
বাবা ডেকেছেন, হঠাৎ সম্বিত ফিরে পাবার মতো একটু ঝাকুনী দিয়ে উঠলো।
হ্যাঁ এদিকে আসো।
একটু আস্তে আস্তে বাবার নিকটে আসলো সে। বিশেষ কারণ ছাড়া বাবা যে ডাকেন না-তা সে ভালোভাবেই জানতো এবং বাড়ীর আলোচ্য আবহ যে তাকে ঘিরে সে ব্যাপারে সে অনেকটা নিশ্চিত। তাই মানসিক প্রস্তুতি একরকম হয়েই আছে তার।
কোথায় যাবে ঠিক করেছো-
না বাবা এখনও ঠিক করিনি-
কবে যাবে-
আগামী পরশুদিন।
হঠাৎ এরকম Decision নেবার কারণ কি?
বাবা একঘেঁয়েমী জীবন বড় ক্লান্ত লাগে। অজানা এক সুন্দর আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়ায়। আমি সদাই বিচলিত, মনকে প্রবোধ দিতে পারি না। সিদ্ধান্ত বাবু একদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন ঔরসজাত সন্তানের দিকে। তার চাহনিতে কেমন যেনো অবচেতনার ভাব আছে, অতীত রোমন্থনে বৈচিত্রের গন্ধ আছে। অপলকে পুলক চাহনি-যাকে বলে অবচেতন দৃষ্টি।
জানো পৃথক, জীবন গড়ে তোলা আর জীবনকে উপভোগ করা এক কথা নয়। জীবন না গড়েও জীবনকে উপভোগ করা যায়-তবে তাতে পূর্ণতা নেই। মানুষ তিন ভাবে জীবনকে উপভোগ করে-
১। নিজস্ব গন্ডীবদ্ধতায়
২। অপব্যয়ে
৩। আত্মার আত্মমিলনে
একটু ব্যাখ্যা করলে বুঝতে সুবিধা হতো বাবা, বেশ সারগর্ভ মনে হচ্ছে-
তাহলে শোন প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব গন্ডী আছে। মাতা-পিতা, স্ত্রী পুত্র নিয়ে রচিত হয় তার নিজস্ব গন্ডী-সংসার জীবন। প্রেম -ভালবাসা আর মায়ার দূর্নিবার আকর্ষণে মানুষ বন্দী থাকে সংসার নামে অদৃশ্য কারাগারে। এর সাথে যোগ হয় প্রতিষ্ঠা আর বৈষয়িক সম্পদ। দুই চাকায় ভর করে সারাজীবন ছুটে চলে এই অপ্রাপ্তির পথযাত্রায়। সুখ ভোগের নাটকীয়তায় স্বার্থপরের মতো উপভোগ করে জীবনকে।
বাবা কিছু মনে করবে না, তুমি একে স্বার্থপরতা বলছো কেন? কিছু কিছু মানুষ আছে যারা নিঃস্বার্থভাবে সংসারে শুধু বিলিয়ে যায়, প্রাপ্তির আশা তাদের থাকে না।
ভুল বুঝেছ পৃথক, আমিত্বের দেয়াল দিয়ে তৈরী কারাগারে আসলে আমি ছাড়া কেউ নেই। অধিকাংশের কথা বলছি নে, দু-একজন নিঃস্বার্থ ব্যক্তির কথাই ধরো না কেনো - প্রচন্ড ভালবাসায় নিজেদের কেমন দায়বদ্ধ করে রেখেছে আপনজনের কাছে। গুটিকয়েক আপনজনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে উৎসর্গ
করে জীবনকে উপভোগ করে। কিস্তু নীরবে অবহেলা করে বাইরের জগতকে-স্বার্থপরতা যেখানে আশ্রয় নেয় বড় সঙ্গোপনে।
অসাধারণ বলেছ বাবা আমি এ সত্যটা সত্যিই জানতাম না। আর অপব্যয়----
অপব্যয় হলো ভোগ লালসায় জীবনকে উপভোগ করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
অপব্যয়ের সাথে স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই না বাবা, কারণ স্বার্থপর মানুষেরা অপব্যয় করে নিজের সুখের জন্য।
ভুল পৃথক, অপব্যয়কারীরা আসলে স্বার্থপরতা কিংবা স্বার্থত্যাগকারী কোনটার মধ্যেই পরে না। তারা আসলে স্ব-ধ্বংসকারী। নিজেদের ধ্বংস করে তারা পায় পরম তৃপ্তি। স্বার্থপর হতে হলে নিজেকে ভালোবাসতে হবে। একজন সচেতন ধূমপায়ী যখন ধূমপান করে তখন কি তাতে স্বার্থের বালাই থাকে। বেহিসাবী জীবনের ছন্দ তাদের মরীচিকার মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়- আর শেষে ফেলে দেয় মরণফাঁদ চোরাবালিতে।
আর আত্মার আত্মমিলন এদের থেকে একটু ব্যতিক্রম। তুমি তো জানো প্রত্যেক জীবের মধ্যে আত্মা নামে অদৃশ্য শক্তি বিরাজমান। যার নাম জীবাত্মা। আর এ জীবাত্মাই মানুষের বেলায় ’আমি’ হিসাবে বসে থাকে। আবার এ জীবাত্মাও পরমাত্মার অংশ। ষড়রিপু ঘেরা পরমাত্মাই জীবাত্মা। তোমার এ আত্মাকে এমন এক স্তরে উন্নীত করা সম্ভব যেখানে থাকবে না কোন অহংবোধ, আমিত্বের দম্ভ, থাকবে শুধু ক্ষমার মহীমায় ভাস্বর এক উন্নত হৃদয়। এই ক্যাটাগরির মানুষ জীবনকে উপভোগ করে ঈশ্বরের খুব কাছে থেকে।
কোনটা তোমাকে বেশী প্রভাবিত করে। I mean তোমার ভাবনার উপযোগ কি?
দূর তেপান্তরে আলিঙ্গনের আহবান- নীলিমা চুমিছে প্রান্তরে। যেথায় উচ্ছ্বাস বা ব্যাকুলতা নেই, আছে হারানো সূর্য্যরে গোধূলিয়াময় রক্তিম আভা। পাখির কূজনে নিথর নিস্তব্ধ প্রকৃতির ঘুম ভাঙে। লোকারণ্য আছে কিন্তু কোলাহল নেই। দিনান্তে দীনের ঘামে গৃহিণীর গৃহ সরব হয়।
ঠিক ধুম্রের কবিতার মতো---
হে তেপান্তর দাও তব ক্লান্ত দিবাকর
তাহা নিয়ে ছড়াবো আমি রক্তিম আভা
যেখানে ঠিকানা খুঁজে পায়-হারানো কথা-হারানো সুর
জনপদ আর সবুজ আলিঙ্গনে বাঁধিয়া
হৃদয় মোর ব্যাকুল পিয়াসে
চিত্ত নৃত্য করে অনন্ত সুধাগীতে
নিষ্পাপ ললনার মুখশ্রী ভাসে
ভাষা সম্বিত হারায় আপনাতে।
তাহলে কি তুমি ধুম্রকে অনুসরণ করছো।
না বাবা , একটু জোরে শোরে অনেকটা প্রতিবাদের স্বরে বললো। ব্যাপারটাকে তুমি এভাবে দেখো না। ধুম্রের কথার সাথে আমার চিন্তার অনেক মিল আছে। আমার মনের কথাগুলোই আমি তার কবিতায় পাই।
কিন্তু আমি তো তোমার কথার সাথে ধুম্রের কবিতার অনেক অমিল খুঁজে পাচ্ছি। ধুম্র সাহসী এবং পূর্ণাঙ্গ আর তুমি ভীতু এবং অংশ।
কেনো বাবা ?
নির্বোধ, জীবন্ত আগ্নেয়গিরির চেয়ে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বেশী বিপদজনক, সেখানে সভ্যতার বিকাশ ঘটে মস্থর গতিতে। তুমি যে ভুল করেছো তা নিতান্তই স্বাভাবিক আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। যুগ যুগ ধরে আমরা পুরোনো সভ্যতাকে, সংস্কৃতিকে লালন করে, যতন করে আঁকড়ে ধরে রাখি আর সামাজিক বিধান হিসাবে চাপিয়ে দেই সমাজ ব্যবস্থায়। সত্যকে লুকানো সভ্যতার ক্রমবিকাশ নয়।
পৃথক নীচু স্বরে বললো বাবা আমি কি কোন অন্যায় কথা বলে ফেলেছি ? অন্যায় যদি হয় তাহলে তা অবোধে হয়েছে বোধে নয়।
তুমি বলে অন্যায় করোনি-না বলে অন্যায় করেছো। তোমার কথাটা যদি তুমি এভাবে বলতে -
এক নিষ্পাপ মেয়ের মুখ যার শ্রীঅঙ্গ জীবনের সাথে ছন্দময়, চির সবুজের প্রান্তরে ব্যস্ত জনপদের সাথে একীভূত। যার কোন কৃত্রিমতার বালাই নাই, আছে শুধু উদার চিত্তের এক সম্যক প্রকাশ।
বাবা একদম ঠিক- তুমি আমার মনের কথাটাই বুঝেছ। আসলে আমি লুকাতে চাইনি, লুকাতে হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

