somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয় কী?

১৭ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।আসসালামু আলাইকা।

সম্প্রতি ভয়াবহ মাত্রায় নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনায় সারাদেশ বিষ্ময়ে হতবাক; ঘৃণা ও ক্ষোভে ফুঁসছে সারাদেশের মানুষ।আলোচনা চলছে সর্বত্র।সাধারণ মানুষ খুঁজে ফিরছে এর সম্ভাব্য কারণ। সমাজ বিজ্ঞানী ও মনোবিদগণও নানাভাবে ব্যাপারটিকে বিশ্লেষণ করছেন।কিন্তু আমি বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম এ ধরনের যৌন হয়রানি কেন বাড়ছে তার গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো উপস্থাপিত হচ্ছে না এবং অতীতেও হয়নি।সমস্যার কারণ সুনিদিষ্টভাবে চিহ্নিত করা না গেলে তার প্রতিকারে কোন পদ্ধতিই সুদূরপ্রসারী কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।আজকের এই পোস্টে যৌন সহিংসতার কিছু মৌলিক কারণ ও এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করছি। আলোচনার শুরুতে বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার চিত্রটা কত যে ভয়াবহ তার কিছু পরিসংখ্যান আপনাদের বিবেচনার জন্য নিচে তুলে ধরা হলো-

*মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক স্কুলসমূহে ১২-১৬বছর বয়সী মেয়ে শিশুদের ৮৩% যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

*ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহে ৪০%-৫০% নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

*নয়া দিল্লির ২০১০ সালের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় প্রায় ৬৬% নারী বছরে ২-৫বার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

*বিশ্বব্যাপী পাচার হওয়া নারীদের প্রায় ৪৪ লক্ষকে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছে।

*২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩,৪৬,৮৩০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন যাদের বয়স ১২ বছর বা তারচেয়ে বেশি।এর মধ্যে মাত্র ১২%-১৬% কেস পুলিশের কাছে রিপোর্টেড হয়েছে।

*ছোটবেলায় যেসব নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদের প্রায় ৩৫% প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আবারও ধর্ষিতা হয়েছেন।

*প্রতি ৪ জন নারীর ১ জন এবং প্রতি ৬ জন পুরুষের ১ জন ১৮ বছর বয়সের পূর্বেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন।

*৪০% যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর কোন উপসর্গ থাকে না।

*শিশু যৌন নির্যাতনকারীদের মধ্যে ১০% অপরিচিত,৩০% আত্মীয় এবং ৬০% পরিবারের সদস্য নন এমন পরিচিতজন (পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশী, কাজের লোক, ড্রাইভার, ডাক্তার, হুজুর …)।এদের মধ্যে ২৩% শিশু যৌন নির্যাতনকারীর বয়স ১৮ এর নিচে।

*মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৫-২০১০ পর্যন্ত চালানো জরিপ থেকে জানা যায় ধর্ষণকারীদের ৭৮% ই ধর্ষিতার আত্মীয়, বন্ধু ও পরিচিতজন।

*শুধু ২০০২ সালে বিশ্বে প্রায় ১৫ কোটি নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন যাদের বয়স ছিলো ১৬ বছরের নিচে।

*বিশ্বে যত নারী যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে তার ৫০% এরও বেশি শিকার ১৬ বছরের নীচের নারীরা।

*ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৫% ক্ষেত্রে ধর্ষিতার নিজ বাড়ি বা কাছাকাছি স্থানে,১২% ক্ষেত্রে তার পরিচিত মানুষের বাড়ি বা তার কাছাকাছি স্থানে,১০% ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক এলাকা বা পাকিং লট বা গ্যারেজে,৮% ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ১৫% ক্ষেত্রে গাড়িতে বা পার্কে বা অন্যন্য স্থানে।

*৯০% ক্ষেত্রে ধর্ষণকারী একজন ছিলো এবং ১০% ক্ষেত্রে ২ বা ততোধিক।

*ধর্ষণের ঘটনা ৭৮% ক্ষেত্রে পরিচিতজনদের দ্বারা (বর্তমান বা প্রাক্তন স্বামী ও ছেলে বন্ধু-৩৪%, আত্মীয়-৬% এবং অনাত্মীয় পরিচিতজন-৩৮%) এবং ২২% ক্ষেত্রে অপরিচিতের দ্বারা সংঘটিত হতে দেখা গেছে।

*৮৩% ক্ষেত্রে ধর্ষণকারী নিরস্ত্র ছিলো এবং ১১% ক্ষেত্রে কোন না কোন অস্ত্রে মুখে ধর্ষণ করা হয়।

*যৌন নির্যাতনকারীর বয়স ৪৮% ক্ষেত্রে ছিলো ৩০ বছর+,২৫% ক্ষেত্রে ২১-২৯ বছর,২৪% ক্ষেত্রে ১৭-২০ বছর এবং ৩% অন্যন্য বয়সের।

The United Nations Multicountry Study মোতাবেক বাংলাদেশের চিত্রও ভয়াবহ -

*গড়ে ১০% বাংলাদেশী পুরুষ জীবনে কোন না কোন মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।

*বাংলাদেশে গ্রামের ৮২% ও শহরের ৭৯% পুরুষ ধর্ষণের কারণ হিসাবে মেয়েটিকে বশে রাখা,বাগে আনা বা অধিকারভূক্ত করাকে দেখিয়েছেন।

*বাংলাদেশে ৬১.২% শহুরে পুরুষের মধ্যে ধর্ষণ করার পর কোনরূপ অপরাধবোধ বা পরিণতির ভয় কাজ করেনি।

*৮৯.২% বাংলাদেশি শহুরে পুরুষ কোন নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম করাকে ধর্ষণ মনে করেন না যদি না সে নারী শারীরিকভাবে বাঁধা দেয়।

*বাংলাদেশে ৯৫.১% ধর্ষককে কোন ধরনের আইনি পরিণতি ভোগ করতে হয়নি।



এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে যৌন সহিংসতার সংজ্ঞা ও সীমা জানা।কারণ সঠিক সংজ্ঞা ও সীমা না জানার জন্য অনেক সময় নারী যৌন নির্যাতিত হয়েও তা বুঝতে পারে না এবং যা তাকে আরও বড় ধরনের যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ‘যৌন অপরাধ(sexual offence)’,‘যৌন হয়রানি(sexual harassment)’,‘যৌন নির্যাতন(sexual assault)’ ও ‘যৌন সহিংসতা(sexual violence)’ প্রায় সমার্থক হওয়ায় পুরো অার্টিকেলটিতে ‘যৌন সহিংসতা’ টার্মটিই ব্যবহার করা হবে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌন সহিংসতা বা Sexual violence কে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে-

“Any sexual act, attempt to obtain a sexual act,unwanted sexual comments or advances, or acts to traffic women’s sexuality,using coercion, threats of harm or physical force, by any person regardless of relationship to the victim, in any setting, including but not limited to home and work”

“ঘরে কিংবা বাইরে কোন ব্যক্তি যদি শারীরিক বলপ্রয়োগে বা হুমকি দিয়ে কিংবা পরিস্থিতি সাপেক্ষে বাধ্য করে যে কোন ধরনের যৌন কর্মে লিপ্ত হয়,যৌনতা লাভের প্রয়াস চালায় বা অবাঞ্চিত কোন যৌনতা নির্দেশক কথা বলে বা প্রস্তাব পেশ করে কিংবা নারীর যৌনতাকে পুঁজি করে কোন ধরনের বাণিজ্য করে তাহলে সেই ব্যক্তি উক্ত ভূক্তভোগীর সাথে যে সম্পর্কেই সম্পর্কিত থাকুক না কেন সেটা যৌন সহিংসতা বলে বিবেচিত হবে”।

আমি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য কোন কোন বিষয়গুলো যৌন সহিংসতা বলে বিবেচিত হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে উপস্থাপন করছি-

১)ধর্ষণ-এমন কি ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে সেটাও ধর্ষণ (spousal rape) তথা যৌন সহিংসতা বলে বিবেচিত হবে।যদিও বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম করাটা অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না সচেতনতার অভাবে।প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যৌন কর্মীর অনুমতি ছাড়া তার দেহ স্পর্শ করাও যৌন অপরাধ।

২)শারীরিক যৌন হয়রানি-মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া,বিশেষ অঙ্গ স্পর্শ করা,এমন কোন কাজ করতে বলা যাতে মেয়েটির শরীরের বিশেষ জায়গা স্পষ্ট হয়ে উঠে বা দৃশ্যমান হয়, নারীকে পুরুষের বিশেষ অঙ্গ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্পর্শ করতে বাধ্য করা, অনুমতি ছাড়াই এবং নারীর অস্বস্তি উপেক্ষা করে কোন নারীকে আদর করা বা জড়িয়ে ধরা বা চুমু খাওয়া, নারীর বস্ত্র ধরে টান দেওয়া বা নগ্ন করতে চেষ্টা করা বা এমন কোন কাজ করা যাতে নারী শরীর থেকে বস্ত্র অপসারণ করতে বাধ্য হয় বা বস্ত্রের ভিতর দিয়ে তার দেহের বিশেষ অঙ্গসমূহ দেখা যায় ইত্যাদি।

৩)মানসিক যৌন হয়রানি-নারীর উদ্দেশ্যে যৌনতা নির্দেশক কোন কথা বলা বা প্রস্তাব দেওয়া (ইভ টিজিং), এমন কথা বলা যাতে একজন নারী যৌন নির্যাতনের আতঙ্কে ভোগে (যেমন-‘আমি তোমাকে তুলে নিয়ে যাব’,‘তোমাকে আমার কাছে আসতেই হবে এক রাতের জন্য হলেও’ ),অপছন্দ বা অমত সত্বেও প্রেম বা বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করা, কোন নারীকে ভয় দেখানো যে তার কোন ফোনালাপ, অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি কিংবা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিবে ইত্যাদি।

৪)যৌনতায় বাধ্য করা (coercion)-এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে একটি মেয়ে অনীহা সত্বেও যৌন মিলনে বা অন্যন্য যৌন কর্ম করতে বাধ্য হয়।যেমন বিয়ের প্রলোভন, চাকুরীর প্রলোভন বা পদোন্নতির মুলো ঝুলিয়ে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে, মিডিয়া জগতে তারকা বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভনে, আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার বিনিময়ে, সম্পর্কের অবনতি বা ভেঙ্গে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে, অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও বা নগ্ন কোন ছবি বা কোন গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কিংবা অস্ত্র বা নিরাপত্তার ভয় তথা জীবননাশের ভয় দেখিয়ে যৌনকর্ম করতে দূর্বল করা।

৫)বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে যৌনকর্ম করা (false agreement)- এ অবস্থায় পুরুষটি ঐ নারীকে বিয়ে না করলে এটি যৌন সহিংসতা হিসাবে বিবেচিত হবে ।অর্থাৎ মেয়েটি এ শর্তেই ছেলেটিকে যৌনকর্মের সম্মতি দিয়েছিলো যে সে তাকে বিয়ে করবে।সম্প্রতি একটি আলোচিত কেসে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণী তার প্রাক্তন প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন।এ বিষয়ে আমাদের ব্যাপক অসচেতনতা আলোচ্য কেসে নেটিজেনদের মন্তব্যে ফুটে উঠেছে।

৬) অকার্যকর সম্মতি- কোন নারীর পূর্ণ সম্মতি ও ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ করার পরও এমনকি লিখিত বা সাক্ষীর উপস্থিতিতেও যৌন মিলনের ঘটনা সংঘটিত হলেও যদি সে নারীর সম্মতি দেওয়ার আইনত বয়স না থাকে (১৬ বছরের নীচে) কিংবা মানসিক পরিপক্কতা না থাকে (যেমন পাগল) অথবা মানসিক অবস্থা না থাকে (যেমন মদ্যপ অবস্থায় বা নেশা করা অবস্থায় কিংবা কোন ঔষধের প্রতিক্রিয়ায় যেখানে স্বাভাবিক চেতনা থাকে না) সেক্ষেত্রে এরূপ যৌনতা ‘যৌন সহিংসতা’ হিসাবে বিবেচিত হবে।

৭)যৌন-দাসত্ব: নারী পাচার, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, পতিতাবৃত্তিতে শিশুদের ব্যবহার করা, শিশু পর্ণোগ্রাফি ইত্যাদি।

৮) ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে- জোরপূর্বক বিয়ে করা, অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করা, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে মেয়েটি অনিচ্ছা সত্বেও বিয়ে করতে বাধ্য হয়।

৯)যৌন প্রজননে বল প্রয়োগ- জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা, জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো ও জোরপূর্বক স্থায়ী জন্মনিরোধী পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য করা, অসুস্থ স্ত্রীর সাথে জোরপূর্বক সেক্স করা তার অনাগ্রহ বা নিষেধ সত্বেও, যৌন সঙ্গমে এমন কোন স্টাইল বা পদ্ধতি ব্যবহার করা যেক্ষেত্রে সঙ্গীর সম্মতি নেই।

উপরোক্ত অনেক অবস্থাই যে যৌন সহিংসতা সে বিষয়ে আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ ওয়াকিবহাল নয়।ফলে অনেকেই যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন এবং যৌন অপরাধীরা তাদের পরিধি কিংবা মাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন।মানসিক যৌন নির‌্যাতনকারীরা অনেকসময় নারীর দূর্বলতা কিংবা সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় দূর্বলতার সুযোগে শারীরিক যৌন নির‌্যাতনকারী হয়।এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।নিজের অধিকার ও তার সীমা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে এবং সেটি রক্ষায় দৃঢ়তা দেখাতে না পারলে যৌন সহিংসতা সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনা অসম্ভব।




যৌনানুভূতি ও যৌন আচরণের ব্যাপারে নারী পুরুষের বিরাট পার্থক্য রয়েছে।এসব বিষয় না জানা ও না মানার কারণে যৌন সহিংসতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা হলো-

১)প্রকৃতিগতভাবেই পুরুষদের যৌনতাড়না মেয়েদের তুলনায় বেশি-এ বিষয়ে Case Western Reserve University এর Department of Psychology’র একটি গবেষণার খানিকটা আপনাদের জন্য তুলে ধরছি-
“The sex drive refers to the strength of sexual motivation. Across many different studies and measures, men have been shown to have more frequent and more intense sexual desires than women, as reflected in spontaneous thoughts about sex, frequency and variety of sexual fantasies, desired frequency of intercourse, desired number of partners,masturbation, liking for various sexual practices, willingness to forego sex, initiating versus refusing sex, making sacrifices for sex, and other measures. No contrary findings (indicating stronger sexual motivation among women) were found. Hence we conclude that the male sex drive is stronger than the female sex drive.”

২)প্রকৃতিগতভাবেই ছেলেদের সেক্স ফিজিক্যাল এবং মেয়েদের সেক্স ইমোশনাল-ফলে পুরুষরা নারীদেহে যৌনতা খুঁজে পেতে উদগ্রীব থাকে এবং সেটা পেতে বৈধ-অবৈধ সকল পন্থাই অবলম্বন করে।আর নারীদের সেক্স ইমোশোনাল হওয়ায় সম্পর্কিত হওয়ার জন্য তারা তাদের আবেগকে সম্মান জানাবে এমন সুন্দর মনের পুরুষ খুঁজে এবং অন্তরঙ্গ পুরুষ ছাড়া কারো সাথে সহজে সেক্সে জড়াতে চায় না।হয়ত এ কারণেই প্রতারকরা নারীর আবেগের জায়গাটি আগে দখল করে অন্তরঙ্গ হয় এবং তারপর তাকে খুব সহজেই ভোগ করে।

৩)ইরোটিক প্লাস্টিসিটি(Erotic plasticity)-পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা পরিবেশ(Situational), সামাজিক(Social), সাংস্কৃতিক(Cultural), ধর্মীয়(Religious), শিক্ষা(Educational)-সহ অন্যন্য ফ্যাক্টরগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একজনের যৌন তাড়না কতটা পরিমিত হয় তাকেই ইরোটিক প্লাস্টিসিটি বলে।যাদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি বেশি (Flexible) তারা খুব সহজেই এসব উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণ বা পরিমিত করতে পারেন বা করানো যায়।কিন্তু যাদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি কম (Relatively rigid) তাদেরকে উপদেশ, নিষেধ, নসিহত, ধর্মীয় বিধান মানিয়ে বা তাদের শাসন করে খুব বেশি তাদের যৌন তাড়না পরিমিত করা যায় না।এমনকি উচ্চশিক্ষা, উচ্চবংশীয় মর্যাদা বা অনেক লোকের উপস্থিতিও তাদের যৌন তাড়না খুব বেশি পরিমিত করতে পারে না।

২০০০ সালে বিষয়টি প্রথম সবার নজরে আনেন সামাজিক মনোবিজ্ঞানী Roy Baumeister এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত এ নিয়ে দুটো বড় গবেষণাও হয়েছে।Roy Baumeister এর হাইপোথিসিস অনুসারে মেয়েদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি।অন্যদিকে ছেলেদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি কম হওয়ায় তাদের যৌন তাড়না এসব ফ্যাক্টর দ্বারা পরিমিতকরণ তুলনামূলক কঠিন।তবে আশার কথা হলো বয়ঃসন্ধির পূর্বে ছেলেদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি বেশি থাকায় এসময় তাদেরকে যৌনতা পরিমিতকরণের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিলে সেটা খুব কার্যকরী হতে পারে যে কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথাতেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে-

“Responsible sexual behaviour, sensitivity and equity in gender relations, particularly when instilled during the formative years, enhance and promote respectful and harmonious partnerships between men and women." অর্থাৎ “দায়িত্বশীল যৌন আচরণ এবং লিঙ্গিক সম্পর্কের সমতা ও সংবেদনশীলতার বিষয়াদি যদি উঠতি বয়সে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেটা নারী ও পুরুষের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি ও বর্ধন করে।”

৪)সেক্স কন্ডিশনিং করার পুরুষের সক্ষমতা বেশি- যৌনতার সাথে দেহের কোন অংশ কিংবা বাচনভঙ্গী বা আচরণ সম্পৃক্ত করার সক্ষমতা পুরুষ ব্রেনের বেশি।একটি পরীক্ষণে দেখা গেছে পুরুষদের একই সাথে পর্ণোছবি ও নারীর পেটের ছবি দেখানো হলো এবং নারীদেরকে একইসাথে পর্ণোছবি ও পুরুষের পেটের ছবি দেখানো হলো ।পরবর্তীতে যখন শুধু পেটের ছবি দেখালো হলো তখন পুরুষরা কামোত্তেজিত হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলক কম দেখা গেছে।এ সক্ষমতার কারণে নারী দেহের যেকোন অংশকে পুরুষরা যৌনতার সাথে কন্ডিশনিং করতে পারে।এমনকি নারীর বাচনভঙ্গী বা বিশেষ কোন আচরণের সাথে সেক্সকে কন্ডিশনিং করতে পারে।

৫)পুরুষরা প্রকৃতিগতভাবেই বহুগামীঃবিবর্তনবাদে যৌনসঙ্গী নির্বাচনে আমাদের আদি নারী পুরুষদের বিবেচনা জ্ঞান বহুল আলোচিত Robert Trivers এর “Parental Investment” ধারণাতে ব্যাখা করা হয়েছে।সে সময় মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে সুস্থ সন্তান উৎপাদনে বাবা-মা দুজনই উদগ্রীব থাকতেন।একজন নারী যেহেতু ৯মাসের আগে আরেকটি সন্তান উৎপাদন করতে পারতেন না তাই নিশ্চিত গর্ভধারণ,সুস্থ বাচ্চা পাবার আশায় এবং সন্তানের ভরণপোষণ বহনে ইচ্ছুক ও সমর্থ পুরুষ বাছাই করতেন এবং তার প্রতি অনুগত থাকতেন।কিন্তু পুরুষরা সুস্থ সন্তান পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে অল্প সময়ের জন্য হলেও অন্যন্য নারীর সাথেও সঙ্গম করতেন।সন্তান উৎপাদনের জন্য সেই ধারার মানসিকতা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বর্তমানের নারীরাও।তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে সেটা সন্তান উৎপাদনের পরিবর্তে যৌনতায় রূপ নিয়েছে।তাই নিজ ঘরে স্ত্রী থাকার পরও অন্য মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে এবং যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার প্রয়াস চালায়।ফলে বিয়ের পরও পুরুষদেরকে অন্য নারীর প্রতি যৌন সহিংসতায় জড়ানো থেকে বিরত রাখা ক্ষেত্রবিশেষে সম্ভব হয় না।

৬)মানসিক রোগ-যেসব মানসিক রোগে যৌন অপরাধ করার প্রবণতা প্রকটভাবে থাকে সেগুলো পুরুষদেরই বেশি হয়।

৭)সকল ধরনের অপরাধের ক্রমবর্ধ হার ও তাতে পুরুষদের ব্যাপক অংশগ্রহণঃযেহেতু সকল ধরনের অপরাধেই পুরুষদের তুলনামূলক ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায় কাজেই অপরাধ মনস্তাত্বিকতায় স্বাভাবিকভাবেই যৌন অপরাধেও তাদের অংশগ্রহণ বেশিই থাকে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো যৌনতা ও যৌন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুরুষদের সীমাবদ্ধতা।এসব বিষয় যদি নারীরা না বোঝেন এবং নিজেদের অনুভূতির বিচারে পুরুষদেরও বিচার করেন তাহলে তারা যৌন সহিংসতার প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে থাকবেন।যে কোন সক্ষম পুরুষের (এমনকি তিনি যদি সর্বজনবিদিত সৎ ও পরহেযগার এবং মুরুব্বীগোছেরও হউন) সাথে সম্পর্কিত হওয়ার হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের সীমাবদ্ধতার কথাগুলো মনে রাখা এবং তদানুযায়ী প্রতিরক্ষা/প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা কমানোর জন্য অতীব জরুরি।



এমন কতকগুলো মানসিক রোগ বা ডিসঅর্ডার রয়েছে যার প্রধান উপসর্গই হলো যৌন সহিংসতা বা যৌন বিকৃত যৌন আচরণ।আবার এমন কতকগুলো ব্যক্তিত্বের ত্রুটি রয়েছে যার কারণে একজন যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারে।দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে এসব রোগগুলোর প্রকোপ ক্রমাগত বাড়লেও এ বিষয়ে গণসচেতনতা না থাকায় এবং চিকিৎসা না হওয়ায় এদের হিংস্র থাবায় নারী ও শিশুরা আজ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত।আপনাদের বিবেচনার এরকম কিছু রোগের কথা নিচে তুলে ধরা হলো-

প্রথমেই আলোচনা করি ব্যক্তিত্বের ত্রুটি বা পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার নিয়ে।গবেষণায় দেখা গেছে সাজাপ্রাপ্ত যৌন অপরাধীদের ৫০%-৭৪% নানাবিধ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।এর মধ্যে অ্যান্টিসোস্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের কেস প্রায় ২৯.১%, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের কেস প্রায় ৪৪% এবং অবসেসিভ-কমপালসিভ পার্সোনালিটির কেস প্রায় ১০%।অর্থাৎ যৌন অপরাধীদের সিংহভাগই ব্যক্তিত্বের ত্রুটিতে ভূগে থাকেন।যৌন অপরাধীদের মধ্যে পাওয়া প্রধান এই ৩ধরনের ব্যক্তিত্বের ত্রুটি নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

অ্যান্টি সোস্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারঃএরা হলো সকল নিয়ম কানুন অগ্রাহ্য করে চলা একদল অপরাধপ্রবণ মানুষ যাদেরকে অসামাজিকও বলা হয়।নারীকে যৌন নির্যাতন করা এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।এদের জীবন ইতিহাসে একাধিক নারী ধর্ষণের কেস হিস্ট্রি পাওয়া যায়।সাধারণ জনসংখ্যার ৩% পুরুষ ও ১% নারী এ রোগে ভুগে থাকে বলে ধারণা করা হয়।বিশ্বব্যাপী প্রিভ্যালেন্স হার বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রায় ১৫লক্ষ পুরুষ এ রোগে ভুগছে।ধর্ষকদের একটি বিরাট অংশ এ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যেহেতু এরা অমিত সাহসী, জানের তোয়াক্কা করে না, হিংস্র ও দাপুটে এবং সর্বোপরী অপরাধপ্রবণ মানসিকতার অধিকারী বিধায় গ্যাং তৈরি করা, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হওয়া বা এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী গ্রুপ তৈরি করা এদের বৈশিষ্ট্য।তাদের এসব গুণের জন্য ক্ষমতাসীনরা প্রায়ই তাদের ব্যবহার করে এবং ক্ষমতাসীনদের আস্কারায় তাদের অপরাধপ্রবণতাও প্রকট হয়।এ রোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারঃএমনিতে এ মানুষগুলো খুবই প্রাণোচ্ছল ও আপাত ভালো মানুষের মত মনে হলেও এরা যথেষ্ট বদরাগী এবং কোন ধরনের অবহেলা,অপমান বা অপদস্ত হলে কিংবা প্রিয় মানুষ ছেড়ে চলে গেলে এ মানুষগুলো ঝোঁকের মাথায় নানা ধরনের অবিবেচক কাজ করে থাকে যার মধ্যে যৌন নির্যাতন অন্যতম।অন্যের ক্ষতি করার পাশাপাশি এরা নিজেদেরও ক্ষতি করে থাকে।হাত ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটা, দেয়ালে মাথা ঠুকা ইত্যাদি ৫০%-৮০% রোগির মধ্যে দেখা যায়।স্বাভাবিক অবস্থায় এদের অমায়িকতা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতায় হিংস্রতা দেখানোর এ দ্বৈতগুণের জন্য এরাও পাড়ার দাদা, রাজনৈতিক দলের সদস্য কিংবা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রিয়ভাজন হয়ে থাকে।বিশ্বব্যাপী এ রোগের প্রাদূর্ভাব হারের সর্বনিম্ন হার বিবেচনা করলেও বাংলাদেশে প্রায় কমপক্ষে ১৫লক্ষ ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত।গুরুত্বপূর্ণ হলো এ ডিসঅর্ডারে অনেক নারী ভূগে থাকেন।এ ধরনের নারীরা অন্য নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা প্রদর্শনে অনেকসময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

অ্যান্টিসোস্যাল ও বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের মানুষগুলো নিজেদের জীবনকেই তোয়াক্কা করে না।এদের অনেকেরই পুলিশের খাতায় নাম থাকে।আর এরাই কিশোর গ্যাং, পাড়ার দাদা, রাজনৈতিক ক্যাডার ও অন্যন্য অপরাধজগতের বাসিন্দা হয়ে থাকে।মৃত্যুভীতি না থাকায় এবং জীবনের মূল্য না বোঝায় এদেরকে আইনের ভয় দেখিয়ে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করা অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।২০০২ সালের এক রিভিও এ দেখা যায় জেলখানার সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে ৪৭% পুরুষ ও ২১% মহিলা এ রোগে আক্রান্ত [Fazel, Seena; Danesh, John (2002). "Serious mental disorder in 23 000 prisoners: A systematic review of 62 surveys". The Lancet 359 (9306): 545.]

আপনাদের আরেকটি ব্যক্তিত্বের ত্রুটির সাথে আপনাদের পরিচয় দিই যেটিতে একজন নারী নিজের আচরণের কারণেই যৌন সহিংসতার শিকার হন এবং অন্য নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে ধণাত্মক প্রভাবক হিসাবে কাজ করেন।আর সেটি হলো হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।

হিসট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারঃএ ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা বেশিরভাগই মেয়ে।এদের অনেকগুলো বৈশিষ্টের মধ্যে একটি হলো পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দেহ তথা যৌনতা প্রদর্শনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা যদিও তারা সেক্সের ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী থাকে না।এ ধরনের আচরণের কারণে অনেক পুরুষ প্রলুব্ধ হয় এবং তারাই তাকে নানা ফাঁদে ফেলে যৌন নির্যাতন করে থাকে।আবার একই সাথে একাধিক ছেলের সাথে প্রেমিকার ন্যায় অভিনয় করায় প্রতিশোধমূলক ধর্ষণেরও শিকার হয়।এদের সাথে সম্পর্কিত হয়ে অনেক সাধারণ মেয়েও যৌন সহিংসতার শিকার হয়।এ রোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

আবার কিছু বিকৃত যৌনাচারী রয়েছে (Paraphiliac) যাদের কারণে নারী ও শিশুরা হরহামেশা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।এরকম কিছু প্যারাফিলিয়ার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি-

পেডোফিলিয়াঃ- Pedophilia(ল্যাটিন Pedo শব্দের অর্থ শিশু)।এক্ষেত্রে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কাম-লালসা চরিতার্থ করার জন্য নাবালক শিশুকে যৌনসঙ্গী হিসাবে ব্যবহার করে।এ ধরণের বিকৃত যৌনাচারে শিশুর মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটে এবং তা তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।ঘরের মধ্যে নিকট আত্মীয়,কাজের লোক, ড্রাইভার ও প্রতিবেশী দ্বারা এবং স্কুলে বা মাদ্রাসায় শিক্ষকের দ্বারা আমাদের শিশুরা অহরহ এ ধরণের অনাচারের শিকার হচ্ছে।এ রোগে ভোগার হার সাধারণ জনসংখ্যার ৩%-৫% বলে ধারণা করা হয়।অবশ্য সকল পেডোফিলিক যৌন সহিংসতা দেখায় না।অামি যদি যৌন সহিংসকারী পেডোফিলিকের প্রিভ্যালেন্স রেট মাত্র ১%ও বিবেচনা করি তাহলেও বাংলাদেশে প্রায় ১০লক্ষ শিশু যৌনাচারী অপরাধী রয়েছে বলে ধারণা করা যায়।শিশুকালে যৌন নির‌্যাতনের শিকার হওয়ার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এসব শিশু বড় হয়ে কেউ কেউ ধর্ষকের ভূমিকা পালন করে।

র্যাপটোফিলিয়াঃ Raptophilia (from Latin rapere, "to seize") বা Biastophilia(from Greek biastes, "rape") এর ক্ষেত্রে জোরপূর্বক ধর্ষণের সময় একজন নারী প্রতিরোধমূলক যেসব কাজ করে(কিল ঘুষি মারা, চিৎকার করা, কান্নাকাটি করা ইত্যাদি) সেগুলো তার জন্য যৌন উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে।মেয়েটির শরীর ভোগ করা তার মূল উদ্দেশ্য থাকে না।অবশ্য কামোত্তেজিত হওয়ার পর ধর্ষণ কিংবা ধরা পড়ার ভয়ে তাকে হত্যা করা হতে পারে।বৈধ স্ত্রী থাকার পরও তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা যায় না।যারা একের পর এক ধর্ষণ করে সেঞ্চুরি হাকাচ্ছেন তারা এ রোগের রোগী কি না নিশ্চিত হওয়া দরকার।

ন্যারেটোফিলিয়াঃ Narratophilia(Narrate=বর্ণনা করা)।এ ধরণের পুরুষরা মেয়ে দেখলেই তাদের সাথে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চটুল কথাবার্তা শুরু করে দেয় এবং তার প্রভাব অবলোকন করে।এর দ্বারা সে যৌন উদ্দীপনা লাভ করে।মেয়েটির নির্লিপ্ততায় কিংবা না বলার অক্ষমতায় অথবা আস্কারায় এ উদ্দীপনা থেকে তীব্র যৌন তাড়না সৃষ্টির মাধ্যমে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের মত ঘটনাও ঘটতে পারে।দুলাভাই,স্বামীর বন্ধু,দেবর,অফিসের কলিগ এবং ইভ টিজারদের মধ্যে এরকম ন্যারেটোফিলিক দেখা যায়।

স্পর্শসুখ বা শ্লীলতাহানিঃ এটাকে Toucherismও বলা হয়।অনেক মনোবিজ্ঞানী টাচেওরিজম ও ফ্রটেওরিজরমকে একই অর্থে ব্যবহার করেন।এ ধরণের কুকর্মের হোতা মূলতঃ পুরুষরাই।হাত দিয়ে অপরিচিত নারীর শরীর স্পর্শ করা, স্তনে চাপ দেওয়া, নিতম্বে চাপড় দেওয়া, চুমু খেতে চেষ্টা করা, যৌনাঙ্গে হাত বোলানো ইত্যাদি।বৈশাখী মেলা, বইমেলা, বাণিজ্যমেলা, ঈদের কেনাকাটার ভীড়ে, ঘরে নারীর একাকিত্বের সুযোগে কিংবা টিএসসির থার্টি ফার্ষ্ট নাইটেও এদের হ্রিংস থাবা প্রসারিত।নারীদেহের স্পর্শসুখই তাদের তীব্র কামোত্তেজনা তৈরির জন্য যথেষ্ঠ।এ ঘটনাকে বার বার সে মনে করে পূণঃ পূণঃ যৌন উদ্দীপনা অনুভব করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হস্তমৈথুনের দ্বারা কামনার পরিসমাপ্তি ঘটে।

পডোফিলিয়াঃPodophilia(pod=পা)।পা দেখে বা তাতে আদর করে বা পায়ে আদরের কল্পনা করেই একজন চরম উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে।এ রোগে ছেলে মেয়ে উভয়েই ভূগে থাকে।এ রোগের মেয়েদের পা কোন কারণে কোন পুরুষ স্পর্শ করা মাত্রই তারা প্রচন্ড কামাতুর হয়ে উঠে এবং দেহমিলনের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।অন্যন্য দেশের মত আমাদের দেশেও এটা দেখা যায়।

ট্রিকোফিলিয়াঃtrichophilia এর ক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের চুলে হাত বুলালে তীব্র কামনা তৈরি হয়।এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নারীর চুল স্পর্শ করা বা তা নিজ মুখের উপর টেনে আনার চেষ্টা করে।

ইনসেস্টঃ- INCEST।যাদের মধ্যে বিয়ে করা হারাম(যেমন পিতা-কন্যা,মা-ছেলে কিংবা আপন ভাই-বোন) তাদের মধ্যের যৌন সম্পর্ককেই ইনসেস্ট বলে।এধরণের প্যারাফিলিকরা রক্তের সম্পর্কের মানুষের সাথে যৌন সম্পর্কের কল্পনা থেকে প্রচন্ড যৌন উদ্দীপনা ও তাড়না লাভ করে এবং যৌনকর্ম সংঘটিত করে।বর্তমানে এটি বিরল নয়।মাঝে মাঝে এ ধরনের খবর পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে।গত ২২শে সেপ্টেম্বর এক মা তার কন্যাকে দিনের যৌন নির‌্যাতন করার অভিযোগে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।পত্রিকার খবরের লিংকটি এখানে
পাবেন।

টেলিফোন স্ক্যাটোলোগিয়াঃ telephone scatologia (scatos=dirt/shit বা নোংরা)।এ ধরণের বিকৃত যৌনাচারীরা ফোনের মাধ্যমে অপরিচিত বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে(তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে) যৌন বিষয়ক নোংরা কথা বলে যৌনানন্দ লাভ করে।আমাদের দেশে মোবাইলের অবাধ ব্যবহারে এ বিকৃতিটি হু হু করে বাড়ছে।অনেক মেয়েই এ কারণে অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা কল রিসিভ করেন না।এটি এক ধরনের মানসিক যৌন নির্যাতন।

জেরেন্টোফিলিয়াঃ- Gerontophilia(Greek: geron, মানে "old man or woman") ।বৃদ্ধা বা রজঃনিবৃত মহিলা যাদের সাথে সেক্স তৃপ্তিদায়ক নয় তাদেরকে দেখলেই এদের যৌন উদ্দীপনা তৈরি হয়।যেহেতু এরা শারীরিকভাবে বাঁধাদানে অসমর্থ তাই তারা অনেকসময় এরূপ জেরেন্টোফিলিক দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন ৭০ বছর বয়সী মহিলা ধর্ষিতা হয়েছেন বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।বিষয়টিতে কোন জেরেন্টোফিলিক জড়িত কিনা তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

যৌন নেশা (Sex addiction) ও হাইপারসেক্সুয়ালিটি (Sexual obsession) : এ মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সবর্দা সেক্স নিয়ে চিন্তা করতে থাকে এবং যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য পাগল প্রায় হয়ে থাকে।এদের সকলের জীবনে নারী বা শিশু উপর যৌন নির্যাতন করার ইতিহাস থাকে।ছেলেদের ক্ষেত্রে এটাকে স্যাটাইরিয়াসিস(satyriasis) বলে।মেয়েদের ক্ষেত্রে নিম্ফোম্যানিয়া (Nymphomania) বলে।

ম্যানিয়াঃঅতি উৎফুল্লতার এ রোগের রোগীরাও তীব্র যৌন তাড়না থেকে যৌন সহিংসতা ঘটাতে পারে।

বিষন্নতাঃ বিষণ্নতা মানুষকে একাকীত্ব এনে দেয়,মনে কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় একটু মানবিক আশ্রয়ের জন্য,একটু শান্তির পরশ পেতে।এরা প্রায়ই ঘরের মানুষদের উপর বীতশ্রদ্ধ থাকে।আর এ সুযোগটা নিতে পারে কিছু সুযোগসন্ধানী।প্রাণোচ্ছল বন্ধু সেজে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি করে এরা প্রায়ই ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়েটিকে যৌনতায় জড়াতে বাধ্য করে।পরবর্তীতে মেয়েটি বাস্তবতা উপলব্ধি করে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইলেও এরা ব্ল্যাকমেলিং করে পূর্বের সম্পর্কে ফিরে আসতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।এ অর্থে বিষণ্নতাও যৌন সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

লাভ অবসেশনঃ প্রেমপাগল এ রোগের রোগীরা প্রায়শই ভালোবাসার মানুষকে হারায় অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কারণে।এরা প্রায়ই হারানো প্রেমিকার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার নামে সেক্স সংক্রান্ত কলঙ্ক রটায় কিংবা সুযোগ পেলে ধর্ষণ বা অন্যন্য যৌন সহিংসতার আশ্রয় নেয় এমনকি খুনও করে ফেলতে পারে।প্রেমঘটিত যত যৌন সহিংসতা ঘটে তার পিছনে লাভ অবসেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ।লাভ অবসেশন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে
ক্লিক করুন।

ড্রাগের নেশাঃ হেরোইন বা ইয়াবার মত নেশাদ্রব্যের ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে সমাজে।এসব রিক্রিয়েশনাল ড্রাগ ব্যবহারের সময় যৌন তাড়নার সৃষ্টি হয় যা সমাজের অন্যন্য মানুষদের যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলে।এমনকি এরা নিজেরাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়।

বিশ্বব্যাপী রোগের প্রাদুর্ভাবের হার(Prevalence Rate) বিবেচনায় বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫০লক্ষ সম্ভাব্য সক্ষম যৌন সহিংসতাকারী (Potential sex offender) রয়েছে মানসিক কারণে এ অপরাধ করে থাকেন। এই বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য যৌন উৎপীড়কদের চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ না করে এবং চিকিৎসার বাইরে রেখে আমাদের নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখা অসম্ভব।যেহেতু এ রোগগুলো শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব, আস্তিক-নাস্তিক যে কারো হতে পারে এবং এসব রোগ নিজ থেকে ভালো হওয়া প্রায় অসম্ভব;এমনকি চিকিৎসার পরও সব রোগীকে ভাল করা সম্ভব হয় না (তাছাড়া ক্ষেত্র বিশেষে সারাজীবনই রোগীকে ফলো আপে রাখতে হয় কারণ ভালো হয়ে যাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে পূর্বের উপসর্গ ফিরে আসতে পারে যাকে Relapse বলে) বিধায় উন্নত-অনুন্নত বিশ্বের সকল দেশেই নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার হার বেশ উঁচু।


এধরনের মানসিক রোগিদের দ্বারা যৌন সহিংসতা ঠেকাতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা উচিৎ-

১)এ রোগগুলো সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে যেন এদেরকে চিহ্নিত করা যায় এবং এদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।বিশেষত আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আইনজীবি ও বিচারকদের এ বিষয়ে বিশেষ সচেতনতা জরুরি।

২)যারা চিকিৎসায় ভালো হবেন না তাদেরকে সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রাখতে হবে।

৩)ড্রাগ অ্যাডিক্ট সন্তানের যন্ত্রণা সইতে না পেরে কোন কোন বাবা-মা পুলিশের হাতে সন্তানকে তুলে দেন অথচ মানবতার শত্রু পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের সন্তানদের ব্যাপারে আস্কারা দেওয়া কিংবা বদদোয়া করা ছাড়া অভিভাবকদের ভূমিকা দেখা যায় না।অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ এ ধরনের ডিসঅর্ডারে ভোগা আপনার সন্তানটিকে নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পুলিশের সহায়তা নিন।সঠিক চিকিৎসায় তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করুন।

৪)লাভ অবসেসনের মত পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন এবং কেউ আপনার ব্যাপারে লাভ অবসেসড হয়ে গেলে অভিভাবকদের অবহিত করুন এবং প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নিন।

৫)ন্যারেটোফিলিয়ার [Narratophilia;Narrate=বর্ণনা করা] পুরুষরা মেয়ে দেখলেই তাদের সাথে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চটুল কথাবার্তা শুরু করে দেয় এবং তার প্রভাব অবলোকন করে।এর দ্বারা সে যৌন উদ্দীপনা লাভ করে।মেয়েটির নির্লিপ্ততায় কিংবা না বলার অক্ষমতায় অথবা আস্কারায় এ উদ্দীপনা থেকে তীব্র যৌন তাড়না সৃষ্টির মাধ্যমে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের মত ঘটনাও ঘটতে পারে।আপনার রূপ বা শারীরিক সৌন্দর্য্যের প্রশংসায় কোন পুরুষের কথায় বিগলিত না হয়ে সতর্ক আচরণ করুন।স্বামী ছাড়া কারো সাথে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কোন কথা বলবেন না এবং কাউকে তা বলার সুযোগ দিবেন না কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্ররোচিত করবেন না।আপনার দেয়া একটি সুযোগেই আপনার পরিচিত একজনই হয়ত আপনাকে যৌনতায় টানতে প্ররোচিত হবে।মনে রাখবেন এ ক্ষেত্রে আপনার ‘না’ বলা যেন দৃঢ় ও আন্তরিক হয়।

৫)শিশুকে আদরের নামে যার তার কোলে দেওয়ার এবং আদর হিসাবে পুরো শরীরে চুমু দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বাস্তবতার নিরিখে বের হয়ে আসা উচিৎ।বিশ্বব্যাপী হার বিবেচনায় বাংলাদেশে ১০লক্ষ শিশু যৌনাচারী রয়েছে যাদের মধ্যে প্রায় ১লক্ষ নারী পেডোফিলিক

৬)সামাজিক কারণের বাধ্যবাধকতায় যদি শিশুটিকে কারো কোলে দিতেই হয় সেক্ষেত্রে আপনি তার সরাসরি নজরদারিতে রাখুন।কোন অবস্থাতেই যেন কেউ একা কোথাও শিশুটিকে নিয়ে যেতে না পারে তা নিশ্চিত করুন।

৭)বোধশক্তি হওয়া মাত্রই শিশুটিকে শরীরের বিভিন্ন অংশের নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন এবং কোন কোন অংশ অন্যদের স্পর্শ করা কিংবা তাকিয়ে দেখা উচিৎ নয় তা ভালোভাবে শেখান।

৮)কেউ শিশুটির অনুচিত অংশ স্পর্শ করলে বা তার দিকে তাকিয়ে থাকলে কিংবা অন্য কেউ তার বিশেষ অংশগুলিতে শিশুটিকে দিয়ে স্পর্শ করিয়ে নিতে চাইলে তা যেন শিশুটি তাৎক্ষণিকভাবে আপনাকে অবহিত করে সে শিক্ষা দিন।

৯)কারো আদর শিশুটির ভালো না লাগলে সে যেনো ‘না’ বলতে পারে সে শিক্ষা দিন।

১০)জীবনে চলার পথে শিশুটি কার কার সাথে মিশছে এবং তাদের সাথে কী কী করছে তা গল্পের ছলে প্রতিদিন জেনে নিন।

১১)শিশুদের পাশে বসিয়ে কামোদ্দীপক বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমা, সিরিয়াল দেখা এবং যৌন সহিংসতার কোন ছবি দেখানো থেকে বিরত রাখুন।

১২)নিয়মিত শিশুটির শরীরে বিশেষ জায়গায় কোন দাগ বা আহত হওয়ার চিহ্ন অাছে কিনা দেখুন ও কারণ নিশ্চিত হোন।তবে মনে রাখবেন এরূপ কোন চিহ্ন দেখা না গেলে এটা মনে করা সমীচিন হবে না যে আপনার শিশুটি আক্রান্ত হয়নি;কারণ যৌনতার শিকার ৪০% শিশুর দেহে কোন চিহ্ন বা উপসর্গ নাও থাকতে পারে।

১৩)শিশু যৌন নির্যাতনের বিষয়ে পরিবারে ও সমাজে আলোচনা করুন।আপনাদের সচেতনতা শিশু যৌনাচারীর জন্য সতর্ক বার্তা হিসাবে কাজ করবে।

১৪)আপনার পুরুষ শিশুটিকে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই মেয়েদের কীভাবে শ্রদ্ধা করতে হয় তার পরিপূর্ণ শিক্ষা দিন। গবেষণায় দেখা গেছে পুরুষদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি (যৌনতা পরিমিতকরণে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব) বয়ঃসন্ধির পূর্বেই সবচেয়ে বেশি থাকে।এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথাটি বিশেষভাবে মনে রাখুন-
“Responsible sexual behaviour, sensitivity and equity in gender relations, particularly when instilled during the formative years, enhance and promote respectful and harmonious partnerships between men and women." অর্থাৎ “দায়িত্বশীল যৌন আচরণ এবং লিঙ্গিক সম্পর্কের সমতা ও সংবেদনশীলতার বিষয়াদি যদি উঠতি বয়সে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেটা নারী ও পুরুষের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি ও বর্ধন করে।”


Princeton University -এর Professor Susan Fiske অসাধারণ এক তথ্য উপস্থাপন করেন ২০০৯ সালের American Association for the Advancement of Science এর বার্ষিক মিটিংয়ে।গবেষকরা নারীর অশালীন পোশাক (Indecent or Provocative dress) পরা ছবি দেখায়রত পুরুষদের ব্রেন স্ক্যান করে দেখেছেন যে তারা এরূপ নারীকে বস্তু হিসাবে দেখছেন।একটা বস্তুকে দেখতে তথা বস্তু হিসাবে বিবেচনা করতে ব্রেনের যে অংশগুলো সক্রিয় হয় অশালীন পোশাকের নারীকে দেখে ঠিক সেই অংশগুলোই সক্রিয় হয়।অর্থাৎ কামোদ্দীপক নারীকে ‘মানুষ’ এর পরিবর্তে ‘বস্তু’ হিসাবে দেখছে।প্রফেসর সুসান ফিস্ক আতঙ্ক নিয়েই বলেছেন “তরুণীদেরকে যৌনতার প্রতিচ্ছবি হিসাবে সমাজের সর্বত্র ক্রমাগত উপস্থাপনের কারণে নারী হিসাবে তাদের বিলুপ্তি ঘটছে”।

প্রখ্যাত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe) যাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবেদনময়ী মানবী হিসাবে বিবেচনা করা হয় তার একটা চমৎকার কথা মনে পড়ে গেল।প্রাসঙ্গিক হওয়ায় তার উক্তিটি তুলে ধরছি-“A sex symbol becomes a thing.I hate being a thing.”

Sexual Objectification কারণে একজন নারীর মূল্যায়ন ও মরয্যাদা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে যাকে ডিহিউমাইজেসন (Dehumanization) বলে।আর ডিহিউমাইজেসন হলো নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার খুবই মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।এ বিষয়ে সাইকোলজিস্ট Barbara Fredrickson, Tomi-Ann Roberts, Rudman, L. A. এবং Mescher, K এর গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো প্রণিধানযোগ্য “ The sexual objectification of women extends beyond pornography (which emphasizes women's bodies over their uniquely human mental and emotional characteristics) to society generally. Men who dehumanize women as either animals or objects are more liable to rape and sexually harass women and display more negative attitudes toward female rape victims.”

আর Sexual Objectification এবং Sexualization এর প্রধান কারণ যৌন মূলধনীয় বা Erotic capitalism ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা।বর্তমান ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রচলিত ৩ ধরনের মূলধনের(economic capital, cultural capital and social capital) সাথে অধুনা যুক্ত হয়েছে ৪র্থ ধরনের মুলধন তথা Erotic capital বা Sexual capital।ব্রিটিশ সমাজ বিজ্ঞানী ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের প্রফেসর-গবেষক ডঃ ক্যাথেরিন হাকিম ২০০০ সালে প্রথম Erotic capital কথাটি ব্যবহার করেন।যেহেতু যৌনতার ব্যাপক আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য রয়েছে সুতরাং এটি একটি স্বতন্ত্র মূলধন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।আর যেহেতু মেয়েদের যৌনতার (female sex) চাহিদা সমাজে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সে অর্থে অন্তত Erotic capital এ মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি মূলধনের অধিকারিনী হওয়ায় এ মুলধনকে ঠিকমত বিনিয়োগ করা গেলে অন্যন্য তিন মুলধনে তাদের হিস্যা বাড়বে যা নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণে দ্রুততার সাথে কার্যকরী হবে।মূলত এরূপ ভ্রান্ত ভাবনা থেকেই যৌন আবেদনকে এখন লগ্নি করা হচ্ছে এবং অনেকেই তাতে সাঁয় দিচ্ছেন।ক্যাথেরিন হাকিম গবেষণায় দেখিয়েছেন এটা শুধু যৌনক্ষেত্র ছাড়াও মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, রাজনীতি, খেলা, শিল্পকলা, এমনকি প্রাত্যহিক জীবনেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। আছে।ক্যাথেরিনের মতে যৌন মুলধনের(Erotic capital) ৬টি উপাদান রয়েছে-

১)BEAUTY বা সৌন্দর্য্য

২)SEXUAL ATTRACTIVENESS বা যৌন আকর্ষণীয়তা

৩)SOCIAL ATTRACTIVENESS বা সামাজিক আকর্ষণীয়তা

৪)VIVACIOUSNESS AND ENERGY বা প্রাণবন্ততা ও শক্তি

৫)PRESENTATION বা উপস্থাপনা

৬)SEXUALITY বা যৌনতা

ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কর্পোরেট হাউসগুলো এবং তাদের সহযোগী মিডিয়া বিপুল সংখ্যক নারীকে তাদের যৌন মুলধনের গুরুত্ব ও তার নানাবিধ ব্যবহার এবং সেটাকে অর্থনৈতিক মূলধনে রূপান্তরের ব্যাপারে উৎসাহিত করতে নানা ধরণের আয়োজন করছেন এবং সেটাতে তারা সফলতাও লাভ করছেন।বিশ্বব্যাপী এ ট্রেন্ড আমাদের দেশেও ঢেউ তুলেছে।সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপন, বিনোদনের অন্যন্য মাধ্যম, পর্ণোগ্রাফি, ফোন সেক্স, এসকর্ট সার্ভিস, ফ্যাসন হাউস, বিউটি পার্লার, বিউটিফিকেসন সার্জারি, খেলার মাঠের চিয়ার গার্লস, ফ্যাসন সো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, চাকুরিক্ষেত্রে এমনকি পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইরোটিক ক্যাপিটাল গুরুত্ব পাচ্ছে।

কিন্তু আমাদের দেশে Erotic capitalism এর ধারণা এবং তার অবশ্যম্ভাবী ক্ষতিকর দিক ও তা সুরক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হওয়ার আগেই জোয়ারে গা ভাসাচ্ছেন অনেকেই।ফলে অন্য সকল মুলধনকে যেমন চুরি করা যায়,ডাকাতি করা যায়,জোরপূর্বক দখল করা যায়,অপব্যবহার করা যায় এবং নষ্ট করা যায় বা হয় ঠিক তেমনি এ মুলধনটিও স্বাভাবিকভাবেই সে সব দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে।বিষয়টা শুধু এখানেই থেমে থাকছে না বরং যিনি এটা বিনিয়োগ না করে নিজের কাছেই সুরক্ষিত রাখছেন তারাও চোর-বাটপার-লুণ্ঠনকারী ও ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

ইরোটিক ক্যাপিটাল লগ্নি করতে গিয়ে নারীরা যে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সেটা আড়ালে রাখতেও তৎপর এ ধারনার ধারক ও বাহকরা।সাধারণ মানুষের অনেকেই তাদের মতাদর্শে প্রভাবিত।এ দলে নারীরাও রয়েছেন।যৌন সহিংসতা বিশেষত ধর্ষণের ক্ষেত্রে যখন নারীর কামোদ্দীপক পোষাককে একটা কারণ হিসাবে দায়ী করা হয় তখন সেটাকে প্রতিহত করতে অধিকাংশ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন।এক্ষেত্রে গবেষকরা বড়ই অসহায়।ইউনিসেফের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অফিসের প্রকাশনার হেডলাইনটির দিকে নজর দিন “The objectification and sexualization of girls in the media linked to violence against women and girls worldwide.”



ইউনিসেফের মত আন্তর্জাতিক সংস্থা যথন অবজেক্টিফিকেসন ও সেক্সুয়ালাইজেসনের মত বিষয়ের সাথে নারীদের প্রতি সহিংসতার যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন সেক্ষেত্রে কিছু বেকুব আর জ্ঞানপাপীর কারণে যৌন অপরাধীদের ক্ষেত্র অবারিত থাকছে।

বিশ্ব মিডিয়া যৌন সহিংসতার নানা বিষয় নিয়ে ক্রমাগত নিউজ করলেও ডিহিউম্যানাইজেসন যে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার প্রধান কারণ সে বিষয়ে সঙ্গত কারণেই তারা এ বিষয়ে লেখালেখি করেন না। তারপরও গুগলসার্চে দুটো পত্রিকায় এ সংক্রান্ত নিউজ দেখলাম-

Sexual assault is rooted in dehumanization

Sexual Assualt and Rape Are About Dehumanization

নারীরা যৌনতার উন্মাদনায় নিজেদের ভাসিয়ে পুরুষের চোখে ভোগ্যপণ্য হয়ে যাক তা আমরা নিশ্চয়ই কেউ চায় না।আর সেটা মানব সভ্যতার টিকে থাকার জন্য সহায়কও হবে না।আমাদের নারীদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।আপনার পোষাক ও আপনার আচরণ আপনাকে নারী হিসাবে উপস্থাপন করছে না সেক্স সিম্বল হিসাবে উপস্থাপন করছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করুন।আপনি আপনার যৌনতা গ্রহণযোগ্য সীমায় ব্যবহার করছেন না সেটার বিনিময়ে কোন কিছু অর্জনের চেষ্টা করছেন তা অনুধাবনের চেষ্টা করুন।

প্রাসঙ্গিক হওয়ায় খুবই বিতর্কিত “ধর্ষণে নারীর পোষাকের ভূমিকা’ বিষয়ে নিয়ে একটু কথা বলা দরকার।পোষাক কী নারী ধর্ষিতা হওয়ার জন্য দায়ী? গবেষণালব্ধ তথ্য বলে ‘না’ সরাসরি দায়ী নয়।অনেক ধর্ষিতারই পোষাক শালীন বা তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিলো।কিন্তু কামোদ্দীপক পোষাক নারীকে সেক্সুয়ালি অবজেক্টটিফাই করে।আর সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেসনের কারণে নারী ডিহিউম্যানাইজ হন।আর ডিহিউম্যনাইজেসন নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার জন্য দায়ী।এ বিচারে নারীর কামোদ্দীপক পোষাক নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার জন্য পরোক্ষভাবে অবশ্যই দায়ী।এ সংক্রান্ত একটি আর্টিকেলের অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম “Sexual violence is a consequence of a dehumanized perception of female bodies that aggressors acquire through their exposure and interpretation of objectified body images.” (Frontiers in Psychology, 8, Article 338.)







পুরুষদেরকে বলছি।নারীদেহ দেখে কামোত্তেজিত হওয়া স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া এবং এটি অপরাধও নয় যদি সেটা নিজ দেহ ও মনের অভ্যন্তরে রাখেন বা নিজের বৈধ সঙ্গীর সাথে করেন।আপনি আপনার কামোত্তেজনাকে সম্মান করুন এবং সেটা যেন অন্যকে অসম্মানিত না করে তা নিশ্চিত করুন।এ জন্য যা করতে পারেন-

১)জীবনে চলার পথে কী কী বিষয় আপনার কামোত্তেজনা তৈরি করছে তার একটি তালিকা তৈরি করুন এবং কীভাবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ বা পরিহার করবেন তার কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করুন।এ বিষয়ে অভিজ্ঞ পরিচিতজন, ধর্মীয় নেতা ও মনোবিদদের সহায়তা নিতে পারেন।

২)যদি কোন নারীকে দেখার পর যৌন উত্তেজনা অনুভব করেন তাহলে প্রথমেই মনের দৃঢ়তার সাথে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিন।সম্ভব হলে ঐ স্থান ত্যাগ করুন।কারো সাথে মোবাইলে কথা শুরু করতে পারেন।কাজের পরিকল্পনার কথা ভাবতে পারেন।সুযোগ থাকলে বই বা পত্রিকা পড়া শুরু করতে পারেন।যারা ধার্মিক তারা দোয়া-দরুদ বা সমজাতীয় ধর্মীয় মন্ত্র বা শ্লোক মনে মনে পাঠ করতে পারেন।মনে রাখবেন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাও যৌন উত্তেজক হিসাবে কাজ করতে পারে।গবেষণায় দেখা গেছে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ত্বক স্পর্শ করার সমতুল্য।

৩)যা দেখেছেন বা তার প্রতিক্রিয়ার আপনার অনুভূতির কথা বার বার চিন্তা করা থেকে বিরত থাকুন এবং এসব কথা মজা করার ছলে হলেও কারো সাথে শেয়ার করবেন না।যেসব বন্ধু বা ঘনিষ্টজন যৌন আলাপে অভ্যস্ত ও উস্কানিদাতা তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন।

৪)অভিভাবকদের বলছি বয়ঃসন্ধিকালেই ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে প্রত্যেকের যৌনতার অনুভূতি তৈরি হয় এবং এসময় হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণে শারীরিক ও মানসিক যৌন বৈশিষ্ট্যগুলো পরিস্ফুটিত হয়।টেসটসটেরন হরমোনের কারণে ছেলেরা যৌনতার ব্যাপারে তুলনামূলক বেশি আগ্রাসী হয় এবং প্রাকৃতিক কারণেই নারীদেহের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে।এ সময়টুকু তাদের বিচারিক পরিপক্কতাও কম থাকে।এ সময়ে তাদের যৌন আচরণ পর্যবেক্ষণে বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে।বয়সের দোষ বলে ছাড় দিলে চলবে না।

৫)বিয়ের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হবে এবং
বিয়েকে সহজ করতে হবে।যৌনতা জীবনের অন্যন্য জৈবিক চাহিদার (খাওয়া, পান করা…) মত একটি চাহিদা।যৌন চাহিদা মিটানোর একমাত্র বৈধ ও সুস্থ পথ হলো বিয়ে। এখন বিয়েকে বয়স, সন্তান ধারণ ও আর্থিক সক্ষমতার সাথে শর্তযুক্ত করায় যৌন চাহিদার তুঙ্গে থাকার সময় বিশেষত পুরুষরা বিয়ে করতে পারছে না।ফলে অসুস্থ ও অবৈধ যৌনাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে যা নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

৬)চেষ্টার পরও কামোদ্দীপনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।



ধর্ষণসহ শারীরিক যৌন হয়রানির সিংহভাগই ঘটে থাকে ঘর বা ঘরের কাছাকাছি অংশে।বিভিন্ন জরিপ থেকে জানা যায় ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির প্রায় ৫৫% ক্ষেত্রে নিজ ঘরে সংঘটিত হয়,১২% এরও বেশি ক্ষেত্রে সংঘটিত হয় ধর্ষক ও অন্যন্য পরিচিতজনের ঘরে বা তৎসংলগ্ন এলাকায়।সুতরাং ঘরে নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারলে তাত্বিকভাবে যৌন সহিংসতার ঘটনা কমানো যেতে পারে।এক্ষেত্রে নিন্মোক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে-

১)বাড়িতে বা ঘরে যেন সহজেই কেউ ঢুকতে না পারে সে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।

২)ঘরে নারীর একাকী অবস্থানকালে অন্যন্য পরিচিত পুরুষদের অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে হবে।

৩)কারো বাসায় গেলে নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে এবং ভাই-বোন, পিতা-মাতা বা অতি বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গী হিসাবে সাথে নিতে পারেন।

৪)গ্রামের বাথরুমগুলো অনেকক্ষেত্রেই ঘর থেকে খানিকটা দূরে হয়।বাথরুমে যাওয়ার সময় অবশ্যই কাউকে এসকর্ট বা নিরাপত্তা সঙ্গী হিসাবে নিয়ে যাবেন।গ্রামে ধর্ষণের বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে টয়লেটে যাওয়ার পথে ধর্ষিত হতে।

৫)ছেলে বন্ধু,প্রেমিক,অফিসের বস বা অন্য কারো কথায় কারো বাড়ি বা হোটেল এবং জনশূন্য স্থান বা অফিস রুমে যাবেন না।বিশেষ প্রয়োজনে একজনকে জানিয়ে যান বা খুব কাছাকাছি থাকতে অনুরোধ করুন।

৬)বাড়িতে লোকজন থাকার পরও কেউ আপনাকে একা কোন রুমে নেওয়ার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন চেষ্টা করলে সতর্ক হোন।

৭)আজকাল অনেকের হাতেই মোবাইল আছে।‘আমি বিপদে পড়তে যাচ্ছি’ এরকম একটি মেসেজ স্ট্যান্ডবাই রাখুন এবং বিপদ টের পেলেই তা পাঠিয়ে দিন এমন একজনের কাছে যাকে আপনি বিষয়টা আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছেন এবং যিনি আপনার কাছাকাছি অবস্থান করেন।যদি মেসেজ পাঠাতে না পারেন সেক্ষেত্রে তার নাম্বার দ্রুত ডায়াল করে ফোনটি অন করে রেখে দিন এবং আক্রমণকারীর সাথে জোরে জোরে কথা বলুন এবং আপনার অবস্থান ও পরিস্থিতি বর্ণনা করতে থাকুন।

৮)ডাক্তারের চেম্বারে আপনার শরীর পরীক্ষার (physical examination) সময় আপনার স্বামী বা একজন মহিলা আত্মীয়কে পরীক্ষণকালীন উপস্থিত রাখবেন।চিকিৎসক এ বিষয়ে আপত্তি করলে তা অগ্রাহ্য করুন।তাছাড়া চিকিৎসকের কোন আচরণ আপনার কামোত্তেজনা তৈরির চেষ্টা বলে মনে হলে তাকে সে বিষয়টা জানান।অনেক মেয়ের জীবনের যৌন নিপীড়নের প্রথম অভিজ্ঞতা চিকিৎসকের রুমেই হয়ে থাকে।

৯)ইন্টারপার্সোনাল স্পেস: একজন অন্তরঙ্গ বা স্বল্প পরিচিত কিংবা অপরিচিত ব্যক্তি শরীরের কতটা কাছে আসলে বা দূরত্ব বজায় রাখলে একজন স্বস্তিবোধ করবেন তা নির্ধারণ করে আমাদের ব্রেনের একটি অংশ যা ‘অ্যামিগডালা(amygdala)’ নামে পরিচিত।সম্পর্কের ক্ষেত্রভেদে দু’জন ব্যক্তি পরস্পরের সর্বনিম্ন যে নৈকট্যে অবস্থান করলে অস্বস্তি অনুভূত হয় না তাকেই আন্তঃব্যক্তিক দূরত্ব বা Interpersonal space বলে। আন্তঃব্যক্তিক দূরত্ব বা Interpersonal space শুধুমাত্র সভ্যতার বা ভদ্রতার মাপকাঠিই নয় বরং এটি প্রতিরক্ষামূলকও বটে।সকল শারীরিক যৌন সহিংসতা পার্সোনাল স্পেসে ঢুকেই করা হয় সুতরাং যৌন সহিংসতা রোধে নিজের পার্সোনাল স্পেসের হেফাজত করুন।নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে।



গবেষকদের মতে একজন মানুষের চারপাশে ৪টি Interpersonal space এর স্তর রয়েছে।এগুলো হলো-



১)ঘনিষ্টজনদের স্হান (Intimate space)-একজন মানুষের ত্বক থেকে ১৮ ইঞ্চি বা ৪৬ সেমি ব্যাসব্যাপী স্পেসটুকুকে ঘনিষ্টজনদের স্থান বলা হয়।এ স্থানটুকু কেবল স্বামী/স্ত্রী, সন্তান, অতি নিকট আত্মীয় (যেমন বাবা, মা, আপন ভাইবোন), অত্যন্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু, প্রেমিক/প্রেমিকা ও পোষা প্রাণীর জন্য সংরক্ষিত।

২)ব্যক্তিগত স্থান(Personal space)- Intimate space এর পরবর্তী ৪ফুট বা ১২২সেমি ব্যাসব্যাপী স্থানটুকু ব্যবহৃত হয় অন্যন্য বন্ধুদের সাথে আলাপ করতে,অফিসের কলিগদের সাথে কথা বলতে,পরিচিত গ্রুপের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে বা সাধারণ বন্ধু ও অন্যন্য আত্মীয়দের সাথে ভাব বিনিময় করতে।

৩)সামাজিক স্থান(Social space)- Personal space এর পরিধির বাইরে ৮ফুট ব্যাস অব্দি স্থানটুকুকে সামাজিক স্থান বা Social space বলে।এখানে অবস্থান করবে অপরিচিত সকলে,স্বল্প পরিচিত ব্যক্তিগণ,নতুন কোন গ্রুপ,নতুন বন্ধু….।

৪)পাবলিক স্পেস(Public space)-Social space এর পরিধির বাইরের স্থানটিই পাবলিক স্পেস।এই দূরত্ব বজায় রাখতে হয় ক্লাস নেওয়ার সময় বা লেকচার দেওয়ার সময় বা জনসম্মুখে কোন কাজ বা পারফরম্যান্স দেখাতে।

নারী পুরুষের সৃষ্টি হয়েছে সেক্স ভিত্তিক।স্বাভাবিক সেক্স করতে হলে শরীর স্পর্শ করা লাগবে।আপনি লক্ষ্য করে দেখুন Interpersonal space চার্টে একান্ত ঘনিষ্টজনরা ছাড়া বাকী সকলের স্থান ১৮ ইঞ্চির বাইরে।আর এই ১৮ ইঞ্চি হলো প্রায় এক হাত সমান দূরত্ব।অর্থাৎ ঘনিষ্টজনরা (যাদের সাথে সেক্স করা গ্রহণযোগ্য-স্বামী/স্ত্রী কিংবা সর্ব অবস্থায় নিষিদ্ধ-বাপ/মা/ভাই/বোন অথবা যারা যৌন হয়রানি করবে না এমন আস্থাভাজন-অন্তরঙ্গ বন্ধু/ প্রেমিক/ প্রেমিকা) ছাড়া কেউ আপনার এত কাছে আসতে পারবে না যে হাত প্রসারিত করে আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে।অর্থাৎ যৌন নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আপনাকে এ দূরত্ব বজায় রেখে সমাজে সকলের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে।মনে রাখবেন আপনি যেমন যাকে তাকে আপনার রক্তমাংসের দেহ স্পর্শ করতে দেন না ঠিক তেমনি পার্সোনাল স্পেস হলো আপনার মনোজাগতিক দেহ।এটিও যেন কেউ অযাচিতভাবে স্পর্শ না করতে পারে তা নিশ্চিত করা উচিৎ।

বর্তমান জীবনের বাস্তবতায় এই দূরত্ব মেনে চলবেন কীভাবে?-আধুনিক জীবনের নানা প্রয়োজনে নারীদেরকে ঘরের বাইরে অবস্থান করতে হয়।বাসে, ট্রেনে, পথে, বাজারে, মেলায় সব জায়গায় ভীড়ের মধ্যে এ দূরত্ব বাস্তবতার নিরিখে মেনে চলা সম্ভব নয়।আর সম্ভব হচ্ছে না বলেই যৌন নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা ও ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়গুলো অবলম্বন করা যেতে পারে-

১)এ দূরত্ব (Interpersonal space) রক্ষার কারণ ও প্রযোজনীয়তার বিষয়ে ব্যাপক জন সচেতনতা তৈরি করতে হবে।ট্রাকের মত একটি জড় পদার্থ যদি অ্যাক্সিডেন্ট ঠেকাতে পিছনে “নিরাপদ দূরত্বে থাকুন” বা “১০০হাত দূরে থাকুন” লেখা বহন করে চলে তবে আপনি কেন যৌন সহিংসতার মত ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট ঠেকাতে এটা প্রচার করবেন না এবং আপনার আচরণ ও অভিব্যক্তিতে ফুটিয়ে তুলবেন না?দু’জন মানুষের মাঝে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা যে অতি আবশ্যকীয় ভদ্রতা তা জানা, মানা এবং প্রচার করা খুবই জরুরি।



২)পরিচিত বা অপরিচিত যে কেউ অযাচিতভাবে আপনার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়লে প্রথমেই আপনি এক পা পিছনে সরে যান বা সরে যাওয়ার মত স্থান না থাকলে শরীরটা পিছনে খানিকটা এলিয়ে দিন।এটা তার কাছে নেগেটিভ সিগন্যাল হিসাবে অনুভূত হবে।তারপরেও কাছে আসার চেষ্টা করলে হাত তুলে ইশারায় থামতে বলুন।তাতেও কাজ না হলে সরাসরি মুখে বলুন।




৩)ঘরের ভিতর, অফিসে ও অন্যন্য কম জনসমাগমের এলাকায় যেখানে সর্বনিম্ন দূরত্ব রক্ষা করার মত জায়গা থাকে সেখানে এ রীতি অাপনিও মেনে চলবেন এবং অন্যদেরকেও মেনে চলতে উৎসাহিত করবেন।মনে রাখবেন একজন নারী বা শিশু সবচেয়ে বেশি যৌন সহিংসতার শিকার হন নিকটজন ও পরিচিতজনদের দ্বারাই।বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ধর্ষণের ৭০%-৮৫% ক্ষেত্রে এ কুকর্মটি করে থাকেন স্বয়ং নির্যাতিতার আপনজন ও পরিচিতজনরা।কেউ অযাচিতভাবে আপনার কাছে আসতে চাইলে তাকে সরাসরি না বলুন।জীবনে সফলতার অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক সময়ে দৃঢ়তার সাথে ‘না’ বলার উপর।

৪)হাসি-ঠাট্টা,খেলার ছলে,স্বভাবসুলভভাবে(যেমন হাত ধরে হাঁটা, গায়ে হাত দিয়ে কথা বলা, যখন তখন আহ্লাদে জড়িয়ে ধরা….), অত্যন্ত আপনজন প্রতিপন্ন করতে, সিনিয়র বা মুরুব্বীর মুরুব্বীপনায় অথবা এমনভাব যেন সে ইচ্ছে করে করেনি….এরকম প্রতিটি ক্ষেত্রে পার্সোনাল স্পেস রক্ষায় দৃঢ়তা প্রদর্শন করুন।



৫)ভীড়ের মধ্যে যেখানে এ দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে না সেখানে আপনার আচরণে ও চেহারায় বিরক্তি বা অস্বস্তির ভাব বজায় রাখুন।অপরাধীরা সাধারণত অপকর্ম করার আগে আপনার চেহারার ভাষা বোঝার চেষ্টা করে থাকে।অবস্থা প্রতিকুল মনে করলে মুখে সাহস ফুটিয়ে রাখুন।সম্ভব হলে ‘ভীড়ের মধ্যে নারীর নিরাপত্তা রক্ষায় পার্সোনাল স্পেস রক্ষার গুরুত্ব’ বিষয়ে কড়া আলাপ শুরু করতে পারেন।



৬)ভীড়ের মধ্যে অবস্থান কালে ভুলেও কারোর দিকে বার বার তাকাবেন না।যদি ঘটনাক্রমে চোখ পড়ে যায় সেক্ষেত্রে চেহারায় বিরক্তির ছাপ বজায় রাখুন।

৭)ভীড়ের মধ্যে সতর্ক খেয়াল রাখুন কেউ বার বার স্থান পরিবর্তন করে আপনার কাছে আসার চেষ্টা করছে কি না।

৮)কথা বলতে বলতে কেউ আপনার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়লে এবং তাকে কায়দা করে বোঝানো সম্ভব না হলে এবং তাকে সরাসরি না বলতে কোন দ্বিধা কাজ করলে তার সাথে হেঁটে কথা বলা শুরু করুন এবং দূরত্ব বজায় রাখুন।অথবা কোন জিনিস আনার কথা বলে দূরে সরে যেতে পারেন কিংবা মোবাইলে গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ করার অজুহাতে ব্যস্ত হতে পারেন।

৯)ভীড়ের মধ্যে কেউ গায়ে হাত দিলে বা আপনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে (গবেষকদের মতে কারো দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তার ত্বক স্পর্শ করার সমতুল্য) তাৎক্ষণিকভাবে চ্যালেঞ্জ করুন। কারণ আপনার এই সচেতন আচরণ অনেক অপরাধীকেই সতর্ক করবে এবং অন্য আরেকটি মেয়েকে যৌন হয়রানি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।সামাজিকভাবে যত এদের আচরণের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ বা প্রতিহত করা হবে ততই তাদের ব্রেন এ ধরনের কাজ করার ক্ষেত্রে Inhibitory impulse তৈরি করবে এবং অপরাধ সংঘটনে বাঁধা সৃষ্টি করবে।

১০)ভীড়ের মধ্যে সম্ভব হলে পরিচিত গ্রুপের সাথে চলাফেরা করুন।

১১)প্রেমিক প্রেমিকাদের ক্ষেত্রে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত পার্সোনাল স্পেস অতিক্রম না করাই সর্বোত্তম।তবে সঙ্গীর কমিটমেন্টে আপনি পূর্ণমাত্রায় আস্থাশীল হলে সেক্ষেত্রে ইন্টিমেট স্পেসে তাকে যায়গা দেওয়া যেতে পারে;তবে আপনি সবসময়ই তাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন আপনার অনুমতি ছাড়া আপনার সাথে কোন ধরনের যৌনকর্মে যেন লিপ্ত না হয় এবং সতর্ক থাকবেন।

১২)চিকিৎসকের চেম্বারে আপনার শরীর পরীক্ষার (physical examination) সময় পার্সোনাল স্পেস বজায় থাকে না যৌক্তিক কারণেই।এসময় চিকিৎসক একজন নার্সের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করবেন এটাই নিয়ম।যেহেতু তা করা সম্ভব হয় না সেক্ষেত্রে আপনার স্বামী বা একজন মহিলা আত্মীয়কে পরীক্ষণকালীন উপস্থিত রাখবেন।চিকিৎসক এ বিষয়ে আপত্তি করলে তা অগ্রাহ্য করুন।তাছাড়া চিকিৎসকের কোন আচরণ আপনার কামোত্তেজনা তৈরির চেষ্টা বলে মনে হলে তাকে সে বিষয়টা জানান।অনেক মেয়ের জীবনের যৌন নিপীড়নের প্রথম ঘটনা চিকিৎসকের হাতেই হয়ে থাকে।

১৩)শিশু যতই ছোট হোক তার ক্ষেত্রেও পার্সেনাল স্পেস বজায় রাখার প্রয়োজন আছে।ছোটকাল থেকেই শিশুকে পার্সোনাল স্পেস বজায় রাখা যে একটি আবশ্যকীয় ভদ্রতা সেটা শিক্ষা দিন।ছোটকালের শিক্ষার প্রভাব সারাজীবনব্যাপী কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।একই সাথে কেউ তার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়লে কীভাবে তা সামলাবে তারও শিক্ষা দিন।





প্রত্যেক যৌন অপরাধী এবং ভিক্টিম কোন না কোন পরিবারের সদস্য।সুতরাং যৌন অপরাধ দমনে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।অভিভাবকদের যা করা উচিৎ-

১)সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া- প্রত্যেক সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া যৌন সহিংসতা রোধের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।আর এই নৈতিক শিক্ষাদানটা মৌখিক না হয়ে ব্যবহারিক হতে হবে।সন্তানরা শুধু আদেশ-নিষেধ থেকে শিখে না;তাদের শিক্ষলাভের গুরুত্বপূর্ণ উপায় পর‌্যবেক্ষণ, অনুসরণ ও অনুকরণ। সুতরাং আপনি/আপনারা নিজেরা উন্নত নৈতিকতা চর্চা করুন এবং সন্তানদেরকে সেটা শিখান।বাবা-মা’র উন্নত নৈতিক চর্চা সন্তানকে শক্ত নৈতিকতার ভিতে দাঁড়াতে প্রভূত সাহায্য করে।

বিশেষত আপনার পুরুষ শিশুটিকে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই মেয়েদের কীভাবে শ্রদ্ধা করতে হয় তার পরিপূর্ণ শিক্ষা দিন। গবেষণায় দেখা গেছে পুরুষদের ইরোটিক প্লাস্টিসিটি (যৌনতা পরিমিতকরণে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব) বয়ঃসন্ধির পূর্বেই সবচেয়ে বেশি থাকে।এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথাটি আবারো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি-
“Responsible sexual behaviour, sensitivity and equity in gender relations, particularly when instilled during the formative years, enhance and promote respectful and harmonious partnerships between men and women." অর্থাৎ “দায়িত্বশীল যৌন আচরণ এবং লিঙ্গিক সম্পর্কের সমতা ও সংবেদনশীলতার বিষয়াদি যদি উঠতি বয়সে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেটা নারী ও পুরুষের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি ও বর্ধন করে।”

২)লিঙ্গ বৈষম্য না করা-ধর্ষণের প্রধান কারণ নারীকে বশে রাখা বা অধীনস্ত করে রাখা বা তাকে অবমূল্যায়িত করা বা তাকে নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।সেজন্য যে সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য বেশি সেখানে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সকল যৌন সহিংসতা বেশি।আর লিঙ্গিক সমতা ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তি তৈরি করার প্রাইমারি স্কুল হলো পরিবার।

৩)পারিবারিক অশান্তি ও সহিংসতা না করা- পারিবারিক সহিংসতা, শিশুদের শারীরিক নির্যাতন ও কঠোর পিতৃতান্ত্রিকতা এবং বাবা-মা’র স্নেহবঞ্চিত শিশুদের তুলনামূলক অধিক যৌন সহিংসতার শিকার হতে দেখা যায় এবং বড় হয়ে এদের কেউ কেউ নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন করার প্রবণতা দেখায়।

৪)সন্তানের অপরাধ প্রবণতাকে উপেক্ষা করা বা প্রশ্রয় না দেওয়া- এক সময় যৌথ পরিবারের অন্যন্য সদস্যরা এবং পাড়া প্রতিবেশিরা আরেকজনের সন্তানকে পর‌্যবেক্ষণে রাখতেন এবং শাসন করতেন।এখন সে পরিস্থিতি অনেকটাই অনুপস্থিত।বরং এখন কেউ কারো সন্তানের নামে কমপ্লেইন করলে সে সন্তানের বাবা-মা ‘আমার ছেলে/মেয়ে ভালো’, ‘বয়সের দোষ’, ‘এ বয়সে এরকম আমি-আপনিও করেছি’ এমন কি ‘আমার ছেলে/মেয়ের নামে কমপ্লেইন করলে এলাকা ছাড়া করে দেব’ বলে ভাবে ডুবে এবং সন্তানকেও ডুবায়।আবার কোন কোন সময় বাপে শাসন করলে মা প্রশ্রয় দেয় আবার মা শাসন করলে বাপে প্রশ্রয় দেয়।এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া খুব জরুরি।

৫)বাইরের পরিবেশে সন্তানের কাজকর্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা-আপনার সন্তান ঘরের বাইরে কার সাথে মেলামেশা করে, কি কাজ করে, কোথায় যায় এসব বিষয়ে সচেতন থাকা খুব জরুরি।অথচ অভিভাবকদের উদাসীনতায় অনেকসময় সন্তান বিপথে বা বিপথগামীদের সাথে চলে যায়।

৬)ইন্টারনেটে সন্তানের কার‌্যাবলী পর‌্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা- পর্ণগ্রাফি, ফোন সেক্স, সেক্স টেক্সট, অপরিণত বয়সে প্রণয়, সাইবার বুলিং (আন্তর্জালিক উৎপীড়ন) ইত্যাদিতে আপনার সন্তান জড়িয়ে পড়েছে বা পড়ছে কিনা তা নজরদারিতে রাখুন।এসবের ব্যাপ্তি ও কুফল নিয়ে পরিবারে আলোচনা করুন।

৭)ঘরে ও ঘরের বাইরে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- যৌন সহিংসতার সিংহভাগই ঘটে ঘরে বা ঘরের আশেপাশের এলাকায়।সুতরাং আপনার ঘরের সন্তান ও নারী সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করুন।পার্সোনাল স্পেসের গুরুত্ব, আন্ত:ব্যক্তিক আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ এবং যৌন উৎপীড়কদের আচরণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিন।পরিবারের সদস্যদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখায় উৎসাহ দিন।পরিবারের কোন সদস্য নিপীড়নের সম্মুঙ্খীন হলে বা নিপীড়িত হলে সে যেন অভিভাবকদের তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারে সেরকম আস্থার যায়গা তৈরি করে রাখুন।

৮)যৌন সহিংসতার বিষয়ে পারিবারিক আলোচনা- যৌন সহিংসতার ধরন ও পরিসীমা এবং এটা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে পরিবারের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা করুন।

৯)মনোবিদদের সাহায্য নিন-যদি আপনি আপনার সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝে অপরাধমূলক বা সাধারণ বিচারে অগ্রহণযোগ্য আচরণ দেখেন এবং আপনার সঠিক অভিভাবকত্ব যদি তাকে সে অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারে কিংবা কোন মানসিক রোগে ভূগছে বলে মনে করেন সেক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে পরামর্শ করুন।



মানুষ সামাজিক জীব এবং সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে।কাজেই যৌন সহিংসতা রোধে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে এবং সমাজকে সেটা প্রদর্শন করতে হবে।এ সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো-

যৌন সহিংসতাবিরোধী ক্লাব গঠনঃযৌন সহিংসতা মূলত একটি সামাজিক সমস্যা।তাই এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।এ জন্য সমাজে শক্ত সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান দরকার।এ উদ্দেশ্যে প্রতিটি সেকেন্ডারি স্কুল,কলেজ,ভাসির্টি ও মাদ্রাসায় ‘নির্যাতন বিরোধী’ ক্লাব গঠন করা দরকার।এ ধরনের প্রতিটি ক্লাব থেকে সদস্য নিয়ে উপজেলা কমিটি গঠন করতে হবে।ঠিক একইভাবে জেলা কমিটি,বিভাগীয় কমিটি ও জাতীয় কমিটি গঠন করতে হবে।এ ধরনের একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করা গেলে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা বহুলাংশে কমানো সম্ভব হতে পারে।আর এর জন্য শুধু সদিচ্ছা ও উদ্যোগ দরকার।এ ধরনের ক্লাবগুলোর কার্যক্রমের কিছু ধারণা দেওয়া হলো-

১)গ্রুপ আলোচনা-প্রান্তিক স্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাবগুলো নিজেদের মধ্যে যৌন সহিংসতার কারণ, করণীয়, আত্মরক্ষার কৌশল, ইভটিজারদের তালিকা তৈরি, নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্যাতিতদের তালিকা তৈরি,যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় কৌশলের বিষয়ে আলাপ করবে।বাসা থেকে স্কুল পর্যন্ত নিরাপদ চলাচলের জন্য গ্রুপে চলাচলের ব্যবস্থা করতে পারে।

২)প্রতিবাদ কর্মসূচী-প্রতিটি স্কুলের সামনে যৌন সহিংসতা বিরোধী পোস্টার ও ব্যানার লাগিয়ে রাখতে পারে।প্রতিমাসে ১বার নিজ স্কুলের সামনে যৌন সহিংসতা বিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করা খুবই জরুরী।বছরে মাত্র ১২দিনের এ প্রতিবাদ অনেক অপরাধীকে সতর্ক বার্তা দেবে ও নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েরা সাহস সঞ্চয় করবে।

৩)গণসংযোগ-এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।প্রতি মাসের প্রতিবাদ কর্মসূচীতে গণসংযোগকে যুক্ত করা যেতে পারে।স্কুলের সামনের দোকানপাট (যেখানে বখাটেদের সবচেয়ে বেশি অবস্থান লক্ষ্য করা যায়), মসজিদের ইমাম, ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, থানার ওসি সহ অন্যন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে মত বিনিময় খুবই কার্যকর হতে পারে।

৪)প্রচার-ক্লাবগুলোর কার্যক্রম,সফলতার চিত্র,সমস্যা ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ধরা যাতে সবাই এ কর্মসূচীগুলো সম্পর্কে জানতে পারে এবং সম্পৃক্ত হতে পারে।

অপরাধীর বিষয়ে সমাজের সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক হওয়াঃযৌন সহিংসতাকারী যে দলের হোক, মতের হোক, ধর্মের হোক, সামাজিক মর্যাদার হোক তার ব্যাপারে সমাজের সকলের দৃষ্টিভঙ্গি এক হওয়া খুবই জরুরি।কারণ সমাজে মতভেদ থাকলে অপরাধী সহজেই বিচারের আওতার বাইরে থাকতে পারে এবং অন্যন্যরাও অপরাধ করতে উৎসাহিত হতে পারে।নির্যাতিতাও আশাহত হয়ে বিচারপ্রার্থী না হওয়ায় অপরাধীরাও একই অপরাধ বার বার করতে দ্বিধাহীন থাকে।

নারী যৌন নির্যাতনের অনেক কারণ থাকতে পারে;এমনকি মেয়েটির আচরণ বা নির্বুদ্ধিতাও কারণ হতে পারে কিন্তু কোন নারী নির্যাতিত হলে একটাই লক্ষ্য হতে হবে তা হলো অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।অপরাধের কারণ নিয়ে কাজ করবে সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।কিন্তু আমাদের সমাজে একটা প্রবণতা দেখা যায় নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার কোন ঘটনা ঘটলেই একদল মানুষ উঠেপড়ে লাগে মেয়েটির দোষ খুঁজতে।কেন আধুনিক পোশাক পরেছিলো, ভীড়ের মধ্যে কেন গেল, ছেলেদের সাথে এত ঢলাঢলি কেন করত, পর্দা করে নাই কেন, ধর্মীয় আচরণ মেনে চলে নাই কেন, এ মেয়ের জন্য সমাজে মুখ দেখাব কেমনে ইত্যাদি।এতে নির্যাতিতা মেয়েটির কষ্টের মাত্রা অনেকগুণ বেড়ে যায় (কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে ফেলে) আর অপরাধের গুরুত্ব হালকা হয়ে যায় যা অপরাধীকে সুবিধা দেয় ও পরোক্ষভাবে উৎসাহ প্রদান করে।সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে হবে।

পুরুষতান্ত্রিকতা ও লিঙ্গিক বৈষম্য দূর করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে- পুরুষশাসিত সমাজ হওয়ায় যৌন অপরাধ করার পরও একজন পুরুষ নানা সুবিধা পেয়ে থাকে এবং নিজ অপরাধের দায়-দায়িত্ব নির্যাতিতার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে আইনের চেয়ে সামাজিক উদ্যোগ অধিক ফলদায়ক হতে পারে।

তবে পুরুষতান্ত্রিকতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে ধৈর্য্যশীল হোন।সমাজের যে কোন পরিবর্তন ধীর ও কৌশলগত না হলে সেটা চরম বিশৃংঙ্খলার সৃষ্টি করে।বর্তমানে কিছু উস্কানিদাতা নারীদের সরাসরি পুরুষতান্ত্রিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে রাতারাতি নারী পুরুষের সম অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্ররোচিত করছে।এদের প্ররোচনায় অনেক নারী আজ এ কাজ করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন।পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষরা যখন “Crisis of masculine identity”-তে ভুগতে থাকে তখন তারা নারীদের বশে রাখতে সৃষ্টিকালের শুরু থেকেই ধর্ষণকে মোক্ষম অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছেন।সুতরাং সমাজে নারী পুরুষের সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন সহ অবস্থানের জন্য নারীদের ধৈর্য্য ও কৌশলী হয়ে ধীরে ধীরে এগুনো উচিৎ এবং পুরুষদেরও পরিবর্তনের এ হাওয়াকে মানব সভ্যতার মঙ্গলার্থে মেনে নেওয়া উচিৎ।মনে রাখবেন গায়ের জোর নয় বরং কৌশলই দূর্বলদের সবলের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে।

সামাজিক বিশৃংখলা রোধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে- ১৮৯৩ সালে ফরাসি সমাজ বিজ্ঞানী এমিলি ডার্কহেইম দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থায় অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সামাজিক কারণ হিসাবে THEORY OF ANOMIE (a="without", and nomos="law") তত্ত্বটি দেন যা সারাবিশ্বে আজও সমাদৃত।ডার্কহেইমের মতে যখন কোন সমাজ তার প্রথাগত আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে উন্নত ও আধুনিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার দিকে দ্রুত ধাবিত হয় তখন প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থার নিয়মকানুন, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যন্য বিশ্বাস ও রীতিনীতি চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।আবার আধুনিক সমাজ থেকে অর্জিত নিয়ম-কানুন, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অন্যন্য বিশ্বাস ও রীতিনীতিও পুরোনো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সমভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে প্রগতিশীলরা।ফলে সমাজে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়; তৈরি হয় নানা নতুন নতুন মতের ও পথের মানুষ।এতদিন যে রীতিনীতি মেনে সমাজ একটি কাঠামোর মধ্যে স্থিতিশীল ছিলো তা ভেঙ্গে বের হওয়ার কারণে সমাজে আপাত একটি হ য র ব ল অবস্থা তথা সামাজিক বিধি-বিধানের প্রয়োগ ও পালনে এক ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়।এমত অবস্থায় একদল শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আর আরেকদল আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার নানা উপাদানকে প্রতিষ্ঠিত করতে একে অপরের উপর জোর করে নিজের মত চাপাতে গিয়ে নানা ধরনের অপরাধের জন্ম দেয়।সরলভাবে এটাই হলো ‘Anomie’ তত্ত্ব যা প্রতিটি পরিবর্তনশীল সমাজে দেখা যায়।যেহেতু নারীরা সমাজের একটি বিরাট অংশ সুতরাং তাদেরকে ঘিরেও সংঘটিত হয় নানা অপরাধ যার মধ্যে যৌন অপরাধের মাত্রা অনেক বেশি থাকে।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ-

১)পুরুষতান্ত্রিকতার উন্মত্ততা কমিয়ে আনতে হবে।

২)আর্থিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

৩)সকল ধরনের সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

৪)পরিবর্তনের গতি ধীর ও টেকসই করতে কৌশলী হতে হবে।

পারিবারিক সহিংসতা রোধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে- পারিবারিক সহিংসতা, শিশুদের শারীরিক নির্যাতন ও কঠোর পিতৃতান্ত্রিকতা এবং বাবা-মা’র স্নেহবঞ্চিত শিশুদের যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া এবং বড় হয়ে নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।এসব বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।মাত্র কয়েকদিন আগে এক পিতা তার দু নাবালক কন্যার একজনকে কাজে না যাওয়ার জন্য এতটাই বকাঝকা করেছেন যে তারা কাজ শেষে ভয়ে বাড়ি না ফিরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে।পরে এলাকার একটি বাড়ির কেয়ারটেকার মুরব্বী তাদের স্নেহাবিষ্ট করে তার ঘরে নিয়ে যায় এবং রাতে দু’বোনকেই ধর্ষণ করে।

যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে-আমাদের সমাজ যৌন সহিংসতার শিকার নারীর প্রতি অনেকসময় নির্মমতা প্রদর্শন করে।তাকে কটাক্ষ করা, তার দোষত্রুটি খুঁজে বের করা, ভিক্টিমের বাবা-মাকে অপমান করা এগুলো আমাদের সমাজের সাধারণ চিত্র।শুধু সামাজিক ভয়েই অধিকাংশ যৌন সহিংসতার কেস রিপোর্টেড হয় না।আবার সামাজিক মরর‌্য্যাদাহানির ভয় দেখিয়েই অনেক সময় যৌন নির‌্যাতন করা হয়।সুতরাং এসব ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সহানুভূতিশীল ও সহায়ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিয়েকে সহজ করাঃ একটি ছেলে বা মেয়ে বয়ঃসন্ধিকালেই যৌনতা অনুভব করা শুরু করেন।এসময় প্রচুর পরিমাণে সেক্স হরমোন নিঃসৃত হয়।টেসটসটেরনের জন্যই ছেলেরা আক্রমণাত্মক (aggressive) ও যৌন তাড়িত হয়।এসময় তারা হস্তমৈথুনের মাধ্যমের তা নিবৃত করে।যেহেতু পুরুষদের যৌনতায় নারীদেহের প্রচ্ছন্ন প্রাধান্য রয়েছে তাই তারা নারীদেহের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে বা হয়।কিন্তু আমাদের দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতাসহ নানা কারণে ছেলেদের পক্ষে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে পরবর্তী ১৫-২০ বছর পর্যন্ত সুস্থ যৌন চর্চার জন্য বিয়ে করা সম্ভব হয় না।এ সময়টা পুরুষদের অস্বাভাবিক বা অবৈধ যৌনাচারসহ যৌন সহিংসতার বাস্তব ঝুঁকি বহন করে।কিন্তু বাংলাদেশে অনেকেই (ছেলেমেয়ে উভয়ই) বিয়ে করতে পারছেন না বিয়ের খরচ বহন করতে না পারার কারণে। আনুষ্ঠানিকতার নামে বিয়ের এই অনাবশ্যক অংশকে প্রতিহত করা গেলে অনেকের পক্ষেই বিয়ে করা সম্ভব হতে পারে।আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে-

১)ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা।

২)এনগেজমেন্ট, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাত, ফিরানি ইত্যাদি অনুষ্ঠান আয়োজন না করা।

৩)মোহরানা নির্ধারণে পাত্রের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া এবং মোহরানার সাথে সামাজিক মর্যাদা (অমুক ৫লক্ষ টাকার মোহরানায় বিয়ে করেছে কাজেই তুমি ৭লক্ষ টাকা না দিলে ইজ্জত থাকবে না) ও নারীর ভবিষ্যতের বিষয়কে সম্পৃক্ত না করা।

৪)কাজী অফিসের পরিবর্তে ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয় বা ইউনিয়ন পরিষদে বিনামূল্যে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা।

৫)যৌতুকের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া।একই সাথে সোনা-দানা, দামী কাপড়-চোপড় ইত্যাদি পরিহারযোগ্য বিষয়কে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বাদ দেওয়া।

আর এই বিষয়গুলো আইন করে কার্যকর করা সম্ভব নয় বিধায় সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।



রাষ্ট্র তার জনগনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।রাষ্ট্র যখন যৌন সহিংসতার কারণগুলো অনুধাবনে কিংবা প্রতিরোধ বা প্রতিকারে দৃশ্যমানভাবে ব্যর্থ হয় তখনই যৌন সহিংসতা মহামারীর দিকে ধাবিত হয়।সুতরাং সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসাবে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। যৌন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের কিছু অবশ্য করণীয় সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

সম্ভাব্য যৌন অপরাধীদের চিহ্নিত এবং নিষ্ক্রিয় করতে হবে-মানসিক সমস্যা বা রোগের কারণেই ৫০ লক্ষাধিক যৌন উৎপীড়ক রয়েছে এদেশে।এদেরকে চিহ্নিত করা ও তাদেরকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে পর‌্যবেক্ষণে রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করাঃনারী পুরুষের জেন্ডার বৈষম্য ও ধনী-গরীবের অর্থনৈতিক বৈষম্য বিষয়গুলো সমাজে বিশৃংঙ্খলা তৈরি করে আর অ্যানোমি তত্ব অনুসারে সামাজিক বিশৃংঙ্খলা যৌন সহিংসতার ঘটনা বাড়ায়।The United Nations Multicountry Study on Men and Violence থেকে জানা যায় বাংলাদেশে গ্রামের ৮২% ও শহরের ৭৯% পুরুষ ধর্ষণের কারণ হিসাবে মেয়েটিকে বশে রাখা, বাগে আনা বা অধিকারভূক্ত করাকে (Entitlement) উল্লেখ করেছেন।আর্থ সামাজিক বৈষম্য দূর করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করা-বিচারহীনতার সংস্কৃতির সমাজ অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসাবে কাজ করে।আমাদের দেশে ৯৫% এরও বেশি ক্ষেত্রে যৌন অপরাধীকে আইনি পরিণতি ভোগ করতে হয় না।এ বিষয়ে সরকার ও সমাজের অন্যন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও মানবিক আচরণ করতে হবে এবং দক্ষতা অর্জনপূর্বক দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী সাপোর্ট দিতে হবে-যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ভয়াবহ এক মানসিক বিপর‌্যয়ের মধ্য দিয়ে সময় কাটায়।অনেকের ক্ষেত্রে সেটা জীবনব্যাপী কুপ্রভাব ফেলে।কেউ কেউ পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভোগেন।এছাড়া বিষণ্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদিও দেখা দেয়।অনেকে সামাজিক এমনকি পারিবারিকভাবেও নিগৃহীত হন।এছাড়াও ছোটবেলায় ধর্ষিতা নারী শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ধর্ষিত হওয়ার হারও বেশ উচ্চ প্রায় ৩৫%।আবার অনেক ছেলে শিশু যৌন নির্াতনের শিকার হয়ে বড় হয়ে তারাই যৌন সহিংসতা ঘটায়।সার্বিক বিবেচনায় যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির দীর্ঘ মেয়াদে কাউন্সেলিং দরকার যেটা নিশ্চিত করতে রাষ্টকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।

রাজনীতিতে পেশী শক্তি নিষ্ক্রিয় করতে হবে- পেশী শক্তি প্রদর্শন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।আর এর জন্য গড়ে উঠেছে ক্যাডার বাহিনী।অমিত সাহসী ও পেশী শক্তি প্রদর্শনে সিদ্ধহস্ত অপরাধপ্রবণ দুই ব্যক্তিত্বের ( অ্যান্টিসোস্যাল ও বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার) অনেকেরই ঠাঁই হয় এসব স্থানে।রাজনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এরা অনেকেই নির্ভীকচিত্তে যৌন সহিংসতাসহ নানাবিধ অপরাধ করে থাকে বড় ব্যাপ্তীতে।জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে এ ধরনের পেশী শক্তির লালন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

পিংক প্রিভিলেজ সার্ভিস প্রবর্তন করা দরকার: গোলাপী (Pink) রঙ নারীবান্ধব হিসাবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে নিম্নোক্ত সুবিধাগুলো সংযোজন করতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে-

১)পিংক ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস-শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা যেখানে ড্রাইভার,হেল্পার ও কন্ডাকটর সবাই মহিলা হবেন।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সার্ভিসের সুবিধা পাওয়া গেছে।পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত-পাকিস্তানেও এ ধরনের সার্ভিস চালু করেছে।

২)পিংক পুলিশ স্টেশন-নারী নির্যাতিত হওয়ার পর থানায় গিয়ে আইনী সহায়তা না নিতে যাওয়ার অন্যতম কারণ পুরুষ পুলিশের কাছে বর্ণনা দিতে বিব্রত বোধ করা।প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় একটি করে পিংক পুলিশ স্টেশন স্থাপন করা যেখানে সকল পুলিশ কর্তা ও কর্মচারী মহিলা হবেন।এ ধরনের পরিবেশে ভিকটিম তথ্য দিতে ও আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহ বোধ করবেন বলে আশা করা যায়।

৩)পিংক মেডিক্যাল সার্ভিস-যৌন নির্যাতনের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা ফরেনসিক টেস্ট করতে হয়।এ কাজটি অল উইমেন সেন্টারের মাধ্যমে করালে নির্যাতিতা নারীরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার পাশাপাশি আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হবে বলে আশা করা যায়।

৪)পিংক বিচারিক আদালত-আইন পেশায় বাংলাদেশী নারীদের অংশগ্রহণ রীতিমত ঈর্ষণীয়।অল উইমেন ক্যামেরা ট্রায়াল করার ব্যবস্থা করা গেলে অনেক নির্যাতিতা নারী আইনী সহায়তা নিতে আগ্রহী হবেন।

ইমার্জেন্সি রেসপন্স সেন্টার স্থাপনঃ যখন কেউ যৌন সহিংসতার সম্মুখীন হয় তখন তার পক্ষে অধিকাংশ সময়ই ৯৯৯ এ কল করা সম্ভব হয় না।সরকারের উচিৎ এমন একটি অ্যাপ ডেভেলপ করা যেখানে প্রিসেট এসওএস ম্যাসেজ রিসিভ করতে পারবে এবং ম্যাসেজ প্রেরকের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারবে।একই সাথে সেটি যেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট রেসকিউ বার্তা প্রেরণ করতে পারে।আর এই অ্যাপটিতে মেসেজ পাঠানোর জন্য একটি সহজ ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করা দরকার (হতে পারে সেটা লকেট, আংটি বা চাবির বিং, কানের দুল, হেয়ার ব্যান্ড... আকারে) যাতে ভিকটিম পরপর ২বার চাপ দিলেই প্রিসেট এসওএস বার্তা ইমার্জেন্সি রেসপন্স সেন্টারে পৌঁছে যাবে।

যৌনতা ও যৌন সহিংসতা এবং আত্মরক্ষার কৌশল পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে- এসব বিষয়গুলো ছাত্রছাত্রীদের জানানো যৌন সহিংসতা রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।এছাড়া আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো অন্যন্য অপরাধ কমাতেও সাহায্য করতে পারে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে মার্শাল আর্ট শেখার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

মাদক,যৌন উত্তেজক এবং পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে- ইয়াবা, আইস এর মত উত্তেজক মাদক এবং নানা ধরনের যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট আমাদের দেশে সহজলভ্য।এগুলো যৌন সহিংসতার রিস্ক ফ্যাক্টর।এছাড়া পর্ণোগ্রাফির সাথে নারীর অবজেক্টিফিকেসন এবং ডিহিউম্যানাইজেসন জড়িত যেগুলো যৌন সহিংসতার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।এসব উপাদান নিয়ন্ত্রণে আরও ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ দরকার।

জরুরি অবস্থা জারি করাঃ যৌন সহিংসতার সাথে মানসিক রোগ ও দারিদ্রতা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।করোনাকালে মানসিক রোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে আর দারিদ্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।আর তাই বিশ্বব্যাপী যৌন সহিংসতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

১৯শে জুন ২০২০ এ ইউএন নিউজের হেডলাইনটা দেখুন-



এবার হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রকাশনার হেডলাইন নিউজটা দেখুন-



আগামী নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ শীতকালে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।এমতবস্থায় যৌন সহিংসতা আরও ভয়াবহ আকার ধারন করতে পারে।বাস্তবতা উপলব্ধি করে এ বছরেই নাইজেরিয়া জুন মাসে এবং লাইবেরিয়া সেপ্টেম্বর মাসে যৌন সহিংসতা বিশেষত ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি অবস্থা জারি করেছে।






বাংলাদেশেও নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।সামাজিক আন্দোলনের মুখে সরকার তড়িঘড়ি করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নির্ধারণ করেছেন।তারপরেও যৌন সহিংসতার ঘটনা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।এমতবস্থায় যৌন সহিংসতা রোধে জরুরি অবস্থা জারি করা এখন সময়ের দাবি।অন্যথায় বড় ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার আশংকা রয়েছে।



আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে দুটো প্রচেষ্টা থাকতে হবে- ১)যৌন সহিংসতা ঠেকানো ২)জীবন বাঁচানো

আতঙ্কিত না হয়ে কৌশলী হউনঃ আপনি যদি যৌন সহিংসতার সম্মুখীন হন সেক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে বরং কৌশলী হলে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ হতে পারে।বিপদের সময় যথাসম্ভব মাথা ঠান্ডা রাখুন এবং পরিস্থিতি সাপেক্ষে প্রতিকার বা প্রতিরোধের কৌশল নির্ধারণ করুন।

অ্যাড্রেনালিন রাশ কমানঃ ধর্ষণের সময় ধর্ষকের শরীরে প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন ও নর অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয় যা তাকে উত্তেজিত,অস্থির ও শক্তি প্রদান করে।কেন সে আপনার সাথে এরূপ আচরণ করছে তা জানতে চেয়ে অালাপ শুরু করুন।এসময় আপনি তার সাথে কোমল ব্যবহার করে শান্ত করার চেষ্টা করুন।অনুরোধ করুন। ধর্ষণের পরে আপনার কী কী কষ্ট ও সমস্যা হতে পারে তা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করুন।কৌশলের অংশ হিসাবে বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে বলুন কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যেতে পারেন।এখানে একটা কথা বলা ভালো পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিয়ের সম্মতি দিলে সেটা সম্মতি হিসাবে গ্রাহ্য হয় না বরং এ অবস্থায় বিয়ে করলে তা যৌন সহিংসতা হিসাবে গণ্য হবে।ধর্ষকের অ্যাড্রেনালিন রাশ কমাতে পারলে ধর্ষণ ঠেকানো যেতে পারে।

জীবন বাঁচানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন- আক্রমণকারী শুধু আক্রমণাত্মকই থাকে না বরং তার মাঝে ধরা পড়ার ভয়ও কাজ করতে পারে।এমত অবস্থায় তার সাথে উদ্ধত আচরণ কিংবা হুমকি প্রদান আপনার জন্য মৃত্যুঝুঁকি বহন করে।যদিও আক্রমণকারী ৯০% ক্ষেত্রে একাই থাকে এবং ৯০% ক্ষেত্রে পরিচিতজনদের দ্বারাই কুকর্মটি সম্পন্ন হয় তারপরেও মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে।পরিচিতজননা ধরা পড়া ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়েই অনেক সময় ধর্ষণ পরবর্তী খুন করে থাকে।

কিন্তু আপনি যদি নিশ্চিত হয়ে যান যে আপনার উপর নির্যাতন অত্যাসন্ন সেক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্য নিন্মোক্ত ব্যবস্থাগুলো নিন-



চোখে আক্রমণ করুনঃচোখে চাপ প্রয়োগ করলে বেশ ব্যাথা হয় এবং চোখের চারপাশের চামড়াও খুব সেনসিটিভ। চিত্রের মত আক্রমণকারীর চোখ দু হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরুন এবং পিছনের দিকে হেলিয়ে দিন।প্রচন্ড ব্যাথায় কাতর হয়ে পিছনে হেলে পড়ে যাবে।ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাবার সময় পুংলিঙ্গে কষে লাথি মারুন।অন্তত এবারের জন্য বেঁচে গেলেন।



থুতনি ও নাকে আঘাত করুনঃথুতনি ও নাকে নিচ থেকে উপরের দিকে আঘাত করলে মাথা ঘুরে বা দূর্বল হয়ে পড়ে যায় বা নাক দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে।এসময় প্রচন্ড মাথা ঝিমঝিম করায় আক্রমণকারী একেবারে কাবু হয়ে যেতে পারে।কেউ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলে কনুই দিয়ে পিছনের দিকে সজোরে আঘাত করে তা করতে পারেন।আর সামনে থেকে আক্রমণ করলে সোজা চিত্রের ন্যায় মাথা দিয়ে সমস্ত শক্তি প্রয়োগে থুতনিতে হিট করুন অথবা হাতের তালুর নিচের অংশ দিয়ে থুতনি ও নাক বরাবর পাঞ্চ করুন।



কানে জোরে থাপ্পড় মারুনঃকানের পর্দা খুবই সেনসিটিভ।হাতের তালু সামান্য একটু গোল করে (cupped hand) করে সজোরে কানের উপর আঘাত করুন।একটা সঠিক শক্ত আঘাতেই কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে এবং ব্যাথার সাথে সাথে প্রচন্ড মাথা ঘোরানোর কারণে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে পারে।কানের পর্দা না ফাটলেও পর্দায় প্রচন্ড চাপ লাগার কারণে ব্যাথা, মাথা ঝিমঝিম করা ও মাথা ঘোরানোর কারণে আক্রমণকারী সহজেই ঘায়েল হয়ে যেতে পারে।



লিঙ্গে আঘাত করুনঃসবচেয়ে সহজ কৌশল এটি।অনেক মেয়েই এটা জানে ও মানে।আমার এক পরিচিত অপরূপার কেস হিস্ট্রি নেওয়ার সময় তার এই পদ্ধতির প্রায় শতভাগ সাফল্যের কথা জানতে পারি।মেয়েটি অনিন্দ্য সুন্দর ও একটু বেশি আধুনিকা এবং হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটির রোগী হওয়ায় অনেক পুরুষের সাথেই ছেনালিপনা করত এবং প্রায়ই যৌন সহিংসতার সম্মুখীন হতো।প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে আক্রমণকারীকে বাঁধা দেয়া বা চিৎকার না করে অনুরোধের ভঙ্গিতে তার কাছাকাছি গিয়ে অথবা পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলে সম্মতিজ্ঞাপনের মত ভান করে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা লিঙ্গ বরাবর কষে লাথি মারত।তার লাথি এতটাই নিঁখুত ছিল যে এক লাথিতেই সবাইকে কাবু করতে পারত (নিয়মিত প্র্যাকটিস করলে সবার পক্ষেই সে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব)।পুরুষের বীচি (Testes) খুবই স্পর্শকাতর অঙ্গ।এখানে আঘাত করলে বা শক্ত করে চেপে ধরলে প্রচন্ড ব্যাথার সাথে সাথে সামনের দিকে গোল হয়ে ঝুঁকে পড়ে, কান্নাকাটি করতে থাকে, মাথা ঘোরায়, বমি বমি লাগে বা হয় এমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।ক্ষেত্রবিশেষে মারাও যেতে পারে।আপনারা নিশ্চয়ই ক্রিকেট খেলার সময় দু রানের চিপায় বলের আঘাতে খেলোয়াড়দের মাটিতে গড়াগড়ি পাড়তে দেখে থাকবেন।



হাঁটুতে আঘাত করার কৌশলঃঅাক্রমণকারী দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তার হাঁটুর সামনে বা সাইডে সজোরে আঘাত করলে বা লাথি মারলে প্রচন্ড ব্যাথা হয় এবং জয়েন্ট লিগামেন্টের ফাইবার ছিড়ে গেলে সে আর হাঁটতে বা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।



শরীরের পূর্ণ ওজন প্রয়োগে পায়ের পাতা মাড়ানঃপায়ের পাতার উপরিভাগও নাজুক তথা বেশ
সংবেদনশীল অংশ।পিছন থেকে আক্রমণ করলে নিচের চিত্রের ন্যায় আপনার এক পা তার পায়ের পাতার উপর তুলে দিয়ে পুরো শরীরের ভর চাপিয়ে ডানে-বায়ে ঘুরিয়ে মাড়াতে থাকুন।



পূর্ণ শক্তিতে কামড়ানঃব্রেনের জন্য ব্যাথা অত্যন্ত শক্তিশালী ঋণাত্মক প্রভাবক।তীব্র ব্যাথা কামোদ্দীপনাসহ অন্যন্য অনুভূতি কমিয়ে দিতে পারে।সুতরাং শক্ত করে কামড়ানো একবারেই সস্তা ও কার্যকরী আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হতে পারে।শুধু মনে রাখবেন কামড়াবেন শরীরের পুরো শক্তিতে এবং যতই টানা হ্যাঁচড়া করুক না কেন কামড়ানোর তীব্রতা বাড়িয়ে দিন।

সোলার প্লেক্সাসে হিট করুনঃপেটের উপরিভাগের মাঝখানে যেখানে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা হয় তার পিছনেই সোলার প্লেক্সাস নামের স্নায়ু জালিকা থাকে।এখানে আঘাত করলে প্রচন্ড ব্যথা ও ক্ষণিকের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।ফলে আক্রমণকারী সহজেই কাবু হয়ে যায়।



একেবারে অসহায় আত্মসমর্পণের এবং প্রতিরোধহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হতে এ ধরনের কৌশলগুলো অনুশীলন করা দরকার।আত্মরক্ষা তথা সেলফ ডিফেন্সের উপর নির্মিত এই ভিডিওটিও দেখতে পারেন-




ধর্ষণের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে ধর্ষণকারী একাই ছিল এবং ৮৪% ক্ষেত্রে নিরস্ত্র ছিল।এসব ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার ডিভাইসগুলো বেশ কার্যকারী হতে পারে।এরূপ কিছু ডিভাইস এর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি-

পিপার স্প্রেঃউন্নত বিশ্বের নারীদের পয়লা নম্বর প্রতিরক্ষা অস্ত্র হলো পিপার স্প্রে বা মরিচের স্প্রে।এটি শুকনা মরিচের নির্যাস থেকে তৈরি।এটি চোখে স্প্রে করার সাথে সাথে চোখে এত জ্বালাপোড়া শুরু হয় যে চোখ খোলা যায় না এবং চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।ধর্ষক মরিচের জ্বালায় এতই অস্থির থাকে যে ধর্ষণতো দূরের কথা নিজের চোখের জ্বালা কমাতে পানির জন্য ছুটোছুটি শুরু করে।এ ধরনের স্প্রে লিপস্টিক কন্টেইনারের আদলে পাওয়া যায় তাই বহন করাও সহজ এবং অন্যের পক্ষে বোঝাও মুশকিল যে এটা ভযংঙ্কর পিপার স্প্রে।



রেপ-এক্সঃদক্ষিণ আফ্রিকার ডাক্তার ডাঃ সনেট এহলারস রেপ-এক্স (Rape-axe) নামের নারীর কনডমের আদলে এই ডিভাইসটি তৈরি করেছেন।এর ভিতরের দিকে খাঁজ কাটা আছে।একজন নারী খুব সহজেই কোন জটিলতা ছাড়াই এটি যোনিতে ঢুকিয়ে চলাফেরা করতে পারবেন।কোন ধর্ষক এই নারীকে ধর্ষণ করতে গেলে যোনিতে পেনিস ঢোকানোর সময় এটি পেনিসের সাথে লেগে যায় এবং প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হয়।নিজে থেকে ছাড়াতে গেলে এটি আরও শক্তভাবে আটকে যায়।প্রচন্ড ব্যাথায় পেশাব করা,সিমেন বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং ধর্ষকের স্বাভাবিক নড়াচড়া করাও কঠিন হয়ে পড়ে।ক্লিনিক বা হাসপাতাল ছাড়া এটা বের করা সম্ভব হয় না বিধায় ধর্ষক চিহ্নিত ও গ্রেফতার করাও সহজ হয়।



স্টান গানঃএটা হাই ভোল্টেজ ডিভাইস।আমাদের দেশে মশা মারার জন্য যে জ্যাপার (মশা মারার চাইনিজ র‌্যাকেট) পাওয়া যায় এর কার্যপ্রণালী অনেকটা সেরকম।মশা মারার জ্যাপারে ২২হাজার ভোল্ট তৈরি হয় আর স্টান গানে প্রায় ৫মিলিয়ন থেকে ৯০মিলিয়ন ভোল্ট তৈরি হয়।কাউকে এটা দিয়ে একবার শক খেলে অন্তত দ্বিতীয়বার কাছে আসার চেষ্টা করার আগে সে হাজারবার চিন্তা করবে যে ২য় শক সামলানোর মত আর গায়ের জোর অবশিষ্ট আছে কি না।



এন্টিরেপ বেল্ট বাকলঃযে সকল নারী জিন্সের প্যান্ট পরেন তাদের জন্য এটা বেশ কাজে লাগতে পারে।এই বেল্ট বাকল আললক করতে দু হাতের প্রয়োজন হয় এবং কিছুটা সময় লাগে।ধর্ষক যখন এটা খুলতে কসরত করতে থাকেবে ততক্ষণ আপনি তাকে ঘায়েল করার ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগে বেশ সময় পাবেন।



গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল নেকলেসঃএটা দেখতে নেকলেসের মত হলেও মূলত এটা একটা ইলেকট্রনিক ডিভাইস।এর বাটনে চাপ দেওয়ার সাথে সাথে তীব্র স্বরে রিং বাজতে থাকে এবং এর মাধ্যমে অটোমেটিক্যালি আপনার সাহায্যকারীর নাম্বারে টেক্সট চলে যাবে।তবে আমি বাংলাদেশের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ানারদের অনুরোধ করবো তারা যেন স্টিল বডির এরকম একটি ডিভাইস তৈরি করেন যার রিং টোন হবে ‘বাচাও’ ‘বাঁচাও’ এবং এটি যেন অফ করা পাসওয়ার্ড ডিপেন্ডডেন্ট হয়।ধর্ষক এরকম ডিভাইস টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিলেও রিং বা সাইন্ড করা বন্ধ না হওয়ায় ভড়কে গিয়ে পালিয়ে যেতে পারে।

ব্রা স্টিকার- এটা পাতলা পাতের ন্যায় একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা ব্রা এর ভিতরে লাগিয়ে রাখা হয়।এতে বেশি চাপ পড়লেই ভিকটিমের মোবাইলে নিষ্ক্রিয়করণ মেসেজ যাবে।এ অবস্থায় ডিভাইস অফ না করলে কয়েকসেকেন্ড পরই তীব্র স্বরে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করবে।এর ২০সে. এর মধ্যে তা বন্ধ না করা হলে সাহায্যকারীর মোবাইলে বিপদ বার্তা ও আপনার লোকেসন চলে যাবে।


ডিএনএ ডাইঃএ ধরনের ডাই বা রং চামড়ার এপিডার্মিসে লেগে যায় এবং ধুলেও উঠে না।স্কিন পাল্টাতে যে ৩-৪ সপ্তাহ সময় লাগে সে অব্দি এটা তার শরীরে তথা চেহারায় লেগে থাকে।কেউ আপনার গায়ে হাত দিলে কিংবা ধর্ষণের চেষ্টা করলে তার মুখে স্প্রে করে দিন।৩ সপ্তাহের মধ্যে তাকে খুঁজে বের করা সহজ হবে আর সে নিজেও ঘর থেকে বের হতে পারবে না দাগী হওয়ায়।বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এর জন্য একটি নির্দিষ্ট রঙ ঠিক করে দিতে পারেন এবং নারীরা সেই রঙেরটাই ব্যবহার করবেন।এবং এ রঙের কাউকে পাওয়া গেলেই জিঞ্জাসাবাদের জন্য আটক করা যাবে।অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়াও কঠিন হবে।

বাঁশি বা হুইসেলঃ এটিও কার্যকরী হতে পারে।কেউ আপনার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলে কিংবা পিছু নিলে আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জোরে জোরে বাঁশি বাজাতে পারেন।দূর্বল চিত্তের অপরাধী আসন্ন গণধোলাইয়ের কথা চিন্তা করে ভোঁ দৌড় দিতে পারে।

ব্লেড ট্যাম্পুনঃ এই ট্যাম্পুনে নিডল বা ব্লেড স্প্রিং অ্যাকশনে লুকানো থাকে।যোনিতে রাখা অবস্থায় কেউ যোনিতে পেনিস ঢুকানোর চেষ্টা করলে নিডল বা ব্লেড সম্মুখ চাপের কারণে ভিতর থেকে বের হয়ে পেনিসে বিদ্যুত বেগে ঢুকে যায়।ধর্ষণকারী ব্যাথা ও রক্তপাতে ধরাশায়ী হয়ে চিৎকার করতে থাকে।



মরিচের গুঁড়া বা টাইগার বামঃযাদের আর্থিক সামর্থ্য কম বা এ ধরনের ডিভাইসগুলো যদি না পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে মরিচের গুঁড়ো বা টাইগার বাম চোখে লাগিয়ে দিতে পারেন।

যৌন সহিংসতা ও এর প্রতিকার বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক এবং মাল্টিফ্যাক্টরাল।এ ক্ষুদ্র পরিসরে সবদিক বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হলো না।চেষ্টা করেছি কিছু মৌলিক বিষয় তুলে ধরতে।গবেষণা থেকে জানা যায় যৌন সহিংসতার সাথে পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার ও অন্যন্য মানসিক রোগ সিংহভাগ ক্ষেত্রে জড়িত।যেহেতু দীর্ঘদিন এ বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে তাই এর বিস্তৃতি ও মাত্রা সমাজে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।উপরন্তু আর্থসামাজিক বৈষম্য বিশেষত লিঙ্গিক বৈষম্য সমাজে কার‌্যকরভাবে বিরাজমান। তাছাড়া এদেশের তরুণ সমাজ ইরোটিক ক্যাপিটালের ব্যবহারিক দিকের প্রতি তীব্রভাবে আকর্ষিত হয়েছে এবং তাতে সমাজের একটা বিরাট অংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে।এছাড়াও দেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যেম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার চেষ্টায়রত।এই ট্রানজিসনাল পিরিয়ডে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা যাওয়া স্বাভাবিক।এর সাথে যুক্ত হয়েছে করোনাকালীন মানসিক রোগ মহামারী ও অর্থনৈতিক মন্থরতা।এই ৫টি বিষয় একসাথে অবস্থান করায় যৌন সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারন করা অস্বাভাবিক নয়।আর এই ৫টি বিষয়ের কোনটিই কেবলমাত্র অপরাধীদের মৃত্যুদন্ড দেওয়ার মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।এক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনতা, পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের কঠোর অভিভাবকত্ব অতীব প্রয়োজন।যৌন সহিংসতার একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ জনসম্মুখে আসে।তাতেই আমরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠি।অথচ এর ব্যাপ্তি অনেক অনেক বড়।কত লক্ষ লক্ষ নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে গভীর ক্ষত নিয়ে দিনাতিপাত করছে তা ভাবলেও গা শিইরে উঠে।তার সাথে রয়েছে পুরুষের প্রতি যৌন সহিংসতা।সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে নিজ মাথা খাটিয়ে।তা না হলে এ আগুনের তাপ হয়ত আমাদের সবাইকে স্পর্শ করবে আজ কিংবা আগামীকাল।ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হতে পারে যে নায্য বিচার পাওয়া ও সামাজিক সমর্থন পাওয়া দুটোই হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে অমানুষদের রাজ্যে অনেকটা নিচের ছবির মত-



ধন্যবাদ যারা অসীম ধৈর্য্যের সাথে শেষ পর‌্যন্ত পাঠ করলেন।

তথ্যসূত্রঃ

what-we-do/ending-violence-against-women/facts-and-figures Crimes Against Children Research Center in 2012

fast-facts-statistics-on-violence-against-women-and-girls

Rape_statistics

violence_injury_prevention/resources/publications/en/guidelines_chap2.pdf

Borderline_personality_disorder

Risk and Prevalence of Personality Disorders in Sexual Offenders Allison Sigler John Jay College of Criminal Justice New York, NY

The Prevalence of Personality Disorders in Sex Offenders

Dehumanization


Men see bikini-clad women as objects, psychologists say-CNN

A recent study suggests that people feel less empathy for women who are dressed in revealing clothing

Personal Space

Sexual Objectification

How Sexual Objectification Generates Dehumanization

Erotic Plasticity

Erotic Capital

Stop Thinking About Sex

Dr. Hakim is a research professor of sociology at the London School of Economics. Her new book is "Erotic Capital: The Power of Attraction in the Boardroom and the Bedroom.
More Than a Body: Mind Perception and the Nature of Objectification (Journal of Personality and Social Psychology)

Review of General Psychiarty by Howard H. Goldman
Clinical Psychology by A.K.Agarwal

Essentials of Medicine by M.E.Ullah.

Forensic medicine & Toxicology by Reddy.

ছবিঃ সকল ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে।এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক;এর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই।তারপরেও কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে কারো আপত্তি থাকলে তা জানা মাত্র সে ছবি বা ছবিসমূহ এই আর্টিকেল থেকে অপসারণ করা হবে।(All the images in this article are collected from different web sites & have been used for non-commercial purposes.If anyone has any objection of using these images,I’m assuring their removal upon getting valid complaint)।


বি.দ্রঃ সামুতে যৌন সহিংসতা সম্পর্কিত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট এসেছে।সেগুলোকে এখানে সন্নিবেশিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।এ বিষয়ে সম্মানিত ব্লগারদের সহযোগিতা কামনা করছি।ধন্যবাদ।

শিশু নির্যাতনঃ ঘরের ভেতরের নির্যাতনের একটা চিত্র!!! - ভুয়া মফিজ

মেয়েমানুষ নয়, আসুন তাদের মানুষ ভাবতে শিখি-সোহানী

ব্লগারদের মানবতাবোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বভাব কি হারিয়ে যাচ্ছে? সবাই কি সব কিছুতে সহনশীল হয়ে যাচ্ছে?- জাদিদ

আপনার শিশু সন্তানকে কিভাবে বাচাঁবেন নরপশুদের হাত থেকে !!!!!- সোহানী

এতএত ধর্ষণ ও এসবের বিচার না হওয়ার কারণ কি?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ২:৫৬
৪৮টি মন্তব্য ৫২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজ জন্মদিন আমার সোনামণিটার

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৩:০২


দেখতে দেখতে আরো একটা বছর চলে গিয়ে আবারো আমার ছেলেটার জন্মদিন চলে এলো। অনেক প্ল্যান-প্রোগ্রাম করার করার পরেও এবারও দেশে যাওয়া হলো না। পরপর দু'টো বছর এভাবে ছেলেটার জন্মদিনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিগত শতকের ফতুয়ার বিবর্তন

লিখেছেন এ আর ১৫, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ৭:৩১


মুর্তি আর ভাষ্কার্যের পার্থক্য নির্বাচনে ব্যর্থ মুখস্ত বিদ্যায় জ্ঞানী মুর্খরা জগতে আর কি কি হারাম ফতোয়া দিয়ে নিজেদের, মুসলমানের আর ইসলামের ইজ্জতের বারোটা বাজিয়েছিলেন, আসুন লিস্ট নিয়ে বসি:
১। এই উপমহাদেশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমার মহানুভবতা

লিখেছেন রামিসা রোজা, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:১৩






হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়ে সালমা যার আনুমানিক বয়স হবে ১৯/২০। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে এবং মা অন্যত্র বিয়ে বসেছে । সালমা যখন কিশোরী তখন থেকেই অন্যের বাসায় কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালের ধারেই রাতের মেলা (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন জুন, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:২৪


অং আং ক্লং --- আজ এই করোনাকালে ক্লং অর্থাৎ খালটিকে বদলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ ,গড়েছে নাগরিকদের জন্য এক বিনোদনের স্থান

চীনা আর ভারতীয় রিটেইল আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের দিনটা মানব সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক দিন।

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৯



আজকের দিনটি মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান, টেকনোলোজীর আরেকটি মাইলষ্টোন।

আজকের দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন; মানব জাতি এই ১ম'বার এতো কম সময়ে ভয়ংকর কোন ভাইরাসের ভ্যাকসিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×