somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে সিনেমাটি বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আরো মানবিক করে তুলবে

২৩ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




কারুপ্পু দুরাই নামের আশি বছর বয়স্ক লোকটি আজ তিন মাস যাবত কোমায় শয্যাশায়ী। বাড়িতে একটি ছোট খাটের উপর নিথর পড়ে আছে তার দেহ। তার তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। এ পর্যন্ত তার চিকিৎসার পেছনে তারা বহু অর্থব্যয় করেছে কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ছেলেরা কিংবা তাদের স্ত্রীরা কেউই আর এ বৃদ্ধের দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। তাই শেষমেষ কারুপ্পু দুরাইয়ের সন্তানেরা ‘থালাইকুথাল’ প্রথানুযায়ী তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারপর তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে তারা।

রাতে তাকে মেরে ফেলার বিষয়টি নিয়ে ছেলেমেয়েরা আলাপ করছে। তার ছোট মেয়ে সিলভি কেঁদেকেটে তার ভাইদের কাছে বাবার জীবন ভিক্ষা চাইছে। ঠিক এমন সময় জ্ঞান ফেরে কারুপ্পু দুরাইয়ের। আস্তে আস্তে হেঁটে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সে শুনতে পায় তার প্রিয় সন্তানদের নিষ্ঠুর পরিকল্পনার কথা। প্রচণ্ড কষ্টে অসুস্থ আর অভুক্ত অবস্থায় তখনই নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় সে। আর এরই সাথে শুরু হয়ে যায় কে ডি (K.D.) নামক সিনেমাটির গল্প।

ঠিক গল্প নয়, সত্যি। ২০১০ সালে তামিল নাড়ুর ভিরুধুনগর থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ এক ব্যক্তি তার পরিবারের হাতে এভাবে ‘হত্যা’ হওয়ার কথা জানতে পেরে পালিয়ে যান। সেই ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই বানানো হয়েছে কে ডি নামের এই তামিল ভাষার সিনেমাটি। পরিচালকের নাম মধুমিতা।

অদ্ভুত শোনালেও তামিল নাড়ুর দক্ষিণাঞ্চলে বয়স্ক মানুষদের মেরে ফেলার ‘থালাইকুথাল’ নামক একটি প্রথাটি চালু ছিল। পরিবারের সদস্যরাই কখনো দারিদ্র্যের অযুহাতে, কখনোবা সম্পত্তি হাতে আনার জন্য বাড়ির বয়োবৃদ্ধ কর্তা ব্যক্তিকে থালাইকুথাল রীতি অনুসরণ করে মেরে ফেলত। এজন্য প্রথমে খুব ভোরে বয়স্ক লোকটির সারা শরীরে ও মাথায় তেল ডলে তাকে ‘তৈলস্নান’ করানো হতো। এরপর পর্যায়ক্রমে তাকে দশ থেকে বারোটি কচি ডাবের পানি খাওয়ানো হতো। এতে করে তার শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে স্বাভাবিকের অনেক নিচে নেমে যেত। এবং বয়স্ক শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় কিডনি-ফেইলিয়র, উচ্চমাত্রার জ্বর, ইত্যাদিতে লোকটি এক থেকে দুইদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতো। এ উপলক্ষে মোটামুটি একটা ঘরোয়া উৎসবের আয়োজন করতো পরিবারের অনান্যরা। সামাজিক রীতি হিসেবেই এই ‘থালাইকুথাল’ পালিত হতো তামিল নাড়ুর দক্ষিণের অনেক অঞ্চলে। যদিও পরবর্তীতে সরকার এটাকে অবৈধ ঘোষণা করে।

নিষ্ঠুর অমানবিক এই বিষয়টিকেই দর্শকের সামনে তুলে এনেছেন পরিচালক মধুমিতা তার কে ডি সিনেমাটির মাধ্যমে।

বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রবীণ মানুষেরা বেশিরভাগ সময়ই অবহেলিত। বিশেষ করে তাদের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সন্তানেরা ভাবতে চান না। সবাই নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও সংসার নিয়ে সুন্দর ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ সময় বিয়ের পর বাবা-মাকে ছেলেমেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জীবন উপভোগের অন্তরায় বলে মনে করে থাকে। ফলে পিতামাতার সাথে সন্তানদের অবস্থানগত এবং একই সাথে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়। পিতামাতা বৃদ্ধ হলে তাদেরকে দেখাশোনা করার কেউ থাকে না। সন্তানেরা শুধু মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়েই সব দায়িত্ব শেষ করতে চান। বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রবীণ মানুষদেরকে সম্পদ হিসেবে তো দূরের কথা, তাদেরকে সাধারণ মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার মানসিকতাও অনেকের মধ্যে তৈরি হয় না। এর অন্যতম একটি কারণ সঠিক মূল্যবোধের অভাব ও পিতামাতার চিন্তাভাবনা, চাওয়া-পাওয়ার সাথে তাদের সন্তানদের চিন্তাভাবনা, চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্য। পরবর্তীতে দেখা যায়, সন্তানদের তাদের পিতামাতার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন হয় পিতামাতার জীবনের শেষ মুহুর্তে সম্পত্তি বণ্টনের সময়।

যাহোক, সিনেমার গল্পে ফেরা যাক। কারুপ্পু দুরাই বাড়ি থেকে পালিয়ে হেঁটে, তারপর বাসে করে উপস্থিত হয় নতুন একটি জায়গায়। ঘুরতে ঘুরতে একসময় একটি মন্দিরে তার পরিচয় হয় কুট্টি নামের আট বছরের এক বালকের সাথে। পিতৃমাতৃহীন এই ছেলেটির একরোখা স্বভাব আর স্বতঃস্ফুর্ত কথাবার্তা ভালো লাগে কারুপ্পু দুরাইয়ের। ক্রমে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। কারুপ্পু দুরাই হয়ে ওঠে কে ডি। অন্যদিকে, দুরাইয়ের ছেলেরা তাদের অঞ্চলের এক দুঁদে গোয়েন্দাকে ভাড়া করে তাকে খুঁজতে। কারণ, সম্পত্তির দলিলে দরকার বাবার হাতের টিপসই।

সমস্ত জীবন ধরে যে সন্তানদের কারুপ্পু দুরাই বড় করে তুলেছে, তারাই আজ তাকে হত্যা করতে চায় সম্পত্তির অধিকার পেতে। সে অসুস্থ হতে পারে, কিন্তু সবকিছুর পরেও সে তো তার সন্তানদের বাবা। তাদেরকে বড় করে তুলতেই তো সারাজীবন পরিশ্রম করেছে সে। আর এখন তাদেরই কারণে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। এই অবর্ণনীয় দুঃখ আর হতাশার মধ্যে কুট্টি নামের ছোট্ট ছেলেটির সান্নিধ্য যেন মরুভূমির মধ্যে এক পশলা বৃষ্টির মতো। আমরা দেখতে পাই, কুট্টিকে সাথে নিয়ে নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও কারুপ্পু দুরাই যেন আবার নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠে। আট বছরের কুট্টিই তাকে দেখতে শেখায় নতুন এক জীবনকে, যা বিগত আশি বছর তার অদেখা ছিল। সেই সাথে আমরা দর্শকেরাও জড়িয়ে যাই এই সংবেদনশীল প্রবীণ মানুষটির জীবনের সাথে, যার সবচেয়ে পছন্দের খাবার মাটন-বিরিয়ানি। কুট্টিকে সাথে নিয়ে আমরাও বেরিয়ে পড়ি নতুন এক জীবন ও জীবনবোধের সন্ধানে।

অনেক পথ পাড়ি দিয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে যে মানুষ, সে আসলে কি চায়? কতটুকু প্রত্যাশা বাকী থাকে জীবনের কাছে? সন্তান ও স্বজনদের কাছে? জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন কিছু কি আবিস্কৃত হবে? নতুনভাবে উপভোগ করা যাবে কি প্রতিদিনকার একঘেয়ে এই জীবনকে? জীবনের শেষ সময়টাকে নিয়ে কিংবা যে মানুষগুলো সে সময়টা পার করছেন তাদেরকে নিয়ে, আমাদের কি নতুন করে ভাবা উচিত?

কে ডি নামের ১২৩ মিনিটের এই তামিল সিনেমাটি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে। জীবনের দুটি পৃথক সময়কে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখতে চেয়েছে এর অন্তর্গত রসায়ন। একদিকে আশি বছর বয়স্ক বৃদ্ধ, অন্যদিকে আট বছর বয়সের একটি ছোট্ট ছেলে। জীবনের এই দুই বিপরীত মেরুকে একসাথে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন পরিচালক মধুমিতা।

অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আর দুর্দান্ত স্টোরিটেলিং – সবমিলিয়ে কে ডি একটি অনবদ্য সিনেমাটিক-এক্সপেরিয়েন্স দেবে আপনাকে। আর সেই সাথে বদলে দেবে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। এবং এটি অত্যন্ত জরুরী; কারণ আপনি না চাইলেও জীবনসায়াহ্নের বিশেষ সময়টা আপনাকে পাড়ি দিতেই হবে। আর তাই যারা এখন পাড়ি দিচ্ছে জীবনের শেষ অধ্যায়, তাদের প্রতি আপনার মানবিকবোধ জাগ্রত হওয়া আবশ্যক।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৭
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালো মানুষ

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ১:০৩



দেশ ভাগের আগের কথা।
মোয়াজ্জেম হোসেন মাসের অর্ধেকের বেশি সময় থাকেন কলকাতায়। কলকাতায় তার বিরাট ব্যবসা। নিউজ প্রিন্ট কাগজের ব্যবসা। নিজের তিনতলা বাড়ির নীচ তলা ব্যবসার কাজে ব্যবহার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয় বাংলাদেশ - ছবি ব্লগ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৩০



বিজয়ের গান
সব কটা জানালা
----------------------------------------------------------------------
সব কটা জানালা খুলে দাও না,
আমি গাইবো গাইবো বিজয়ের-ই গান
ওরা আসবে চুপি চুপি,
যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ।
----------------------------------------------------------------------
সুরকারঃ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল
গীতিকারঃ নজরুল ইসলাম বাবু
শিল্পীঃ সাবিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের জন্য উপহার , আমার লেখা দুখানি বই

লিখেছেন শাহ আজিজ, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:০১





গেল ফেব্রুয়ারিতে বই দুখানি মেলায় বেরুল ভিন্নচোখ প্রকাশনীর মাধ্যমে । আমার একক প্রথম প্রয়াস । ৭১ সালে আমি ১৪ বছরের তরুন , বিপ্লবী এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

নন্দিনী

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:১৫



তুমি আমার কাছে কি চাও নন্দিনী?
বারবার কেন আমার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চেষ্টা করছো?
দেখো, আমি সাংসারিক মানুষ। বউ বাচ্চা আছে।
এরকম করো না। প্লীজ। এসব ভালো নয়।

তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মা

লিখেছেন বিএম বরকতউল্লাহ, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৪৯


ব্যথায় তুমি জল ফেলিবার আগে
কার সে চোখে বহে জলের ধারা
তোমার দুখে কে বা উঠে কেঁদে
কষ্টে তোমার হয় যে দিশাহারা!



না খেয়ে মা কোঁচড় ভরে ভিক্ষে করা ভাতে
ইচ্ছে করে ছেলের মুখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×