somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার দণ্ডিত কালো রাত

১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ৮:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


তার সাথে দেখা হল দূর বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া সেই গাঁয়ে। তোমরা সে গাঁয়ের নাম জানো না, যাওনি কখনও কেউ। সেখানে আষাঢ়ের ঝমঝমে বৃষ্টিতে শুরু হয়েছিল আমার বোধনের কালযাত্রা, পুরুষত্বের পুলকে পদার্পণ, আমার প্রেমিক সত্তার অভিষেক; সেই গাঁয়েরই মেঠো পথে হাঁটতে গিয়ে দেখা হল ফের অবন্তীর সাথে!

'অবন্তী', শুধুই 'অবন্তী', এখন আর তাকে 'আমার অবন্তী' বলে সম্বোধন করবার সাহস বা অধিকার কোনটাই আমার নেই। সেকালের কিশোরী অবন্তী আজ অন্যের ঘরণী, পুরোদস্তুর মহিলা এক, কোলে তার মাতৃত্বের নিদর্শন, চাঁদের মতো ফুটফুটে এক মেয়ে!

ধূমপানের আঁচড়ে আঁচড়ে বুকটা আমার অনেক আগেই তার দম হারিয়েছে, দম ফুরানো বুকটা আজ আচমকা আবার মোচড় দিয়ে উঠল সেই কিশোর কালের মুগ্ধ প্রেমিকের প্রাণ চঞ্চল টগবগে লাল হৃৎপিণ্ডের মতো। অবন্তীর চোখে দেখলাম যেন বজ্রপাতের ধাঁধানো ঝিলিক, নয়তো ভূমিকম্প!

একদিন দেখা হবেই জানতাম, তবে এভাবে হবে, ধারণাতেও ছিল না।
অদৃষ্টের এই অনির্ণেয় ধারাপাত বড়ই অদ্ভুত কড়চা।

বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছি, সেও দাঁড়িয়েছে, চোখে তার চিকচিক করছে দীর্ঘদিনের শুকিয়ে যাওয়া জলের কণা, হয়ত। কিংবা হতে পারে ও চোখে আজ সে ধরেছে অহংকার কিংবা অবজ্ঞা, এই চালচুলোহীন সাবুক্তগীন নামের প্রাণীটির প্রতি। 'পুরুষটি'ও নয়, সম্বোধনটা 'প্রাণীটি'!

কেমন আছ? এই প্রশ্ন কি খুবই অসমীচীন হবে? ভাবছি। আমার বিহ্বল ঠোঁট আপনাআপনিই কেঁপে চলেছে, কথা সরছে না মুখে।

এমন সময় অবন্তীই বলে উঠল, মেয়েকে দেখিয়ে, আমার মেয়ে, রূবাব!

কণ্ঠে অহংকার, না আমার প্রতি অবজ্ঞা- আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না!

মেয়েটাও কেমন যেন উদাস হয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে! যেন মায়ের কাছ থেকে আগে থেকেই শিখে নিয়েছে যে, সাবুক্তগীন নামের এই লোকটিকে অবজ্ঞা করতে হবে!

আমি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে, কিংবা অব্যক্ত কোন অসংজ্ঞেয় হাহাকার নিয়ে হাত বাড়ালাম মেয়েটির কপোল ছোঁব বলে।

ফোঁস করে সরিয়ে নিল অবন্তী ওর মেয়েকে!
হাউ ডেয়ার ইউ! হাউ ডেয়ার ইউ টাচ্ মাই ডটার!!

চোখ ফেটে পানি এল আমার! ওর মেয়ে! আমার তো কেউ নয়! কে আমি আজ?
ঢোক গিলে খসখসে কণ্ঠে বললাম, অনেক সুন্দর হয়েছে তোমার মেয়ে!

হঠাত মনে হলো, অবন্তী যেন বালির মূর্তির মতোন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল!

এতদিনের এত অভিযোগ, এত ব্যাকুলতা, এত জমানো কথা- সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল, কিংবা সব চাপা পড়ে গেল মুহুর্মুহু দীর্ঘশ্বাসের দ্যোতনায়!

বলার মতো কিছু না পেয়ে, আমি কবি, বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগলাম-

আমারও সাধ হলো
স্বাদ নিতে বিষাক্ত বিস্বাদের;
ছেড়ে স্বর্গের মায়া,
সুগন্ধী গন্ধমের মতো,
আমি তাই তোমাকে নিলাম খুঁজে
আদম সত্তার মতো,
উলঙ্গ সন্ত্রস্ত হাওয়াকে
বুক পেতে
এ নশ্বর মর্ত্যের মাটিতে
প্রেমিকের জ্বলন্ত আহ্লাদে!

অবন্তীর বিরক্তি যেন দপ করে জ্বলে উঠল হঠাত!

জীবনে পেরেছ কী আর আগডুম বাগডুম কয়েকটা চটকদার শব্দের পিঠে শব্দ বসানো ছাড়া? এই দিয়েই তো মুগ্ধ করে জখম করে গেছ একের পর এক সরল সাধারণ মেয়েকে!

আমার বাকপটু মুখ অবন্তীর সামনে কোনদিনই ভাষা খুঁজে পায়নি। সারাজীবনই ও ইচ্ছে মতো যা খুশি বকেছে, অপবাদ দিয়েছে, অপমান করেছে, আমি শুধু শুনে গেছি। জানি বুঝিয়ে লাভ নেই, আমি ভালো হই বা শত খারাপও যদি হই, তাতেও অবন্তী- সাবুক্তগীন সম্পর্কের কোন অদল বদল ঘটবে না। এ যেন অবধারিত চির সমান্তরাল এক সহযাত্রা, তফাত রেখে পথ পাড়ি দেওয়া, কখনও খুব কাছাকাছি এসে হাঁটা, আবার কখনও দুজনের মাঝখানে অনেকে গাড়িঘোড়া, পথচারী আর ঘরবাড়ির আড়াল! সহযাত্রা ফুরায় না তবু কোনদিন।

আমি প্রতিবাদ করিনি কখনও, আজও করলাম না। শুধু মিনমিনিয়ে বললাম, তুমি তবে কেন মুগ্ধ হয়েছিলে অবন্তী? তুমি তো সাধারণ নও!

মুগ্ধতা? কাকে তুমি মুগ্ধতা বলছ? তুমি তো করুণারও যোগ্য নও!

তাহলে এত জল কেন ঝরালে?

বাজে কথা বলবে না একদম! তোমার জন্য অশ্রু ঝরাব আমি? কী ভাব তুমি নিজেকে!!

কী আর ভাবব আমি? তুমি তো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন, সাধ ভরে বয়ে বেড়ানো ব্যাকুল দীর্ঘশ্বাস!

এতক্ষণে পরীর মতো ছোট্ট মেয়েটি যেন একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে মুখ ফিরিয়েছে আমার দিকে, তার যে উজ্জ্বল চোখ- যেন আমার অন্তরাত্মায় গিয়ে চুমু দিয়ে এল নিমিষেই! আমি আবার কিছু বলার মতো খুঁজে পেলাম না।

অবুঝ মেয়েটি আঙুল তুলে আমার দিকে তাকিয়ে ঠিক মায়ের মতো করেই দুর্বোধ্য একটা হাসি দিল।

কী যেন টের পেয়ে চকিতে অবন্তী মেয়ের হাত নামিয়ে চেপে ধরল নিজের বুকের সাথে। কাঁপা গলায় বলে উঠল, আর কখনও এসো না সাবুক্তগীন, আর কখনও এসো না! আমায় ঘেন্না কর, আমায় ভুলে যাও, মনে করো তোমায় নিয়ে শুধু খেলেছি আমি।

হাহ, এই কণ্ঠের প্রতিটি কম্পন আমি চিনি, পাথরের মতো শক্ত অবন্তী যে নিঃশব্দে কত কেঁদে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে, তা আমি ছাড়া আর কে বুঝতে পারে পৃথিবীতে?

হুট করে আমার সব মনে পড়তে লাগল, সব অভিযোগ, সব জমানো কথা, সব ফিরে আসতে লাগল, সব! আমায় ফেলে এগিয়ে যাওয়া অবন্তীর দিকে পেছন ফিরলাম, অনেক দূরে চলে গেছে অবন্তী, দূরে, আরও অনেক দূরে চলে যাচ্ছে, নিমিষেই যেন যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল আমাদের মাঝে! রুবাব, অবন্তীর ছোট্ট মেয়ে, চিৎকার করে কাঁদছে। হাত পা ছুড়ছে অদম্য আক্রোশে।

আমার ভেতর হতেও এবার হড়হড় করে আওয়াজ এল, এই কান্না আমি চিনি, ওই সন্তান, ওই কণ্ঠ- ওকে আমি চিনি অবন্তী, ওকে নিও না অবন্তী, ওকে আরেকটু দেখতে দাও প্লিজ!... অবন্তী....!!


আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসেছি! রাত এখন চারটা। বুকটা ছটফট করছে, একটু পানি খাওয়া দরকার। না, পানি নয়, তারচেয়ে একটু বিষ হলেও মন্দ হত না!

পা দুটো এ্যাক্সিডেন্টে পঙ্গু। উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে খাব, সে সামর্থ্য নেই।
আমার অবন্তীর কাছে যাওয়া হয়নি। রুবাবকে আমার কখনই দেখা হয়নি।

রাতের পর রাত কেটে যায় স্মৃতির কারাগারে নির্ঘুম নির্যাতনের বন্দিদশায়। হায়, মরণ! হায় রে আমার চিন্তা-চিতায় দহন!
অক্ষমের আয়ু কেন এত দীর্ঘ হয় বিধি? এ তোমার অন্নপ্রাশনের কেমন প্রহসন?

ভোতা ধার, শীতল আঁচড়ের-
মুখভর্তি মৃত্যু নিয়ে এগিয়ে আসে ওরা,
হলদে দাঁতের গোড়ায় গোড়ায়
ফেনায়িত হয় হিংস্র আনন্দ ওদের,
ভেঙে ভেঙে যাওয়া নিঃশ্বাসের দুঃস্বপ্নে
এভাবেই ঘামে ভিজে ওঠে প্রতিটি রাত-
আমার দুঃস্বপ্নের দণ্ডিত কালো রাত!
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তর....দ্রুত বাস্তবায়ন হোক।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তর....

বর্তমান সচিবালয়ের আয়তনঃ ঢাকার আবদুল গনি রোড- সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় প্রায় ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মাত্র ১৭ লাখ বর্গফুট যায়গায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ঢাকা দক্ষিণের নতুন সমীকরণ: রাজনৈতিক খেলায় ইশরাক কোথায়?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২

রাজনীতির মাঠে অতি-উৎসাহ কখনো কখনো যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে, দলবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×