মাত্র আঠারো বছর বয়সের ঘর তাড়ানো একটা ছেলে। সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছে। 'হাপুড় পারা'র বয়স থেকে তার কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই। সেইযে নেই, নেইতো নেই। সাত-আটটা বড়ভাই এবং তিন তিনটা বড়বোন থাকার পর সবচে ছোট সে। সব্বার স্নেহ যা পাবার, উপরদিকে ভাগ-যোগ হতে হতে নি:শেষিত। একটা শিশু'র বাবা ছাড়া সবাই ছিলেন। কিন্তু যার বাবা ছাড়া অনেক বেশি সবাই থাকেন এবং সবাইকেই নিজ একান্ত পরিবার দেখতে হয়, সেই শিশু ভাসতে ভাসতে এখান থেকে সেখানে গেলে তার জীবনটা কেমন হতে পারে? আক্ষরিক অর্থেই সে স্নেহ'র পূর্ণ রূপ কী জিনিস, তা জানে না। যদি স্নেহ কাকে বলে তা জেনেও থাকে, পূর্ণ নির্ভরতা, পূর্ণ নির্ভারতা কাকে বলে, তা কক্ষনো চেনেনি। অন্তত মানুষের কাছ থেকে জানেনি।
শুধু একটা কথা জেনেছে, মেনেছে, হৃদয় ও প্রাণ দিয়ে বাস্তবে বিশ্বাস করে সেটার প্রমাণ রেখেছে, 'ভালবাসা পায়নি যে জন, রাসূল দ. তাকে ভালবাসে!'
ছেলেটার বাবা ছিলেন ফুরফুরা শরীফের একজন খলিফা, পীর সাহেব। তাঁর চার হাজার বই লুট হয়ে গেছে। মরণের পর সব লুট হয়ে যায়। কিন্তু পিতা সন্তানের ভিতর যে চিত্র এঁকে দিয়ে যান, সেই লক্ষ বই কখনো লুট হয় না। ছেলেটার শৈশবের স্মৃতি যেটুকু আছে, তাতে বাবা'র নবী দ. প্রেম রয়েছে। চাচার সাথে নামাজের পর মসজিদে বসে বসে না'ত এ রাসূলে পাক দ. পড়ার স্মৃতি আছে। সে ক্লাস ফাইভে থাকার সময় যেসব কবিতা লিখেছে, সেগুলো বিশ্বাস করাও অসম্ভব। তার বই কেনার টাকা হয় না অথবা তার বাউন্ডুলেপনার কারণে কেনা হয় না যাই হোক- বই না কিনেই সে বছরের পর বছর শুধু মাঝে মাঝে ক্লাস করে সব ক্লাসে প্রথম হয়ে আসছে। এমনকি, প্রায়ই স-ক-ল বিষয়ে সর্ব্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে স্কুল ও কলেজে প্রথম হয়ে আসছে।
আঠারো বছর পার হয়েছে কি এখনো? হয়ত। তার নবীপ্রেমের দ. কবিতাই পেরিয়ে গেছে সহস্র।
হ্যা, ইতোমধ্যে মাহদি আল গালিবের পরিচয় স্পষ্ট।
"মাহদি আল গালিব" শুধু কোটের ভিতর থাকা শব্দটা কপি করে গুগল ইমেজ সার্চে পেস্ট করুন। প্রথমে শুধু মদীনার সবুজ গম্বুজের ছবি আসবে। অসংখ্য। পরিচয় এখানেই নিহিত। আর সব পরিচয় নিহত।
আমি গালিবকে ফোনে-ইনবক্সে প্রায়ই বলতাম, 'দেখেন, ভাইয়া, আমি ব্যক্তি আপনাকে ভালবাসি না। ব্যক্তি আপনাকে প্রেফারেন্স দেই না। আপনার ভিতরে যে সম্ভাবনা আছে, আপনার ভিতরে যে ভালবাসার নহর বইছে, সেটাকে ভালবাসি ও প্রেফারেন্স দেই।' আসলে পোড় খেয়ে খেয়ে প্লাস্টিকের মত হয়ে গেছি নতুন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে। কিন্তু তাকে যেটা বলা হয়নি, সেটা হল, ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনও মমত্ব পাবার দাবিদার।
এই প্রস্ফুটায়মান অতিসম্ভাবনাময় মানুষটা মায়ের কাছে খুব একটা যায় না। কারণ, তার একটু একটু মাতৃ-অভিমানও আছে। এবার মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিল, মা মদীনায় যাবেন। মা হজ্বে যাবেন, তাই ও ছুটে গিয়েছিল কয়েকটা কবিতা নিয়ে, মদীনা দেখতে কেমন, সেই আকুলতা নিয়ে, মদীনায় যে আছেন তাঁর কাছে কী কী জানাতে হবে সেই আকুলতা নিয়ে। মায়ের সাথে একটা ছবিও তুলেছিল। সেই ছবিতে মা আপাদমস্তক বোরখায় ভালভাবে ঢাকা, শুধু হাতের কব্জি ও চেহারা খোলা।
রাজারবাগের সুস্থ স্বাভাবিক পরিপূর্ণ মানবিক চিরায়ত মানুষগুলো করল কী, গালিবের মায়ের সেই হজ্বে যাবার আগের হজ্বে যাবার উদ্দেশ্যে ভিসাপত্র করতে বের হয়ে ছেলের সাথে তোলা ছবিটাকে জগৎজুড়ে উড়িয়ে দিল। বি-ড়া-ট্ট পূণ্যের কাজ করল। ক্যাপশন দিল, (খুবই বাজে ভাষায়, ভাষাটা বলছি না) গালিব তার মাকে বেপর্দা করেছে।
হজ্ব বেপর্দাগিরি। মদিনায় যাওয়া বেপর্দাগিরি।
ছবি তোলা বেপর্দাগিরি।
বৃদ্ধা একজন মহিলা (গালিবের মা আসলেই বৃদ্ধা, গালিব তাঁর সর্বশেষ সন্তান।) মুখমন্ডল ও হাতের কব্জি খোলা রেখে ভালভাবে বোর্খা পরলেও বেপর্দা।
তারা একটা জিনিস ভুলে গেছে, যে ফুরফুরার খলিফা হিসাবে রাজারবাগীরা সারা দুনিয়া চাউড় করে, সেই ফুরফুরার একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান পরলোকগত খলিফার বৃদ্ধা স্ত্রী ও কিশোর সন্তানকে নিয়ে তারা কুৎসা ছড়ালো। তাও যিঁনি মদিনার যাত্রী হিসাবে কাজ করার সময় ছবিটা তুলেছিলেন। যিঁনি হজ্বে বাইতুল্লাহ তে যাবার কাজে নিয়োজিত হয়ে ছবিটা তুলেছিলেন।
যে পাত্র থেকে 'সুধা' পান করো, সেই পাত্রে জলত্যাগ করলে পরবর্তীতে সেখান থেকেই যে পান করতে হবে, সেটা যখন ভুলে যাও, তখনি তুমি মনোবিকারগ্রস্ত। তোমার আইসোলশেন ছাড়া কোন চিকিৎসা নেই। যে গাছের গোড়ায় সমস্যা (দিল্লুর রহমান), যে গাছের বীজে মনোবিকার, সেই গাছ কেমনধারা ফল দেবে, তা আর দেখার কিছু নাই।
এরা এই কাজ একবার করেনি, দশবার করেনি, একশবার করেনি, এক হাজার বারও করেনি, এরচে বহু বেশিবার করেছে। এটা তাদের কাজের ধারা। এই কাজ তারা ঘরে বসে করে না। তাদের 'দরবারের' ভিতরে সাইবার ক্যাফেতে বসে বসে করে, সবাই একসাথে। পেশাদার। অফিস টাইম মেইনটেইন করে করে করে। বেতন দিয়ে করে। রাসূলপাক দ. কে মক করে দাঁড়ি টুপি জোব্বা আচকান চামড়ার মোজা চামড়ার বালিশ চামড়ার বিছানা কাঠের ও পাথরের পানপাত্র ছোট ছোট ডেস্কে ফরাশের উপর বসে কাজ করা স-ব সত্যিকার সুন্নত পালন করে। নামাজের সময় বিরতি দেয়, নামাজ শেষ করে আবার বসে পড়ে। এইযে সুন্নতগুলো পালন করা, এতে কি বিন্দুমাত্র অভিযোগের সুযোগ আছে? নেই! তাঁকে দ. অন্তর থেকে শুধু পোশাকে কেন ট্রান্সফার করব? তাঁকে দ. পোশাকে যেমন লালন করতে হবে, তারচে বেশি ধারণ করতে হবে অণ্তরে! মা ও ছেলের হজে যাবার আগের ছবি বের করে সেটাকে পাবলিশ করে। অথচ বাইরে সুন্নতের বহর নহর বয়ে গেলেও ভিতরটা কীরকম ভীষণরকম ফাঁপা! হায়, যদি ভিতরে তাঁর দ. শিক্ষা একটু হলেও ঢুকত!
গালিব এদের বিরুদ্ধে লিখে খুবই বড় পাপ করে ফেলেছিল তো, তাই তার এই শাস্তি। সাব্বাশ নীতিময়তা, সাব্বাশ বিবেক, তাদের কাছে ইন্টারপ্রেট হওয়া ইসলামের নৈতিকতা-চালিকাশক্তি-কোড অভ লাইফ, সাব্বাশ রাজারবাগের ভবিষ্যত বিশ্বব্যাপী "খিলাফাত" এর ট্রায়াল!
অ-নে-ক আগে মির্জা গালিব (নিতান্তই মদ্যপ এক কবি, যদিও মেধাবী) লিখেছিলেন,
মসজিদেই পান করতে দাও,
নয়তো এমন স্থান দাও,
যেখানে নেই খোদা।
পোশাকে বাস করে তো কোন লাভ নেই যদি হৃদয়ে না থাকে। আর হৃদয় ও পোশাক উভয়ে থাকলে তখনি সফলকাম। কার হৃদয়ে আল্লাহ ও রাসূল দ. বাস করেন এবং কার হৃদয়ে তাঁরা বাস করেন না, সেই বিষয়ে অনেক পরে আল্লামা ইকবাল লিখেছিলেন-
অস্বীকারকারীর হৃদয়ে পান করো, হে গালিব!
কেননা ওটাই একমাত্র স্থান, যেখানে খোদা নেই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



