দিলু নাসের
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ভূমি ফিলিস্তিনকে আমরা অনেকসময় দেখি কেবল সংবাদপত্রের শিরোনামে। সংঘাত, দখল, দেয়াল, চেকপয়েন্ট, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে।
ফিলিস্তিনের কথা উঠলেই আমাদের অনেকের চোখের সামনে প্রথমে ভেসে ওঠে গাজার ছবি, ধ্বংসস্তূপ, যুদ্ধ, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি আর মানবিক বিপর্যয়। গাজার ভয়াবহ বাস্তবতা নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনের ইতিহাসের এক গভীর বেদনার অধ্যায়। কিন্তু ফিলিস্তিন মানেই শুধু গাজা নয়। গাজার বাইরে রয়েছে জেরুজালেম, হেবরন, রামাল্লা, বেথলেহেম, জেনিন, হালহুল, জেরিকোসহ অসংখ্য শহর, জনপদ ও গ্রাম। সেখানে মানুষের জীবন নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চললেও প্রতিদিনের জীবন সেখানে থেমে নেই।
সংবাদপত্র অথবা টেলিভিশনে দেখা সেইসব ছবির বাইরে আছে আরেক ফিলিস্তিন, যেখানে মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যায়, দোকান খোলে, সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, কাফেতে বসে বন্ধুর সঙ্গে চা খায়, আড্ডা দেয়, বাজার করে, হাসে, গল্প করে, বিয়ে করে, উৎসব করে। সেখানে আছে স্বপ্ন, ভালোবাসা, আতিথেয়তা এবং জীবনের প্রতি গভীর টান। কোথাও আধুনিক শহুরে জীবন, কোথাও প্রাচীন জনপদের ঐতিহ্য, এই সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এক বহুমাত্রিক ফিলিস্তিন। এই ফিলিস্তিনকে কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি ফিলিস্তিনের পথেপ্রান্তরে, শহরে-নগরে। যে ভূখণ্ডের সঙ্গে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে এত বেশি বেদনা ও সংঘাতের ছবি জড়িয়ে আছে, সেই ভূখণ্ডের মানুষ যে এত প্রাণবন্ত হতে পারে, তা কাছ থেকে না দেখলে হয়তো উপলব্ধি করা কঠিন।
জেরুজালেমের ব্যস্ত রাস্তা, হেবরনের বাজার, বেথলেহেমের কাফে, হালহুলের জনজীবন কিংবা জেরিকোর সবুজ উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমি সেই অন্য ফিলিস্তিনকেই দেখেছি,যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে, ক্ষোভ আছে, অনিশ্চয়তা আছে; কিন্তু একই সঙ্গে আছে হাসি, বন্ধুত্ব, আতিথেয়তা, স্বপ্ন এবং স্বাভাবিক জীবনের অবিরাম প্রবাহ। জেরুজালেম থেকে ওয়েস্ট ব্যাংকের শহর, জনপদ আর ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে আমি চেষ্টা করেছি মানুষের জীবনযাত্রাকে একটু কাছ থেকে দেখতে। দেখতে চেয়েছি তাদের চলন-বলন, সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ; শুনতে চেয়েছি তাদের কথা। আর সেই পথ চলায় যে ফিলিস্তিনকে আবিষ্কার করেছি, তা কেবল সংঘাতের ফিলিস্তিন নয়- এ এক অসাধারণ সহিষ্ণু, অতিথিপরায়ণ এবং আত্মমর্যাদাবোধে দৃঢ় মানুষের ফিলিস্তিন।
জেরুজালেমে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। এই শহর শুধু ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগের শহর নয়, এটি একই সঙ্গে বহু মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের শহর। সেখানে ইসরাইলী পাসপোর্টধারী ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো নানা ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। কোথাও অভাব-অনটন, কোথাও চলাচলের সীমাবদ্ধতা, কোথাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তাদের জীবন যে খুব সহজ নয়, তা অনুভব করা যায়।
কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানুষের মধ্যে যেন কোনো ক্লান্তি নেই। বিষণ্নতা যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠেনি।
বাজারে মানুষ স্বাভাবিকভাবে কেনাকাটা করছে, দোকানদার ব্যবসা করছেন, শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, তরুণরা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, পরিবারগুলো নিজেদের মতো করে জীবন কাটাচ্ছে। বয়স্ক পুরুষ-মহিলারা বিকেলে রাস্তার পাশে বসে চা খাচ্ছেন, গল্প করছেন কেউ কেউ মনের সুখে সিগারেট টানছেন। মানুষের মুখে হাসি আছে, কথায় প্রাণ আছে, জীবনযাত্রায় স্বাভাবিকতার ছাপ আছে।
কারও কারও মনে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে ক্ষোভ আছে, কথাবার্তায় সেই ক্ষোভের প্রকাশও পেয়েছি। কিন্তু সেই ক্ষোভ তাদের জীবনকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেয়নি। এই স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যেই আমি জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের এক অসাধারণ মানসিক শক্তি দেখতে পেয়েছি।
জেরুজালেমের পুরোনো শহরের দামেস্ক গেটের সামনে দেখা একটি দৃশ্য আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। একদিন দেখলাম, একজন ১২-১৩ বছরের কিশোরের সঙ্গে কয়েকজন সশস্ত্র ইসরাইলি সেনার কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ঠিক কী নিয়ে তাদের মধ্যে সেই বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। কিন্তু যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছিল, তা হলো কিশোরদের একজনের সাহসী ও দৃঢ় আচরণ। তার বয়স খুব বেশি নয়। সামনে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনা। অথচ তার কথাবার্তায় এমন এক আত্মবিশ্বাস ছিল, যা দেখে আমরা সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম।
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এই শহরের কিশোরদের শৈশবও যেন ইতিহাস ও রাজনীতির ভার থেকে মুক্ত নয়। যে বয়সে পৃথিবীর অন্য অনেক শহরের কিশোররা খেলাধুলা কিংবা নিজেদের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই জেরুজালেমের কিছু কিশোরকে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে এত কঠিনভাবে মুখোমুখি হতে হয়। তবু তাদের চোখে আমি ভয়ের চেয়ে আত্মবিশ্বাসই বেশি দেখেছি।
হেবরনে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজায় আমার দেখা একটি পরিবারের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। পরিবারটি এসেছিল ফিলিস্তিনের আরেক আলোচিত শহর জেনিন থেকে। সেখানে পরিবারের একজন বয়স্ক মহিলা আমার সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি। আমি লন্ডন থেকে এসেছি এবং আমি বাঙলি এই পরিচয় জানার পর পুরো পরিবারটি যেন আরও আগ্রহী হয়ে ওঠলো। একে একে তারা আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। কথাবার্তার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, কোনো দূরত্বও ছিল না। মহিলার কিশোর ছেলে ইব্রাহিম মেয়ে জহুরা এবং সারা আমার সাথে অনর্গল ইংরেজিতে অনেক কথা বললো। কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমরা একে অপরকে বহুদিন ধরে চিনি।
অচেনা একটি দেশে, অচেনা একটি পরিবারের সঙ্গে এমন সহজ ও আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাওয়া হেবরন ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে আছে আমার কাছে। সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম, আতিথেয়তা শুধু খাবার কিংবা চায়ের আয়োজন নয়, আতিথেয়তা হলো একজন অপরিচিত মানুষকে নিজের আপনজনের মতো গ্রহণ করার মানসিকতা। জেনিনের সেই পরিবারটি আমাকে সেই মানবিক আতিথেয়তারই স্বাদ দিয়েছিল।
হেবরনের রাস্তায় প্রতমবার পরিভ্রমণের সময় কয়েকজন ছোট ছোট শিশুর সঙ্গে আমর দেখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি তাদের জন্য কিছু খাবার কিনে দিয়েছিলাম।
সেই দেখা হয়তো তাদের কাছে খুব ছোট একটি ঘটনা ছিল, আমার কাছেও হয়তো তখন মনে হয়নি যে এই মুহূর্তটি এতদিন মনে থাকবে। কিন্তু কয়েক মাস পর যখন আবার হেবরনের সেই জায়গায় গেলাম, আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারা আমাকে চিনতে পেরেছে।
আমাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এসে একটি ছেলে বলল, ওয়েলকাম ফ্রেন্ড। তাদের সেই আনন্দ, সেই সরলতা আমাকে সত্যিই আপ্লুত করেছিল। কয়েক মাসের ব্যবধান, তবু তারা একজন দূরদেশ থেকে আসা মানুষকে মনে রেখেছে। তাদের সেই নিষ্পাপ হাসির মধ্যে আমি যেন পুরো ফিলিস্তিনকে দেখতে পেয়েছিলাম। কষ্টের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়া একটি জনগোষ্ঠী, প্রতিকূলতার মধ্যেও সম্পর্ককে মনে রাখা একটি সমাজ। শিশুদের সেই হাসি আমার কাছে যেকোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল সেদিন।
কোনো একটি দেশকে শুধু তার রাজনৈতিক সংকট দিয়ে বোঝা যায় না। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন শুধু রাজনীতিতে থেমে নেই।
ওয়েস্ট ব্যাংকের শহরগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়েছে ব্যস্ত বাজার, ছোট ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, ফলের দোকান, পোশাকের ব্যবসা, আধুনিক গাড়ি, মোবাইল ফোন হাতে তরুণ-তরুণী। কোথাও কোথাও আধুনিক শপিং সেন্টার, সুন্দর বাড়ি কিংবা নতুন নির্মাণকাজ দেখে মনে হয়েছে, এই সমাজও সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সহাবস্থান এখানে খুব স্বাভাবিক। একদিকে পুরোনো পাথরের বাড়ি, সরু গলি, ঐতিহাসিক মসজিদ ও গির্জা; অন্যদিকে আধুনিক পোশাকের তরুণ প্রজন্ম, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, আধুনিক ক্যাফে ও নতুন প্রজন্মের জীবনধারা।
এই বৈপরীত্যই হয়তো ফিলিস্তিনের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। এ যেন অতীতকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলা।
ওয়েস্ট ব্যাংকে কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ আমার ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তাদের কারও পরণে ছিল আধুনিক পোশাক, আবার কেউ পরেছিলেন আধুনিক ইসলামিক পোশাক। পোশাকের ধরন আলাদা হলেও তাদের মধ্যে একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে তা হলো তাদের আত্মবিশ্বাস, রুচি এবং জ্ঞান।
আমি তাদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেছি। তাদের ইংরেজি বলার দক্ষতা আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। শুধু ভাষাজ্ঞান নয়, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ধারণা, বিশ্বের নানা ঘটনা সম্পর্কে সচেতনতা এবং কথাবার্তার পরিশীলিত ধরন আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আমার সৌভাগ্য হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ ভ্রমণ করার। উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক থেকে অন্যান্য মুসলিম সমাজ, বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ফিলিস্তিনের নারীদের মধ্যে যে আধুনিক রুচি, আত্মবিশ্বাস, শিক্ষা ও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দেখেছি, তা আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। তাদের মধ্যে আমি একই সঙ্গে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক চমৎকার সমন্বয় দেখেছি।
তারা নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধারণ করছেন, আবার একই সঙ্গে আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছেন। তাদের পোশাকে যেমন বৈচিত্র্য আছে, চিন্তাভাবনাতেও তেমনি রয়েছে উদারতা ও আধুনিকতা।
তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, একটি সমাজের শক্তি শুধু তার পুরুষদের মধ্যে নয়, সেই সমাজের নারীদের শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং সচেতনতাও তার ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওয়েস্ট ব্যাংকের সেই নারীদের মধ্যে আমি সেই শক্তিরই প্রতিচ্ছবি দেখেছি।
বেথলেহেমে একটি কাফেতে কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। আমি লন্ডন থেকে এসেছি শুনে তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। লন্ডনের জীবন, ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি, পড়াশোনা, ভ্রমণ, সংস্কৃতি- বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রাণবন্ত কথোপকথন হয়েছিল।
তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় কোনোভাবেই আমার মনে হয়নি,এদের কেউ মুসলিম, কেউ খ্রিস্টান। তাদের নাম, চেহারা, পোশাক, কথাবার্তা ও চলন-বলনে এমন কোনো দৃশ্যমান পার্থক্যও ছিল না, যা দেখে আমি তাদের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা করতে পারি। তারা সবাই একই সমাজের তরুণী, একই শহরের মানুষ- এটাই যেন ছিল তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। পরে জানতে পারলাম, তাদের মধ্যে কয়েকজন খ্রিস্টান।
বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। কারণ বাইরে থেকে আমরা অনেক সময় একটি সমাজকে ধর্মীয় পরিচয়ের আলাদা আলাদা খোপে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বেথলেহামের সেই কাফেতে বসে আমার মনে হয়েছিল, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিচয়ের এই বিভাজন অনেক বেশি স্বাভাবিক ও সহজ।
একজন মুসলিম তরুণী এবং একজন খ্রিস্টান তরুণী পাশাপাশি বসে একইভাবে কথা বলতে পারেন, হাসতে পারেন, বন্ধুত্ব করতে পারেন, ধর্ম তাদের মানবিক সম্পর্কের পথে কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। এই ছোট্ট ঘটনাটি আমার কাছে বেথলেহামের বড় একটি পরিচয় হয়ে আছে।
জেরুজালেমের হোটেলে, দোকানে এবং রাস্তাঘাটে এমন অনেক মানুষের সঙ্গেই কথা হয়েছে, যাদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় আমি বুঝতেই পারিনি কে ইহুদি, কে মুসলিম।
কথাবার্তা হয়েছে একেবারেই স্বাভাবিকভাবে। ব্যবসা, ভ্রমণ, শহরের জীবন, লন্ডনের জীবনযাপন বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা হয়েছে। মানুষের আচরণে প্রথমেই সামনে এসেছে তাদের মানবিক পরিচয়; ধর্মীয় পরিচয় নয়। পরে যখন পরিচয় জেনেছি, তখন অনেক সময় সত্যিই বিস্মিত হয়েছি।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। আমরা বাইরে থেকে যেসব ধর্মীয় বিভাজনকে অনেক বড় করে দেখি, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার সবসময় একই রকম প্রকাশ থাকে না।
আমার দেখা ও অনুভবের জায়গা থেকে মনে হয়েছে, এই অঞ্চল এখনও ধর্মীয় সহাবস্থান ও সম্প্রীতির এক অনন্য ভূখণ্ড। এখানে সংঘাত আছে, রাজনৈতিক বিরোধ আছে, গভীর ক্ষতও আছে, কিন্তু একই সঙ্গে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাসের অভিজ্ঞতা।
পুরোনো জেরুজালেমের গলিতে হাঁটতে হাঁটতে আরেকটি দৃশ্য আমাকে ভাবিয়েছে। সেখানে অনেক ইসরাইলি কিশোর-কিশোরীকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় টহল দিতে দেখেছি।
তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথাও হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, টহলের ফাঁকে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাদের হাসিমুখে আড্ডা দিতেও দেখেছি। দৃশ্যটি ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্যে ভরা, একদিকে হাতে ভারী অস্ত্র, অন্যদিকে কিশোর-কিশোরীদের স্বাভাবিক হাসি ও বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা।
একজন সুন্দরী কিশোরী সৈনিকের সঙ্গে কৌতুক করে আমি বলেছিলাম, “তোমার তো এই বয়সে টিকটক করার কথা, কিন্তু এত ভারী অস্ত্র নিয়ে হাঁটছো কেন? ভয় করে না?”
সে হেসে উত্তর দিয়েছিল, তাদের এখানে নির্দিষ্ট বয়সে সামরিক সেবায় যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এবং সে সেই দায়িত্ব পালন করছে। তার হাসিমুখের উত্তর আমাকে আরও ভাবিয়ে তুলেছিল।
পুরোনো জেরুজালেমে এমন দৃশ্য একেবারেই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, ঐতিহাসিক পাথরের গলি দিয়ে হাঁটছে কিশোর-কিশোরী, অথচ তাদের হাতে ভারী অস্ত্র! এই পরিবেশের সঙ্গে অস্ত্র যেন বেমানান, কিন্তু তাদের আচরণে ভয় বা অস্বস্তির প্রকাশ খুব একটা দেখিনি।
তখন মনে হয়েছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বড় হয়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের শৈশবও কীভাবে অদৃশ্যভাবে রাজনীতি ও নিরাপত্তার বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
একই শহরে একদিকে ফিলিস্তিনি কিশোরদের দৃঢ়তা, অন্যদিকে ইসরাইলি কিশোর-কিশোরীদের হাতে অস্ত্র, দুটি দৃশ্যই আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে।
ফিলিস্তিন ভ্রমণের আরেকটি অভিজ্ঞতা আমাকে বিশেষভাবে অভিভূত করেছে, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্কের নানা দৃশ্য।
ফিলিস্তিনের ইতিহাস বহু ধর্মের মানুষের ইতিহাস। জেরুজালেম, বেথলেহেম, হেবরন, প্রতিটি শহরের পাথর যেন সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসের সাক্ষী।
আমি ব্যক্তিগতভাবে যেসব জায়গায় গিয়েছি, যেসব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর মানবিক পরিচয়কে অনুভব করেছি। রাজনৈতিক সংঘাতের বাস্তবতা অবশ্যই আছে, মতপার্থক্যও আছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আমি ধর্মের নামে সেই উগ্রতা দেখিনি, যা অনেক সময় বাইরের পৃথিবী থেকে ফিলিস্তিনকে দেখার সময় মনে হতে পারে বরং মনে হয়েছে, মানুষের জীবনে ধর্ম আছে,কিন্তু তার সঙ্গে পরিবার, প্রতিবেশ, বন্ধুত্ব, ব্যবসা, শিক্ষা এবং সামাজিক সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উঁচুনীচু মরুভূমির অভ্যন্তরে, সবুজ উপত্যকার মধ্যে খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা এই ভূখণ্ডের দিকে তাকালে বারবার মনে প্রশ্ন জাগে ঠিক কী ছিল এই মাটিতে, যা মূসা, ইবরাহিম, ঈসা মসিহ থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত মানব ইতিহাসের এত বড় বড় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের স্মৃতিকে ধারণ করে এসেছে? এই মাটিতে এমন কী আছে, যা পৃথিবীর তিনটি বিরাট একেশ্বরবাদী ধর্মের ইতিহাসকে একই ভূখণ্ডে এসে মিলিয়েছে?
হয়তো এর উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু এখনও এই মাটির প্রতিটি পাথর, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি উপত্যকা, প্রতিটি প্রাচীন নগরী যেন হাজার হাজার বছরের মানুষের পদচিহ্ন বহন করে চলেছে।
এখানে ধর্ম শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়, ধর্ম ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। তাই এই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে মনে হয়, পৃথিবীর ইতিহাসকে বুঝতে হলে এই ভূমিকে বোঝা জরুরি।
একদিকে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, অন্যদিকে আধুনিক শহর। একদিকে মসজিদের আজান, অন্যদিকে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। কোথাও ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীর উপস্থিতি, কোথাও মুসলিম জনজীবন, কোথাও খ্রিস্টান স্মৃতির অসংখ্য চিহ্ন। এমন ইতিহাস, এমন ধর্মীয় বৈচিত্র্য, এমন রাজনৈতিক জটিলতা এবং একই সঙ্গে এমন মানবিক জীবন, পৃথিবীর আর কোথাও এত গভীরভাবে একসঙ্গে পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।
ফিলিস্তিন ঘুরে দেখার পর আমার মনে হয়েছে, একটি ভূখণ্ডকে বুঝতে হলে তার রাজনৈতিক মানচিত্রের চেয়েও বেশি কিছু দেখতে হয়। দেখতে হয় মানুষের মুখ। শুনতে হয় তাদের গল্প। বসতে হয় তাদের পাশে। জানতে হয় তাদের আনন্দের কথা, দুঃখের কথা, স্বপ্নের কথা।
আমি ফিলিস্তিনে গিয়ে শুধু যুদ্ধ দেখিনি, দেখেছি জীবন। দেখেছি কষ্টের পাশাপাশি হাসি। দেখেছি অনিশ্চয়তার পাশাপাশি স্বপ্ন। দেখেছি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও সহাবস্থানের নানা ছবি। উঁচুনীচু মরুভূমির ভেতর সবুজ উপত্যকা, খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা প্রাচীন জনপদ, পাথরের শহর, মসজিদ, গির্জা ও ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন। সবকিছুর মধ্যে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হয়েছে, এই ছোট্ট ভূখণ্ডের মধ্যে যেন পৃথিবীর বিশাল এক ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে।
এখানে একই সঙ্গে আছে ধর্মের জন্মের স্মৃতি, সভ্যতার প্রাচীন পদচিহ্ন, মানুষের সহাবস্থান, আবার আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই কারণেই ফিলিস্তিন আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাসের পাতা । ফিলিস্তিনকে শুধু মানচিত্র দিয়ে বোঝা যায় না। ফিলিস্তিনকে বুঝতে হলে সেখানকার মানুষের চোখের দিকে তাকাতে হয়। আর সেই চোখের গভীরে আমি দেখেছি বেদনা, দেখেছি ইতিহাস, দেখেছি সাহস, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দেখেছি বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।



সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




