somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

" শান্তির ধর্ম ইসলাম " - আসুন এক নজরে দেখি ইসলাম কি এবং কেন ? ( ঈমান ও আমল - ১৬ )।

১৭ ই এপ্রিল, ২০২২ দুপুর ১২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছবি - worldatlas.com

ইসলাম আরবী শব্দ, সালাম শব্দ হতে ইসলাম শব্দের উৎপত্তি। ইসলাম অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। আর ধর্মীয় পরিভাষায় ইসলামের অর্থ আল্লাহ তায়ালার নিকট আত্মসমর্পণ করা ও তাঁহার বিধি-বিধানগুলোকে পালন করা। আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ মানবজাতির পরিপূর্ণ কল্যানের জন্য যে আদর্শ এবং সুষ্ঠ জীবন যাত্রার ব্যবস্থা শিক্ষা দিয়েছেন তাহাই ইসলাম। আর তাই ইসলাম ধর্মের অর্থ হল শান্তির ধর্ম। আরবী ভাষায় ইসলাম শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো আত্মসমর্পণ করা। মহান আল্লাহ তাআলার এবাদত বন্দেগীতে বা তাহার উদ্দেশ্যে নিজেকে বিনয়াবনত করা,তাহার সকল হুকুম মান্য করা , কোন আপত্তি ছাড়াই তাহার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং সর্বান্তকরণে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করা। ইসলাম সর্ম্পকে কুরআনে বলা হয়েছে, " নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর নিকট (একমাত্র মনোনীত) ধর্ম "। (সূরা আল ইমরান,আয়াত নং - ১৯)। আল কোরআনে বলা আছে ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম।দুনিয়ার প্রথম নবী ও মানুষ হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আগ পর্যন্ত সকল নবীই ইসলাম প্রচার করেছেন। তবে সময়ের সাথে সাথে মানুষ ইসলামকে বিকৃত করেছে। সেজন্য ইসলামকে সঠিভাবে প্রচারের জন্য মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয় এবং মানব জাতির কল্যাণের জন্য তাহার আবির্ভাব হয়। দুনিয়ায় নাজিলকৃত সকল আসমানী কিতাবের মূল বিষয়গুলোর আল কোরআনে উল্লেখ আছে এবং আল কোরআন সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ। যে ইসলাম কবুল (গ্রহণ ) করে তাকে মুসলিম (আল্লাহর অনুগত ) বলে।


ছবি - muhammadisite.com

আরাকানে ইসলাম বা ইসলামের মূল বিষয় -

ইসলাম ধর্ম পাঁচটি স্তম্ভ বা মূল বিষয়ের উপর স্থাপিত । এগুলো হল -

১। কালেমা বা ঈমান -

ঈমান শব্দটি আরবি।এর শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস করা, স্বীকার করা ইত্যাদি। কালেমা বা ঈমান হলো এ বিশ্বাস ও স্বীকার করে নেওয়া যে , " আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ বা উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল"। এ বিশ্বাসের সাথে সাথে বিস্তৃত বা বিস্তারিত ভাবে বিশ্বাস করা " আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলগণের প্রতি, কিয়ামতের দিনের প্রতি, তাকদিরের প্রতি, ভাগ্যের ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি"। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা - "ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ" - যার শুরুটা কালেমা বা ঈমানে। যা শুধু মুখে বলা নয়, অন্তরে বিশ্বাস ও কর্মে পরিণত করার বিষয়। লিংক - Click This Link

২।নামায -

নামায বা সালাত ইসলাম ধর্মের একটি দৈনিক নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক ইবাদত। প্রতিদিন পাঁচবার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সকল প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীকে নামাজ আদায় করতে হয় যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আছে। শরীয়ত সম্মত কারন ব্যতীত এটি পালন না করলে বা ছেড়ে দিলে শাস্তির কথা বলা আছে। এটি মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন অবশ্য করণীয় একটি ধর্মীয় কাজ,তবে প্রতিদিন অবশ্য করণীয় বা ফরজ ছাড়াও আরও কিছু নামাজ রয়েছে যা সময়ভিত্তিক বা বিষয়ভিত্তিক। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা - " নামাজ " ইসলামের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যা মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে পার্থক্যকারী সূচক হিসাবে বিবেচিত এবং মুসলমান মাত্রই দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লিংক - Click This Link

৩। রোযা -

রোজা শব্দের অর্থ হচ্ছে 'বিরত থাকা'। আর আরবিতে এর নাম সাওম, বহুবচনে সিয়াম। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ,যার অর্থ অবশ্য পালনীয়। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা - " রোযা " ইসলামের তৃতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যার বিনিময় বা প্রতিদান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন নিজেই দিবেন। লিংক - Click This Link

৪। যাকাত -

যাকাত শব্দ যার অর্থ পরিশুদ্ধ করা, বৃদ্ধি পাওয়া,পবিত্র হওয়া, প্রাচুর্য,প্রশংসা ইত্যাদি। সম্পদের যাকাত হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে গরীব-দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়।এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা - " যাকাত " ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যা আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ ছওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির ও প্রতিশ্রুতি দেয়। লিংক - Click This Link

৫। হাজ্জ -

হজ্ব বা হজ্জ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য একটি আবশ্যকীয় ইবাদত বা ধর্মীয় উপাসনা। এটি ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জীবনে একবার হজ সম্পাদন করা ফরজ বা আবশ্যিক। আরবি জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ হজের জন্য নির্ধরিত সময়। হজ পালনের জন্য বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরী এবং সন্নিহিত মিনা, আরাফাত, মুযদালিফা প্রভৃতি স্থানে গমন এবং অবস্থান আবশ্যক।


ছবি - factsanddetails.com

ইসলামী শরীয়তের উৎস বা দলীল সমুহ -

শরিয়ত বা শারি'আত অর্থ কর্মপদ্ধতি। ইসলামি আইন বা শরিয়ত আইন হচ্ছে জীবনপদ্ধতি ও ধর্মীয় আইন যা ইসলামিক ঐতিহ্যের একটি অনুষঙ্গ। ইসলামি পরিভাষা অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং নবী হযরত মুহাম্মাদ(সঃ) যেসব আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-নীতি ও পথনির্দেশনা মুসলমানদের জন্য প্রদান করেছেন, তার সমষ্টিই হচ্ছে শরিয়ত। আর তাই শরিয়ত হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ) এর দিকনির্দেশনার সমষ্টি। অতএব, শরিয়তের প্রধান বা মৌলিক উৎস দুইটি হলো - আল্লাহর বাণী বা আল কুরআন ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতি বা সুন্নাহ। পরবর্তীতে আল কুরআন ও সুন্নাহর স্বীকৃতি ও নির্দেশনার ভিত্তিতে শরিয়তের আরো দুইটি বিষয় নির্ধারিত হয়। এগুলো হলো- ইজমা ও কিয়াস। সুতরাং, ইসলামী শরিয়তের উৎস মোট চারটি।যথা -

১। কুরআন - মহান আল্লাহ পাক হযরত জিবরাঈল (আঃ) ফেরেশতার মাধ্যমে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে যে সকল ওহী বা বাণী নাজিল করেছেন এগুলোর সমষ্ঠিকে আল কোরআন বলে। এটি ইসলামী শরীয়তের প্রথম ও প্রধান উৎস।

২। সুন্নাহ বা হাদীস - রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতি সূচক কার্যাবলীকে সুন্নাহ বা হাদীস বলে । এটি ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস।

৩। ইজমা - ইজমা আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ কোন বিষয়ে সকল ‍জনগণ একমত হওয়া।ইজমা মুসলিম আইনের তৃতীয় উৎস। ইসলামী আইন বিশারদগণের ঐক্যমতকে ইজমা বলে। কোন বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ কুরআনে বা সুন্নায় না থাকলে ইজমার সাহায্যে তার সমাধান করা হয়। আধুনিক মুসলিম বিজ্ঞানীদের মতে, ইজমা মুসলিম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, কারণ মুসলিম আইনের একটি বিরাট অংশ গড়ে উঠেছে ঐক্যমতের ভিত্তিতে। ইজমার মাধ্যমে ইসলামী আইন সৃষ্ট হয়। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম আইনের একটি বিরাট অংশ গড়ে উঠেছে উলামাগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে।

৪। কিয়াস - কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে কোন সমস্যার সমাধান না পাওয়া গেলে কিয়াসের সাহায্য নেওয়া হয়। ইহা মুসলিম আইনের চতুর্থ উৎস। কিয়াস কোন নীতি নির্ধারণ করে না বরং প্রচলিত রীতি- নীতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে মাত্র। তবে কোন কিয়াস যদি ইজমার দ্বারা সমর্থিত হয় তাহলে তা আইনের মর্যদা লাভ করে। তাই বলা যায় যে, কিয়াস কোন আইন সৃষ্টি করে না বটে তবে ইহা আইন উদ্ঘাটন করে।

উল্লেখিত চারটি দলিল দ্বারা যেসব আদেশ -নিষেধ মুসলমানদের জন্য ধার্য হয়েছে, তাদেরকে আহকামে শরীয়ত বা শরীয়তের বিধান বলে।


ছবি - Ahkam.e.Shariat

আহকামে শরীয়ত বা শরীয়তের বিধান

আহকামে শরীয়ত বা শরীয়তের বিধানগুলো সাধারনতঃ দশ ভাগে বিভক্ত। যথা -

১। ফরয - যে সব কাজ ইসলামে সুস্পষ্ট বা অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণীত ও অবশ্য পালনীয় । যা পালন না করলে গুনাহ ও কঠিন সাজার কথা বলা হয়েছে এবং যা অস্বীকার করলে কাফের হতে হয় তাকে ফরজ বলে। ফরজ দুই প্রকার । যথা -

** ফরজে আইন - যে সব কাজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যপালনীয় তাকে ফরজে আইন বলে। যথা - নামাজ,রোযা ইত্যাদি।

** ফরজে কেফায়া - যে সব কাজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যপালনীয় কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কেউ পালন করলেই সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায় তাকে ফরজে কেফায়া বলে । যেমন - জানাযার নামাজ,দাফন-কাফন ইত্যাদি।

২।ওয়াজিব - যে সব ধর্মীয় কাজ দলিলে যান্নি বা অস্পষ্ট প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত কিন্তু প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যপালনীয় তাকে ওয়াজিব বলে। যেমন - বিতরের নামাজ।

৩। সুন্নত - ফরজ ও ওয়াজিব কাজগুলি ছাড়া রসুল (সাঃ) ও তার সাহাবীগণ যেসব কাজ করেছেন তাকে সুন্নত বলে। সুন্নত দুপ্রকার। যথা -

***সুন্নতে মুআক্কাদাহ - যে কাজ গুলো রসুল (সাঃ) ও তার সাহাবীগণ সবসময় পালন করেছেন ও পালনের জন্য বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন এবং এগুলো পালন করলে বিশেষ সওয়াব হয় ও পালন না করলে গুনাহগার হতে হয় ।যেমন - ফজর,যোহর,মাগরীব ও এশার দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।
***সুন্নতে গায়রে মুআক্কাদাহ - যে কাজ গুলো রসুল (সাঃ) ও তার সাহাবীগণ কখনো পালন করেছেন আবার ছেড়েও দিয়েছেন ও সেগুলো পালনের জন্য তাগিদ দেননি এবং এগুলো পালন করলে সওয়াব হয় ও পালন না করলে কোন গুনাহ নেই । যেমন - আছর ও এশার ফরজ নামাজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত নামাজ।

৪।মুস্তাহাব বা নফল - যে সব কাজ গুলো রসুল (সাঃ) কখনো পালন করেছেন আবার ছেড়েও দিয়েছেন সেগুলোকে মুস্তাহাব বা নফল বলে। এগুলো পালন করলে সওয়াব হয় ও পালন না করলে কোন গুনাহ নেই । যেমন - নফল নামাজ।

৫।হালাল - মুমিনদের জন্য হালাল ও হারাম আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। আল কোরআনে আল্লাহ এই সীমারেখা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন।যেসব জিনিষ ইসলামী শরীয়ত মতে খাওয়া বা ব্যবহার জায়েজ বা বৈধ সেগুলেোকে হালাল বলে। যথা - হালাল ভাবে উপার্জন করা , বিবাহ করা ইত্যাদি। হালাল কাজকে হারাম হিসাবে বিবেচনা করলে কাফের হতে হয়।

৬। হারাম - সেসব কাজ,দ্রব্য ও জিনিষ ইসলামী শরীয়ত মতে নিষিদ্ধ বলে প্রমাণীত তাকে হারাম বলে। যথা - সুদ-ঘুষ খাওয়া , যেনা করা ইত্যাদি।

৭। মাকরুহ - যা সব কাজ করা অন্যায় ও ক্ষতিকারক সেগুলোকে মাকরুহ বলে। মাকরুহ দুই প্রকার । যথা -

*** মাকরুহ তাহরীমি - যে সব কাজ অস্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমানীত তাকে মাকরুহ তাহরীমি বলে। যেমন - নামাজের মধ্যে কপালের ধুলো বালি মুছে ফেলা।
***মাকরুহ তানযীহি - যে কাজ শরীয়ত মতে অসংগত ও অন্যায় এবং যা করলে সগীরা গুনাহ হয় তা মাকরুহে তানযীহি। যথা - নামাজের মধ্যে একপায়ে ভর দিয়ে দাড়ানো।

৮। মুফসিদ - যে সকল কাজে নামাজ,রোজা নস্ট হয়ে যায় তাকে মুফসিদ বলে।যেমন - নামাযের মধ্যে কথা বলা রোযার মধ্যে ইচছাপূর্বক কোন কিছু খাওয়া।

৯। মুবাহ - যে সকল কাজে শরীয়তে কোন আদেশ নেই কিংবা নিষেধও নেই এবং যা করায় কোন গুনাহ-সওয়াব হয়না তাকে মুবাহ বলে।যেমন - পান খাওয়া, ভাল পোষাক পরা ইত্যাদি।

১০। বিদআ'ত - যে বিষয়ে কোরআন-হাদীসে কোন কিছু বলা নেই যে কাজের নমুনা রসুল (সাঃ) বা তাহার সাহাবীগণের ও তাবেঈনদের যুগেও পাওয়া যায়না , তাকে বিদআ'ত বলে। যদি এর ফলে ইসলামের উপকার ও সংরক্ষণ হয় তবে এটি বিদআ'তে হাসান।যথা - মাদ্রাসা ও মক্তব তৈরী করা। আর যদি এর ফলে ইসলামের ক্ষতি হয় তবে এটি বিদআ'তে সায়্যিআহ। এটি করলে গুনাহ হয়।যথা - কবরে বাতি দেওয়া ও দরগায় মানত করা।


ছবি - depositphotos.com

ইসলামী শরীয়ত মতে সওয়াব ও গুনাহ -

১। সওয়াব - যে সব কাজ করতে আল্লাহ পাক আদেশ করেছেন এবং যা করলে তিনি খুশী ও সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, সেগুলো করলে সওয়াব হয়। যেমন - নামাজ পড়া, রোযা রাখা। এক কথায় ,আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানাই সওয়াব ।

২। গুনাহ - যে সব কাজ করতে আল্লাহ পাক নিষেধ করেছেন এবং যা করলে তিনি অখুশী ও অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, সেগুলো করলে গুনাহ হয়। যেমন - নামাজ না পড়া, রোযা না রাখা। এক কথায় ,আল্লাহর আদেশ-নিষেধ না মানাই গুনাহ। গুনাহ দুই প্রকার - যথা -
*** কবীরা গুনাহ - যে সব কাজ ইসলামী শরীয়ত মতে হারাম এবং যার জন্য কঠোর আযাবের কথা বলা হয়েছে, তাকে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ বলা হয়। যথা - আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা,অন্যায়ভাবে কাউকে হ্ত্যা করা,মাতা-পিতাকে কষ্ট দেওয়া, যিনা বা অবৈধ যৌন মিলন করা,কোন মুসলিমকে কাফের বলা।

***সগীরা গুনাহ - যে গুনাহের জন্য শরীয়তে কোন নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারিত হয়নি তাকে সগীরা গুনাহ বা ছোট পাপ বলে।
কবীরা গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ হয়না।তওবা না করলে দোযখের ভয়ানক আযাব ভোগ করতে হবে।সগীরা - কবীরা যাই হোক না কেন ,সকল মুসলমানেরই গুনাহ হওয়া মাত্রই তওবা-ইসতেগফার করা উচিত ।


ছবি - dreamstime.com

তওবা-ইসতেগফার

১। তওবা - তওবা অর্থ হলো ফিরে আসা। মানুষ যখন কোন গুনাহ করে, ভুল পথে যায় বা বিপথগামী হয়, তখন সেখান থেকে সঠিক পথে বা ভালো পথে ফিরে আসাকে তওবা বলা হয়। তওবার পারিভাষিক অর্থ হলো লজ্জিত হওয়া। অর্থাৎ স্বীয় কৃতকর্মে লজ্জিত হয়ে সঠিক পথে ফিরে আসা। তওবার জন্য করণীয় হলো, স্বীয় কৃতকর্মের প্রতি লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া, সেই অপরাধ আর না করার দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্প গ্রহণ করা এবং নেক আমলের প্রতি বেশিমাত্রায় মনোযোগী হওয়া। তওবা সম্পর্কে কোরআনে রয়েছে," হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর—বিশুদ্ধ তাওবা , সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না নবীকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয় আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।"(সুরা তাহরিম, আয়াত - ৮)।

২। ইস্তিগফার - ইস্তিগফার মানে হলো ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ হলেন গাফির-ক্ষমাকারী, গফুর- ক্ষমাশীল, গফফার-সর্বাধিক ক্ষমাকারী। ইস্তিগফার একটি স্বতন্ত্র ইবাদত,কোনো গুনাহ বা পাপ মাফ করার জন্য এই ইবাদত করা হয় না। যেমন-নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি ইবাদত দ্বারা গুনাহ মাফ হয় কিন্তু এসব ইবাদত করার জন্য গুনাহ করা শর্ত নয়। তওবা ও ইস্তিগফার আল্লাহ তাআলার অতি পছন্দের একটি ইবাদত। তাই প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। অনুরূপ ইমানের পর নামাজ প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও এই নামাজ আদায়ের পর তিনবার ইস্তিগফার পড়া সুন্নত। অর্থাৎ ইস্তিগফার শুধু পাপের পরে নয়, ইবাদতের পরেও করা হয়। যেমন হজের পর ইস্তিগফার করা বিষয়ে কোরআনে উল্লেখ আছে, "(হজ শেষে) তারপর তোমরা বেরিয়ে পড়ো, যেভাবে মানুষ চলে যাচ্ছে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। (সুরা বাকারা, আয়াত - ১৯৯)।

ইস্তিগফার সম্বন্ধে কোরআনে আরো বলা হয়েছে, " অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, "(সুরা নূহ, আয়াত - ১০)। এ ব্যাপারে আরো বলা হয়েছে,"তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, নিশ্চয় তিনি তাওবা কবুলকারী"। (সুরা নাসর, আয়াত - ৩)। আরো বলা হয়েছে, " আর আল্লাহ এমন নন যে, আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং আল্লাহ এমনও নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন"। (সুরা আনফাল, আয়াত - ৩৩)।

অর্থ্যাৎ মহান আল্লাহপাক মানুষকে বেশী বেশী তওবা ইস্তিগফার করতে বলেছেন যাতে করে মানুষ তার ক্ষমা লাভ করতে পারে।

সায়্যিদুল ইস্তিগফার -

সাইয়িদুল ইস্তিগফার হলো ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়া। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, " যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এই দো‘আ পাঠ করবে, দিনে পাঠ করে রাতে মারা গেলে কিংবা রাতে পাঠ করে দিনে মারা গেলে, সে জান্নাতী হবে"।(বুখারী শরীফ,মিশকাত শরীফ - হাদীস নং - ২৩৩৫)।

বাংলা উচ্চারণ - আল্লা-হুম্মা আনতা রব্বী লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খালাক্বতানী, ওয়া আনা ‘আবদুকা ওয়া আনা ‘আলা ‘আহদিকা ওয়া ওয়া‘দিকা মাসতাত্বা‘তু, আ‘ঊযুবিকা মিন শার্রি মা ছানা‘তু। আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা ‘আলাইয়া ওয়া আবূউ বিযাম্বী ফাগফিরলী ফাইন্নাহূ লা ইয়াগফিরুয্ যুনূবা ইল্লা আনতা।

বাংলা অর্থ- "হে আল্লাহ! তুমি আমার পালনকর্তা। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমার দাস। আমি আমার সাধ্যমত তোমার নিকটে দেওয়া অঙ্গীকারে ও প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট হ’তে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আমার উপরে তোমার দেওয়া অনুগ্রহকে স্বীকার করছি এবং আমি আমার গোনাহের স্বীকৃতি দিচ্ছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ব্যতীত পাপসমূহ ক্ষমা করার কেউ নেই"।

তওবার দোয়া - আস্‌তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি যামবিও ওয়া আতুবু ইলাইহি ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আ'লিয়্যিল আ'যীম বাংলা অর্থ।

বাংলা অর্থ- আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই আমার সব পাপের, আমি তাঁর কাছে ফিরে (তওবা করছি) আসি। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার ও নেক কাজ করার কোনোই শক্তি নেই। (মুসলিম ও তিরমিজি)।

ভাল ও খারাপ (তাকদীর) কাজের জন্য আল্লাহর সাহায্য ও সকল ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন -

ভাল-খারাপ সব আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত । ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী মানুষের ভাগ্য তার জন্মের পূর্বেই নির্ধারিত হয়ে যায় এবং শরিয়ত মোতাবেক ভাগ্যে বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। এ ব্যাপারে বিশদ - " ধর্মহীনতা' বা স্রষ্টায় অবিশ্বাস দোষনীয় নয় এটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার " - তবে কারো ধর্মানুভূতিতে বা কাউকে আঘাত করে নাস্তিকতা নয়।
লিংক -
Click This Link

তাকদিরের চার স্তর

ভাগ্যে বিশ্বাসের মোট চারটি স্তর রয়েছে। যথা—

১। জ্ঞান তথা এই বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে,"নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়"(সুরা নিসা, আয়াত - ১১)।
২। ভাগ্যলিখন তথা এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তাআলা লাওহে মাহফুজে সব কিছুর ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।আল কোরআনে বলা হয়েছে," আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে(১); নিশ্চয় তা আল্লাহর নিকট অতি সহজ।" ’ (সুরা হজ, আয়াত - ৭০)।
৩। ইচ্ছা অর্থাৎ আসমান ও জমিনে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই হয় না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, "নিশ্চয় আমি প্রত্যেক বস্তুকে সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে "। (সুরা কামার, আয়াত - ৪৯)।
৪। সৃষ্টি ,তাহলো আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর সৃষ্টি। মহান আল্লাহ বলেন, " যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্ত্বে তার কোন শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে"। (সুরা ফোরকান, আয়াত -২)।

আর ধর্মের বিধি-নিষেধ তথা ধর্ম পালনের ব্যাপারে সুরা কাফিরুন,আয়াত - ১ বলা হয়েছে, " বলুন, হে কাফিররা!,আমি তার ইবাদাত করি না যার ইবাদাত তোমরা কর,এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদাত তোমরা করে আসছ।এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী হবে না যাঁর ইবাদত আমি করি ।তোমাদের দ্বীন (শিরক) তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন (ইসলাম) আমার জন্য।। (সুরা কাফিরুন,আয়াত - ১ - ৬) ।

ইসলামে এ সূরার গুরুত্ব অনেক। মহান আল্লাহ পাক এ সূরায় সব কাফিরদের বুঝিয়েছেন যে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা জানতেন তারা কাফের হয়েই মরবে। তাদের মৃত্যুও শিরক অবস্থায় হবে। নবী (সাঃ) বলেন, "মহান আল্লাহ যদি তোমাদের জন্য হিদায়াত না লিখে থাকেন তাহলে তোমরাও আল্লাহর হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হবে"। দুনিয়াতে যে যেভাবেই যত চেষ্টা করুন না কেন প্রতিটা মানুষের জন্য হিদায়াত কিংবা গোমরাহী আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।

হিদায়াত ও গোমরাহী-

হিদায়াত আরবী শব্দ,এর বাংলা অর্থ পথপ্রদর্শন। ইসলামী শরিয়ত মতে যে পথ রাসুল ও তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে সেটাই সঠিক পথ। কোরআনে বর্ণিত হিদায়াত শব্দের অর্থ "কাউকে গন্তব্যস্থানের দিকে অনুগ্রহের সঙ্গে পথ প্রদর্শন করা"। তাই ‘হিদায়াত করা’ প্রকৃত অর্থে একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কাজ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, " তিনি যাকে চান বিপথগামী করেন এবং যাকে চান সঠিক ও সোজা পথে পরিচালিত করেন" (সুরা আল আনয়াম, আয়াত - ৩৯)।

আল-কুরআনে বারবার মানুষের অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজসমূহকে হিদায়াত ও গোমরাহীর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, এখানে অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজসমূহকে হিদায়াত পাওয়ার দাবীদার করা হয়েছে ।হিদায়াতের মতো গোমরাহীকেও একইভাবে বলা যায়। মানুষের জীবনে ভালো আমলসমূহ হিদায়াতের ফলাফল। ভালো কাজ যত বেশি হবে হিদায়াতও তত বেশি পাবে। এমনিভাবে পাপ কাজ যত বেশি হবে গোমরাহীও তত বেশি হবে। কেননা আল্লাহ ভালো কাজ পছন্দ করেন, তাই সৎকর্মশীলকে হিদায়াত এ সফলতা দান করে পুরস্কৃত করেন। তিনি পাপ কাজ অপছন্দ করে এবং পাপাচারীকে গোমরাহী ও দুঃখ-কষ্ট দিয়ে তাকে শাস্তি প্রদান করেন।

আল্লাহ উত্তম, তাই তিনি উত্তম ও সৎকর্মশীলকে ভালোবাসেন। তাদের সৎকর্ম অনুযায়ী তিনি তাদের অন্তরসমূহকে তাঁর নিকটবর্তী করেন। আবার তিনি যেহেতু অসৎ কাজ ঘৃণা করেন, ফলে অসৎ কাজের পরিমাণ অনুযায়ী তিনি তাদের অন্তরসমূহকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দেন। প্রথম মূলনীতি হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী," আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত"। (সূরা বাকারা, আয়াত - ১-২)।

দ্বিতীয় মূলনীতি, পাপাচার, অহংকার, মিথ্যাচার ইত্যাদি গোমরাহীর কারণ, এ ব্যাপারেও আল-কুরআনে অনেক আয়াত এসেছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন," নিশ্চয় আল্লাহ মশা কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোন বস্তুর উপমা দিতে সংকোচ বোধ করেন না।অতঃপর যারা ঈমান এনেছে তারা জানে যে, নিশ্চয় এটা তাদের রব-এর পক্ষ হতে সত্য। কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা বলে যে, আল্লাহ কি উদ্দেশ্যে এ উপমা পেশ করেছেন? এর দ্বারা অনেককেই তিনি বিভ্রান্ত করেন, আবার বহু লোককে হেদায়াত করেন। আর তিনি ফাসিকদের ছাড়া আর কাউকে এর দ্বারা বিভ্রান্ত করেন না ।যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়,তারাই ক্ষতিগ্রস্ত"।( সূরা বাকারা, আয়াত - ২৬-২৭)। এ ব্যাপারে আল্লাহ আরও বলেছেন,"আর তারা বলেছিল, ‘আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত’, বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। সুতরাং তাদের কম সংখ্যকই ঈমান আনে"।

জান্নাত ও জাহান্নাম

জান্নাত অর্থ ঘন সন্নিবেশিত বাগান, বাগ-বাগিচা। ইসলামী পারিভাষায় জান্নাত বলতে এমন স্থানকে বোঝায়, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। যা দিগন্ত বিস্তৃত নানা রকম ফুলে ফুলে সুশোভিত সুরম্য অট্টালিকা সম্বলিত মনোমুগ্ধকর বাগান; যার পাশ দিয়ে প্রবাহমান বিভিন্ন ধরনের নদী-নালা ও ঝর্ণাধারা। যেখানে চির বসন্ত বিরাজমান। জান্নাত চিরশান্তির জায়গা। সেখানে আরাম- আয়েশ, সুখ-শান্তি, আমোদ-প্রমোদ, চিত্ত বিনোদন ও আনন্দ-আহলাদের চরম ও পরম ব্যবস্থা রয়েছে।ক্ষণস্থায়ী এ মানব জীবনে যারা মহান আল্লাহপাকের আদেশগুলি যথাযথ পালন করবেন , নিষেধগুলি বর্জন বা ত্যাগ করে শরিয়ত নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করবে এবং শেষবিচারের দিন যাদের আল্লাহপাকের রহমত,ক্ষমা ও মাগফেরাত লাভ নসীব হবে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে জান্নাত এবং তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।জান্নাতে কোন দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। এ ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে, " তারা সেখানে কখনও কোন দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হবে না এবং কোনদিন সেখান থেকে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে না" (সূরা হিজর,আয়াত - ৪৮)"। মহান আল্লাহপাক মুমিনদের জন্য ৮ টি জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন। এদের মধ্যে জান্নাতুল ফিরদাউস সবচেয়ে সেরা।এ ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে, " নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের আতিথেয়তার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখান থেকে তারা স্থানান্তরিত হতে চাইবে না"।(সুরা আল কাহফ, আয়াত - ১০৭-১০৮)। মহান আল্লাহপাক আমাদের সকলকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।


জাহান্নাম হচ্ছে পরলোকের নানা রকমের অসহনীয় যন্ত্রণার বিশাল কারাগার যা একটি বিশাল এলাকা যেখানে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন এলাকা নির্ধারিত আছে।। চির দুঃখ-কষ্ট-পেরেশানী, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপমান, বিড়ম্বনা, দুর্ভাগ্য, লজ্জা-শরম, ক্ষুধা-পিপাসা, আগুন, অশান্তি, হতাশ-নিরাশা, চীৎকার-কান্নাকাটি, শাস্তি, অভিশাপ, আযাব-গযব ও অসন্তোষের স্থান হলো জাহান্নাম। শান্তির লেশমাত্রই সেখানে নেই। হাত-পা ও ঘাড়-গলা শিকলে বেঁধে বেড়ি পরিয়ে দলে দলে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করা হবে। যেখানে শুধু অতিবেশি তেজ ও দাহ্য শক্তিসম্পন্ন আগুন ছাড়া আর কিছু নেই। দোযখের অগ্নিশিখা তাদেরকে উপর, নীচ এবং ডান ও বাম থেকে স্পর্শ করবে, জ্বালাতে-পোড়াতে থাকবে। একবার চামড়া পুড়ে গেলে আবারো নুতন চামড়া গজাবে যেন বার বার আগুনের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। পিপাসায় প্রাণ পেটের নাড়ি-ভূঁমি গলে যাবে। এ হচ্ছে, আজাবের উপর আযাব। তাতে পিপাসা না কমে আরো তীব্র হবে। অতি দুর্গন্ধময় যাক্কুম এবং কাঁটাযুক্ত ঘাস ও গিসলিন হবে তাদের খাদ্য। ক্ষুধার তাড়নায় জঠর জ্বালায় তা ভক্ষণ করতে গেলে পেটের ভেতরে আরো যন্ত্রণা বাড়াবে। খাদ্য এবং পানীয় হবে আযাবের অন্যতম উপকরণ। ক্ষণস্থায়ী এ মানব জীবনে যারা মহান আল্লাহপাকের আদেশগুলি যথাযথ পালন করবেনা , নিষেধগুলি বর্জন বা ত্যাগ না করে নিজের খেয়াল খুশিমত জীবন যাপন করবে এবং শেষবিচারের দিন যারা আল্লাহপাকের রহমত,ক্ষমা ও মাগফেরাত লাভ করতে ব্যর্থ হবে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে জাহান্নাম এবং তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।সেখানে প্রতি মুহূর্তে তারা তাদের মরণ কামনা করবে তবে তারা মরবেনা। এ ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে,"নিশ্চয় জাহান্নাম ওৎ পেতে অপেক্ষমান,সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে"।(সূরা নাবা,আয়াত - ২১-২৩)। আল্লাহপাক পাপীদের জন্য ৭ টি জাহান্নাম তৈরী করে রেখেছেন।মহান আল্লাহপাক আমাদের সকলকে জাহান্নামের আযাব-গযব থেকে হেফাযত করুন।

আমাদের সবার জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহপাকের ক্ষমা ও সন্তুষ্ঠি অর্জন। এর জন্য আমাদের দরকার শরীয়ত নির্দেশীত মত ও পথ অনুসরন। মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পথে ও ঈমানের সাথে পরিচালিত করুন এবং আমাদেরকে হিদায়াত নসীব করুন। নসীব করুন ইসলামি শরীয়ত মতে পরিপূর্ণ ও সৎ জীবন যাপনের এবং সুযোগ প্রদান করুন ধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলার । সামর্থ্য ও সুযোগ প্রদান করুন অন্যের প্রতি এবং অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল আচরন ও শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করার। এই হোক পবিত্র মাহে রমজানে আমাদের সকলের অংগীকার।

তথ্যসূত্র - আল কোরআন,হাদীস ।
==================================================================

পূর্ববর্তী পোস্ট -

ঈমান ও আমল - ১৫ Click This Link
" পবিত্র মাস মাহে রমজান " - রহমত-বরকত-মাগফেরাতের এই মাসে কিছু আমলের অভ্যাস আমাদের সকলেরই করা উচিত।
ঈমান ও আমল - ১৪ Click This Link
" পবিত্র মাহে রমজান " - মাহে রমজানের ঐতিহাসিক পটভূমি , গুরুত্ব ও মর্যাদা ।
ঈমান ও আমল - ১৩ Click This Link
" পবিত্র মাস রজব " - রজব মাসের ফজিলত এবং আমল (করণীয়) ও বর্জনীয় ।
ঈমান ও আমল - ১২ Click This Link
" দোয়া " কি এবং কেন ? কাদের জন্য দোয়া শুধু ধোঁয়া বা কাদের দোয়া কবুল হয়না ?
ঈমান ও আমল - ১১ Click This Link
" পবিত্র ও সম্মানিত মাস মহরম " - হিজরি সনের প্রথম মাস এবং পবিত্র আশুরা ।ইসলামে আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আশুরার দিনে করণীয় ও বর্জনীয় ।
ঈমান ও আমল -১০ Click This Link
("পবিত্র মাস জিলহাজ্জ"-জিলহাজ্জের প্রথম দশ দিন মুসলমানদের নিকট বছরের সেরা দশদিন-ঈমান ও আমলের জন্য)।
ঈমান ও আমল - ৯ Click This Link
(" শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা " - যা সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব হাসিলে সাহায্য করে। পবিত্র রমজানের পর যা সকল মুসলমানেরই রাখা উচিত)।
ঈমান ও আমল - ৮ Click This Link
(আজ পবিত্র " লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত "। মহিমান্বিত এ রজনীতে মুসলমানদের করণীয় ।)
ঈমান ও আমল - ৭ Click This Link
("যাকাত " ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যা আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ ছওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির ও প্রতিশ্রুতি দেয়)।
ঈমান ও আমল - ৬ Click This Link
("রোযা" ইসলামের তৃতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যার বিনিময় বা প্রতিদান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন নিজেই দিবেন)।
ঈমান ও আমল - ৫ Click This Link
(" নামাজ " ইসলামের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ । যা মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে পার্থক্যকারী সূচক হিসাবে বিবেচিত এবং মুসলমান মাত্রই দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে)।
ঈমান ও আমল - ৪ Click This Link
("ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ"- যার শুরুটা কালেমা বা ঈমানে। যা শুধু মুখে বলা নয়,অন্তরে বিশ্বাস ও কর্মে পরিণত করার বিষয়)।
ঈমান ও আমল - ৩ Click This Link
(তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব )।
ঈমান ও আমল - ২ Click This Link
("শুক্রবার - পবিত্র জুমা"- মুসলমানদের জন্য এক মর্যাদা ও ফজিলত পূর্ণ দিন এবং জুমার দিনের কতিপয় আমল )।
ঈমান ও আমল - ১ Click This Link
(যেসব আমলে মানুষের অভাব দূর হয় ও জীবন সুখের)
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২২ দুপুর ১:৩৮
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতা এবং আবৃত্তি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৪১

কবিতা এবং আবৃত্তি.....

আমার কাছে লেখালেখির জগতে কবিতা লেখা হচ্ছে সব চাইতে কঠিন, যা লিখতে মেধার বিকল্প নাই। একজন সাহিত্যিক-উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার যা লিখতে অনেক পৃষ্ঠা, কিম্বা একটা বইতে প্রকাশ করেন-... ...বাকিটুকু পড়ুন

" বাবা জানে :#( বাবা কে "?

লিখেছেন মোহামমদ কামরুজজামান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ দুপুর ১:১৮


ছবি -india.com

ওপার বাংলার জনপ্রিয় সংসদ সদস্যা, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নুসরাত জাহান মা হওয়ার পরে যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশী, তা হলো -"তার সন্তানের বাবা কে"?

সন্তানের পিতৃপরিচয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমেন্ট ক্ষমতা না'থাকলে, ব্লগিং করা কি সম্ভব?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:১৩



মাস দুয়েকের মতো বড় ধরণের জেনারেল পদে আছি, বোনাস হিসেবে কমেন্ট ব্যান; শুরুতে খুব একটা মনে থাকতো না যে, আমি কমেন্ট ব্যানে আছি, ব্লগারদের পোষ্ট পড়ে কমেন্ট করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইডেনের ছাত্রীদের বিয়ে হপেনা। এখন তাগো কি হপে?

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ৯:০৯


কতিপয় দুষ্ট ছাত্রলীগ ইডেনের কিছু ছাত্রীকে বিভিন্ন মহলের মনোরঞ্জনের জন্য পাঠিয়েছে। ফোনালাপ বা অন্যন্য ডকুমেন্ট দেখে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেসে। এটি অত্যন্ত ঘৃণ্য। এ কাজের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে কোন বনের হরিণ ছিলো আমার মনে- ৯

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ৯:২৪



নৌকা চলতেই খোকাভাই খানিক দূরে গলুই এর উপর বসে হাতের আড়ালে হাওয়া আটকে সিগারেট ধরালো। তারপর পোড়া দিয়াশলাই কাঁঠিটা ছুড়ে ফেললো পানিতে। কাঁঠিটা পানির তালে তালে দোল খেয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×