
১২৫৮ সালের ২৯শে জানুয়ারি থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী ছিল বাগদাদ অবরোধ । সেসময় হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করেছিলেন। অবরোধের পর মঙ্গোলদের কাছে বাগদাদ আত্মসমর্পণ করেন।হালাকু খান ইরানে হাসাসিনদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর হাসাসিনরা আত্মসমর্পণ করেন। তারপর তিনি বাগদাদের দিকে অগ্রসর হয়ে খলিফা আল-মুসতাসিমকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। খলিফা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কারনে হালাকু খান শহর অবরোধ করেন। ১২ দিন পরে শহর আত্মসমর্পণ করে। তারপর মঙ্গোলরা বাগদাদে প্রবেশ নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। হামলায় বাগদাদের বিখ্যাত বাইতুল হিকমাহ গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়। খলিফাসহ শহরের অসংখ্য বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়। ফলে শহর জনশূণ্য হয়ে পড়ে। সেই অবরোধকে ইসলামি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।
যুদ্ধের যেভাবে শুরু ও অভিযান এবং বাগদাদ দখল
১২৫৭ সালে মংকে খান মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়া এবং ইরানে শক্ত কর্তৃত্ব স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ভাই হালাকু খানকে খিলাফতসহ বিভিন্ন মুসলিম রাজ্য জয় করার দায়িত্ব দেন। আত্মসমর্পণ যারা করবে না তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়।অভিযানের জন্য হালাকু খান একটি বড় আকারের বাহিনী গড়ে তোলেন। বাহিনীর সেনাপতিদের মধ্যে ছিলেন আরগুন আগা, বাইজু ও বুকা তিমুর, গুয়ো কান এবং কিতবুকা, হালাকু খানের ভাই সুনিতাইসহ বিভিন্ন যুদ্ধনেতা তাছাড়াও সিলিসিয়ার আর্মেনীয় এবং এন্টিওকের ফ্রাঙ্করাও সেনাদল নিয়ে যোগ দেন। জর্জিয়াও তাদের সাথে যোগ দেন। ১০০০ চীনা গোলন্দাজ সৈনিক বাহিনীতে যোগ দেন। এর পাশাপাশি তুর্ক এবং পার্সিয়ান যোদ্ধারাও সেই বাহিনীতে যোগ দেন।হালাকু খান ইরানের দিকে অগ্রসর হয়ে লুরদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তিনি বুখারা এবং খোয়ারিজম শাহ রাজবংশের অবশিষ্টদের উপর হামলা করেন। তাদের পরাজিত করার পর তিনি হাসাসিনদের উপর নজর দেন। তিনি হাসাসিনদের ঘাটি আলামুত দুর্গ দখল করেন। মঙ্গোলরা তৎকালীন হাসাসিন প্রধান ইমাম রুকনউদ্দিন খুরশাহকে হত্যা করেন।
হাসাসিনদের পরাজিত করার পর হালাকু খান আল মুসতাসিমকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন। উজিরে আজম ইবনুল আলকামির পরামর্শে খলিফা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ইতিহাসবিদদের মতে তার কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা এবং অযোগ্যতা।তিনি খলিফাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে মঙ্গোলরা সমস্যা সৃষ্টি করলে মুসলিম বিশ্ব থেকে সহায়তা আসবে।১১ই জানুয়ারি নাগাদ মঙ্গোলরা শহরের কাছে পৌছে যান। তারা দজলা নদীর উভয় তীরে অবস্থান নেয়। আল মুসতাসিম শেষপর্যন্ত যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে ২০০০০ অশ্বারোহীর একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। এই অশ্বারোহীরা মঙ্গোলদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়।

২৯শে জানুয়ারি মঙ্গোলরা বাগদাদ অবরোধ করেন। তারা শহরের চারদিকে পরিখা খনন করেন। শহরের দেওয়াল ভাঙার জন্য অবরোধ ইঞ্জিন এবং কেটাপুল্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। ৫ই ফেব্রুয়ারি নাগাদ তারা প্রতিরক্ষার উল্লেখযোগ্য অংশ ভেদ করতে সক্ষম হন। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় আল মুসতাসিম হালাকু খানের সাথে আলোচনা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হালাকু খান রাজি হননি। বাগদাদের প্রায় ৩০০০ গণ্যমান্য ব্যক্তি হালাকু খানের সাথে আলোচনার চেষ্টা করলে তাদেরকে হত্যা করা হয়। পাঁচদিন পর ১০ ফেব্রুয়ারি শহর আত্মসমর্পণ করে। ১৩ই ফেব্রুয়ারি মঙ্গোলরা শহরে প্রবেশ করে হত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেন।

হালাকু খানের হাতে খলিফা আল মুসতাসিমের বন্দীত্ব। ১৫শ শতাব্দীর লা লিভ্রে দেস মারভেলিস বইয়ের চিত্র।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে মঙ্গোলদের নিষ্ঠুরতার বর্ণনা রয়েছে। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ গ্রন্থাগার সেসময় ধ্বংস করা হয়। ফলে চিকিৎসা এবং জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচিত অসংখ্য মূল্যবান বই হারিয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী দজলা নদীতে অসংখ্য বই ফেলে দেওয়ার ফলে নদীর পানি বইয়ের কালির কারণে কালো হয়ে গিয়েছিল। পালিয়ে যেতে চেষ্টা করা নাগরিকদেরকে মঙ্গোলরা গণহারে হত্যা করেন। সেসময় নারী এবং শিশুদেরকেও হত্যা করা হয়। সেই হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৯০০০০ এর মত নাগরিক নিহত হয়েছে বলে অভিমত রয়েছে। অন্যান্য সূত্রে ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। ১৪শ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ওয়াসসাফের মতে মৃতের সংখ্যা প্রায় লক্ষাধিক ছিল। দ্য নিউ ইয়র্কারের ইয়ান ফ্রেজিয়ারের মতে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২০০০০০ থেকে ১০০০০০০ ছিল। মঙ্গোলরা মসজিদ, প্রাসাদ, গ্রন্থাগার, হাসপাতালে লুটপাট চালায়। ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠা সব ইমারত ধ্বংস হয়ে যায়।খলিফা আল মুসতাসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে শহরের বাসিন্দাদেরকে হত্যার দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা হয়। মঙ্গোলরা রাজকোষেও লুটপাট চালায়। অধিকাংশ সূত্র অনুযায়ী হত্যার জন্য তারা খলিফাকে কাপড়ে মুড়ে তার উপর ঘোড়া চালিয়ে দেয়। তবে পর্যটক মার্কো পোলোর বর্ণনা অনুযায়ী খলিফাকে অভুক্ত রেখে মেরে ফেলা হয়েছিল।
তথ্যসূত্রঃ
http://metis-history.info/euro54.shtml
https://books.google.com.bd/books?id=DRByAAAAMAAJ&pg=PA292&redir_esc=y
http://www.thedailybeast.com/in-threatening-baghdad-militants-seek-to-undo-800-years-of-history
http://www.newyorker.com/magazine/2005/04/25/invaders-3
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০১৭ সকাল ১১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



