব। বুঝতেই পারছেন - একজন মানুষ যতই দরিদ্র হোক না কেন, সে কখনও ক্ষিদে নিয়ে ঘুমাতে যাবে না, কারন খাওয়া দাওয়ার মূল্য তার হাতের নাগালেই আছে।

ওখানে সবাই একটি বিশেষ রুটি খায় এটাকে বলে 'খুবজ'। নান রুটির মতো, কিন্তু এত নরম নয়। এই রুটি ২টার বেশি খাওয়া অসম্ভব, ৪টা রুটির প্যাকেট পাওয়া যেত, ২০০ ফিলসে। সাথে কিছুর ঝোল হলেই পেটপুরে খাওয়া শেষ।



আরো দেখলাম মিস্টি বলে কিছু নাই। আমরা যেমন রসে ভেজানো মিস্টি খাই - ওখানে সবাই শুকনো একটা মিস্টি খায়, যেটা আমার কাছে খুব একটা সুবিধার মনে হয়নি।



চকলেট/আইসক্রিম/জুস/পেপসি/কোক - এসবের দাম ছিল সবচেয়ে কম, তো আমাদের জন্য কুয়েত ছিল স্বর্গের মতো। সারাদিন খালি চকলেট পেপসি খেতাম, আর দোকানে যাবার প্রয়োজন কম ছিল, কারন ওখানে সবাই বাল্কে (পাইকারী স্টাইলে) জিনিস কিনে। আমি নিজেও বোকা হয় গেছিলাম প্রথম প্রথম! বাবা বললেন "জুসের প্যাকেট একটা নিয়ে নাও", আমি নিলাম, উনি বললবেন "না না, পুরোটাই" মানে পুরো কার্টন - ২৪টাই। পুরো মাসের জুস একদিনেই কেনা। চকলেটের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আর আমি যেহেতু প্রথম গিয়েছিলাম, এসবের দিকেই আমার নজর ছিল বেশী। :)

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তারা যে দিলদরিয়া, সেটা তাদের কেএফসি, পিজ্জাহাট-এ গিয়ে বুঝতে পারলাম। কোক একবার কিনবেন এরপর ফ্রি। তাও মানুষের সুবিধার জন্য কোকের ফাউন্টেন (যেখান থেকে আপনার গ্লাসে কোক ভরবেন) কাউন্টার থেকে দূরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আপনি কোক খেতে চাইলে বারবার কাউন্টারে যেতে হবে না। ফাউন্টেনের বোতামে চাপ দিয়ে নিজে নিজের গ্লাস ভরে নেবেন।

মানুষজন সব আলখাল্লা পড়েই ঘুরাঘুরি করত। মহিলারা দেখলাম কিছু বোরখা পরিহিত, কিছু ছোট স্কার্ট পড়া। মানে দেশটিতে দুইরকম সংস্কৃতির পরিচয় চোখে পড়ে। আর মহিলারা সেইরকম মেকআপ দিয়ে রাখত, সেই তুলনায় পুরুষদের অনেকটাই মার্জিত মনে হতো।

একটা মজার ব্যাপার দেখলাম - সবার গাড়ী আছে! মানে সবার! একদিন এক গাড়ী এসে বাসার সামনে থামল (আমি বাসার সামনে সিড়িতে বসে অনেক সময় পার করতাম)। তো গাড়ি থেকে এক লোক বার হয়েই আমার সামনে হাত পাতল - তারমানে ভিক্ষা করতে গাড়ী চালিয়ে এসেছে। এ কেমন দেশরে বাবা - ভয়ানক অবস্থা! তাকে আমি ২৫০ ফিলস দিয়েছিলাম, আমার শর্মা খাওয়ার পয়সা। সে খুব খুশি হয়ে কিসব বলল (গালি দিল কিনা সেটা সেমূহুর্ত বা এইমূহুর্ত - কোন মূহুর্তেই বোঝা গেলনা) - তারপর অন্য বাসা গুলোতে বেল বাজিয়ে ভিক্ষা শুরু করল!

ওখানে আরো মজার একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম সেটা হলো পুরোনো জিনিস ফেলে দেয়া। আপনি হয়ত কাজ শেষে বাড়ী ফিরছেন, হঠাৎ দেখবেন রাস্তার পাশে পড়ে আছে, ২৫ইন্চি এক টিভি সেট অথবা বিশাল বড় এক সোফা। কাছে গিয়ে পরীক্ষা করলেই দেখবেন সেগুলো বলতে গেলে নতুনই। আমরা যখন চলে আসি, আমরাও তখন কালো লেদারের একটি সোফা, ড্রেসিং টেবল, খাট রেখে আসি - যার প্রয়োজন সে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। আবার সেখানে "ফ্রাই-ডে মার্কেট" বলে একটা বাজার বসে। আপনি এই রকম সেকেন্ড হ্যান্ড বিভিন্ন জিনিস সেখানে পাবেন। বিশাল বড় এলাকা নিয়ে এই ফ্রাই-ডে মার্কেট বসত, দিন দুনিয়ার যা আছে সব পাবেন, তবে সেকেন্ড হ্যান্ড অথবা একটু অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের।



কুয়েতে যাবার আগে থেকেই জানতাম, ওখানে বাংলাদেশীরা খুব একটা ভালো নেই। ওখানে যেয়ে কিছু কিছু চোখেও পড়ল। একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেংগে যাওয়ায় বারান্দায় দাড়িয়ে আছি, ভোর হবে হবে, এরপরও ভীষন গরম, সূর্য তখনও ওঠেনি। হঠাৎ দেখি একজন মানুষ রাস্তা দিয়ে আপন মনে হেটে আসছে, গায়ে খুব উজ্জল হলুদ/কমলা ইউনিফর্ম পড়া। তার হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। উনি মাটির দিকে তাকিয়ে হাটছিলেন আর রাস্তা থেকে কাগজ, পেপসি ক্যান -এসব উঠিয়ে উঠিয়ে ব্যাগে ভরছিলেন। তার চেহারা স্পষ্টভাবে দেখিনি, তবে আমাদের দেশী হবার সম্ভাবনাই বেশি। শরীর ও গায়ের রং তো আমার মতোই ছিল। এতদূর দেশে এসে সকাল হতে না হতেই তাকে রাস্তায় নেমে যেতে হচ্ছে, ঘন্টার পর ঘন্টা এই গরমে সে হেটে বেড়াবে, আর ময়লা কুড়াবে, যাতে আমরা পরিস্কার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারি। অথচ আমরা ময়লা ঠিক জায়গায় ফেললেই কিন্তু ঐ মানুষটার কষ্ট ৭০% কমে যাবে - কিন্তু না, আমরা আয়েশী মানুষ! আয়েশ করে এখানে-সেখানে ময়লা ফেলব, পরিস্কার করার জন্য তো এরা আছেই, ওর কষ্ট কমানোর জন্য আমরা আয়েশ করা ছাড়ব কেন???

হয়তো আয়েশ করলেই, সমাজে সম্মান বাড়ে!

(চলবে)
ছবি:গুগল


******************************************
আমার বিদেশ ভ্রমন - ১ - পূর্বকথা
আমার বিদেশ ভ্রমন - ২ - আকাশে উড়াউড়ি
আমার বিদেশ ভ্রমন - ৩ - উড্ডয়ন ও অবতরন
আমার বিদেশ ভ্রমন - ৪ - কুয়েত
******************************************
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৩:৫১
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Lost for words....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ সকাল ১০:৩৫

Lost for words....

ভৌগোলিক আয়তনে আমাদের দেশটা ছোট হলেও আমাদের দেশের অঞ্চলভিত্তিক ভাষার বিচিত্রিতা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আমরা অনেকেই আমাদের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে ট্রল করি। ইদানিং আমাদের দেশের বস্তাপচা নাটক সিনেমায় আকছার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর মত উনার মন্ত্রীগুলোও এখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে ব্রিজের পাশে দাঁড়ানোকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

লিখেছেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ দুপুর ২:৪০


'বাংলার পথেঘাটে এখন টাকা বেশি। পায়ের নিচে টাকা পড়ে এখন'
বন্যার্তদের পাশে না দাঁড়িয়ে বন্যার্ত এলাকার মন্ত্রী যখন মিডিয়ার সামনে এমন উদ্ভট কথাবার্তা বলে, তখন কেমন লাগে বলেন দেখি! উনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ ২০২২ : সীতাকোট বিহার

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ দুপুর ২:৫৫


ডিসেম্বর মাসে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকে দীর্ঘ দিন। বেড়ানোর জন্যও নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সময়টাই বেস্ট। এবার ইচ্ছে ছিলো ডিসেম্বরেই উত্তরবঙ্গ বেরাতে যাওয়ার, যদিও এই সময়টায় ঐ দিকে প্রচন্ড শীত থাকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ-২

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ বিকাল ৪:০২

ছবি ব্লগ-১

মিগ-২১ প্রশিক্ষণ যুদ্ধ বিমানটি ১৯৭৩ সালে পাইলটদের প্রশিক্ষলেন জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়।



এই বিমানটি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি আকাশ তেকে ভুমিতে আক্রমনে পারদর্শী।
... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন কোন কোন সমস্যাকে মেগা-প্রজেক্ট হিসেবে প্রাইওরিটি দেয়ার দরকার?

লিখেছেন সোনাগাজী, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ রাত ৮:৩৮



পদ্মায় সেতুর প্রয়োজন ছিলো বলেই ইহা মেগা প্রজেক্টে পরিণত হয়েছিলো; যখন সরকারগুলো সেতু তৈরির জন্য মনস্হির করেনি, তখন তারা উনার বিকল্প ব্যবস্হা চালু রেখেছিলো (ফেরী ও লন্চ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×