সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ১০:১৩
কানসাট ডায়েরি 1
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে টানা রাস্তা সোনামসজিদের দিকে। পথের মাঝেই অগি্নগর্ভা কানসাট। রোববার সকালে মোটরসাইকেলে চেপে কানসাট যাবার পথে দেখা মিললো পত্রিকা হকার আজিজুলের। দিনের সংবাদপত্রের বোঝা সাইকেলে চাপিয়ে দ্রুত প্যাডেল চেপে ছুটেছেন কানসাটের পথে। চলতি পথে কথা হলো। আজিজুল জানালেন, বিদু্যতের দাবিতে কানসাটের আন্দোলনের পর ওই এলাকায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে সংবাদপত্রের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতিদিন 27 জন হকার ছোটেন কানসাটে পত্রিকা বেচতে। খোশ মেজাজে মোটরসাইকেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকা আজিজুল জানালেন আরো মজার তথ্য: আগে যেখানে কানসাট এলাকায় হাতে গোনা পত্রিকা চলতো এখন সেখানে একেকজন হকারই চালান 50 থেকে 60 কপি করে। কানসাট আন্দোলন নিয়ে কী ছাপা হচ্ছে তা জানতে উদগ্রীব পাঠকদের কেউ কেউ একাই 5-6 টি করে পত্রিকা কেনেন। তাহলে কানসাট আন্দোলন কি একেবারেই প্রান্তিক একটি এলাকার মানুষের পাঠাভ্যাস বদলে দিয়েছে? আজিজুলের ধারণা তাই। গোবিনপুরের কৃষক নজরুল ইসলামও তাই মনে করেন। প্রতিদিন এখন তারা একত্রিত হয়ে খবরের কাগজ পড়েন, সংবাদ দেখেন টেলিভিশনে। দেশ-দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা একদল মানুষ যেনো হঠাৎ করেই বাইরের পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে 26 কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পুকুরিয়া এলাকা। কানসাট আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জনতার নেতায় পরিণত হওয়া গোলাম রাব্বানীর বাড়ি এই পুকুরিয়াতেই। কানসাট আন্দোলন বদলে দিয়েছে এই বাড়িটিকেও। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ আসছেন বাড়িতে। তারা শুনতে চান গোলাম রাব্বানীর পরবর্তী নির্দেশনা কী। গোলাম রাব্বানীর অনুপস্থিতিতে তারা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা চান তার মা মনসুরা বেগমের কাছে। মনসুরা বেগম তার বয়সী চোখে কানসাট আন্দোলনের পর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কীভাবে জনতা দ্রোহী হয়ে ওঠে। কীভাবে অধিকারের আন্দোলন বদলে দেয় সাধারণ মানুষগুলোকে। মনসুরা বেগম ও গোলাম রাব্বানীর ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া বেগম গোলাম রাব্বানীকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সদ্য কারামুক্ত রোকেয়া বেগম মনে করেন, কানসাট আন্দোলন বদলে দিয়েছে এলাকার নারীদেরও। ঘর থেকে যে নারীরা বাইরে বেরুতেই চাইতেন না, তারাই সময়ের প্রয়োজনে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে সামনে এগুতে পারেন তারা- এই আত্মবিশ্বাস দিয়ে কানসাট আন্দোলন নারীদের বদলে দিয়েছে অনেকখানি। পুকুরিয়া এলাকার সিরাজুল ইসলাম নিজের ভেতরেই টের পাচ্ছেন বদলে যাওয়াকে। পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারা, পুলিশের নির্মম নির্যাতন আর অসহায় আতঙ্কিত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে সিরাজুলের 'ঘেন্না' ধরে গেছে দেশের রাজনীতিকদের ওপর। কানসাট আন্দোলনে লাশের পর লাশ দেখে মানুষ স্তম্ভিত, হতভম্ব। জায়গীরগ্রামের কৃষক আবদুল হামিদের উপলব্ধি : মানুষের ওপর এমন করে যারা অত্যাচার চালিয়েছে তারা তো 'জানোয়ার'। তারপরেই আবদুল হামিদ যেনো অন্য এক আবদুল হামিদ হয়ে গেলেন। বললেন, 'তারপরেও সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, কানসাট জনতার এলাকা।' কানসাটে প্রচণ্ড গরম সেই গরমে প্রাণ জুড়াতে সাইকেল আর ভ্যানে করে আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। আব্বাসবাজারে এমন একটি আইসক্রিমের সাইকেলের কাছে গিয়ে দেখা গেলো কানসাট আন্দোলন আইসক্রিম বিক্রির ধরণও বদলে দিয়েছে। মাইকে স্থানীয়ভাবে রেকর্ড করা গান বাজছে : 'কী যে করি লজ্জ্বায় মরি/ এমপি শাহজাহান স্বৈরাচারি/ চাইনিজ শার্ট চাপিয়ে গায়/ তুমি পলাইছো ঢাকায়/ জনতা তোমায় দেবে না রেহাই।' সেই গান শুনে সবাই ছুটে এসে আইসক্রিম কিনছে। আইসক্রিম বিক্রেতা সেমাজুল জানালেন, আগে তারা তারা হিন্দি গান বাজিয়ে আইসক্রিম বেচতেন। কানসাট আন্দোলন শুরুর পর থেকে তারা এখন এই গান বাজিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করেন। বিশ্বনাথপুরের শামসুল আলম পাশ থেকে অস্ফূট স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বুঝেছেন অবস্থাটা? একজন এমপি এলাকার মানুষকে কতোটা আঘাত দিলে মানুষ এমন হয়ে যায়?' সত্যিই তো। কানসাট আন্দোলন এলাকার রাজনৈতিক চিত্রটাও বদলে দিয়েছে। স্থানীয় সাংসদ অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া 1996 সালের নির্বাচনে পেয়েছিলেন 93 হাজার 119 ভোট। 2001 সালের নির্বাচনে তার প্রাপ্ত ভোট 96 হাজার 740। আর এবার? কানসাট আন্দোলনে স্বামীহারা খনিতলা বিশ্বনাথপুরের শামসুন্নাহার ও জায়গীরপাড়ার সন্তানহারা মাইনুল ইসলাম জানালেন, বিদু্যতের আন্দোলন ঠেকাতে সরকার এবার এই এলাকায় যে বধ্যভূমি তৈরি করলো তাতে মানুষ আর আগের মতো চোখ বন্ধ করে মার্কা দেখে ভোট দেবে না। শামসুন্নাহার বললেন, এক আন্দোলন মানুষকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি। তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অন্যরকম এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন
'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন
আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন
সিনেমা-গান-খেলাধুলা
আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন
প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।