
.
সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যতম সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক তিনি। লেখা শুরু করেন বছর ছয়েক আগে। লেখায় এমন একটা জাদু আছে যে, কেউ একবার পড়লেই তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে যায়। নিজের দেখা এক-একটি মানুষকে নিয়ে লেখেন তিনি। এখন সপ্তাহে একটি করে লেখা দেন। প্রতি রবিবার সন্ধে সাতটায়। লেখাগুলো হাজার হাজার লাইক পায়। শয়ে শয়ে কমেন্ট পড়ে ও শেয়ার হয়। সাহিত্য গ্রুপগুলোতেও লেখা শেয়ার করেন। সেখানেও তাঁর লেখা যথারীতি সুপার-ডুপারহিট।
.
অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। পেটের নীচের দিকে ভয়াবহ যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাবার উপক্রম হয়। লেখা কিন্তু থামল না।
অনেক ডাক্তার দেখানো সত্ত্বেও যখন যন্ত্রণা কমলই না, উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল তখন তাঁর আত্মীয়রা চেন্নাইয়ের একটি নামী হাসপাতালে তাঁকে দেখাতে নিয়ে গেলেন। সেখানেই ধরা পড়ল কোলন ক্যানসার। স্টেজ ফোর। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ক্যানসার। ডাক্তাররা পরিষ্কার বলে দিলেন আর বিশেষ কিছু করার নেই। শুধু যন্ত্রণা যাতে কম পান তার জন্য কিছু ওষুধ দেওয়া ছাড়া।
.
লেখক বুঝতে পারছেন তাঁর দিন শেষ হয়ে আসছে। রবিবার এসে গেল। তাঁর পাঠকরা অপেক্ষা করে আছে তাঁর লেখা পড়বে বলে। তিনি ল্যাপটপেই লেখেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে খুব কষ্ট করে কদিনে লিখেছেন। সন্ধে সাতটায় পোস্ট করে দিলেন...
.
"গ্রীমস রোড, চেন্নাই। শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ জানান দিচ্ছে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় হয়ে এলো।"....
লেখা শেষ হল এইভাবে..
...".অসহনীয় যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তির সময় আসছে আমি বুঝতে পারছি। হয়তো এটাই আমার শেষ পোস্ট..."
.
লেখা পোস্ট হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে ২৭৮ টা রিয়্যাকশন। বাহাত্তরটা শেয়ার।
"খুব ভাল লাগল", "দারুণ লিখেছেন দাদা", "চমৎকার", "ফিদা হয়ে গেলাম", "জাস্ট অসাম" ইত্যাদি কমেন্টে ভরে গেল।
সোশ্যাল মিডিয়ার সেলেব লেখক বুঝলেন, তাঁর লেখা এখন সংখ্যাগুরু পাঠক-পাঠিকা আর পড়ে না। অভ্যাস বশে লাইক দিয়ে যায়, কমেন্ট করে, শেয়ার করে। কত কষ্ট করে লিখেছেন তাঁর এই শেষ লেখাটা!
.
যন্ত্রণা.. দুঃসহ যন্ত্রণা...ল্যাপটপ টা সুইচড অফ করে দিয়ে নার্সকে বললেন একটা পেনকিলার দিতে..
.
তাঁকে অবাক করে দিয়ে নার্স মেয়েটি বাংলায় বলল, "স্যার আপনার আজকের লেখাটা পড়ে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করছে!"
লেখক অবাক হয়ে কালো রোগা মেয়েটিকে দেখলেন।
বললেন, "আপনি বাঙালি? চেন্নাইয়ে থাকেন? আপনি আমার লেখা পড়েন?"
--"হ্যাঁ রেগুলারলি পড়ি স্যার। আমি আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে নেই, ফলোয়ার। আমি পড়ি, মাকে পড়ে শোনাই। মাও আপনার লেখা খুব লাইক করে। কিন্তু আপনার এই লেখাটা আমার একটুও ভাল লাগেনি। পৃথিবীতে কত মিরাকেল ঘটে! আমার এই নার্সিং জীবনে আমিই কত মিরাকেল দেখেছি! দেখবেন আপনিও ঠিক ভাল হয়ে যাবেন। এটা কিছুতেই আপনার শেষ লেখা নয়। আপনি আরও লিখবেন। ভগবানের কাছে আমি আর আমার মা প্রেয়ার করি আপনাকে ভাল করে দেওয়ার জন্য।"
লেখকের দু চোখ জলে ভরে উঠল। না ব্যর্থ নয় তাঁর এই লেখালিখি।
যন্ত্রণার ওপর তৃপ্তির প্রলেপ পড়ে যন্ত্রণাটা একটু যেন কমল... পেনকিলার এখন থাক...
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০২০ রাত ১২:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


