somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রসিকতা

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৪:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দীর্ঘক্ষণ প্রতীক্ষার পর যে কথাটি শুনতে পেল সে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মঈন মুখ ঘুরিয়ে ফ্যানের দিকে তাকায়। আজ সকাল দশ এগারো হতে না হতেই খুব গরম লাগতে শুরু করেছে। এপ্রিলের পঁচিশ তারিখ। কয়েকদিন ধরে টানা গুমট গরম। মাথার উপর গনগনে সূর্য। নির্মেঘ আকাশ। কোথাও কোনো পাখি নেই। নিস্তব্ধ বাতাসে থেকে থেকে আচমকা ঢেউ । সে আর একবার সাবধানে রুনুর দিকে দৃষ্টি রাখে। বোকা মেয়েছেলে!

‘তুমি ঠিক বলছ তো? কেমন করে এমন হবে? আমরা তো খুব একটা...।’
‌‘কোথায় কী করে এসেছ দেখ।হা হা হা!’

মঈনের ঠোঁটে বাঁকা হাসি খুব দ্রুত মিলিয়ে যায়। রুনুর দৃষ্টিভ্রম। হাত পা কাঁপছে। সাত সাতটি বছর পেরিয়ে গেল। মঈনের মুখে এ রকম সন্দেহজনক জিজ্ঞাসা কম শোনেনি। কিন্তু আজ এ কি কথা বলল সে!

‘তুমি ঠিক বলছ তো? অন্য কোনো জায়গায় আবার টেস্ট করা যায় না?’
‌‘বার বার টাকা খরচ? তুমি তোমার সাইকেলের তারিখ মনে রাখতে পারো না? উজবুক মেয়েছেলে।’

মঈনের কপট রাগ যে এত বাস্তব রূঢ় হতে পারে, সে নিজেও ধারনা করেনি। রুনু বুঝি কেঁদে ফেলবে। মঈন ভেবে দেখল, আজ তাদের বিবাহবার্ষিকীর দিন; রুনুকে কিছুতেই মনে করতে দেবে না। সন্ধ্যেয় অভিনব সারপ্রাইজ ঠিক করে রেখেছে। সুতরাং কিছু ভ্যাবাচ্যাকায় ব্যস্ত রাখতে হবে। সে সাদা খাম এগিয়ে ধরল তার দিকে। কিন্তু রুনু সেদিকে তেমন আগ্রহ দেখাল না।

‘তুমি আমাকে সন্দেহ করো? ঘর ছাড়া কোথায় যাই আমি?’
‘সে আমি জানি না। এই নাও তোমার রিপোর্ট। পজেটিভ।’
‘কী করে হলো কী করে? আমরা তো...।’
‘তুমি অনুসন্ধান করো, আমি অফিস গেলাম। ফিরে এসে কথা বলব, যা যা জিজ্ঞেস করব সত্য কথা বলবে।’
‘সব সত্য বলেছি তোমায়...আর কী আছে?’
‘মিথ্যেবাদী মেয়েছেলে।’

মঈন সত্যি সত্যি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। যাওয়ার আগে ছুড়ে ফেলে দিল একটি খাম। রুনু সেদিকে দৃষ্টি দিল না। দরজা গলিয়ে দমকা বাতাস সেটিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল টেবিলের নিচে। তখন তার মনে হলো, পৃথিবীতে তার মতো অসহায় আর দায়বদ্ধ কেউ নেই। কী করে বোঝাবে এসব কাজে তার কোনো দোষ নেই। সেই ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় কোন্ এক দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে কিছু বুঝত না...জানত না। লজিং মাস্টার তাকে চেপে ধরে কী করে যায় তার কষ্ট লাগে। সে কষ্টের অর্থ বোঝে স্কুলের শেষ ধাপে এসে। তারপর তো বিয়ে হয়ে গেছে। মঈন খুব ভালো মানুষ। এক রাতে কোনো দুর্বল মুহূর্তে পুরোনো সেই গল্প শুনে আরও জড়িয়ে ধরে তাকে। রুনু তখন কাঁদছিল।

‘আমি কিন্তু তোমাকে ঠকাইনি। কিছু বুঝতাম না জানো।’
‘সে গল্প বাদ দাও তো তুমি, এসব ভালো লাগে না আমার।’

ভালো না লাগলেও কত বার যে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে রুনু সে কথা লোকটিকে কে বোঝায়! পুরুষের মন সন্দিগ্ধ। সবকিছুর মধ্যে পুরীষ খোঁজে। খনন করে জাগিয়ে তুলতে চায় পচা গলিত শবদেহ। তার দুর্গন্ধে ভরে ওঠে মনের চারপাশ। ঘরের সীমানা। অথচ রুনু তাকে ঠকায়নি। ভালবাসার বিশ্বাসে বলেছিল। না বললে কে জানত? কোনো নারী কি তার স্বামীকে অতীত বলে নাকি সেই পুরুষের জানা উচিত? যে লোক অতীতে বিচরণ করে তার মতো অভাগা আর কেউ নেই। আজ তার মন পুরোনো দিনে ভেসে যায়। মনে পড়ে যায়, অন্ধকার দুপুরের সেদিন আর ঘটনা-দুর্ঘটনা। সে কিছু বোঝেনি জানেও না। তারপর ভয়ংকর কুৎসিত লোকটির শাসিয়ে ওঠা দম্ভোক্তি। রুনু কাউকে কিছু বলতে পারেনি। কেন তবে মঈনকে বলে ফেলেছে?

সময় গড়িয়ে যায়। রুনু খুব বিষণ্ন আর বিভ্রান্ত মনে সকল কাজ ভুলে গেছে। রান্নাঘরে ইন্ডাকশন উনুনের ফ্যান বনবন করে ঘুরে চলে সঙ্গে টি টি বিরক্তিকর শব্দ। তার কোনোকিছু খেয়াল থাকে না...কোনোকিছু মনে নেই। সময় প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে ওঠে মাত্র। দৃষ্টি ভিজে ভিজে যায়। মঈন আজও কি ভয়ংকর কথা বলে গেল! অথচ সে...এখন কী করবে সে?


মঈন যখন ঘরে ফিরে আসে, সন্ধেরাত। সারাদিনের তাপদাহ শেষে ফুরফুরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। দরজার বাঁ-দিকে সানশেডের সঙ্গে মাখামাখি করে উঁচু হয়ে যাওয়া গন্ধরাজ বিপুল সুগন্ধ ঢেলে দিয়েছে চারপাশ। তার মনের সকল কোণায় তখন আনন্দের ঢেউ। সকালের রসিকতা আর রুনুর বিহ্বল চেহারা থেকে থেকে ভেসে উঠছে। সে হয়তো এখনো দিন তারিখ মনে করতে পারেনি। মঈনের ঠোঁটে চিলতে হাসি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নিশ্চয় অনেক অভিমান হয়েছে রুনুর। কতবার মোবাইল করেছে, রিসিভ করেনি। আসলে রুনু খুব বোকা। সুন্দরী মেয়েরা বুঝি এমনই বোকাকান্ত হয়!

তখন তেমন করে বোকা বানানো উচিত হয়নি। শুধু কি তাই? সেই ফাঁকে নিজের সন্দেহবাতিক মনকে ক্ষমা করা যায়? জীবনে তো নিজে কম কুকাজ করেনি! কে জানে রুনু কী করে অবশেষে তার কাছে এসেছে। তেমনকিছু করে থাকলে সে কী বলবে? কখনো না, কতজন বলে? ইত্যাদি ভাবনার মধ্যে সে ফুলের তোড়া বাঁ-হাতে বুকে চেপে ধরে রাখে। বাতাসের তেজ বেড়েছে। আকাশের ঈশান কোণায় মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের ঝিলিক। বৃষ্টি হবে। আহা কত দিন পর বৃষ্টি! আজ শীতল ঝরনায় দুজনে বাগানে ভিজবে। কতদিন তেমন করে ভেজা হয় না।

মঈন বাইরের গেট খুলে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আলোছায়া অন্ধকারে বারান্দায় কোনো লাইট জ্বলছে না। ওখানে কয়েকটি লাল দোপাটি গাছ আছে। সকালে দেখেছে চমৎকার গোলাপি লাল ফুল ফুটেছে বৃন্তের কোণায় কোণায়। এখন অন্ধকারে কিছু নেই। রুনু আজও সুইচ অন করতে ভুলে গেছে। খুব মন ভোলা! মঈন তাকে ডাকবে নাকি ডাকবে না ভাবতে ভাবতে দরজায় হাত রাখে। হাট হয়ে খুলে যায় সেটি। বোকা মেয়েটি তখন বাতাসে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। মঈনের দৃষ্টিতে ঘন অন্ধকার নেমে আসে। রুনু সকালের খুনসুড়ির বিনিময়ে এত বড় নির্মম রসিকতা করে বসবে সে কল্পনাও করেনি।

বাতাসে দুলছে রুনু। সট সট শব্দ উঠেছে ঘরের গুমট দেয়ালে। তখনই প্রবলবেগে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমে পড়ে। বিদ্যুৎ চলে যায়। তার হাত থেকে ফুলের তোড়া আছড়ে পড়ে পায়ের নিচে। অন্ধকারে সাদা ফুলগুলো নিদারুণ উপহাস করতে থাকে।

(গল্পটি 'ধানশালিক'-এ প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৪:১৪
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার প্রিয় ২৬টি পোস্ট; যেগুলো আপনারও ভালো লাগতে পারে

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০১


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×