somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কানসাট ডায়েরি 1

১৮ ই এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ৮:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে টানা রাস্তা সোনামসজিদের দিকে। পথের মাঝেই অগি্নগর্ভা কানসাট। রোববার সকালে মোটরসাইকেলে চেপে কানসাট যাবার পথে দেখা মিললো পত্রিকা হকার আজিজুলের। দিনের সংবাদপত্রের বোঝা সাইকেলে চাপিয়ে দ্রুত প্যাডেল চেপে ছুটেছেন কানসাটের পথে। চলতি পথে কথা হলো। আজিজুল জানালেন, বিদু্যতের দাবিতে কানসাটের আন্দোলনের পর ওই এলাকায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে সংবাদপত্রের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতিদিন 27 জন হকার ছোটেন কানসাটে পত্রিকা বেচতে। খোশ মেজাজে মোটরসাইকেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকা আজিজুল জানালেন আরো মজার তথ্য: আগে যেখানে কানসাট এলাকায় হাতে গোনা পত্রিকা চলতো এখন সেখানে একেকজন হকারই চালান 50 থেকে 60 কপি করে। কানসাট আন্দোলন নিয়ে কী ছাপা হচ্ছে তা জানতে উদগ্রীব পাঠকদের কেউ কেউ একাই 5-6 টি করে পত্রিকা কেনেন। তাহলে কানসাট আন্দোলন কি একেবারেই প্রান্তিক একটি এলাকার মানুষের পাঠাভ্যাস বদলে দিয়েছে? আজিজুলের ধারণা তাই। গোবিনপুরের কৃষক নজরুল ইসলামও তাই মনে করেন। প্রতিদিন এখন তারা একত্রিত হয়ে খবরের কাগজ পড়েন, সংবাদ দেখেন টেলিভিশনে। দেশ-দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা একদল মানুষ যেনো হঠাৎ করেই বাইরের পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে 26 কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পুকুরিয়া এলাকা। কানসাট আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জনতার নেতায় পরিণত হওয়া গোলাম রাব্বানীর বাড়ি এই পুকুরিয়াতেই। কানসাট আন্দোলন বদলে দিয়েছে এই বাড়িটিকেও। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ আসছেন বাড়িতে। তারা শুনতে চান গোলাম রাব্বানীর পরবর্তী নির্দেশনা কী। গোলাম রাব্বানীর অনুপস্থিতিতে তারা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা চান তার মা মনসুরা বেগমের কাছে। মনসুরা বেগম তার বয়সী চোখে কানসাট আন্দোলনের পর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কীভাবে জনতা দ্রোহী হয়ে ওঠে। কীভাবে অধিকারের আন্দোলন বদলে দেয় সাধারণ মানুষগুলোকে। মনসুরা বেগম ও গোলাম রাব্বানীর ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া বেগম গোলাম রাব্বানীকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সদ্য কারামুক্ত রোকেয়া বেগম মনে করেন, কানসাট আন্দোলন বদলে দিয়েছে এলাকার নারীদেরও। ঘর থেকে যে নারীরা বাইরে বেরুতেই চাইতেন না, তারাই সময়ের প্রয়োজনে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে সামনে এগুতে পারেন তারা- এই আত্মবিশ্বাস দিয়ে কানসাট আন্দোলন নারীদের বদলে দিয়েছে অনেকখানি। পুকুরিয়া এলাকার সিরাজুল ইসলাম নিজের ভেতরেই টের পাচ্ছেন বদলে যাওয়াকে। পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারা, পুলিশের নির্মম নির্যাতন আর অসহায় আতঙ্কিত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে সিরাজুলের 'ঘেন্না' ধরে গেছে দেশের রাজনীতিকদের ওপর। কানসাট আন্দোলনে লাশের পর লাশ দেখে মানুষ স্তম্ভিত, হতভম্ব। জায়গীরগ্রামের কৃষক আবদুল হামিদের উপলব্ধি : মানুষের ওপর এমন করে যারা অত্যাচার চালিয়েছে তারা তো 'জানোয়ার'। তারপরেই আবদুল হামিদ যেনো অন্য এক আবদুল হামিদ হয়ে গেলেন। বললেন, 'তারপরেও সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, কানসাট জনতার এলাকা।' কানসাটে প্রচণ্ড গরম সেই গরমে প্রাণ জুড়াতে সাইকেল আর ভ্যানে করে আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। আব্বাসবাজারে এমন একটি আইসক্রিমের সাইকেলের কাছে গিয়ে দেখা গেলো কানসাট আন্দোলন আইসক্রিম বিক্রির ধরণও বদলে দিয়েছে। মাইকে স্থানীয়ভাবে রেকর্ড করা গান বাজছে : 'কী যে করি লজ্জ্বায় মরি/ এমপি শাহজাহান স্বৈরাচারি/ চাইনিজ শার্ট চাপিয়ে গায়/ তুমি পলাইছো ঢাকায়/ জনতা তোমায় দেবে না রেহাই।' সেই গান শুনে সবাই ছুটে এসে আইসক্রিম কিনছে। আইসক্রিম বিক্রেতা সেমাজুল জানালেন, আগে তারা তারা হিন্দি গান বাজিয়ে আইসক্রিম বেচতেন। কানসাট আন্দোলন শুরুর পর থেকে তারা এখন এই গান বাজিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করেন। বিশ্বনাথপুরের শামসুল আলম পাশ থেকে অস্ফূট স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বুঝেছেন অবস্থাটা? একজন এমপি এলাকার মানুষকে কতোটা আঘাত দিলে মানুষ এমন হয়ে যায়?' সত্যিই তো। কানসাট আন্দোলন এলাকার রাজনৈতিক চিত্রটাও বদলে দিয়েছে। স্থানীয় সাংসদ অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া 1996 সালের নির্বাচনে পেয়েছিলেন 93 হাজার 119 ভোট। 2001 সালের নির্বাচনে তার প্রাপ্ত ভোট 96 হাজার 740। আর এবার? কানসাট আন্দোলনে স্বামীহারা খনিতলা বিশ্বনাথপুরের শামসুন্নাহার ও জায়গীরপাড়ার সন্তানহারা মাইনুল ইসলাম জানালেন, বিদু্যতের আন্দোলন ঠেকাতে সরকার এবার এই এলাকায় যে বধ্যভূমি তৈরি করলো তাতে মানুষ আর আগের মতো চোখ বন্ধ করে মার্কা দেখে ভোট দেবে না। শামসুন্নাহার বললেন, এক আন্দোলন মানুষকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি। তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অন্যরকম এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ১০:১৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×