![]()
বাংলাদেশ থেকে আরও বিপুল সংখ্যক কর্মী নেবে মালয়েশিয়া। দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, পর্যটন খাতে সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চারটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীরা গতকাল এসব চুক্তিতে সই করেন। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা কূনীতিকরা ভিসা ছাড়াই উভয় দেশ সফর করতে পারবেন। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের প্রস্তুতিমূলক কাজের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। স্থানীয় সময় বেলা ৩টায় শেখ হাসিনা পুত্রাজায়ার পারদানা স্কয়ারে পৌঁছালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নাজিব রাজাক তাকে অভ্যর্থনা জানান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয় তাকে। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। পরে পারদানা সভাকক্ষে শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। সেখানেই একটি চুক্তি, একটি প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারকে সই করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। শ্রমিকদের প্রটোকল সংশোধনীতে সই করেন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো সোরি রিচার্ড রাইয়ত আনাক জায়েম ও বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আহাদ জাহিদ হারমিদি ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভিসা শর্তাবলির আংশিক বিলোপন সমঝোতায় সই করেন। পর্যটন খাতে সহযোগিতার সমাঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মোস্তপা মুহামেদ ও বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত সমঝোতায় সই করেন মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ নাজিব বিন তুন আবদুল রাজাক চুক্তি সই প্রত্যক্ষ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। এটিকে আমরা অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, ভিসা-সংক্রান্ত চুক্তির ফলে এখন থেকে দুই দেশের অফিশিয়াল ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীরা বিমানবন্দরে নেমে ‘অনঅ্যারাইভাল ভিসা’ পাবেন। আর জনশক্তি রপ্তানির প্রটোকলের ফলে মালয়েশিয়ার সারাওয়াক প্রদেশে ১২ হাজার বাংলাদেশির কাজের সুযোগ তৈরি হবে, যা পর্যায়ক্রমে উন্নীত হবে ৬০ হাজারে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বড় বাজার মালয়েশিয়া। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ বাংলাদেশি সেখানে বিভিন্ন পেশায় রয়েছেন। এ ছাড়া পর্যটন খাতে সহযোগিতা এবং শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিষয়ে সহযোগিতার দুটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের পর মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য-সহযোগী দেশ বাংলাদেশ।মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে আমি বাংলাদেশে যাওয়ার উষ্ণ আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনারা গিয়ে প্রকৃত বাংলাদেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করুন। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির বিকাশে নিজেদের অংশীদার করুন।’ কুয়ালালামপুরে গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগবিষয়ক সংলাপ’ অনুষ্ঠানে গতকাল বক্তৃতাকালে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে আজকের আধুনিক মালয়েশিয়া গড়তে আপনাদের অনেকেই অবদান রেখেছেন। আমি বিশ্বাস করি একই সুযোগের হাতছানি বাংলাদেশেও রয়েছে।’ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার সাউথ সাউথ অ্যাসোসিয়েশনের (এমএএসএসএ) প্রেসিডেন্ট আজমান হাশিম এবং দেশটিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ কে এম আতিকুর রহমান। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়া সরকারের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এস সামি ভেল্লু, মালয়েশিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ডাটুকের চেয়ারম্যান মুস্তাফা মনসুর, এমরেইল এসডিএন বিএইচডির নির্বাহী পরিচালক ড. অরবিন্দ হরিনারায়ণ, এক্সিস জাভা গ্রুপের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর বেন্নি হো এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও ওই সংলাপ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। পরে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান অবস্থা, করব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে মালয়েশীয় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক আরও প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা জানি। ফলে ১৮টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সড়ক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পর্যটন ও সেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি সরবরাহের মতো অবকাঠামো খাতগুলো আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। একইভাবে খাদ্য ও কৃষি খাতের পুরোটাই হবে উৎসাহব্যঞ্জক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বসহ (পিপিপি) যে কোনো ধরনের অংশীদারির বিষয় বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া এবং আরও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এ ক্ষেত্রে সার্ক, বিমসটেক ও বিসিআইএনের মাধ্যমে আমাদের অগ্রসরমাণ অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে উঠছে।’ এ সময় মালয়েশীয় ব্যবসায়ীরা আবাসন, নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ খাতে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্থানীয়ভাবে উত্তোলন ও আমদানির মাধ্যমে পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন এবং প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে। বিনট্যাঙ্ক জেভি কনসোর্টিয়ামের চেয়ারম্যান ড. এম সুয়িব কাশমানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার চারদিকে রেল সার্কুলার লাইন নির্মাণে তার (কাশমানের) প্রস্তাবকে সরকার স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে।আজ দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী : মালেয়শিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের আমন্ত্রণে তিন দিনের সফর শেষে আজ দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে বেলা ১টা ৫৫মিনিটে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



