somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প- সমপ্রেম

১৩ ই নভেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৩:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একজন পুরুষ হিসেবে অন্য একটি ছেলেকে দেখে এতটা মুগ্ধ হওয়া উচিৎ নয় জেনেও বেশ ক’বার বাসের ভিতর ভীড়ের মধ্য দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটির দিকে তাকালেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে নজড় দূরে সরিয়ে রাখার চেস্টা করছেন মিনার সাহেব।

কিন্তু কতক্ষণ আর বাহিরে তাকিয়ে থাকা যায়। মনের অজান্তে আবারও সেই সুদর্শন তরুণের দিকে চোখ গেল। এবার তরুণটিও তাকালো মিনার সাহেবের দিকে। পলকেই নজড় সরিয়ে নিলেন এবং একটু যেন লজ্জাও পেলেন। ঘামে ভিজে গেছে সেই ছেলেটির ঘাড়, কপাল কিন্তু চোখে যেন তার রহস্যের খেলা। একটু পরেই মিনার সাহেবের পাশের লোকটি শাহবাগ নেমে গেল। মিনার সাহেব ছেলেটিকে ডেকে তার পাশে বশার ইংগিত করলেন। অন্য কেউ বসার আগেই সেই তরুণ বসে পড়ল ফাঁকা সিটে এবং হাফ ছেড়ে বাঁচল।

ধন্যবাদ দিয়ে মুখে একটু হাসি ফুটাতেই মিনার সাহেব অবাক হয়ে ভাবলেন-ছেলেদের হাসিও এত চমৎকার হতে পারে! মুখে বলেলেন-
না ধন্যবাদের কি আছে? তবুও এই গরমে একটু বসতে পারলে স্বস্তি। তুমি কোথায় যাবে?
বনানী যাব।
চাকরী কর ?
না। চেষ্টা করছি। ইন্টারভিউ দিতেই যাচ্ছি।
লোক আছে ? লবিং করেছ ?
না পরিচিত কেউ নেই। ভাগ্য থাকলে হবে।
শুধু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলেই হবেনা। নিজেকে সেই পরিমান চেষ্টা করে অর্জন করতে হবে।
দেখি কি করা যায় বলে মহিম সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। এমন সময় মহিমের ফোন এল। ফোনে সে তার মার সাথে চাকরি নিয়েই কথা বলল। কথা শেষ হবার পর হতাশার কুয়াশা যেন ছেলেটিকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

মিনার সাহেব বুঝলেন মহিমের চাকরিটা খুব দরকার। মধ্য বিত্তের মা-বাবারা ছেলের দিকে তাকিয়ে তাকে কবে পড়ালেখা শেষ করে একটা কিছু করবে। মিনার সাহেব ওনার কার্ড মহিমের দিকে ধরে বললেন-এটা রাখ, যদি কোথাও কিছু না হয়, তবে যোগাযোগ করতে পার। আর আমাদের অফিসে মাস তিনেক পর কিছু লোক নেওয়া হতে পারে।
মহিম কার্ডটা তার বুক পকেটে রেখে ধন্যবাদ দিয়ে তার গন্তব্যে নেমে পড়লো। সে যেন এক ধরনের আশার আলো দেখতে পেল, এমন একটা আভা তার চোখে মুখে খেলে গেল । আর এ ব্যাপারটাও মিনার সাহেবের চোখ এড়ালনা।
একটা কোম্পানীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তা মিনার সাহেব। মাঝে মাঝেই অফিসের গাড়িতে না চড়ে বাসে চড়ে বাসায় ফিরেন কিংবা অফিসে যান। কোন এক বিচিত্র কারণে এটা তার ভাল লাগে।

রাতে মিনার সাহেব যখন সবকিছু থেকে অবসর হয়ে ঘুমাতে গেলেন তখন তার আজকের দিনের সব ঘটনা ভেসে উঠতে লাগলো মনের পর্দায় সকালের ঘুম ভাঙ্গা থেকে শুরু করে রাতে বাসায় ফেরা পর্যন্ত কিছুই বাদ গেলনা। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে মহিমের সাথে দেখা হওয়ার সময়টেই তাকে বেশ তৃপ্ত করে তুলল। তিনি তার মন অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। মোবাইলে তার ফ্যামিলির সবার ছবি দেখতে লাগলেন। সবাই গ্রামের বাড়ি গেছে। সামনে বন্ধের দিন তিনিও নিজে গিয়ে দুদিন থেকে সবাইকে নিয়ে আসবেন। কিন্তু তার ভাবনায় ঘুরে ফিরে আবার মহিম চলে এলো। শুধুই কি মহিম ? প্রতিদিন কত কত মানুষের সাথে দেখা হয় রাস্তা-ঘাটে, অফিস-আদালতে এদের মধ্যে কাউকে না কাউকে তার ভাল লাগে। আর এ ভাললাগা থেকে কত ছেলের যে উপকার করেছেন তার শেষ নেই। কেউ কেউ ভুল বুজেছে এবং কেউ কেউ গোপন সম্পর্কে জড়াতে ইংগিত দিয়েছে তিনি তা এগিয়ে গেছেন কৌশলে। তার এই ভাললাগা যে সমপ্রেমের তা তিনি এখন বুঝেন।

কিন্তু একটা সময় বুঝতেন না। কেবল ভাবতেন কেন ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলেকে তার ভাললাগে। ছিঃ ছিঃ কি লজ্জার কথা। কাউকে কোন দিন বলা যাবেনা, প্রকাশ করা যাবেনা এই অনুভূতি। কেবল নিজের ভিতর নিজের যুদ্ধ। তবুও তিনি সমপ্রেমী থেকে সমকামী হতে চাননা। কিন্তু থেকে থেকে সমকামের কামনার আগুন জ্বলে ধিকি ধিক।

নামাজ পড়ে কত কান্না কাটি করেছেন। মুনাজাতে বলেছেন-হে মাবুদ, আমাকে এই সমস্যার হাত থেকে উদ্ধার কর। রেহাই দাও এ যন্ত্রনা থেকে। মনকে নানাভাবে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। নিজের কমানা-বাসনাকে মাটিচাপা দিয়ে পশুত্বকে নিভৃত রাখতে রিপুর অগ্নির সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন অহর্নিশ।

তবু পরিত্রাণ নেই। মুক্তি নেই এঅসহ্য জ্বালা থেকে। কবে থেকে এই অভিশপ্ত আগুন তার দেহে এসেছে সেটা বের করতে গিয়ে সেদিন রাতে মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই যৌন নির্যাতনের কথা। পাশের বাড়ির এক সুন্দর কাকা ছিল যে তাকে আদর করে চকলেট, বিস্কুট দিতে। নির্জনে ডেকে নিয়ে যেত। গায়ে হাত দিত। শুরুটা এভাবেই হয়েছিল। তারপর গল্প বলা, গোপন জায়গায় স্পর্শ করা..........।
কিন্তু এগুলো কারে কাছে প্রকাশ করার মত অবস্থা ছিলনা সে বয়সে। তারপর একদিন ঘটে চরম বিপর্যয়। বাড়িতে মেহমান আসে। রাতে ঘুমানোর জন্য সেই কাকার সাথে থাকতে হয় এবং সে রাতেই আদরের নামে এক ধ্বংসাত্মক ঢেউ ঢুকে পড়ে তার ভিতরে।

বেশ কিছু দিন ছিল সারা শরীরে ব্যথা তারপর থেকে সেই কাকাকে পাশ কাটিয়ে চললেও ভয় দেখিয়ে আরও বিভিন্ন সময় আরও কয়েকবার তার সাথে ঘটে এমন ঘটনা যা একজনের নিকট শান্তি ও অপর জনের নিকট অশান্তিময় খেলা। একসময় পুরো পরিবার শহরে চলে গেলে ভুলে যান সেই অতীত। কিন্তু যৌবনের প্রারম্ভেই বুঝে যান তার ভাললাগে ছেলেদের, মেয়েদের প্রতি তেমন টান নেই। তাইতো জীবনে প্রেম এলো না। ভালবাসা হলো না কোন নারীকে।

সেই থেকে শুরু। আজও বয়ে চলছেন এই অভিশপ্ত আগুন। বিয়ে কিংবা সন্তান কিছুই ফেরাতে পারেনি তাকে তার এই গোপন ভাললাগার খেলা থেকে। কিছুটা কমেছে বটে কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হয়তো আর শেষ হবে না।

মাঝে মাঝে মিনার সাহেবের ইচ্ছে করে সেই কাকাকে জিজ্ঞেস করে কেন তাকেই বেছে নিয়েছিল এমন বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার জন্য। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। তার সাথে মুখোমুখি হলে- এটা সেটা অনেক কথা হয় কিন্তু সেই কথা আর জিজ্ঞেস করা হয়না?
কে জানে হয়তো তিনিও একই আগুনে আজও দগ্ধ হচ্ছেন। যে আগুন কেবল ভিতরেই জ্বলে বাহির থেকে দেখা যায় না।

কৃতজ্ঞতা ঃ যিনি শেয়ার করেছে নিজের জীবনের চরম বাস্তব সত্যটা।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৩:১৬
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত- এই বিশ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রেখেছি সারাজীবন। কতবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুযোগ, এমনকি ন্যায্য অভিমানও গিলে ফেলেছি। কতবার চুপ থেকেছি, শুধু এই বিশ্বাসে যে ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকাল বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষ যে কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়

লিখেছেন এমএলজি, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৪

বছর দশেক আগের কথা। আমি তখন কানাডায় ব্যবসারত অস্ট্রেলিয়ান এক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সিনিয়র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। আমার এক সহকর্মী ছিলেন যার বয়স কমবেশি ৪৫ বছর। বেশ ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৬

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা: এক ফাঁকা রাতের গল্প

রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘরে। ঘরের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সীমান্তের সুলতান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৫৬



টেকনাফ মডেল থানার ভেতরের খাস কামরা। এসি চলছে তীব্র গতিতে, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের ভারী, ভয়ের গন্ধ। টেবিলের ওপাশে দুই হাত জোড় করে কাঁপছে এক স্থানীয় বাসিন্দা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১২




শ্রাবনের প্রথম দিন । এই সময়ে আকাশ তার দুই রকম চরিত্রে দেখা দেয় । পেট ভড়া মেঘ নিয়ে পশ্চিম কোন ঝুলে থেকে আবার পূবকোনে ঝলমলে সুর্যের দেখা মেলে ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×