
বর্তমান সউদি রাজ পরিবারের নিষ্ঠুরতার তুলনা হয় না
বর্তমান সউদি রাজ পরিবারের নিষ্ঠুরতার তুলনা হয় না। বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান, যাকে সংক্ষেপে 'এমবিএস' নামে জানেন অনেকে, তিনি একালের বিশ্ব সেরা ক্ষমতাশীলদের যেমন অন্যতম নিষ্ঠুরতায়ও ততোধিক সেরা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি যত অন্যায়ই করে থাকুন, তার কোনো বিচার হয় না। তুরস্কে বাহিনী পাঠিয়ে সাংবাদিক খাশোগিকে হত্যা করানোর পরেই বিশ্ব সেটা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। ইসরাইল, আমেরিকাসহ বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর মাথাওয়ালা লোকদের ম্যানেজ করে চলেন তিনি। তিনি তার ব্যক্তিগত কিংবা রাজ পরিবারের অবৈধ কোনো পদক্ষেপের সামান্যতম সমালোচনা বরদাশত করেন না। শাসক, প্রশাসক ও বাদশাহ কাকে বলে এবং শাসক ও বাদশাহদের শক্তি যে কত প্রবল ও ভয়ঙ্কর হতে পারে, মোহাম্মাদ বিন সালমান অত্যন্ত সহৃদয়তার পরিচয় দিয়ে বিশ্বকে ভাল করে অক্ষরে অক্ষরে তা বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ও কৃতিত্বের সবটুকু বলতে গেলে নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। এই জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে পারা যায় না।
সউদি আরবের কারাগারে নিরপরাধ অনেক মানুষ বছরের পর বছর ধরে ধুকে ধুকে মরছেন, যাদের অপরাধ রাজ পরিবারের অনৈতিক কর্মকান্ডের শুধু সামান্য সমালোচনা করেছিলেন তারা। এসব বন্দিদের অনেককে আইনি প্রতিকার গ্রহণের সামান্য সুযোগ দেয়া হয় না। তাদের অনেককে আইনজীবিদের সাথে কথা পর্যন্ত বলতে দেয়া হয় না। আইনজীবি নিয়োগ করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে অনেককে অন্যায়ভাবে কারাপ্রকোষ্ঠে ফেলে রাখা হয়েছে যাতে তিলে তিলে তারা মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে পারেন। এই কৃতিত্ব বিশ্বে আর ক'জন দেখাতে পেরেছেন? অসামান্য এই কৃতিত্বের জন্য এমবিএস কে আরেকটা ধন্যবাদ দেয়া যায় না?
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সেখানে কার্যত অকার্যকর। মানবাধিকার সংগঠনের প্রবেশাধিকারকেই এক প্রকার সীমিত করা হয়েছে গোটা সউদি আরবে। সাম্প্রতিক কালে সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠা অতি কঠোর চীন কিংবা বিশ্ব থেকে আলাদা এবং এক ঘরে হয়ে থাকা উত্তর কোরিয়া থেকে তাদের অবস্থা খুব বেশি এই ক্ষেত্রে খারাপ নয়, বলাই যায়। মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরও জীবনের নিরাপত্তা সেখানে কতটুকু, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। ক'জনের এমন বুকের পাটা, অন্যের অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলতে গিয়ে অকাতরে নিজের জীবন হারায়! তাই মানবাধিকারকর্মী সেখানে কদাচিতই চোখে পড়ে। কালে ভদ্রে মানবাধিকার কর্মীর জন্ম হয় মরু অধ্যুসিত এই জনপদে।
মিডিয়া, সংবাদ পত্র এবং সাংবাদিকতার গোটা প্রক্রিয়াটিই সেখানে বৃত্তবন্দি। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে চলতে হয়। বলতে হয়। উঠতে হয়। বসতে হয়। রাজপরিবারের, রাজন্যবর্গের সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ সেখানে অকল্পনীয়, তা তারা যত অন্যায়-অবিচারই করুন। রাজপরিবারের কোনো ব্যক্তির সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে এমন সংবাদ পরিবেশনের সাহস দেখানোর নিশ্চিত পরিণতি কি হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ সাংবাদিক খাশোগিসহ কারান্তরিণ নির্যাতনের শিকার অনেকে।
সেখানে বাদশাহ বা বাদশাহর প্রতিনিধির অভিমতই চূড়ান্ত। জনগনের ইচ্ছে কিংবা মতামতের কোনো বিষয় সেখানে আদৌ নেই। চিন্তা করা যায় না। বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান নিজের ভবিষ্যত মসনদ দখলের পথ পরিষ্কার করার স্বার্থে ভিন্ন মতাবলম্বি দমন তো করেছেনই, খোদ রাজপরিবারেও তিনি স্টিম রোলার চালিয়েছেন। রাজ পরিবারে ভবিষ্যতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মত সম্ভাব্য সকল সদস্যকে নির্যাতন নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এসেছেন গত কয়েক বছর যাবত। গ্রেপ্তার, মামলা, নির্যাতন কোনোটাই বাদ যায়নি। অবৈধ অর্থোপার্জন কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের দায় চাপিয়ে দিয়ে প্রায় সকলকে জেল জুলূমের মুখে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছেন। রাজ পরিবারের এসব সদস্যদের জীবনে বেঁচে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিকারের পথ একটাই খোলা ছিল- মোহাম্মাদ বিন সালমানের সাথে আপোষ করে তার দেয়া সকল শর্ত বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া। নিজেদের জীবন রক্ষা করার তাদের এই একটাই পথ ছিল। সে পথেই তারা হেটেছেন। বেঁচেও গেছেন আপাততঃ। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহনের কোনো স্বপ্ন কেউ দেখবে না, বাদশাহ হওয়ার দাবি তুলবে না- ইত্যাকার শর্ত পূরণ করে তবেই তারা জানে বাঁচতে সক্ষম হয়েছেন। বুঝাই যায়, আগামী দিনগুলোতে এমবিএস -এর বাদশাহ হওয়ার পথে কাটা হয়ে দাঁড়ানোর মত মাথা রাজপরিবারে আপাততঃ আর নেই। রাজ পরিবারের বাইরেও নেই। জয় এমবিএস!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

