somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ সময়ের দীর্ঘশ্বাস শেষে

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৪:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রহমান সাহেবের চোখে ক্লান্ত; দৃষ্টির গভীরে জমে আছে দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা। পাপড়ি খসে পড়া চোখগুলো কোনো স্বপ্ন দেখে না আর, যা দেখে কেবল‌ তা অভ্যাসের তাড়না। একসময় মানুষ যতই সংগ্রাম করুক, জীবনের শেষ প্রান্তে থেকে যায় শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। বুকের ভেতর ধুকপুক করা হৃদপিণ্ডটা যেন এক যান্ত্রিক মেশিন; চলার জন্য চলছে; বাঁচার জন্য নয়।

বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবেন, বিজ্ঞানীরা এত আবিষ্কার করলেন, অথচ মানুষের হৃদয়ের যন্ত্রণা কমানোর কোনো ইনজেকশন কি আবিষ্কার করতে পেরেছেন? বুকের ভেতর যে যন্ত্রটি নিরন্তর ধ্বনি তোলে কষ্টের, সেই যন্ত্রের বেদনা মাপার কোনো উপায় কি আবিষ্কার করেছেন তারা?

লাইন সামনে এগোয় না, অথচ পিছনের মানুষগুলো ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। মাত্র দুই টাকার ভাংতি নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়লেন রহমান সাহেবের সাথে কাউন্টারের লোকটা। লোকটি কড়া গলায় ধমক দিচ্ছেন তাকে, বৃদ্ধ একজন মানুষকে তারুণ্যের ক্ষমতায় ধমক দিতেই পারেন।

পেছনের লাইনের মানুষ চাপ সৃষ্টি করছে হতভাগ্য বৃদ্ধ বুঝলেন, এই দুই টাকা তার অমোঘ নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার বার মিনতি করলেন বাবা, দুই টাকা তো ভাংতি নেই এই দশ টাকা আপনার কাছে রাখেন, আমারে যেতে দেন। কিন্তু লোকটি আরও রুক্ষ স্বরে বললো, না ঠিক মতো দেন, বাড়তি টাকা আমি নেবো না।

ঠিক সেই সংকটমুহূর্তে এক তরুণী এগিয়ে এসে ব্যাগ থেকে দুই টাকার একটি চকচকে কয়েন হাতে তুলে দিলেন। রহমান সাহেব অস্ফুট কণ্ঠে বললেন মাগো, কৃতজ্ঞতা তোমার কাছে। মেয়েটি সে কথা কিছু শোনেনি, হেডফোনে ডুবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে সে।

দুপুর গড়িয়ে বাড়ি ফিরলেন তিনি। সারা দেহে তৃষ্ণা, মাথায় ক্লান্তির ভার রহমান সাহেবের। গেট খুলতেই ছেলে তাড়া দিলো
এত দেরি কেন বাবা? বাজার তো করা হলো না! এক্ষুনি বের হন, দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে। গরমে না খেয়ে বসে থাকবো নাকি? এই নেন টাকা।
টাকাটা কাঁপা হাতে নিতে নিতে বলল বৌমাকে একটু যদি পানি দিতে বলতি খুব পিপাশা লেগেছে পরক্ষনেই
ছেলের বিরক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন,
- থাক লাগবে না,রহমান সাহেব আবার বের হলেন। বাজারের পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার ভেসে উঠলো মৃত স্ত্রীর চোখ; টলটলে শীতল কালো জলের মতো, যেখানে একসময়ে তিনি শান্তি খুঁজে পেতেন।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মনের ভেতর কষ্ট চেপে ধরে বললেন ওরা ভুলে যায়, ওরাও একদিন বৃদ্ধ একাকী অসহায় বাবা হবে।

বাজার করে ফিরে এসে গেটের সামনে বাজারের ব্যাগ হাতে হঠাৎই লুটিয়ে পড়লেন রহমান সাহেব। মাটিতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগের ভেতর থেকে সবজি আর ফল একে একে গড়িয়ে পড়লো। বুকের ভেতরকার হৃদপিণ্ডটি থেমে যেতে চাইছে বারবার, নিশ্বাসের শব্দ যেন ভাঙা বাঁশির মতো হেঁচকি দিয়ে উঠছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সুমনা আর তার স্বামী। দীর্ঘদিনের স্বপ্নে গড়া তাদের বানানো বৃদ্ধাশ্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠান আজ। গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে সুমনার চোখে ধরা পড়লো রাস্তায় অচেতন এক বৃদ্ধ পড়ে আছে। বিস্ময় আর আতঙ্কে সে চিৎকার করে বলে উঠলো,
- গাড়ি থামাও

দু’জনে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থামিয়ে রহমান সাহেবকে তুলে নিলো। নিস্তেজ দেহটা যেন মুঠো থেকে ফসকে যাওয়া বালির মতো অসহায়। গাড়ি ছুটলো নিকটতম হাসপাতালে।
ডাক্তাররা পরীক্ষা শেষে বললেন,
- হিট স্ট্রোক হয়েছে। তবে এবারের মতো বেঁচে গেছেন।

ওরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো, রহমান সাহেবের চোখে মুখে ক্লান্তি, ওদের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দেয়ার চেষ্টা করলেন কৃতজ্ঞতায়। ডাক্তার ছাড়পত্র দিলে, সুমনা আর ওর স্বামী তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলতেই; তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন,
- আমি আর আমার বাড়ি ফিরতে চাই না। ওটা এখন আমার ছেলের ঘর, এখন সে ঐ বাড়ির মালিক আর আমি বৃদ্ধ সব কাজে ভুল করা চাকর, ঐ বাড়ি আমায় আর টানে না।

রহমান সাহেবের কথা শুনে সুমনা আর ওর স্বামীর ভেতরটা কেঁপে উঠলো, কতটা কষ্টে একটা মানুষ এভাবে বলতে পারে, নিরবে তাকিয়ে রইল দু’জনের চোখেই একই সিদ্ধান্ত ভেসে উঠলো।

গাড়ি এবার যেতে লাগলো বৃদ্ধাশ্রমের দিকে। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা গেলো রঙিন ফিতা আর উজ্জ্বল ব্যানারে লেখা 'স্বপ্নপূরণ বৃদ্ধাশ্রম'।

এদিকে বাড়ির ভেতরে এসির বাতাসে বসে থাকা রহমান সাহেবের ছেলে আর ছেলের বউয়ের গরমে দম বন্ধ ফিলিং লাগায় এসির পাশাপাশি ফ্যান ছেড়ে আরাম করে বসে মোবাইল নিয়ে। ফুড পান্ডায় খাবার অর্ডার করতে করতে; বাবাকে মনে মনে কয়েকটা গালি দিতে দিতে ভাবে এখনো ফিরলো না বাজার নিয়ে! চুলোয় যাক বুড়ো টা।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৪:৩১
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইনকা চিপা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬


এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণীকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×