somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য : লকডাউন ও আমার সুন্দরী প্রতিবেশিনী

১৩ ই মে, ২০২০ রাত ১২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুরে ভাত খাওয়ার পর সবে একটু তন্দ্রা মতো এসেছে এমন সময় দরজায় ধাক্কা। তন্দ্রা ছুটে গেল। ঘড়ি দেখলাম, দুপুর আর নেই, চারটা বেজে গেছে। বউ অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
.
কিন্তু এখন আবার কে এল! মাস্ক বেঁধে দরজা খুলে দেখলাম মিস্টার শর্মা দাঁড়িয়ে আছেন। মিস্টার শর্মা আমাদের উল্টোদিকেই ভাড়ায় থাকেন। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কাজ করেন। ওঁর স্ত্রী পরমা সুন্দরী। প্রতিদিন সকালে বাড়ির ছাদে দেহচর্চা করেন। আর পাড়ার বেশ কিছু পুরুষ তারিয়ে তারিয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করে। আমারও ক্বচিৎ দেখার সৌভাগ্য হয়।
কিন্তু মিস্টার শর্মার এখন আবার কী দরকার!
.
মিস্টার শর্মা ভালই বাংলা বলেন। বললেন, "একটু সাহায্য চাইতে এসেছি। আমার একটু হানি লাগবে। আপনার বাড়িতে যদি থাকে একটু দিলে খুব উপকার হয়।"
আমি বললাম, "মধু? হ্যাঁ থাকতেও পারে। তা মধু খাবেন, কাশি-টাশি হয়েছে নাকি? এইসময় কাশি হওয়া কিন্তু খুবই চিন্তার বিষয়।"
মিস্টার শর্মা বললেন, "না না কাশি নয়। আপনাকে সত্যিটাই বলি, আসলে আমার ওয়াইফ হর সানডে সন্ধ্যেবেলায় হানি দিয়ে একটা ফেসপ্যাক বানিয়ে মুখে লাগায়। আজ সানডে। বাজারে পেলাম না। আপনি 'নেবার', আপনার কাছে চাইতে লজ্জা নেই। ফেসপ্যাকটা লাগাতে না পারলে ওর খুব মন খারাপ হয়ে যাবে। বহুত দিনের হ্যাবিট। তাই আর কি..."
আমি ভাবলাম, ফেসপ্যাক! তাই বলো! হু হু রূপসী থাকার পেছনে অনেক কলাকৌশল অনেক মেহনত থাকে।
বললাম, "আচ্ছা আপনি যান। আমি খুঁজে দিয়ে আসব।"
দরজার বাইরে বেরিয়ে উঁকি মারলাম কেউ আছে নাকি দেখতে।
ভজহরিদা দূরে সিগারেট টানছে।
বগলাকাকু আর মন্টু কাকু কোথায় ছিলেন, মিস্টার শর্মা চলে যেতেই আমাকে এসে পাকড়ালেন।
বগলাকাকু বললেন, "শর্মাদের কিছু সমস্যা হয়েছে নাকি? কী জন্য এসেছিলেন?"
আমি বললাম, "মধুর খোঁজে।"
তারপর মিস্টার শর্মা যা বলেছেন বললাম।
সব শুনে মন্টুকাকু ঘাড় নেড়ে বললেন, "নিজেকে প্রিয়দর্শিনী রাখা চাট্টিখানি কথা নাকি!"
বগলাকাকুও ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।
.
দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে দেখলাম বউয়ের ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু মধুটা আছে কোথায়?
রান্নাঘরে চিরুনি তল্লাশি করেও মধু পেলাম না। আমার খানাতল্লাশির চোটে রান্নাঘরের অবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
বউ এসে রান্নাঘর দেখে তাজ্জব হয়ে গেল।
বলল, "কোনও মত্ত হাতি ঢুকেছিল নাকি রান্নাঘরে? এ কী অবস্থা হয়েছে?"
আমি বললাম, "মধু ছিল না? সেটা কোথায়?
বউ বলল, "এখন মধু নিয়ে তুমি কী করবে?"
মিসেস শর্মার কথাটা বলা সমীচীন হবে না। বললাম, "মিস্টার শর্মা এসেছিলেন, ওনার লাগবে। খাবেন বোধহয়।"
বউ নিমেষে মধুর শিশিটি বের করে দিয়ে বলল, "এই নাও। বেশি নেই। শিশিটাই দিয়ে দাও।"
আমি আর একটুও সময় নষ্ট না করে জামা চড়িয়ে দৌড়ালাম শর্মার বাড়ি।
.
মিস্টার শর্মার বাড়িতে গিয়ে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে দেখলাম বগলাকাকুও হাতে একটি মধুর শিশি নিয়ে মিস্টার আর মিসেস শর্মাকে তাঁর আনা মধু'র গুণাগুণ বর্ণনা করছেন। শর্মা দম্পতি অভিভূত হয়ে শুনছেন।
বগলাকাকু চোখ বন্ধ করে বলছেন, "হৃষীকেশের এক মুনি এই মধু দিয়েছিলেন আমায়! বলেছিলেন, বড় পবিত্র এই মধু। এই মধু দুষ্প্রাপ্য, দুর্লভ। তোকে দেখে বড় ভাল লাগল রে বেটা, তাই দিলাম!"
বলে কপালে হাত ঠেকালেন বগলাকাকু এবং তাঁর দেখাদেখি শর্মা দম্পতি।
শুনে আমি ব্যোমকে গেলাম! বগলাকাকু আবার কবে হৃষীকেশ গেল! এসব কবে ঘটল!
মিসেস শর্মার একটু হিন্দির টান আছে। মনোমোহিনী হাসি হেসে বগলাকাকুকে বললেন, "লকডাউন উঠে যাওয়ার পর এসে একদিন চা'য় পিয়ে যাবেন।"
ব্যাটা বুড়ো আমার কাছে শুনে কোথা থেকে উন্নত মধু সাপ্লাই দিয়ে বাজিটা জিতে নিল!
বগলাকাকু আবেগকম্পিত গলায় বললেন, "মধু দিয়ে যে সম্পর্কের শুরু সে সম্পর্ক খুবই গভীর হবে। সুতরাং এরপর আসা যাওয়া তো লেগেই থাকবে।"
আমি ভাবতেও পারিনি বগলাকাকুর কথা এভাবে ফলে যাবে এবং আজই আবার আসতে হবে তাঁকে।
.
এইসময় আরও অবাক করে দিয়ে মিস্টার শর্মা বললেন, "মন্টুবাবুও এসেছিলেন। হানি দিয়ে গেছেন।"
শালা বুড়োগুলো মহালম্পট তো! মাঝখান থেকে আমারই আসতে দেরি হয়ে গেল। আর বগলাকাকু এমন বিরল মধুর গপ্পো ফেঁদেছে এখন আমার মধু দেওয়া বেকার। শালা ফালতু পণ্ডশ্রম।
তবুও আমি স্যোশাল ডিসটেন্সিং মেনে ঘরের মেঝেতে রেখে দিয়ে এলাম মধুর শিশিটা। প্রত্যুত্তরে মধুর হাসলেন মিসেস শর্মা।
.
শর্মার ঘর থেকে বেরিয়েই বগলাকাকু ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, "আচ্ছা মন্টুর আক্কেলটা দেখেছ? কখন এসে মধু দিয়ে চলে গেছে! তোকে বলেনি তাও তুই মধু দিয়ে চলে গেলি! আর মধু দিয়েছে না হাতি! গুড় জল দিয়ে গেছে! ছিঃ!"
আমি মনে মনে বললাম, আরে বগলাবুড়ো আপনারও তো সেম কেস!আপনাকেও দিতে বলেছিল নাকি!
মুখে বললাম, "ভজহরিদাকে দেখেছেন?"
বগলাকাকু তখনও মধুর ঘোরে আছেন। বললেন, "ভজহরি বড় ভাল ছেলে।"
যাহ শালা কী জিগ্যেস করলাম আর কী উত্তর! বুড়ো পুরোই গেছে।
.
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ সবে চা খাওয়া শেষ হয়েছে। লকডাউনের কারণে নিস্তব্ধ রাত। হঠাৎ এক নারীকন্ঠের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলাম।
বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আওয়াজটা শর্মাদের বাড়ি থেকেই আসছে। তারমানে মিসেস শর্মার আর্তনাদ।
মিস্টার শর্মা বেরিয়ে পাগলের মতো দৌড় দিলেন। কোথায় যাচ্ছেন কে জানে! তবে একটু পরেই দেখলাম বগলাকাকুকে ধরে নিয়ে আসছেন।
শুনলাম, বগলাকাকুর মধু দিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে মাখার পরেই নাকি মিসেস শর্মার মুখ জ্বলতে শুরু করে। তারপর ধুয়ে ফেলে বরফ টরফ ঘষেও জ্বলুনি কমছে না। মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে।
রাগে অগ্নিশর্মা মিস্টার শর্মা বগলাকাকুকে বগলদাবা করে ঘরে ঢুকলেন।
সামান্যক্ষণ পরে শর্মাদের ঘর থেকে বেরিয়ে বগলাকাকু বিধ্বস্ত অবস্থায় ঠায় কিছুক্ষণ রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "নাহ বাড়ি যাই। ভাল করতে গেলাম, কী হয়ে গেল দেখো! এখন কী যে হবে! আবার থানা-পুলিশেরও ভয় দেখাচ্ছে। আচ্ছা ভজহরিকে দেখেছ?"
আমি না বলে ঘরে চলে এলাম।
.
ঘরে এসেই ভজহরিদাকে ফোনে ধরলাম। পাড়ার এত বড় খবরটা জানানো দরকার।
ভজহরিদা সব শুনে বলল, "বেশিক্ষণ জ্বলবে না বুঝলি। অল্প একটু লঙ্কাগুঁড়ো দেওয়া ছিল।"
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, "ল-লঙ্কাগুঁড়ো! তু-তুমি জানলে কেমন করে?"
ভজহরিদা বলল, "আরে ওই হাড়বজ্জাত বগলাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল বুঝলি। শালা লুচ্চা। তোর কাছে জেনে নিলো শর্মাসুন্দরী মধু খুঁজছে। তা যেই বললাম আমার কাছে হৃষীকেশের স্পেশাল মধু আছে সঙ্গে সঙ্গে বলে, আমায় দাও না ভাই। ডাবরের মধুতে এক চিমটি লঙ্কাগুঁড়ো মিশিয়ে দিয়ে দিলাম খানিকটা। বললাম দুশো টাকা লাগবে। ঝট্ করে দিয়ে দিল মাইরি! আর সেদিন তুই আমি করে বাবলু,দুলালদের ফ্যামিলির জন্য সাহায্য চাইতে গেলাম বুড়ো 'কোথা থেকে টাকা পাই বলো' বলে ভাগিয়ে দিল! শালা ঢ্যামনার ঠিক হয়েছে।"
আমি বললাম, "সে না হয় ঠিক আছে কিন্তু মিসেস শর্মাও তো কষ্ট পেল?"
ভজহরিদা বলল, "কী ব্যাপার বে? তোরও দেখি হেবি দরদ শর্মাসুন্দরীর জন্য! হ্যাঁ, একটু কষ্ট পেল! শালা ঘরে মধু নেই লকডাউনে স্বামীকে লোকের ঘর থেকে মধু আনতে পাঠাচ্ছে। রবিবার প্যাক না মাখলেই নাকি মুখের জেল্লা চলে যাবে! ফিল্মিস্টার ভাবছে নাকি রে? শালা বাতিকগ্রস্ত তারকাটা যতসব!"
বললাম, "বগলাকাকু তোমার খোঁজ করছিল।"
ভজহরিদা বলল, "এখন দুদিন আর ও বুড়োর মুখোমুখি হচ্ছি না..."
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০২০ রাত ১২:৩৪
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৪৮



চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে সদয় আচরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা পাবেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৭

১) "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে নিজ দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় আচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ২২ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭



বাংলাদেশে শেষ কবে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখেছিলাম মনে নাই। গতকাল সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম, স্টার সিনেপ্লেক্স মুভি থিয়েটারে। এখন আর আগের মতন সিনেমা হল নেই। অনেক কিছু বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে প্রথম ১০০০০০ মন্তব্যপ্রাপ্ত রাজীব নুর'কে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা!!

লিখেছেন বিজন রয়, ২২ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০



প্রাপ্ত মন্তব্য ১,০০,০০০!!
ঐতিহাসিক!

এই ব্লগের ইতিহাসে রাজীব নুর আপনি সর্বপ্রথম ১০০০০০ মন্তব্য পেয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন!

আপনাকে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা প্রাণঢালা।

আপনি আবার এই ব্লগে সর্বপ্রথম ১০০০০০ মন্তব্যকারীও বটে!
সেটা নিয়ে আমি এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×