দূরবীণটি যে বেশ কাজের বুঝাই যাচ্ছে। আমার অফিসের কলিগদের দিকে ফোকাস করা মাত্রই যন্ত্রটির স্ক্রিনে লেখা ভাসলো। সাদিক ও আমি একসঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছিলাম। মাঝপথে মরে যাওয়াতে বেচারার ঘাড়ে সব ঝামেলা গিয়ে চেপেছে। মানুষের সঙ্গ ছাড়া যে প্রাণীগুলোর সঙ্গ আমার ভালো লাগে, তার একটি সঙ্গে আমাকে তুলনা করে এবং অন্য একটির সন্তান বানিয়ে আমাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সাদিক। পাশে বসা কবিতার ভাবনা সেই তুলনায় নীরস। আমার মধ্যে যে অমিত সম্ভাবনা সে দেখতে পেয়েছিলো, সেটি নিয়ে মায়াকান্না করার কোনো মানে আছে কবিতা? শোকাবহ পরিবেশের মধ্যেই মানস সিঙ্গারা নিয়ে ঢুকলো, আমি দেখতে পাচ্ছি। আহা, বেচারা আমাদের নয়জনের জন্য নয়টা সিঙ্গারা এনেছে। কিন্তু আমি যে নেই সেটা ভুলে গিয়েছিলো। যা হোক, সহকর্মীর মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উপায় হিসেবে সেটি খাওয়া ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই তার। টুশির সঙ্গে কি কোনো এপয়েন্টমেন্ট ছিলো আমার? সে যেভাবে ডায়েরির পাতাটা উল্টিয়ে রেখেছে, তাতে তো আমার নাম লেখাই দেখতে পাচ্ছি। আহারে, বেচারির কী বিশ্রি হাতের লেখা! আমাকে বললে তো আমি কয়েকদিন প্র্যাকটিস করিয়ে ঠিক করে দিতে পারতাম। মুখ ফুটে কেন যে বললো না একবার!
দেখুন, নারী-পুরুষ সাম্যে না হলেও সমতায় বিশ্বাস করি আমি। এর পার্থিব প্রমাণ আগের প্যারাতেই আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। দুজন পুরুষ এবং দুজন নারী কলিগের নাম আমি লিখেছি। ইচ্ছে করলেই কি আমি লিখতে পারতাম না রেহানা, ঐশিলা, সুলতানা, প্রিয়াঙ্কা কিংবা সালমার কথা? কিন্তু লিখিনি। কেন? কারণ ওই হুমায়ূন আজাদ। সাদিক-মানস আমার চোখের সামনে থাকলেও হৃদয়ে যারা থাকে তাদের অনেকের নামও কিন্তু লিখিনি। কেন লিখিনি? মনের মধ্যে যা যা চিন্তা আসে তার সব নাকি বলতে হয় না, লিখতে হয় না, সেটাই নাকি শিক্ষা। মানুষের মনে নাকি যতসব কু-চিন্তায় ভরা থাকে, যে পড়ালেখা করে যত শৈল্পিকভাবে সেগুলোকে ঢাকতে পারে, সে নাকি ততবড় শিক্ষিত। হু, হু, আমি যে শিক্ষিত, তার প্রমাণ তো এই-ই যে আমি ওদের কথা লিখিনি।
ভালো কথা, মানুষ মরলে প্রাক্তন, বাঁচলে সাবেক। তাহলে আমার কাছে আমার সাবেক নারীবন্ধুটি কি সাবেক না প্রাক্তন? হুমায়ূন আজাদের সঙ্গে দেখা হলেই জেনে নেব। বাংলা ব্যাকরণের ওপর তার লেখা ঢাউস বইটি আমাদের পাঠ্য ছিলো। হুমায়ূন আজাদের মনে কোনোই সন্দেহ ছিলো না, এই বইটি যারা পড়বে, তাদের কেউ না কেউ এই বইটি লেখার জন্য তাকে গালি দিবে। হ্যাঁ, এই ‘কেউ’টি আমি। কষে গালি দিয়েছিলাম। তার প্রতিফল বোধহয় এই যে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমাকে বেহেশত-নরকের ওয়েটিং প্লেস প্লুটোতে বসে দূরবীণ দিয়ে সাবেক প্রেমিকাকে দেখতে হচ্ছে। আহারে, বেচারি এই মুহূর্তে তিন হাজার টাকার জন্য কাকে যেনো ফোন করছে। আমার ক্রেডিট কার্ডটি পাঠানোর কোন ব্যবস্থা থাকলে এই মুহূর্তে সেটি পাঠিয়ে দিতাম। হোক না সে আমার চেয়ে যোগ্যতর কাউকে বেছে নিয়েছে। তাই বলে তার প্রতি মহব্বত তো কমেনি! আরে কী আশ্চর্য, আমার সাবেক (বা প্রাক্তন) প্রেমিকাও ঠিক এই কথাটিই চিন্তা করছে। এই যে যন্ত্রে ভাসছে, ...জাদা না মরলে তো টাকাগুলো চাইতে পারতাম। ওহ্ হুমায়ূন আজাদ, আপনার লাইনটি আরো দুদিন পরে যে কেনো মাথায় ঢুকলো না! টাকাগুলো দিয়েই মরতে পারতাম! ... (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



