
.
কিন্তু এখন আবার কে এল! মাস্ক বেঁধে দরজা খুলে দেখলাম মিস্টার শর্মা দাঁড়িয়ে আছেন। মিস্টার শর্মা আমাদের উল্টোদিকেই ভাড়ায় থাকেন। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কাজ করেন। ওঁর স্ত্রী পরমা সুন্দরী। প্রতিদিন সকালে বাড়ির ছাদে দেহচর্চা করেন। আর পাড়ার বেশ কিছু পুরুষ তারিয়ে তারিয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করে। আমারও ক্বচিৎ দেখার সৌভাগ্য হয়।
কিন্তু মিস্টার শর্মার এখন আবার কী দরকার!
.
মিস্টার শর্মা ভালই বাংলা বলেন। বললেন, "একটু সাহায্য চাইতে এসেছি। আমার একটু হানি লাগবে। আপনার বাড়িতে যদি থাকে একটু দিলে খুব উপকার হয়।"
আমি বললাম, "মধু? হ্যাঁ থাকতেও পারে। তা মধু খাবেন, কাশি-টাশি হয়েছে নাকি? এইসময় কাশি হওয়া কিন্তু খুবই চিন্তার বিষয়।"
মিস্টার শর্মা বললেন, "না না কাশি নয়। আপনাকে সত্যিটাই বলি, আসলে আমার ওয়াইফ হর সানডে সন্ধ্যেবেলায় হানি দিয়ে একটা ফেসপ্যাক বানিয়ে মুখে লাগায়। আজ সানডে। বাজারে পেলাম না। আপনি 'নেবার', আপনার কাছে চাইতে লজ্জা নেই। ফেসপ্যাকটা লাগাতে না পারলে ওর খুব মন খারাপ হয়ে যাবে। বহুত দিনের হ্যাবিট। তাই আর কি..."
আমি ভাবলাম, ফেসপ্যাক! তাই বলো! হু হু রূপসী থাকার পেছনে অনেক কলাকৌশল অনেক মেহনত থাকে।
বললাম, "আচ্ছা আপনি যান। আমি খুঁজে দিয়ে আসব।"
দরজার বাইরে বেরিয়ে উঁকি মারলাম কেউ আছে নাকি দেখতে।
ভজহরিদা দূরে সিগারেট টানছে।
বগলাকাকু আর মন্টু কাকু কোথায় ছিলেন, মিস্টার শর্মা চলে যেতেই আমাকে এসে পাকড়ালেন।
বগলাকাকু বললেন, "শর্মাদের কিছু সমস্যা হয়েছে নাকি? কী জন্য এসেছিলেন?"
আমি বললাম, "মধুর খোঁজে।"
তারপর মিস্টার শর্মা যা বলেছেন বললাম।
সব শুনে মন্টুকাকু ঘাড় নেড়ে বললেন, "নিজেকে প্রিয়দর্শিনী রাখা চাট্টিখানি কথা নাকি!"
বগলাকাকুও ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।
.
দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে দেখলাম বউয়ের ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু মধুটা আছে কোথায়?
রান্নাঘরে চিরুনি তল্লাশি করেও মধু পেলাম না। আমার খানাতল্লাশির চোটে রান্নাঘরের অবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
বউ এসে রান্নাঘর দেখে তাজ্জব হয়ে গেল।
বলল, "কোনও মত্ত হাতি ঢুকেছিল নাকি রান্নাঘরে? এ কী অবস্থা হয়েছে?"
আমি বললাম, "মধু ছিল না? সেটা কোথায়?
বউ বলল, "এখন মধু নিয়ে তুমি কী করবে?"
মিসেস শর্মার কথাটা বলা সমীচীন হবে না। বললাম, "মিস্টার শর্মা এসেছিলেন, ওনার লাগবে। খাবেন বোধহয়।"
বউ নিমেষে মধুর শিশিটি বের করে দিয়ে বলল, "এই নাও। বেশি নেই। শিশিটাই দিয়ে দাও।"
আমি আর একটুও সময় নষ্ট না করে জামা চড়িয়ে দৌড়ালাম শর্মার বাড়ি।
.
মিস্টার শর্মার বাড়িতে গিয়ে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে দেখলাম বগলাকাকুও হাতে একটি মধুর শিশি নিয়ে মিস্টার আর মিসেস শর্মাকে তাঁর আনা মধু'র গুণাগুণ বর্ণনা করছেন। শর্মা দম্পতি অভিভূত হয়ে শুনছেন।
বগলাকাকু চোখ বন্ধ করে বলছেন, "হৃষীকেশের এক মুনি এই মধু দিয়েছিলেন আমায়! বলেছিলেন, বড় পবিত্র এই মধু। এই মধু দুষ্প্রাপ্য, দুর্লভ। তোকে দেখে বড় ভাল লাগল রে বেটা, তাই দিলাম!"
বলে কপালে হাত ঠেকালেন বগলাকাকু এবং তাঁর দেখাদেখি শর্মা দম্পতি।
শুনে আমি ব্যোমকে গেলাম! বগলাকাকু আবার কবে হৃষীকেশ গেল! এসব কবে ঘটল!
মিসেস শর্মার একটু হিন্দির টান আছে। মনোমোহিনী হাসি হেসে বগলাকাকুকে বললেন, "লকডাউন উঠে যাওয়ার পর এসে একদিন চা'য় পিয়ে যাবেন।"
ব্যাটা বুড়ো আমার কাছে শুনে কোথা থেকে উন্নত মধু সাপ্লাই দিয়ে বাজিটা জিতে নিল!
বগলাকাকু আবেগকম্পিত গলায় বললেন, "মধু দিয়ে যে সম্পর্কের শুরু সে সম্পর্ক খুবই গভীর হবে। সুতরাং এরপর আসা যাওয়া তো লেগেই থাকবে।"
আমি ভাবতেও পারিনি বগলাকাকুর কথা এভাবে ফলে যাবে এবং আজই আবার আসতে হবে তাঁকে।
.
এইসময় আরও অবাক করে দিয়ে মিস্টার শর্মা বললেন, "মন্টুবাবুও এসেছিলেন। হানি দিয়ে গেছেন।"
শালা বুড়োগুলো মহালম্পট তো! মাঝখান থেকে আমারই আসতে দেরি হয়ে গেল। আর বগলাকাকু এমন বিরল মধুর গপ্পো ফেঁদেছে এখন আমার মধু দেওয়া বেকার। শালা ফালতু পণ্ডশ্রম।
তবুও আমি স্যোশাল ডিসটেন্সিং মেনে ঘরের মেঝেতে রেখে দিয়ে এলাম মধুর শিশিটা। প্রত্যুত্তরে মধুর হাসলেন মিসেস শর্মা।
.
শর্মার ঘর থেকে বেরিয়েই বগলাকাকু ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, "আচ্ছা মন্টুর আক্কেলটা দেখেছ? কখন এসে মধু দিয়ে চলে গেছে! তোকে বলেনি তাও তুই মধু দিয়ে চলে গেলি! আর মধু দিয়েছে না হাতি! গুড় জল দিয়ে গেছে! ছিঃ!"
আমি মনে মনে বললাম, আরে বগলাবুড়ো আপনারও তো সেম কেস!আপনাকেও দিতে বলেছিল নাকি!
মুখে বললাম, "ভজহরিদাকে দেখেছেন?"
বগলাকাকু তখনও মধুর ঘোরে আছেন। বললেন, "ভজহরি বড় ভাল ছেলে।"
যাহ শালা কী জিগ্যেস করলাম আর কী উত্তর! বুড়ো পুরোই গেছে।
.
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ সবে চা খাওয়া শেষ হয়েছে। লকডাউনের কারণে নিস্তব্ধ রাত। হঠাৎ এক নারীকন্ঠের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলাম।
বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আওয়াজটা শর্মাদের বাড়ি থেকেই আসছে। তারমানে মিসেস শর্মার আর্তনাদ।
মিস্টার শর্মা বেরিয়ে পাগলের মতো দৌড় দিলেন। কোথায় যাচ্ছেন কে জানে! তবে একটু পরেই দেখলাম বগলাকাকুকে ধরে নিয়ে আসছেন।
শুনলাম, বগলাকাকুর মধু দিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে মাখার পরেই নাকি মিসেস শর্মার মুখ জ্বলতে শুরু করে। তারপর ধুয়ে ফেলে বরফ টরফ ঘষেও জ্বলুনি কমছে না। মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে।
রাগে অগ্নিশর্মা মিস্টার শর্মা বগলাকাকুকে বগলদাবা করে ঘরে ঢুকলেন।
সামান্যক্ষণ পরে শর্মাদের ঘর থেকে বেরিয়ে বগলাকাকু বিধ্বস্ত অবস্থায় ঠায় কিছুক্ষণ রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "নাহ বাড়ি যাই। ভাল করতে গেলাম, কী হয়ে গেল দেখো! এখন কী যে হবে! আবার থানা-পুলিশেরও ভয় দেখাচ্ছে। আচ্ছা ভজহরিকে দেখেছ?"
আমি না বলে ঘরে চলে এলাম।
.
ঘরে এসেই ভজহরিদাকে ফোনে ধরলাম। পাড়ার এত বড় খবরটা জানানো দরকার।
ভজহরিদা সব শুনে বলল, "বেশিক্ষণ জ্বলবে না বুঝলি। অল্প একটু লঙ্কাগুঁড়ো দেওয়া ছিল।"
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, "ল-লঙ্কাগুঁড়ো! তু-তুমি জানলে কেমন করে?"
ভজহরিদা বলল, "আরে ওই হাড়বজ্জাত বগলাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল বুঝলি। শালা লুচ্চা। তোর কাছে জেনে নিলো শর্মাসুন্দরী মধু খুঁজছে। তা যেই বললাম আমার কাছে হৃষীকেশের স্পেশাল মধু আছে সঙ্গে সঙ্গে বলে, আমায় দাও না ভাই। ডাবরের মধুতে এক চিমটি লঙ্কাগুঁড়ো মিশিয়ে দিয়ে দিলাম খানিকটা। বললাম দুশো টাকা লাগবে। ঝট্ করে দিয়ে দিল মাইরি! আর সেদিন তুই আমি করে বাবলু,দুলালদের ফ্যামিলির জন্য সাহায্য চাইতে গেলাম বুড়ো 'কোথা থেকে টাকা পাই বলো' বলে ভাগিয়ে দিল! শালা ঢ্যামনার ঠিক হয়েছে।"
আমি বললাম, "সে না হয় ঠিক আছে কিন্তু মিসেস শর্মাও তো কষ্ট পেল?"
ভজহরিদা বলল, "কী ব্যাপার বে? তোরও দেখি হেবি দরদ শর্মাসুন্দরীর জন্য! হ্যাঁ, একটু কষ্ট পেল! শালা ঘরে মধু নেই লকডাউনে স্বামীকে লোকের ঘর থেকে মধু আনতে পাঠাচ্ছে। রবিবার প্যাক না মাখলেই নাকি মুখের জেল্লা চলে যাবে! ফিল্মিস্টার ভাবছে নাকি রে? শালা বাতিকগ্রস্ত তারকাটা যতসব!"
বললাম, "বগলাকাকু তোমার খোঁজ করছিল।"
ভজহরিদা বলল, "এখন দুদিন আর ও বুড়োর মুখোমুখি হচ্ছি না..."
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০২০ রাত ১২:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


