somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ বঞ্চিত

১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাসায় নতুন একজন কাজের খালা এসেছেন। প্রথম দিনই লাবনীর খেয়াল হলো, বয়স হয়েছে ভদ্রমহিলার। মুখে ক্লান্তির ছাপ, হাতের চামড়ায় বয়সের ভাঁজ। অথচ কাজের ফাঁকে ফাঁকে যেভাবে ছোটাছুটি করছেন, তাতে মনে হয়, বাড়ির প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব যেন একা তাঁরই কাঁধে। দুপুরে খেতে বসে লাবনী দেখল, রান্নাঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে ভাত খাচ্ছেন। খাওয়ার সময়ও চোখ বারবার ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছে, যেন একটু দেরি হলেই কোথাও ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে।
লাবনী বলল, খালা, একটু বসে আরাম করে খান। এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?
তিনি লাবনীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। কাম তো অনেক মা। এই বাড়িতে কাম শেষ হইলেও নিজের বাড়িতে গিয়া আবার কাম। আমার আর আরাম কই?
আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
অনেক মানুষ মা। তিনটা নাতি-নাতনি, মাইয়া আছে।
লাবনী একটু অবাক হয়ে বলল, তাহলে এই বয়সে কাজ করতে আসছেন কেন? আপনার মেয়ে কি কিছু করে না?
খালা এবার আর হাসলেন না। হাতের ভাতটুকু মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, মাইয়ারে লইয়া আইছি নিজের কাছে।
কেন?
জামাই মারে মা। সারাদিন মারে। ওইখানে থাকলে একদিন আমার মাইয়াডারে মাইরাই ফালাইবো। তাই লইয়া আইছি। এখন কাম না করলে খাওয়ামু কী? তিনটা বাচ্চা আছে। আমার মাইয়াডার কত কষ্ট।

লাবনী আর কোনো কথা বলতে পারল না। খালা আবার খাওয়ায় মন দিলেন, যেন খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। যেন পৃথিবীতে মেয়েকে স্বামীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসা, নিজের বৃদ্ধ বয়সে অন্যের বাড়িতে কাজ করে তার সন্তানদের খাওয়ানো তার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

কিন্তু লাবনীর কাছে ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক মনে হলো। সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে লাবনীর মায়ের কথা মনে পড়ল। তার মা পৃথিবীতে লাবনীর সবচেয়ে আপন মানুষদের একজন। ছোটবেলা থেকে লাবনী বিশ্বাস করে এসেছে, মায়েরা বুঝি এমনই হন। সন্তান কষ্ট পেলে তাঁদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, সন্তান বিপদে পড়লে তাঁরা সবকিছু ফেলে ছুটে আসেন। পৃথিবীর বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও মায়ের দরজাটা অন্তত খোলা থাকে। লাবনী ভুল ভেবেছিল কি না, জানে না। শুধু জানে, তার জীবনে সেই দরজাটা কোনোদিন পুরোপুরি খোলেনি।

লাবনীর বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর। স্বামীর নাম তন্ময়। বিয়ের প্রথম দিকে মানুষটা এমন ছিল না, অন্তত লাবনীর তাই মনে হতো। বিয়ের পর মানুষকে বোঝার জন্য যতটা সময় দরকার, তার আগেই হয়তো সে সংসার নামের একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। তারপর ধীরে ধীরে তন্ময়ের রাগ বাড়তে শুরু করল। সামান্য কথায় চিৎকার, কথায় কথায় অপমান, তারপর একসময় গায়ে হাত তোলা। প্রথমবার যখন তন্ময় লাবনীকে মেরেছিল, সে অবাক হয়ে গিয়েছিল। মানুষটা তাকে মারতে পারে, এটা তার মাথায় আসেনি। সেদিন রাতে বাথরুমে দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিল লাবনী। আয়নায় নিজের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, একে সে চেনে না। পরদিন সকালে তন্ময় এমনভাবে কথা বলল, যেন আগের রাতে কিছুই হয়নি। লাবনী চুপ করে রইল। তারপর আবার হলো, তারপর আরও কয়েকবার। একসময় মারধর আর অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে হতো না। বরং কোনো সপ্তাহে মারধর না হলে লাবনী ভাবত, হয়তো এবার সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের সহ্য করার ক্ষমতা বোধহয় ভয়ংকর রকমের বেশি।

একদিন রাতে তন্ময় লাবনীর মাথায় এত জোরে আঘাত করেছিল যে বিছানা থেকে উঠতে পারছিল না। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল,শরীরের ব্যথার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, তার কিছু হয়ে গেলে কেউ কি জানতো, সে কতটা কষ্টে ছিল? রাত তিনটার দিকে মাকে ফোন করেছিল লাবনী। মা ঘুমিয়ে ছিলেন। কয়েকবার ফোন করার পর ধরলেন। কী হয়েছে রে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন? লাবনী কান্না আটকে রাখতে পারল না। মা, তন্ময় আমাকে খুব মেরেছে। আর পারছি না। মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আবার কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে? লাবনী বলল, কী হয়েছে সেটা বড় কথা না মা। ও আমাকে মেরেছে। তুইও নিশ্চয়ই কিছু বলেছিস। পুরুষ মানুষ রাগ করলে একটু-আধটু হয়। তুই চুপচাপ থাকবি। সংসার করতে গেলে একটু সহ্য করতে হয়। ফোনটা কানে নিয়ে বসে রইল লাবনী। তার মনে হচ্ছিল, মা বুঝি কথাটা ঠিকমতো শুনতে পাননি। সে আবার বলল, মা, সত্যি আর পারছি না। তুমি আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও। মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তুই চলে এলে মানুষ কী বলবে? তোর ভাইদের সংসার আছে। তাদেরও তো একটা মানসম্মান আছে। তুই একটু বুঝে চল।

সেদিন আর কাঁদেনি লাবনী। কান্না পাওয়ার মতো শক্তিটুকুও যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। লাবনীর দুই ভাই, বড় ভাই রাশেদ আর ছোট ভাই সুমন। রাশেদের স্ত্রী শিউলি, সুমনের স্ত্রী নীলা। একদিন বড় ভাইকে ফোন করে সব বলেছিল লাবনী। ভেবেছিল, ভাই অন্তত বুঝবে। ছোটবেলায় তার হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া মানুষটা নিশ্চয়ই তার কষ্টটা বুঝবে। ভাই বলল, দেখ, তুই আমার বোন। তোর খারাপ চাই না। কিন্তু সংসারে এসব হয়। তুই একটু মানিয়ে চল। লাবনী বলল, ভাই, ও আমাকে মারে। রাশেদ বলল, তুই কি একবারও ভাবিস, তুই চলে এলে আমাদের কী অবস্থা হবে? শিউলির আত্মীয়স্বজন আছে, আমার অফিস আছে। সবাই জানবে আমার বোনের সংসার টেকেনি। লাবনী কিছু বলল না। সেদিন মনে হয়েছিল, তার শরীরের ওপর পড়া আঘাতের চেয়ে ভাইয়ের কাছে মানুষের কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ছোট ভাই সুমনকে বলেছিল আরেক দিন। সুমন বলল, আপা, তুই একটু ঠান্ডা মাথায় থাক। দুলাভাইয়ের মেজাজ তো জানিসই। লাবনী বলল, আমি কি মানুষ না? সুমন চুপ করে রইলো। তারপর বলল, তুই একটু বুঝে চলিস। আমরা তো আছি।

তারা ছিল, কিন্তু এমনভাবে ছিল, যেন লাবনীর কষ্টের কথা জানাটাই তাদের দায়িত্বের শেষ। তার জীবন থেকে কষ্টটাকে সরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কেউ নিতে রাজি না। মাকে বলেছে লাবনী, ভাইদের বলেছে, ভাবিদের বলেছে। কেউ বলেনি, চলে আয়। কেউ বলেনি, তোর জীবনটা একটা সংসারের চেয়ে বড়।

নতুন খালা রহিমা বেগম তাদের বাসায় আসার কয়েক দিন পর এক দুপুরে তাঁর সঙ্গে আবার কথা হলো লাবনীর। তিনি রান্নাঘরের মেঝেতে বসে আলু কাটছিলেন। লাবনী পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল। খালা, আপনার মেয়ের নাম কী? রহিমা বললেন, রুবিনা। রুবিনার বয়স কত? চল্লিশের কাছাকাছি হইবো মা। তিনটা বাচ্চা? হ, দুই পোলা, এক মাইয়া। আপনি একা সামলাতে পারছেন? খালা আলু কাটতে কাটতে বললেন, পারতে তো হইবো মা। মাইয়াডা যদি একটু শান্তিতে থাকতে পারে, আমি সব পারমু। লাবনী জিজ্ঞেস করল, আপনার জামাই যদি আবার এসে নিয়ে যেতে চায়? এবার খালা হাত থামালেন। নিতে চাইলে আগে আমারে পার হইতে হইবো। আমার মাইয়াডারে আর ওইখানে পাঠামু না।
লাবনী তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। একজন বৃদ্ধা নারী, নিজের বাড়িতে হয়তো তাঁরও অনেক সমস্যা আছে, অভাব আছে, দায়িত্ব আছে, বয়সের কারণে শরীরের কষ্ট আছে। তারপরও মেয়ের স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তাঁর দ্বিধা নেই। তিনি জানেন, মেয়েকে নিজের কাছে রাখলে সংসারের খরচ বাড়বে, নাতি-নাতনিদের মানুষ করতে হবে, অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হবে। তবু তিনি মেয়েকে ফিরিয়ে দেবেন না।

লাবনী মনে মনে ভাবল, মা হওয়া কি তবে এমনই? পরক্ষণেই নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল। তার মা কি তাকে ভালোবাসেন না? এই প্রশ্নের উত্তর লাবনী জানে না। ছোটবেলায় জ্বর হলে মা তার মাথায় পানি দিতেন, স্কুলে যাওয়ার আগে চুল বেঁধে দিতেন, তার পছন্দের খাবার রান্না করতেন। সে অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকতেন। সেই মা-ই এখন তার কষ্টের কথা শুনে বলেন, সংসার করতে গেলে সহ্য করতে হয়। মানুষ কি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়? নাকি ছোটবেলায় মায়ের যে রূপটা দেখা যায়, বড় হওয়ার পর তাঁর অন্য রূপগুলো চোখে পড়তে শুরু করে? লাবনী জানে না।

একদিন বিকেলে মা ফোন করলেন। কী করিস? এই তো মা, বাসায়। তন্ময় কোথায়? অফিসে। তোর সঙ্গে এখন ভালো ব্যবহার করে? লাবনী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হ্যাঁ মা, ভালো। মা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আলহামদুলিল্লাহ। সংসারটা ভালোভাবে করিস। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটু-আধটু ঝামেলা থাকেই। লাবনী ফোনের ওপাশে মায়ের কণ্ঠ শুনছিল। হঠাৎ খুব জানতে ইচ্ছে করল, মা, তুমি কেন এই প্রশ্নটা করো? তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, আমি ভালো আছি কি না? নাকি তুমি শুধু নিশ্চিত হতে চাও, আমি আর তোমাকে কোনো অস্বস্তিকর কথা বলব না? তুমি যদি জানতে, তন্ময় এখনো আমাকে মারে, তাহলে কী করতে? আমাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে? নাকি আবার বলতে, সংসার কর, মানিয়ে চল? লাবনী কিছুই জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল, মা, তুমি কেমন আছ? মা তাঁর শরীরের নানা সমস্যার কথা বলতে শুরু করলেন। হাঁটুতে ব্যথা, ঘুম হয় না, রক্তচাপ বেড়েছে। লাবনী মন দিয়ে শুনল। ওষুধ খেতে বলল, ডাক্তারের কাছে যেতে বলল। ফোন রাখার আগে মা বললেন, সুযোগ পেলে একদিন বাসায় আসিস। লাবনী হেসে বলল, আসব মা।

ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ বসে রইল সে। মা তাকে বাসায় আসতে বলেছেন, কিন্তু তার মনে পড়ল না, শেষ কবে মা বলেছিলেন, তুই কষ্টে আছিস, চলে আয়।
সেদিন রাতে তন্ময়ের সঙ্গে আবার ঝগড়া হলো। কী নিয়ে শুরু হয়েছিল, এখন আর মনে নেই। হয়তো খাবারে লবণ কম ছিল, হয়তো ফোন ধরতে দেরি করেছিল লাবনী, হয়তো তন্ময়ের দিনটা খারাপ গিয়েছিল। কারণগুলো কখনোই খুব গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ তার রাগ হলে তন্ময় লাবনীকে মারতে পারতো, আর তাকে সেই মার সহ্য করতে হতো। রাত বাড়তে থাকলো। পাশের ঘরে টেলিভিশনের শব্দ, বাইরে গাড়ির আওয়াজ, লাবনীর ঘরের দরজা বন্ধ। তন্ময় ঘুমিয়ে পড়ার পর লাবনী বিছানার একপাশে বসে রইল। মোবাইল হাতে নিয়ে মায়ের নম্বর খুলল। কল দিতে গিয়েও দিল না। কী বলবে তাঁকে? মা, আজও আমাকে মেরেছে? মা, আজও আমার খুব কষ্ট হচ্ছে? মা, আমাকে নিয়ে যাও? একই কথা বারবার বলতে বলতে নিজের কাছেই কেমন অসহায় লাগে। মনে হয়, সে বুঝি এমন একটা মানুষ, যার কষ্টের কোনো শেষ নেই, অথচ সেই কষ্ট থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তাও নেই।

মোবাইলটা পাশে রেখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল লাবনী। হঠাৎ রহিমা খালার কথা মনে পড়ল। নিতে চাইলে আগে আমারে পার হইতে হইবো। কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো। ঈর্ষা, অভিমান, না কি দুঃখ, ঠিক বুঝতে পারল না লাবনী। খালা তাঁর মেয়েকে বাঁচাতে পারবেন কি না, সে জানে না। কিন্তু তিনি অন্তত চেষ্টা করছেন। মেয়ের জন্য নিজের বয়সকে বাধা হতে দেননি, সমাজের কথাকে ভয় পাননি। মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার চেয়ে মেয়ের জীবনটাকে বেশি মূল্য দিয়েছেন। আর লাবনী? সে শুধু অপেক্ষা করছে, কেউ একজন এসে বলবে, আর না, আর তোমাকে এসব সহ্য করতে হবে না।

কয়েক দিন পর রহিমা খালাকে দেখল লাবনী, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে কথা বলছেন। হ, মা, খাইছস? বাচ্চাগুলারে খাওয়াইছস? ওষুধ খাইছস? ওপাশ থেকে কী বলল শুনতে পেল না লাবনী। খালা বললেন, কিছু লাগলে কইস। আমি আছি তো। চিন্তা করিস না। ফোন রেখে তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। লাবনী জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে খালা? তিনি তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বললেন, কিছু না মা। মাইয়াডার মন খারাপ। বাচ্চাদের নিয়া চিন্তা করে। লাবনী বলল, আপনি ওকে খুব ভালোবাসেন, তাই না? খালা এমনভাবে লাবনীর দিকে তাকালেন, যেন প্রশ্নটা বুঝতেই পারেননি। মাইয়ারে ভালোবাসমু না তো কেডারে বাসমু মা? লাবনী আর কিছু বলতে পারল না। খালা আবার কাজে লেগে গেলেন।

লাবনী তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাবল, মায়ের ভালোবাসা এত সহজ? সন্তানের কষ্টের কথা শুনলে তাকে নিজের কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে করবে। সে বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে করবে। সে বারবার ভেঙে পড়লে তাকে বলব, তুই আর একা না। অন্তত রহিমা খালার ভালোবাসা দেখে লাবনীর তাই মনে হলো। কিন্তু তার মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে এই ভালোবাসার হিসাবটা মেলাতে পারে না সে। লাবনী জানে, মা তাকে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় কত স্মৃতি, কত দিন মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে, কতবার মায়ের হাতে খেয়েছে। মায়ের অসুখ হলে আজও তার বুক কেঁপে ওঠে। তবু কেন তার কষ্টের কথা শুনে মা তাকে নিজের কাছে ডাকেন না? কেন তাঁর কাছে সংসারের মানসম্মান লাবনীর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে? কেন তিনি লাবনীর মুখে শুনতে চান যে সব ঠিক আছে, অথচ সত্যিটা জানার পরেও কিছু বদলাতে চান না?

হয়তো মা নিজেও সারাজীবন অনেক কিছু সহ্য করেছেন। হয়তো তাঁর কাছে সংসার টিকিয়ে রাখাটাই নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। হয়তো তিনি ভয় পান, লাবনী চলে এলে সমাজ আত্মীয়স্বজন তাঁকে দোষ দেবে। হয়তো তিনি নিজের বিশ্বাসের বাইরে আর কোনো পথ দেখতে পান না।

রহিমা খালা লাবনীকে জিজ্ঞেস করলেন, মা, তোমার মায়ের বাড়ি কই? লাবনী বলল, ঢাকাতেই। মা আছে? হ্যাঁ, আছে। ভালো কথা। মা থাকলে মেয়েদের অনেক সাহস। কথাটা বলে তিনি হাসলেন। লাবনী তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। হ্যাঁ খালা, মা আছে। কিন্তু মনে মনে ভাবল, মা থাকলেই কি মেয়েদের সাহস হয়? কিছু মেয়ের মা থাকেন, তাঁরা মেয়ের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করেন। আর কিছু মেয়ের মা থাকেন, যাঁদের ভালোবাসার ভেতর শর্ত থাকে, যেগুলো পেরিয়ে মেয়েরা তাদের কাছে পৌঁছানো পারে না।

লাবনীর মা আছেন। সে তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর জন্য তার মায়া হয়, তাঁর অসুখ হলে তার চিন্তা হয়, তাঁর মুখে হাসি দেখলে তারও ভালো লাগে। কিন্তু লাবনী যখন নিজের জীবনে সবচেয়ে বেশি অসহায়, তখন তাঁর কাছেই যেতে পারে না। এই কথাটা কাউকে বলতে ইচ্ছে করে না। কারণ মানুষ শুনলে হয়তো বলবে, মা তো মা-ই। মা কখনো সন্তানের খারাপ চান না। লাবনী জানে না, মা তার খারাপ চান কি না। হয়তো চান না। হয়তো তিনি সত্যিই মনে করেন, সংসার টিকিয়ে রাখার মধ্যেই লাবনীর ভালো থাকা। কিন্তু ভালো চাওয়া আর ভালো রাখার মধ্যে যে একটা পার্থক্য আছে, সেটা তাঁকে বোঝাবে কী করে?

রহিমা খালা এখনো তাদের বাসায় কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে আসেন, দুপুরে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নেন, বিকেলে বাড়ি ফেরার আগে মেয়েকে ফোন করেন। কখনো মেয়ের শরীর খারাপ, কখনো নাতির স্কুলের খরচ, কখনো বাজারের টাকা। খালার চিন্তার শেষ নেই। তবু তাঁর মুখে একটা শান্তি আছে। তিনি জানেন, তাঁর মেয়েটা অন্তত এখন স্বামীর মারধরের ভয়ে প্রতিটি রাত কাটায় না। তিনি জানেন, মেয়ের কষ্ট হলে সে তাঁর কাছে বলতে পারবে অথচ লাবনীর সেই নিশ্চয়তাটুকু নেই।

কখনো কখনো মাকে ফোন করে ইচ্ছে করে বলে, মা, আমি ভালো নেই। কিন্তু কথাটা মুখ পর্যন্ত এসেও আটকে যায়। মা হয়তো আবার জিজ্ঞেস করবেন, তন্ময় কি এখনো তোকে মারে? লাবনী হয়তো বলবে, না মা, আর মারে না। মা হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। বলবেন, আলহামদুলিল্লাহ। সংসারটা ভালোভাবে করিস। আর লাবনী ফোন রেখে আগের মতোই বসে থাকবে। একটা মিথ্যে উত্তর দিয়ে মাকে নিশ্চিন্ত রাখবে, নিজের কষ্টটা নিজের কাছেই রেখে দেবে।

হয়তো একদিন লাবনীর মাই ওকে জিজ্ঞেস করবেন না, সংসারে কী হয়েছে। বরং বলবেন, তুই কেমন আছিস? সত্যি করে বল। তোর কষ্ট হলে আমাকে বলিস। তোর জন্য আমার দরজা খোলা আছে। লাবনী জানে না, সেই দিন কোনোদিন আসবে কি না। শুধু জানে, নতুন কাজের খালা যখন তাঁর মেয়েকে ফোন করে বলেন, চিন্তা করিস না মা, আমি আছি তো, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। ইচ্ছে করে, কেউ তাকে একবার ওই কথাটা বলুক। কেউ বলুক, আমি আছি। তোর সংসার থাকুক বা না থাকুক, তুই ভালো থাকিস। তোর শরীরের ওপর কেউ হাত তুললে তুই সেটা সহ্য করতে বাধ্য না। তুই ফিরে আয়।

লাবনীর মা হয়তো কোনোদিন এসব বলবেন না। তবু লাবনী তাঁকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার ভেতরে অভিমান আছে, অভিযোগ আছে, জমে থাকা কান্না আছে। এত বছর পরেও, সে একটু আশ্রয়ের অপেক্ষায় আছে। কোনো অভিযোগ ছাড়া তা নয়, অসংখ্য অভিযোগ বুকে নিয়েই।

(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতটা নির্লজ্জ বেহায়া ভিসি সারা দুনিয়াতে নেই-- ছি:

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০১

একটা মানুষ কতটা নির্লজ্জ হতে পারে, সেই সাথে ক্ষমতার+ টাকার+ সরকারী সুবিধাদী পাবার কাঙ্গাল হতে পারে, চুয়েটের ভিসি (Vice-Chancellor) কে না দেখলে জানতেই পারতাম না। এতদিন শুধু লোভী বলে বুবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×