somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুরানো সেই দিনের কথা ....

০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে খারাপ লাগছিল। তাই তিনি নিজেই কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দিয়েছেন। ঘটনাটি পড়ে আমার নিজের কলেজ জীবনের একটি পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।

তখন আমি ক্যান্টনমেন্টের একটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ি। একদিন কলেজে ঢুকতেই দেখি, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সারিবদ্ধ ভাবে মুরগির মতো বসিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না, ঘটনা কী! কিছু সময় পার হওয়ার পর দেখি, একজন নাপিত এসে শিক্ষার্থীদের মাথার সিঁথির মাঝখানের চুল কেটে দিচ্ছেন। কারও মাথার মাঝখানে চুল কেটে এমন অবস্থা করা হয়েছে যে, বাইরে থেকে দেখলে হাসি পাওয়ার কথা। কিন্তু যাদের সঙ্গে ঘটনাটি ঘটছিল, তাদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না ।

সেদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, ভাগ্যিস আমার চুল ছোট ছিল ! নইলে হয়তো আমাকেও ওই সারিতে বসতে হতো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নাপিত মামা প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫ টাকা করে নিচ্ছিলেন। অর্থাৎ অপমানিত হওয়ার শাস্তি তো ছিলই, নিজের পকেটের টাকাও খরচ করতে হচ্ছিল।

আমাদের ক্লাসের দুজন ছিল ফরহাদ ও রিপন। তারাও সেদিন এই শাস্তির শিকার হয়েছিল। সারাটা দিন তাদের মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখেছি। কলেজে আমাদের প্রতিদিন সাতটি ক্লাস হতো। সেদিন তারা একবারের জন্যও শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়নি। তাদের চুলের অবস্থা দেখে বারবার ফুটবল খেলোয়াড়দের কথা মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাদের বিষন্ন মুখ দেখে ঠাট্টা করার সাহস হয়নি। দুজনই পরবর্তী সাত দিন কলেজে আসেনি।

এরপর কয়েক দিন কেটে গেল। একদিন খেয়াল করলাম, কলেজের পাশের সেই নাপিত মামার দোকান বন্ধ। পরে জানতে পারলাম, যেসব শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল, তাদের কয়েকজন মিলে সেই নাপিত মামা কে মারধর করেছে। ভাষানটেক এলাকার শিক্ষার্থীদের বেশ দাপুটে হিসেবেই সবাই জানত । নাপিত মামাকে এমন মারধর করা হয়েছিল যে, ভয়ে তিনি আর দোকান খোলার সাহস পাননি। দোকান ছেড়ে দিয়েছিলেন ।

শিক্ষার্থীদের হাতে নাপিতের মারধরের শিকার হওয়াটাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজটি করেছিলেন। আবার নিজের পেশাগত কাজ হিসেবেও করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অপমান করার পরিণতি যে এমন হতে পারে, সেটি হয়তো তিনি ভাবেননি। অপমানের প্রতিশোধ নিতে কাউকে মারধর করা কোনো সমাধান নয়।

আমরা এখন জেন-জি পেরিয়ে জেন-আলফার যুগে প্রবেশ করেছি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও ভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হচ্ছে। তাদের আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং নিজের চেহারা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সচেতনতা আলাদা। বিশেষ করে বড়ো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করে পার পাওয়ার সুযোগ কম । ছোট শিশুরা হয়তো ভয়ে চুপ করে থাকবে, কিন্তু বড় শিক্ষার্থীরা এমন আচরণ কে সহজভাবে নাও নিতে পারে। কখনো কখনো তার প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমার কলেজের সেই নাপিতের ঘটনা তার একটি উদাহরণ।

নওগাঁর প্রধান শিক্ষক হয়তো ভেবেছেন, ছোট বাচ্চাদের চুল একটু কেটে দিলে তেমন কিছু হবে না। তারা প্রতিবাদ করবে না, অভিভাবকের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলেও হয়তো বিষয়টি সামান্য শাসন হিসেবেই দেখা হবে। কিন্তু শিশুদেরও আত্মসম্মান আছে। তাদেরও নিজের চেহারা নিয়ে পছন্দ-অপছন্দ আছে। চুল বড় হলে অভিভাবককে জানানো যেত। প্রয়োজনে স্কুলের নিয়ম মেনে চুল ছোট করার পরামর্শ দেওয়া যেত। কিন্তু কাঁচি দিয়ে এলোমেলো করে কেটে দেওয়ার প্রয়োজন কী ?

শিক্ষার্থীদেরও প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানতে হবে। শিক্ষকের কথা শুনতে হবে। কোথাও ভুল করলে সেই ভুল স্বীকার করতে হবে। কিন্তু শিক্ষক বলেই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মর্যাদা উপেক্ষা করার অধিকার কেউ পান না। শাসন আর অপমানের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটি শিক্ষকদের বোঝা জরুরি।

ফরহাদ আর রিপনের সেই বিষন্ন মুখ আজও মনে আছে। এত বছর পর নওগাঁর ঘটনাটি পড়ে আবার তাদের কথা মনে হলো। সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালও হয়তো নতুন রং পায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকদের আচরণের কিছু স্মৃতি থেকে যায় বহু বছর।




ফটোকার্ড ক্রেডিট : সারা বাংলা এবং ডেলটা লেন্স


শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে- সারা বাংলা

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×