somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিলীন স্বপ্ন

০৫ ই মে, ২০১৫ রাত ৯:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অসময়ে শুয়ে থাকাটা ইদানিং অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। কিছুই করার নেই, ক্লাস পরীক্ষা, আড্ডা আর এখন তেমন টানে না, হয়ত আমিই বুঝি না এসবের মজা নয়ত হারিয়ে ফেলেছি এর আকর্ষণ। এখন আমার দিন কাটে শুয়ে বসে, আর গিটারে কিঞ্চিৎ টুং টাং করে। যাক না, খারাপ কি, বেঁচে তো আছি। মাঝে মাঝে সিগারেট কিনতে বাইরে যেতে হয় তাই সেটাও কমিয়ে দিচ্ছি, আলাদা হয়ে যেতে চাই, হারিয়ে যেতে চাই হয়ত পৃথিবী থেকে অথবা নিজের থেকেই। জীবনটা হয়ত এমনি, যে যেতে চায় তাকে আটকানোর চেষ্টা করে আর যে থাকতে চায় তাকে দূরে ঠেলে দেয়।

আজ কি মনে করে আকাশ দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, শুক্লপক্ষের ভাঙা চাঁদ হয়ত টুকরো টুকরো মেঘে লুকোচুরি খেলছে। হয়ত আজ অমাবস্যা, কালোর এক রহস্যময় চাদরে এই শহরটাকে ঘিরে ধরেছে আপন করে, তারার আলোয় আধো আলোকিত ঘুমন্ত শহরটাকে দেখতে হয়ত খারাপ লাগবে না। অথবা পূর্ণিমা, অস্ফুট কোন এক মায়াবী আলোতে ঘিরে পুরো শহর, হয়ত কিছু মানুষ জেগে আছে, চাঁদকে সাক্ষী রেখে প্রেমিক প্রেম নিবেদন করছে প্রেমিকাকে, হয়ত সদ্য জন্ম নেওয়া কোন শিশু উষ্ণতা খোঁজে মায়ের কাছে, হয়ত সদ্য বিবাহিত কোন জুটি কাঁধে মাথা রেখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে নিশ্চুপ ।

একটা সিগারেট ধরালাম, সিলিং এর আকাশে ধোঁওয়ার মেঘ দেখতে ভালই লাগে। মেঘ......মেঘা...... মেঘলা। হুম একটা মেয়ে ছিল, মেঘলা। ভাল মেয়ে, ভাল গাইত, আবৃত্তি করত, মিশুক ছিল, দেখতে ঠিকঠাক কিন্তু মনটা অনেক ভাল ছিল। একসাথে চা খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, ফুচকা খাওয়া কত কিছু, কত স্মৃতি। ওর সাথে শেষ দেখা হবার দিনটা আমার এখনো মনে আছে। সেদিন বৃষ্টি ছিল না কিন্তু মেঘলা অনেক কেঁদেছিল। বারবার বলছিল "তুমি যেয়ো না, আমি থাকতে পারব না। প্লিজ, এমন কর না। আমার দোষ টা কোথায়??" না, মেঘলার দোষ ছিল না, তবুও তাকে যেতে দিয়েছিলাম, সব বন্ধন গুলো একটা একটা করে ছাড়িয়ে নিয়েছি। নিজের প্রয়োজনেই।

মেঘলার সাথে দেখা হবার দিনটা আমার আজো চোখে ভাসে। পহেলা বৈশাখের আগে চারুকলায়। পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি দেখতে ভাললাগে, সবার মধ্যে কেমন যেন একটা ব্যাস্ততা। রঙ, মুখোশ ভালই তো। হটাত পেছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠে চিৎকার এই এই সরেন সরেন। চমকে সরে পেছনে তাকালাম। না আমাকে না, পাশেই কাউকে একটা মেয়ে সরতে বলছিল। একগাদা রঙের ব্রাশ নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল সে। এটাই মেঘা মানে মেঘলা। সেদিন তাকে আর দেখিনি। পরের দিন মানুষের ভিড় ঠেলে আবার গেলাম চারুকলায়। খুঁজলাম তাকে, পেলাম না, বেরিয়ে আশার সময় দেখলাম তাকে, একটা ছোট পিচ্চির গালে রঙ করে লিখে দিচ্ছে। সাদা শাড়ি লাল পাড়, খোঁপায় ফুল, ছিমছাম সাঁজ তবু তাকে লাগছিল অসাধারন। কতক্ষণ তার দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম জানি না কিন্তু হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম ঠিক তার সামনে.........- ভাইয়া, আপনার গালে শুভ নববর্ষ লিখে দেই ????
চমকে উঠলাম আমি। বলে কি, বলা নেই কওয়া নেই সরাসরি গালে হাত !!!
- না
- সবাই করাচ্ছে, আর আমরা চারুকলার স্টুডেন্টরা প্রতিবছর এটা করে থাকি আর সবাই খুশি হয়ে আমাদের কিছু সম্মাননা দিয়ে যান। আপনাকেও করে দেই ???
- না

এরপর আমি ঘুরে চলে আসতে চাইলাম কিন্তু কোথাথেকে একটা ফুলওয়ালি পিচ্চি এসে বলা শুরু করল
- ভাই, একটা ফুল নিয়া যান, আপারে দিয়েন, খুশি হইব আপা
- টাকা নাইরে, অন্যদিন নিব।
- ভাই নিয়া যান না, ফুল না বেচতে পারলে খাইতে পারুম না।

হটাৎ কি মনে করে ঘুরে দাঁড়ালাম মেয়েটার দিকে
- আপনার রঙ আর তুলিটা দিন
মেয়েটা অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
- কেন??
- আপনার মুখে এঁকে দিব, তার বদলে আপনি আমাকে সম্মানি দিবেন, সেটা দিয়ে আমি ফুল কিনব

এবার আমি মেয়েটার চোখে ভয়, কৌতূহল এবং শঙ্কা মেশানো একটা চাহুনি দেখতে পেলাম।
আমি আবার বললাম
- দিন রঙটা, নইলে আমাকে কিছু টাকা ধার ও দিতে পারেন, পরে শোধ করে দেব।

হয়ত ভয় থেকেই আথবা উটকো ঝামেলা দূর করতে মেয়েটি একটু দূরে দাঁড়ানো কোন পরিচিত কারও কাছ থেকে কিছু টাকা এনে দিল আমাকে।

- কি নাম আপনার ???
- জী ??
- আপনার নাম জানতে চাচ্ছি, নইলে ধার শোধ করব কিভাবে ???
- লাগবে না, আপনি নিয়ে যান।
- ঠিক আছে, আপনাকে খুঁজে নিব

ঘুরে আমি টাকাগুলো ছোট মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে বললাম " খেয়ে নিও"। তারপর হেঁটে হেঁটে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাবার আগে পিছন ফিরে দেখলাম অদ্ভুত ভাবে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এর কিছুদিন পর চারুকলায় টাকাটা ফেরত দিতে যাবার কথা থাকলেও ব্যাস্ততার কারনে যাওয়া হয়ে উঠেনি। হটাৎ একদিন কি কাজে যেন চারুকলার সামনে দিয়ে যাবার সময় মনে পড়লো ধার ফেরত দেওয়ার কথা। ঢুঁ মারলাম, কি একটা এক্সিবিসন হচ্ছিল। একটু খুঁজতেই পেয়েগেলাম মেয়েটাকে। একটা ছবির সামনে দাঁড়ানো, ছবিটা একটু আলাদা অন্যান্য ছবিগুলো থেকে। একটা ছেলে একটা ছোট মেয়ের কাছ থেকে ফুল কিনছে। রঙগুলো ও বেশ উজ্জ্বল, মন ভাল করা একটা ব্যাপার আছে। কাছে গিয়ে ডাকলাম মেয়েটাকে

- এক্সকিউজ মি, একটু শুনুন
মেয়েটি ঘুরে তাকাল, চিনতে পেরেছে আমাকে অথবা চেনার চেষ্টা করছে ............

- আমাকে হয়তো চিনতে পারবেন না, আমি আপনার কাছে ঋণী। ধারটা পরিশোধ করতে চাই
- ওহ আপনি, আপনাকে চিনেছি। আপনার ধার পরিশোধ করা লাগবে না, এই এক্সিবিসন এ আমার এই ছবিটা একটু আগে বিক্রি হয়ে গেল। মডেল আপনি, কিন্তু আপনার অনুমতি না নিয়েই ছবিটা আঁকা। উলটো আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।
- তাহলে ঋণগুলো কাটাকাটি করে নেই, কি বলেন ??? ঋণী থাকা আমার পছন্দ না।
- সেটা অবশ্য হয়, তবে আমার সাথে এক কাপ চা খেতেই হবে, না করতে পারবেন না আজ।
- হুম, জটিল হিসাব। ঠিকাছে চলুন......
- ও আপনার নামটা জানা হল না, আমি মেঘলা
- আমি রাহাত

এভাবেই পরিচয় আমাদের। এরপর মাঝে মাঝে কথা হতো, ধিরে ধিরে সখ্যতা বাড়তে লাগলো। কথা বলা, দেখা করা, সময় দেওয়া, একে অপরের সাথে সবকিছু শেয়ার করা। আমরা আরও কাছাকাছি হতে লাগলাম। একসময় বুঝতে পারলাম আমি তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি। আমার জীবনটা তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে, আমি আরও একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি তার মাঝে ..................


টপ টপ কয়েক ফোঁটা নোনা পানি পড়লো ডাইরিটায়। খুব যত্নে মুছে নিল মেঘা। এটাই রাহাতের সৃতি, রাহাতের লেখা শেষ কিছু কথা। অনেকদিন হয় রাহাত মারা গেছে। ক্যান্সার বাসা বেঁধেছিল তার রক্তে। কাউকে বুঝতে দেয় নি, নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল সবার থেকে। আজ অনেক মনে পড়ছিল রাহাতকে, তাই ডাইরিটা পড়ছিল, প্রতিবার পড়ে, প্রতিবার চোখ টা আপনিতেই ভিজে ওঠে। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, কালবৈশাখী। আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরে সে ডায়েরিটা, জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বাইরে। ঘুমন্ত শহর আজ বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে, নতুন বছরের আগমনের ধ্বনি, পুরনো বছরের সব জরা, ক্লান্তি, কষ্ট ধুয়ে নিচ্ছে কিন্তু কিছু মানুষের মাঝে কিছু চাপা কষ্ট থাকে যা বৃষ্টি ধুয়ে নিতে পারে না, কখনই পারে না ।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাসাগরের ধারের সেই ছোট্ট দ্বীপ সামোয়া এবং বিশ্বকাপ ফুটবল

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিশ্বকাপের এই মৌসুমে ফুটবল নিয়ে একটা দারুণ হার্ট লিফটিং মুভি দেখে ফেললাম - "Next Goal Wins"
গল্পটা আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩১-০ গোলে হেরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা ভয়ংকর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!

শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×