
বিয়েতে ‘উকিল বাপ’ নির্ধারণের প্রয়োজন বা বৈধতা কতটুকু?
আমাদের দেশে অনেক বিয়েতে কোনো একজনকে ‘উকিল বাপ’ নির্ধারণ করতে দেখা যায়। ইসলামী শরিয়ায় এর বিশেষ কোনো প্রয়োজনীয়তা কিংবা অনুমোদন আছে কি না কিংবা আদৌ আছে কি না সেটা জানা দরকার। আসল বাবা যদি জীবিত থেকে থাকেন এবং তিনি নিজের সন্তানকে বিয়ে দিতে সক্ষম হন তাহলে আবার ‘উকিল বাপ’ -এর প্রয়োজন কি? প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে প্রচলন ঘটে যাওয়া এই যে ‘উকিল বাপ’ এর একটা রীতি, এটার ভিত্তি কি? কুরআন হাদিস ইজমা কিয়াস এই বিষয়টিকে কিভাবে দেখে? তাছাড়া শুধু 'উকিল বাপ' কেন? উকিল হলেই তাকে বাপ হতে হবে কেন? উকিল ভাই, উকিল মামা, উকিল বন্ধু হতে সমস্যা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে উকিলের দায়িত্ব যিনিই পালন করে থাকুন, তাকে উকিল বাবা হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি উকিল ভাই, উকিল মামা, উকিল বন্ধু ইত্যাদিও হতে পারেন।
হাদিয়া তোহফা প্রাপ্তির অধিক হকদার প্রকৃত পিতা, উকিল বাপ ননঃ
আমাদের সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে উকিল বাবা নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেগানা কোনো পুরুষকে খামাখা উকিল সাজানো হয়। অতঃপর খুব গুরুত্বের সাথে সারা জীবন সেই সম্পর্ক রক্ষা করে চলা হয়। উকিল বাবাকে পিতা মনে করে সবসময় হাদিয়া আদান প্রদান করতে হয়। যদিও এগুলো পাওয়ার অধিক হকদার প্রকৃত পিতা-মাতা। ক্ষেত্র বিশেষে এমনও দেখা যায় যে, উকিল বাবা মাহরাম কেউ না হওয়া সত্বেও, শুধু উকিল বাবার দোহাই দিয়ে উক্ত মেয়ে তার সামনে নির্দ্বিধায় আপন পিতার মত যাতায়াত করেন। এটি ইসলামি শরিয়াতের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ বিধান পর্দাপ্রথার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শরীয়তে এসব কর্মকান্ড কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়। এসবের কোনো ভিত্তিও নেই ইসলামি শরিয়ায়। মূলতঃ উকিল বাপ সিস্টেমটিই একটি কুসংস্কার। নিছক রুসম রেওয়াজ থেকে প্রচলিত হয়ে চলে আসা সামাজিক প্রথা মাত্র।
‘উকিল বাপ’ বলতে কি বুঝায়?
‘উকিল বাপ’ বাংলাদেশের বহুল ব্যবহৃত এবং অতি পরিচিত একটি পরিভাষা। বাংলা একাডেমি প্রণিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘উকিল’ শব্দের অর্থ লিখেছে ১. আইন ব্যবসায়ী। ২. প্রতিনিধি, মুখপাত্র। ৩. মুসলমানদের বিয়েতে যে ব্যক্তি কনের সম্মতি নিয়ে বরকে জানায়। (বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-১৪৭)। আর ‘বাপ’ শব্দের অর্থ বাবা, পিতা, জন্মদাতা ও পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি।
ইসলামে পবিত্র বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য দু'জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। এই সাক্ষীমণ্ডলীর একজনকে দেশীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘উকিল বাপ’।
সাক্ষী একাধিক, অথচ উকিল বাপ হন একজন, তা কেন?
আমাদের দেশে এই ‘উকিল বাপ’ ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কের মতো আচরণ করা হয়। অবলীলায় তাঁদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়। অথচ ‘উকিল বাপ’ সংস্কৃতি ইসলামসম্মত নয়। কেননা, যদি বিয়ের সাক্ষী হলেই তাকে ‘উকিল বাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে দু'জন সাক্ষীরই তো ‘উকিল বাপ’ হওয়ার কথা। অথচ, বিয়ের সাক্ষী একজনকে পিতার আসনে বসানো হয় আর অন্যজনকে এই বিশেষ বিশেষণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এটাতেও রয়েছে বে-ইনসাফি।
ইসলাম যাদেরকে পিতৃস্থানীয় মর্যাদা প্রদান করেছেঃ
তা ছাড়া পৃথিবীতে প্রকৃত বাবা একজনই, যার ঔরসে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। এর বাইরে ইসলাম কয়েক ধরনের ব্যক্তিকে পিতৃস্থানীয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এক. ‘দুধ পিতা’ অর্থাৎ কোনো শিশু যদি অন্য কোনো নারীর দুধ পান করে, তাহলে সে নারীর স্বামী উলিখিত শিশুর ‘দুধ পিতা’। এমন পিতার সঙ্গে দুগ্ধপায়ী মেয়েশিশুর বিয়ে বৈধ নয়। তবে তারা একে অন্যের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবে।
দুই. বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে আরেক ধরনের পিতৃত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দেশীয় পরিভাষায় ওই পিতাকে বলা হয় ‘শ্বশুর’। ‘শ্বশুর’ স্বামীর পিতা বা পিতৃস্থানীয় হওয়ার কারণে তাঁর সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম। স্বামী যদি কখনো তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে স্বামীর সঙ্গে আর দেখা করা যাবে না; কিন্তু ওই শ্বশুর তখনো হারামই থেকে যাবেন। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে বিয়ে বৈধ নয়। তাঁর সঙ্গে পিতার মতো সর্বাবস্থায় দেখা দেওয়া যাবে।
তিন. দত্তক নেওয়া সন্তানের অভিভাবককেও পিতার মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। এ বিষয়ে ইসলামের বিধান হলো, দত্তক নেওয়া সন্তানের লালনকারীদের সম্মানার্থে মা-বাবা ডাকা বৈধ। একইভাবে তারাও সন্তানকে স্নেহ করে ছেলে-মেয়ে ডাকতে পারবে। তবে এটা মনে করার সুযোগ নেই যে পালক নেওয়ায় সন্তানের আসল মা-বাবা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন লালনকারীই তার সব কিছু। এমন মনে করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি জাহেলি যুগের কুসংস্কার। পবিত্র কোরআনে বিষয়টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৬/৩৩৭, আবু দাউদ, হাদিস : ১৯৪০)।
পর্দা রক্ষা করতে হবে লালন-পালনকারীর সঙ্গেওঃ
লালন-পালনকারীর সঙ্গে পালিত সন্তান পর্দার ক্ষেত্রেও পুরোপুরি ইসলামের বিধান রক্ষা করে চলতে হবে। নিজ হাতে লালন-পালন করেছি বলে পর্দার বিধান লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ পালক নেওয়া শিশুটি ছেলে হলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাকে পালক নেওয়া মায়ের সঙ্গে পর্দা করতে হবে। অন্যদিকে পালক নেওয়া শিশুটি মেয়ে হলে তাকে পালক নেওয়া বাবার সঙ্গে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। কেননা ইসলামী শরিয়ত মতে, দত্তকসংক্রান্ত সম্পর্ক কখনো বংশীয় সম্পর্কে পরিণত হয় না। এমনকি তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কও অন্য সাধারণ মানুষের মতো বৈধ। (তুহফাতুল ফুকাহা : ২/১২৩)
উল্লিখিত কয়েক ধরনের পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের পিতা হিসেবে ইসলাম স্বীকৃতি দেয়নি।
‘উকিল বাপ’ ইসলামি সংস্কৃতির অংশ নয়ঃ
‘উকিল’ একটি মুসলিম পরিভাষা। বিশেষ পদ্ধতিতে বিয়ে মুসলমানদের সংস্কৃতি। কালক্রমে মুসলিম পরিভাষা ও সংস্কৃতির ভেতর ইসলামবিরোধী ‘উকিল বাপ’ কালচার ঢুকে পড়েছে। এ ‘উকিল বাপে’র সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ নয়। তাঁকে ‘বাবা’ ডাকারও কোনো কারণ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজের পিতাকে ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩২৬) ।
'উকিল বাপ' এর সঙ্গে পর্দা করা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজঃ
উকিল বাবা সাধারণত কনের মাহরাম কোনো আত্মীয়-স্বজন হন না; বরং তিনি গাইরে মাহরামই হয়ে থাকেন। তাই তাঁর সঙ্গে পর্দা করা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজ। শুধু সামাজিক প্রচলনের ওপর ভিত্তি করে একজন গাইরে মাহরাম ব্যক্তিকে ‘উকিল বাপ’ বানিয়ে তাঁর সঙ্গে মাহরাম আত্মীয়-স্বজনদের মতো দেখা-সাক্ষাৎ করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
গাইরে মাহরাম কেউ মেয়ের কাছে অনুমতি আনার জন্য তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারবে নাঃ
অনেক সময় দেখা যায়, মেয়ের কাছ থেকে অনুমতি আনার সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য উকিল বাবার সঙ্গে বর-কনে উভয়পক্ষের দুজন সাক্ষী যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে গাইরে মাহরাম কেউ মেয়ের কাছে অনুমতি আনার জন্য তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারবে না।
বিয়ের আগে পাত্রী দেখাঃ
বিয়ের আগে পাত্রীকে পাত্রপক্ষের মহিলাগণ দেখতে পারবেন। তবে, গাইরে মাহরাম পুরুষদের মধ্যে শুধু পাত্রই শর্ত সাপেক্ষে দেখতে পারবে। সে শর্তগুলো হলোঃ
এক. পাত্রী দেখার সময় পাত্রের পক্ষের কোনো পুরুষ যেমন বাপ-ভাই, বন্ধুবান্ধব প্রমুখ কেউ থাকতে পারবে না। তাদের পাত্রী দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ।
দুই. পাত্র-পাত্রী একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। কিন্তু একে অন্যকে স্পর্শ করতে পারবে না।
তিন. পাত্রীর শুধু কবজি পর্যন্ত হাত, টাখনু পর্যন্ত পা ও মুখমণ্ডল দেখা পাত্রের জন্য বৈধ। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ আবরণ ছাড়া দেখতে পারবে না।
চার. নির্জনে পাত্র-পাত্রী একত্রিত হওয়া বৈধ নয়। সুতরাং, যেখানে পাত্রের জন্যই এত শর্ত রয়েছে, সেখানে ‘উকিল বাবা’ পাত্রী দেখার তো প্রশ্নই আসে না। এমনকি পাত্রের প্রকৃত পিতার জন্যও বিয়ের আগে তাঁর হবু পুত্রবধূকে দেখা বৈধ নয়। বিস্তারিত দেখুন, সুরা নিসা, আয়াত : ২৩, তাফসিরে মাজহারি : ২/২৫৪
শেষের কথাঃ
ধৈর্য্য নিয়ে লেখা পাঠের জন্য অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা। ইসলাম যারা সত্যিকারার্থে কুরআন হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাকটিস করতে অভ্যস্ত এবং আগ্রহী, লেখাটি মূলতঃ তাদের জন্য। এখানে 'উকিল বাপ' বিষয়টি আলোচনার সাথে সাথে বিয়ের আনুষঙ্গিক কিছু বিধি-বিধান ইসলামি শরিয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে কুরআন হাদিসে বর্ণিত নির্দেশনার আলোকে তুলে ধরার প্রয়োজন হয়েছে। অতএব, কারও কাছে লেখাটি প্রথা বিরোধী কিংবা অপ্রিয় মনে হলে সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি এবং একই সাথে জানাচ্ছি যে, তারা এই লেখা এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী।
সকলের জন্য কল্যানের দোআ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

