somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: অপরিচিতা

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সামনের চেয়ারে বসা সদ্যপরিচিতা মহিলাটি বললেন, আসলে আমার স্বামী পরকীয়া করে। প্রেমিকারে লইয়া এইহানে আসার কথা তার।

মিনিট দশেক আগে এখানে এসেছে মীরা। লাঞ্চ আওয়ারে মতিঝিল পাড়ার এই ক্যাফেটা একটু বেশিই ব্যস্ত থাকে। সাঈদের আসতে খানিকটা দেরি হবে জেনেও কেবল মাত্র পছন্দসই একটা টেবিল দখল দেবার জন্য আগে এসেছে। দােতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান পাশের কর্ণারের একটা টেবিল, পাশে জানলা থাকায় প্রবেশ পথটাও বেশ দেখা যায়। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো টেবিলটার সাথে চেয়ার মাত্র দুটো। কেবলমাত্র মুখোমুখি দুজন বসা যায়। দক্ষিণ দিকের চেয়ারে বসে মােবাইল ফােনে কিছু একটা ব্রাউজ করছিলো মীরা, এমন সময় এক নারী কণ্ঠ শােনা গেলো।
- আপা, আপনে কি একা?
মীরা মাথা তুলে তাকিয়ে অপরিচিত মানুষটিকে দেখলো। বললো, না একা না। একজন আসবে।
- ও। কিছু মনে না করলে, আমি কিছুক্ষণ এইখানে বসি।
মীরার কাছে নেহাতই বেহায়া মহিলা মনে হলো। একজন আসবে বলার পরেও সে বসার জন্য রিকুয়েস্ট করে যাচ্ছে। মহিলাটি আবার বললো, আপনারে জন আইলে আমি উইঠা যাবো। আশে পাশে কুনো টেবিল পুরাপুরি খালি নাই। পুরুষ গাে লগে বইতে হইবো। আপনে মহিলা তাই কইতেছিলাম।
আশে পাশে এক নজর বুলিয়ে নিল মীরা। উনি ঠিকই বলছেন। মহিলার দিকে আবারো তাকালো সে। ঠিক মাঝবয়েসী বলা যায় না, ত্রিশের আশেপাশে বয়স হবে। কথায় আঞ্চলিক টান স্পষ্ট। এই ক্যাফের বা মতিঝিলের রেগুলার কেউ মনে হলো না। ব্যস্ত অফিস পাড়ায় দুপুরে লাঞ্চ করতে বেরোনো মানুষগুলোর চেহারা একটু অন্যরকম। তাদের মধ্যে কেমন যেনো একটা তাড়া থাকে। উনার মধ্যে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না, তবে অন্যরকম কিছু কি চােখে পড়ছে? মনে হয় না। সে বললো, বসুন। আশে পাশে একটু খেয়াল রাখবেন সিট খালি হয়ে যাবে। আমার গেস্ট এর মধ্যেই চলে আসবে।
- জ্বী জ্বী। ঠিক আছে। মতিঝিল খুব একটা ভালো কইরা চিনি না। আমি আসতাছি গাজীপুর থাইকা।
- এসেই যখন পড়েছেন তখন চিনে ফেলবেন নিশ্চয়।
- জ্বী আপা, ধন্যবাদ।
- ইন্টারভিউয়ের জন্য এসেছেন?
- ইন্টারভিউ?
- না মানে অফিসপাড়ায় তাে কেউ ঘুরতে আসে না। তাই ভাবলাম, চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেবেন হয়তো।
- না না তেমন কিছু না। একটা কামে আসছি।
কী কাজে এসেছে মীরা জানতে চায় না। অযথাই কথা বাড়িয়ে পরিবেশ সহজ করার প্রয়োজন নেই। খানিকটা ভারী হয়েই থাক। অন্তত সাঈদ এসে পড়লে যেনো উনি নিজে থেকেই চলে যান।

খানিকক্ষণ পরে মীরা খেয়াল করলো মহিলাটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। খাবারের অর্ডার করেনি। তাহলে উনি কি খেতে আসেননি এখানে? মীরা বললো, কারো জন্য অপেক্ষা করছেন?
- জ্বী অপেক্ষা করতাছি। তয় যার জন্য অপেক্ষা করতাছি হেয় জানে না যে আমি আসমু!
- কার জন্য?
- আমার বাচ্চার বাপের জন্যে।
- সারপ্রাইজ দেবেন। তাই তাে?
- আসলে আমার স্বামী পরকীয়া করে। প্রেমিকারে লইয়া এইহানে আসার কথা তার।
মীরা হকচকিয়ে গেলো। খুবই সহজ স্বীকারোক্তি। তাহলে মহিলাটি গাজীপুর থেকে এসেছেন তাঁর স্বামীর পরকীয়া হাতে নাতে ধরার জন্য? আগে থেকেই জানে যে তারা এখানে আসবে? কিভাবে জানলো? আর ওর হাজব্যান্ড কি সত্যিই জানে না ওর আসার কথা? যদি ওরা সামনাসামনি হয় তাহলে কী হবে? সিনক্রিয়েট করবে? নানান প্রশ্ন ভীড় করছে মীরার মাথায়। শুধু বললো, কী বলছেন এসব?
- জ্বী আপা। আমি জানি সে পরকীয়া করে। কিন্তু স্বীকার যায় না আমার কাছে।
- আপনি কিভাবে জানলেন?
- সে অনেক কথা আপা। আমি খবর পাইছি হেরা প্রতিদিন এইহানে দুপুরের খাইতে আসে।
- দেখা হলে আপনি কী করবেন?
- কিছু করমু না আপা। আমার খুব ইচ্ছা, ঐ মাইয়াডারে দেখুম। ভালো কইরা দেখুম। হেয় নিশ্চয় খুব সুন্দর। সুন্দর কইরা কথা কয়। সুন্দর পরিপাটী সাইজা চলে। শরীর নিশ্চয় খুব বাঁধানো, আমার তাে শরীর ছাইড়া দিছে। পায়ের পাতা জােড়া নিশ্চয় আমার পায়ের পাতার মতন ফালতু না। তারে দেইখা আমার নিজের কমতিগুলো আমি বুঝতে চাই আপা। সুযোগ পাইলে তারে বলবো, বইন, সময় থাকতে সাবধান হইবেন, আমার মতন যাতে না হয়।
- কী বলছেন এসব? আর যে লােকটা আপনার সাথে বেঈমানী করলো, তাকে কিছু বলবেন না?
- না। তারে কিছু বলার নাই। আমার ওপর থাইকা মন উইঠা গেছে তার। ঘরে তিন বছরের একটা মাইয়া আছে। তার প্রতিও মানুষটার ভালোবাসা নাই। তারে তাে আটকে রাখা যাইবো না। তার বন্ধুরা যখন আমাকে কইতো, তার ঢাকায় আরেকটা বউ আছে তহন আমি তাদের কথা বিশ্বাস করি নাই। মনে করতাম হেরা মানুষটাকে ঈর্ষা করে। কিন্তু পরে প্রমাণ পাইছি।
মীরা কিছু বললো না। মহিলাটি আবার বললেন, আগে প্রতি সপ্তা অফিস ছুটি হইলে বিশুদবার বাড়ি আইতো, আদর সােহাগ করতো। এখন কুনো কুনো মাসে একবারও আগে না। মাইয়ার প্রতিও কুনো টান নাই। আমি কি তারে আটকাইতে পারমু?
- তা নয়। কিন্তু আপনি কি পরকীয়ার ব্যাপারটা শিওর?
- হ্যাঁ আপা। প্রমাণ আছে। আর তাছাড়া কিছু কিছু পুরুষ আছে হেরা গেরামে এক বিয়ে করে বউ রাইখা শহরে আইসা আরেকটা বিয়ে করে। হেরা এমুনই। আমি যদি মাইনা লই তাইলে সারাজীবন এমনেই চলবে। যেইদিন আমার কথা মনে পড়বো হেইদিন মুবাইল দিবো, মনে না পড়লে নাই।
মহিলাটি বাইরে তাকায়। তাঁর চােখের কােণটা কি সামান্য ভিজে উঠেছে কিনা বুঝতে পারছে না মীরা। বরং অদ্ভুত একটা চিন্তা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। সাঈদের গ্রামের বাড়িও তাে গাজীপুরের দিকে কােথাও। একই প্রতিষ্ঠােন চাকরি করার সুবাদে বছর খানেক আগে পরিচয় হয়। তারপর ধিরে ধিরে তারা খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। বছরের শেষদিকে বিয়ে করার কথা আলোচনাও করেছে নিজেদের মধ্যে, যদিও পারিবারিকভাবে তেমন একটা অগ্রসর হয়নি এখনো। ওর বাবা-মা অবশ্য ঢাকায় থাকে না। কিন্তু সাঈদের জীবনে এমন কিছু নেই তাে? গ্রামে যদি তার আরেকটা পরিবার থেকেও থাকে সে তাে জানে না! সাঈদও কি তাকে ধোঁকা দিচ্ছে? না, এমন তাে হবার কথা না। সাঈদের সম্পর্কে আসলেই কি সে কম জানে? এই মহিলা কি তার জীবনে সর্তকসংকেত!

দূরে সাঈদকে আসতে দেখলো মীরা। রাস্তা পাড় হচ্ছে। ধিরে ধিরে এগিয়ে আসছে ক্যাফের দিকে। মীরা এক দৃষ্টিতে সাঈদকে দেখছে। মীরা যে সাঈদকে দেখছে মহিলাটি তা বুঝতে পেরেই হয়তো বললো, আপা আপনের জন মনে হয় চইলা আসছে। আমি বরং উইঠা পড়ি।
- হ্যাঁ। ঐ যে আসছে।
- এতক্ষণ বিরক্ত করলাম আপনেরে মাফ কইরা দিয়েন। আপনার নামটা জানা হইলো না।
- না না বিরক্ত হবো কেনো! আমার নাম মীরা।
- বাহ্ সুন্দর নাম। আমার নাম লাবণী।
- আপনার নামটাও বেশ মিষ্টি। সাবধানে থাকবেন।
লাবণী নামের মহিলাটি বিদেয় হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সাঈদ এসে পড়লো। বললো, সরি, বেশি দেরি করে ফেললাম কি!
- না ঠিক আছে।
হঠাৎই মীরা বললো, ‘লাবণী এসেছিলো।’ বলেই সাঈদের দিকে তাকালো তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে, যদিও সাঈদের ওপর এ বাক্যের কোনো প্রভাব হলো না। শুধু বললো, লাবণী কে?
- কেউ না। হঠাৎ পরিচয় হলো।

++++++++++

ছবি: গুগলমামা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:০৮
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কমলাকান্তের কৃষ্ণ কন্যা (শব্দের ব্যবহার ও বাক্য গঠন চর্চার উপর পোস্ট)

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৪:৫৯


শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনও অক্ষর দিয়ে শুরু শব্দাবলি ব্যবহার করেও ছোট কাহিনী তৈরি করা যায় তার একটা উদাহরণ নীচে দেয়া হোল। এটা একই সাথে শিক্ষণীয় এবং আনন্দদায়ক।

কাঠুরিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমার বেলা আমার বেলা

লিখেছেন সাইন বোর্ড, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৮:০৮


করোনা রোগি হাসপাতাল থেকে পালানো কিংবা নমুনা দেওয়ার সময় ঠিকানা ও ফোন নম্বর ভুল দিয়ে পজিটিভ রিপোর্ট এলে তা না নেওয়া

এসব সাধারন রোগির বেলায় অতি সাধারন ঘটনা ।

কিন্তু ভিআইপি'দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন অযোগ্য নাগরিক

লিখেছেন অনিরুদ্ধ রহমান, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৯:০৭

ঢাকা শহর নাকি টু-লেটে ছেয়ে গেছে। অনেকের মুখে শুনি। নগরীর অনেক মানুষ রাজধানীতে বসবাসের যোগ্যতা হারাচ্ছেন। মধ্যবিত্তরা পরিণত হচ্ছেন নিম্ন বিত্তে, নিম্নবিত্তরা পরিণত হচ্ছেন এই মহানগরীতে বসবাসের অযোগ্য নাগরিকে।

সংবাদপত্র, সামাজিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেলখানার দিন গুলো- ৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৯:৪৪



(এই লেখাটি আমার নয়। এটা লিখেছেন আমার শ্বশুরমশাই। তার অনুমতি নিয়েই লেখাটি ব্লগে দিলাম।)

আমার জেল জীবনের কিছু ঘটনা বলা অপরিহার্য হওয়ায় আবার পিছনে ফিরে গেলাম। জেলখানায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আয়মান সাদিক, ইসলাম - এবং অন্যান্য ।

লিখেছেন অ্যাপল ফ্যানবয়, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১০:২২

[শুরুতেই বলে নিই পোস্টটি আকারে যথেষ্ঠ বড়, তবে ধৈর্য্য ধরে পড়লে অনেক চিন্তার খোড়াক পাবেন আশাকরি । যেকোনো গঠনমূলক মন্তব্য সাদরে গ্রহণীয় । ধন্যবাদ ।]

“ইসলাম” শব্দটি শুনলে আমাদের চিন্তাধারায় যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×