somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ কর্ম পরিবার

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রাত ১০:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




অফিসের অন্য দিন গুলোর মতন কর্মব্যস্ত দিনে হঠাৎ অফিসের মালিক ম্যানেজিং ডিরেক্টর অসুস্থ হয়ে গিয়ে হসপিটালে ভর্তি তাই আপাতত কোম্পানির দায়িত্ব তাঁর ছেলে সামলাবে এইরকম মেইল আসলো সবার কাছে।
বছরের পর বছর ধরে অফিসের সকল কর্মচারী যার ছায়ায় সুখে দুঃখে নিরাপদে ছিল, হঠাৎ তাঁর অনুপস্থিতি পুরো অফিসে এক ধরনের অস্বস্তি ছড়িয়ে দিল তাই।

এই নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনার পর পরের দিন নতুন বস এলো অফিসে অর্থাৎ মালিকের ছেলে, তিনি অফিসে এসেই প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিল কিছু কর্মীকে ছাঁটাই করবেন। অযথা এতগুলো টাকা বেতন দিয়ে এত কর্মচারী রাখার কোন মানে হয় না অফিসে।
বেতনেই তো লক্ষ লক্ষ টাকা লস করে দিচ্ছে কোম্পানি, ছাঁটাইয়ের খবর শুনে কম বেশি সবার বুকের ভেতর ধক করে উঠল, ৫-১০ কেউ কেউ ১৫-২০ বছর এই কোম্পানিতে কাটানোর পর এখন যদি চাকরি থেকে বের করে দেয়া হয়, এই বয়সে গিয়ে কোথায় আবার ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি নেবে, লজ্জার ও তো ব্যাপার; সংসারই বা চলবে কিভাবে! প্রায় প্রত্যেকে এই চিন্তায় অস্থির হয়ে রইল ভেতরে ভেতরে।

তারপর সেই বিধ্বংসী তালিকা প্রকাশিত হলো, তালিকায় প্রথমেই নাম উঠে এলো বৃদ্ধ আমান সাহেবের, যিনি এই কোম্পানির প্রথম দিকের কর্মচারী। তাঁর বয়স হয়েছে, কাজের গতি কমেছে ঠিকই, কিন্তু এত বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন, খবরটা শুনে তাঁর চোখেমুখে আতঙ্ক ফুটে উঠলো।
সে যাবার সময় মালিকের ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আপনি যদি বিশ্বাস করেন আমাকে এই কোম্পানিতে আর প্রয়োজন নেই তবে আমি আপনাকে এটা কখনোই বিশ্বাস করাতে পারবো না; আমি এবং এই কোম্পানি একজন মানুষ আরেকটি কর্মস্থল দুই ক্ষেত্রই কতটা কষ্টে থাকবে এই হঠাৎ বিচ্ছেদে।

সপ্তাহটা যেন ভারি হয়ে গেল। অফিসের বাকি কর্মচারীদের মাঝে যেন আর আগের সেই উৎসাহ উদ্দীপনা নেই কাজ কর্মের। পরের আরো পনেরো দিন একই রকম কাটলো,

তারপর একদিন সকালে অফিসের গেট পর্যন্ত পৌঁছে সবাই অবাক হয়ে গেলো।
গাড়ি থেকে নামছেন অফিসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অর্থাৎ পুরনো বস, হুইলচেয়ারে, তার পাশে দাঁড়ানো তার ছেলে। ছেলে কিছুটা গম্ভীর চুপচাপ মলিন।

অফিসের সবাই হতবিহব্বল হয়ে চেয়ে দেখলো আমান সাহেব সহ সকল ছাটাই করা কর্মীরা অফিসে একে একে ঢুকছে, আমন সাহেবকে দেখে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের ছেলে নিজে এসে আমান সাহেবের হাত ধরে অফিসের ভিতরে নিয়ে গেলেন, অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ক্ষমা চাইলেন। বৃদ্ধ আমান সাহেবের চোখ ছল ছল করে উঠলো।

ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে হুইল চেয়ারে ভেতরে আনার পর সকল ছাটাইকৃত কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে প্রথমেই বললেন,
- যতদিন আমি বেঁচে আছি, আমার কোনো কর্মীকে দরকার নেই বলা যাবে না। আপনারা সবাই আমার পরিবার। পরিবারকে ছাঁটাই করা যায় না। আমার ছেলে আপনাদের ছাটাই করে যে অপরাধ করেছে তার জন্য আমি দুঃখিত এবং লজ্জিত আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দিন।

কথাগুলো শুনে সকল কর্মচারীর চোখে জল চলে এলো বুক হালকা হয়ে গেল সবার।
ছেলে নিচু গলায় বাবাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করলে তিনি তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন
- কোম্পানি শুধু লাভ ক্ষতির হিসাব করলে হয় না, প্রত্যেকটা মানুষ আমার জীবনের অংশ বলে মনে করি। আজ আমি অসুস্থ, কাল তুমিও হবে। তখন পাশে দাঁড়াবে কারা? এই মানুষগুলোই।
সবাই একযোগে করতালি দিয়ে ম্যানেজিং ডিরেক্টর স্যারকে ঘিরে তার শরীর স্বাস্থ্যের খবর নেওয়ার ব্যস্ত হয়ে গেল।

কুশলাদি বিনিময়ের একফাঁকে তিনি সবার অগোচরেই চোখের জল মুছলেন। এরাই তো তাঁর আপনজন! এরাই তাঁকে কোথা থেকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কোম্পানির শুরুতে চাদর পেতে এই আমান সাহেবের সঙ্গেই বসে দুপুরের ভাত খেতেন তিনি।
আজ সেই মানুষগুলো পাশে আছে তবে প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে, চাদরের পরিবর্তে এখন রাজকীয় ডাইনিং টেবিল। আসন পাল্টেছে, পরিবেশ পাল্টেছে, কিন্তু মনুষ্যত্বের বন্ধন কখনো পাল্টায় না। (সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:১১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাবধানের মার্ নেই

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩১


নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরার পথে নিউ আর্ক্ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন এরোপ্লেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটের কাছে পৌঁছলাম দেখলাম এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক জানালার পাশের সিটটাতে অলরেডি বসে আছেন। আইল ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×