somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"লুসি" মুভি রিভিউ: একটা সত্যিকার মূল্যায়ন ও তুলনা

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



লুসি'র সাতচল্লিশ মিনিট তেরো সেকেন্ডে থাকা অবস্থায় লিখছি। না, কোন স্পয়লার থাকবে না। তবু, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মাস্ট।

লুসি মুভিটার কথা বলল এক ছোটভাই। তাকে অনেকেই "গুগল" নামে ডাকে। যথার্থ নাম। সত্যায়ন করছি :) । সেও তখনো সদ্য বেরুনো লুসি দেখেনি। শুধু এটার বিষয়ে পড়েছে এবং এরপর থেকেই আমাকে চেপে ধরা, ভাই, লুসিটা একটু দেখেন। লুসিটা একটু দেখেন।
আপনি দেখেছেন?
ক্যাম্নে? ভাল প্রিন্ট আসেনাই তো।
ভাল প্রিন্ট ছাড়া আমিও দেখি না। চাইনিজ লুসি আছে। ওয়াক থুহ্ কাটাছেঁড়া প্রিন্ট। ওইটা দেখব না।

কিন্তু তার কথার একটা মূল্যায়ন আছে। তাই দ্য পাইরেট বে' তে প্রতি সপ্তায় তিন/চারবার সার্চ দেই, লুসি ওয়াইফাই। ওয়াইফাই লুসি বের করে না, আমিও ওয়াইফাই ছাড়া মুভি দেখি না, নয় মণ তেলও হয় না, রাধাও নাচে না।

কাল রাতে হঠাৎ দেখি মিলে গেল! নামালাম, দেখছি এবং দেখা বন্ধ রেখে লিখছি।

লুসি'র উপর সত্যিকার মূল্যায়ন ও তুলনা হবে।

আইএমডিবিতে সাত পেয়েছিল। সেটা নেমে সাড়ে ছয়ে ঠেকেছে। ডাউন টু আইএমডিবি। এই মুভির রেটিং আট থাকা উচিত ছিল। কিন্তু রেট করনেওয়ালারা বোঝেনাই, যে এইটা পুরা ফিকশন না।

এম্নিতে টিভি দেখি না কখনো। নাম শুনে কোন মুভি দেখি না। জানব, শুনব, আগ্রহী হব, তারপর দেখব। এইটা হল স্টাইল।

কারণ, দুনিয়ার তাবৎ অ্যাকশন/হরর/ফ্যান্টাসি/সায়েন্স ফিকশন/রোমান্টিক/কমেডি/অ্যাডভেঞ্চার/ওঅর এমনকি ঐতিহাসিক মুভির উপর থেকেও মন উঠে গেছে। সব থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। ব্রেইনের উপর ইম্প্রেশন ফেলার জন্য শুধু মুভি তৈরি হয়, এই সত্য জানার পর থেকে নিজের ব্রেনে পরের ইম্প্রেশন ফেলতে ভাল লাগে না।

লুসি হতাশ করেনি।

সম্ভবত তাইওয়ান। একটা মেয়ে বাধ্য হয় ড্রাগ স্মাগলারের ডেরায় যেতে। সেই প্রাইম হোটেল সু্ইটে তার ভিতরে পুঁতে দেয়া হয় জগতের সবচে ভয়ানক একটা ড্রাগ। নিজ দেশে গেলে তার থেকে তা তুলে নেয়া হবে এবং সাপ্লাই দেয়া হবে। যে ড্রাগ গর্ভবতীরা ষষ্ঠ সপ্তাহে খুবই সামান্য পরিমাণে উৎপাদন করে এবং এই সামান্য পরিমাণের কারণেই পারমাণবিক বিষ্ফোরণের মত করে গর্ভের বাচ্চার শরীরে হাড়ের গঠন শুরু হয়।

কিন্তু এক লোভীর খপ্পড়ে পড়ে লুসি কিছু লাথি হজম করে এবং তার শরীরে ড্রাগের পোঁটলাটা বিস্ফোরিত হয়। যা হবার তাই হয়। লুসি তার ব্রেন একশোভাগ ব্যবহার করা শুরু করে।

ব্রেইনের কর্মক্ষমতার উপর যে দৃষ্টিটা দিয়েছে এই মুভিতে, সেটা ভালমতই দিয়েছে। "বেড়েন, বেড়েন" বলে পশ্চাদ্দেশ থাবড়ে পুরা মুভি জুড়ে শুধু আধনাঙা মেয়ের বন্দুকবাজি দেখায়নি। বাঁচোয়া।

প্রথমত একটা কথা বলি, এই মুভিতে ব্রেনের কর্মক্ষমতা বিষয়ে যে "থিওরি" দেয়া হয়েছে, সেটা মোটেও থিওরি নয়। বরং চিরন্তন সত্য। দুনিয়াজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তা জানতো এবং এখনো লক্ষ লক্ষ মানুষ জানে। জগতের সবচে বড় ওপেন সিক্রেট এটাই। এটাই জগতের সবচে বড় খোলা কোকের বোতল।

এখানে ব্রেনের যে পারদর্শীতা দেখানো হয়েছে, তাও মোটেও থিওরি নয়। নিওটিক সায়েন্স অনেক এগিয়ে গেছে। এখন আর এইসব সত্য লুকিয়ে রাখা যাবে না। তাই ফিকশন আকারে সত্যিকার সায়েন্সকে দেখানো হচ্ছে। তাও ভাল। এটা তারাই জানে, যারা ধ্যানবিদ্যায় পারদর্শী।

মুভিতে মূলত বলা হয়, মানুষ নিজের ব্রেনের দশ পার্সেন্ট পর্যন্ত ব্যবহার করতে পেরেছে। এবং তাতে এই মানব সভ্যতার উত্থান। এখানে আরেকটা কথা বলা হয়েছে, ব্রেনের বিশ পার্সেন্ট যে ব্যবহার করতে পারবে, সে তার শরীরের সমস্ত মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং "সোনার" প্রজেকশন করতে পরবে। এইটা একটা বুলশিট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, এই পর্যন্ত যা বুঝলাম, তাতে দেহের প্রতি কণার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে ও নিজের অস্তিত্বকে প্রজেকশন করতে আর যাই হোক, বিশ পার্সেন্ট ব্রেনের দরকার নাই। তবে স্থায়ীভাবে হলে হতেও পারে। এরচে বেশি পার্সেন্টেজে গেলে তাদের কথা অনুযায়ী মানুষ পৃথিবীর রোটেশন টের পাবে, তার জন্মের আগে থেকে এখন পর্যন্ত সমস্ত অনুভূতি ও স্মৃতি সরাসরি অনুভব করতে পারবে, ইলেক্ট্রিক/ম্যাগনেটিক/ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস অনুভব নিয়ন্ত্রণ ও বীক্ষণ করতে পারবে, প্রায় সকল গাণিতিক যৌক্তিক বিষয় যেমন কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা ই ইজ ইকুয়াল টু এমসি স্কয়ার এম্নি বুঝতে ও অনুভব করতে পারবে। এমনকি দূর থেকে বেশ কিছু বিষয় 'লোকেট' করতে পারবে। একটা পর্যায়ে তার আবেগ থাকবে না, চাহিদা থাকবে না, ইচ্ছা ও অনিচ্ছা থাকবে না। এই বিশ্লেষণ ভাললাগল। বাস্তব। এইটাকে সূফি পরিভাষায় বলে কামালিয়াত। ঋষি পরিভাষায় মোক্ষলাভ। বৌদ্ধিক পরিভাষায় নির্বাণ।

এখানে ইন জেনারেল বলা হচ্ছে দশ পার্সেন্টের কথা। এইটাও বুলশিট। ইন জেনারেল মানুষের ব্রেইন কখনোই দশ পার্সেন্টে পৌছায় না। সাধারণ মানুষ তো দুই থেকে সাত পার্সেন্টের মধ্যে ঘোরে। ব্রেনের দশ পার্সেন্ট ব্যবহার করা ও এগারো পার্সেন্ট ব্যবহার করার মধ্যে ফারাক কিন্তু আকাশ পাতাল। আসলে বিষয়টা পার্সেন্টেজের নয়, বিষয়টা হল, কত পার্সেন্ট নিউরনকে আমরা পরস্পরের সাথে সক্রিয়তায় সংযুক্ত করতে পারলাম! একটা নিউরন হাজার পাঁচেকের সাথে যুক্ত থাকতে পারে। আর মানব ব্রেনের ১ পার্সেন্ট মানে ১ বিলিয়ন অ্যাক্টিভ নিউরন! মাই গড! একটা পার্সেন্ট ব্রেনকে এগিয়ে নেয়া মানে, একশো কোটি অসম্ভব ক্ষমতাধর মস্তিষ্ক-কোষকে পরস্পরের সাথে এবং আগে অ্যাক্টিভ আরো দুই চার ছয় অথবা আটশো কোটি অ্যাক্টিভ নিউরনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে দেয়া।

বুম্!!!

এখনো সর্ব ডাইমেনশনের বিষয়টা দেখায়নি। সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত দেখায়নি। যদি তারা মুভিতে এটা না দেখায়, তবে বিষয়টা ব্যর্থই থেকে যাবে। কারণ, ব্রেনের সক্ষমতার সাথে সর্ব ডাইমেনশন (স্থান-কাল অর্থাৎ সর্বস্থান ও সর্বকাল) সরাসরি জড়িত। এটাও কোন সিক্রেট নয়। বরং কোকের খেলা বোতল। বহুল পানকৃত, এখনো অ্যামেইজিং।

আর এই মুভিতেও কিন্তু ইম্প্রেশন আছে। যেই কারণে মুভিটুভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সাবলিমিনাল ল্যাঙ্গুয়েজ। হ্যা, নামকরণেই তা আছে। লুসি। লুসি এসেছে লুমোস থেকে। লুসি মানে আলোকিত। আরামদায়ক অর্থ। কিন্তু লুসিফার থেকে লুসি শব্দের উৎপত্তি। লুসিফার মানে আলোকবাহী। এই অর্থও আরামদায়ক। কিন্তু জনাবে লুসিফারের পূজারীরা (এখানে আক্ষরিক অর্থে পূজারী বোঝানো হচ্ছে। থিওরির অর্থে নয়। যেমন, ভালমানুষ সূফিদের উপর মাজার পূজারী শব্দটা অপবাদ। এটা অপবাদ নয়। লুসিফারের আরাধনা আক্ষরিক অর্থেই তারা করেন) শুধু এইটা জানায় না, যে জনাবে "লুসিফারের" অন্যান্য নাম হচ্ছে বিলজিবাব, শাইত্বোয়ান, মালিক তাউশ ইত্যাদি।

আর বিজ্ঞানী সাহেব তো বলেই দিয়েছেন, আরাম মানে হল রিপ্রোডাকশন। আয়েশের অবস্থা মানে নিজেকে পরের প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়ার তাগিদ। নিজের জেনেটিক অগ্রগতি, নিজের সবটুকু। আর সংকট মানে হল, টিকে থাকা। চিরজীবী হওয়া। সেখানে নানাভাবে সংকট বলতে হেলের আবহ তৈরি করা হয়েছে। আপনাদের লুসিফারকে "চিরজীবী" বলতে খুবই আরাম হবার কথা, এ আর বিচিত্র কী।

সাতচল্লিশ মিনিট দেখার পর এটুকু বলতে পারি, ঘটনা সত্য। যদিও বিবর্তন নিয়ে সর্বকালেই প্রশ্ন থেকে যাবে... প্রতি মিনিটে ব্রেনের সক্ষমতার উপর যে তথ্য তারা একটু একটু করে দিয়েছে, তা দারুণ।
এইসব কথা তো আত্মউন্নয়নের বিভিন্ন ধারা যুগে যুগে শিখিয়ে এসেছে। কিন্তু তা মুভিতে ছড়িয়ে পড়াটা মোটেও মন্দ নয়। দেখার মত একটা জিনিস এসেছে বহুদিন পর।

এই ধরনের মুভি যেহেতু তৈরি হয় না, শুধু সেই কারণে এটাকে পাঁচে পাঁচ।

স্পিকিং অভ ব্রেইন- মানুষ কী করতে পারে, এইটা মানুষ জানে না। না, এইটা সবচে বড় ট্রাজেডি না। সবচে বড় ট্রাজেডি হল, মানুষ কী করতে পারে, এইটা মানুষকে জানতে দেয়া হয় না।

মানুষকে আত্মপরিচয়হীন করে রাখাই যেন যান্ত্রিক সভ্যতার একটা মূখ্য উদ্দেশ্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:১৫
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৩

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট’ একটি বহুল ব্যবহৃত পরিচয়। সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পরিচয়ের কদর দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×