খুব ভোরে দৈবত সমুদ্রের পার ঘেষে হাটতে থাকি। ভাটার টানে উত্তরসাগরের ছোট ছোট ঢেউয়ে একরমর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ দ্যোতনার সৃষ্টি করে। আমি মেপে মেপে হাটি। কিছু দূরের ম্যাকডোনাল্ট সারারাত খোলা থাকে। ভোরের আলোয় শিফট চেন্জ করা সতেজ ক্রুমেম্বারদের হাসি আর এগমাফিনের সাথে ক্যাপাচিনোর উৎফুল্লতা নিয়ে আবারও উঠে পড়ি সকালের সমুদ্রযাত্রায়। দিগন্তে তখন শাদা- রুপালী আলোর বিভ্রম। মনে হয় ওখানে একটি পারদের মতো দ্বীপ; আকাশের অলিন্দের ভাগ-বাটোয়ারা করছে নূরের নকশা।
কোন বৃদ্ধ ঘাড গুজে এগিয়ে যাওয়ার সময় সুপ্রভাত বলে হেসে উঠে সহসা। আর তারপর বরফের মতো নি:স্তব্ধতা।
আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সারিবদ্ধ কাঠের পাটাতনে বসে পড়ি। ভোরের শিশির মৃদ্যু ভিজিয়ে দেয় আমার পরিধেয় ট্রাউজারটি। আমি সারারাত্রীর শীতলতা মেখে নেই। সমুদ্রচিলের একটানা আহ্বান মনে করিয়ে দেয়: বাতাসের সুরভি আর ভোরের স্নিগ্ধতার অন্য এক ব্যাকরণ আছে।
দূরে একটি সমূদ্রগামী জাহাজের মাস্তুল দেখা যায়। দু’একটি ছোট নৌকার মতো স্প্রিডবোট। লালচে নিশানা। তিনভাগে ভাগ হওয়া পানির স্তর।
হঠাৎ কখনও আমার মনে হয়, আমি মেঘনার অববাহিকায় বসে আছি। জেলে নৌকা আর ভোরের আলোকস্তম্ভের মুখোমুখি। পাল তোলা সারিবদ্ধ নৌকার গলুইয়ে- রেশমের মতো নরোম উষ্ণতায়!
গামছা পরা আদুল গায়ের জেলের দল আমাকে দেখছে বিষ্ময়ে- দু’একটি ডাহুক আর পানকৌড়ির সম্মিলনে।
মানুষের এই এক ক্ষমতা। একাকার করে দিতে পারে দ্রাঘিমার মাপজোক। অতীত আর বর্তমানের সীমানায় তার কোন কাটাতারের দেয়াল নেই- উত্তরসাগর আর মেঘনা যেন সহোদরা, দু’বোন!
নষ্টালজিয়ার যে মোহ আমাকে এখানে আনে প্রায়শ: তার গল্প আমি কখনও করতে পারি না কাউকে। আকাশের যে অপার্থিব পরিধী তার অতলে শুধু দিকবিদিক ছডিয়ে দেই কাল্পনিক অনুরণন।
একসময় ফুরিয়ে যায় আমার প্রাত:ভ্রমণের সষ্ণয়। সময় আমাকে তীর্যক রোদ্দুরের প্লাবিত করে জানিয়ে দেয়, প্রত্যাহিক লেনাদেনার সালতামামী। আমি ক্যাপাচিনোর কাপটি ডাষ্টবিনে ফেলে মুছে ফেলি ইলিশের গন্ধ। ঝাঝালো সার্ডিনের স্বাদে কবে ভুলে গিয়েছি বোয়ালের আস্বাদ! একাকী বেচে থাকার অভিনব সব কায়দা ভেবে ভেবে বের করেছি আর ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি সবুজাভাব এক বদ্বীপের স্বপ্ন!
আসলেই কি মানুষ পারে! যে দ্রাঘিমার পরিধী একাকার করে সে কি ভুলতে পারে দোআশলা স্মৃতির সোদা রোমান্থন! মানুষ কি আসলেই একা হতে হতে, নির্জনতায় জনারণ্যের চাষ করে!
এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমার আরও একটা ভোরসকাল দরকার, ভাববার!!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




