somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢাকার পাড়া-মহল্লার নামের ঠিকুজী (মেগা পোস্ট)

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ দুপুর ১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার প্রাণের শহর ঢাকা, আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা। ঢাকায় জন্মেছি, বড় হয়েছি আমরা যারা, তারা অনেক সময় অনেক এলাকায় গিয়েছি যেখানকার নাম শুনে কিছুটা অবাক হয়েছি, কখনোবা মজা পেয়েছি। পাতলাখান লেন, গরম পানির গলি, আল্লুবাজার এই রকম নাম শুনে আপনারা কখনো অবাক হয়েছেন কিনা জানিনা, আমি কিন্তু হয়েছি। ছোট বেলায় স্কুল ম্যাগাজিনে একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল যা ছিল এরকম – “হাতিরপুলে নেইকো হাতি, ধানমণ্ডিতে কি হয় ধান; কলা নেই, কাঁঠাল নেই, আছে যে বাগান”। মনে আছে একবার এক রিকশা চালককে বললাম যে ঢাকা ভার্সিটির কার্জন হলে যাব, সে বলল, “টারজেন হল, যামু”। তাকে অনেক চেষ্টা করেও বুঝাতে পারিনি যে জায়গাটার নাম কার্জন হল। যাই হোক আসল কথায় আসা যাক, আজকের লেখা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার নামের ইতিহাসের ইতিবৃত্ত নিয়ে

ঢাকার অলি-গলির নামের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক-লৌকিক-অলৌকিক ঘটনা। শহরের কোনো কোনো রাস্তার রাখা হয়েছে সুচিন্তিতভাবে। কিছু নাম মুখে মুখে হয়ে গেছে। কিছু এলাকা পরিচিত হয়ে উঠে স্থানীয় পেশা, সম্প্রদায়ের বা প্রসিদ্ধ শিল্প বা স্থাপত্যের নামে। আবার কোনো রাস্তার নাম রাখা হয়েছে স্থানীয় বা বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি, মোগল বা ইংরেজ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নামে। কোনো নাম আবার লোকমুখে প্রচারিত হতে হতে হয়ে গেছে বিকৃত। ইংরেজ শাসনামলে আবার এসব নাম পাল্টানোর হিড়িক লাগে। এভাবে নানা খেয়ালে ঢাকার রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে বা হয়ে গেছে। আজ অবশ্য এর বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস খুঁজে পাওয়া কঠিন। কাগজ-পত্র, বই-দলিল-দস্তাবেজ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকার অলি-গলি-রাজপথের নামকরণের ইতিহাস। মোগল শাসনামলে গড়ে ওঠা বা নাম রাখা এলাকার নামের শেষে-গঞ্জ, বাগ, বাগিচা, টুলী, তলি, হাট্টা, রওজা, কাটরা, গলি, দরওয়াজা, কুচা, ময়দান, পুর, মণ্ডি, খানা প্রভৃতি দেখা যায়। অবশ্য পরেও কিছু রাস্তার নামের শেষে শব্দগুলো ব্যবহারের জন্য এ প্রক্রিয়ায় মোগল আমলের রাস্তা চিহ্নিত করা যায় না।

আসুন জেনে নেই কয়েকটি এলাকার নামকরণের গ্রহনযোগ্য কিছু ইতিহাস।

আমরা শুরু করি পিলখানা এলাকা থেকে। মোঘল আমলে বাদশাহ-সুবেদাররা ছিলেন খুবই শৌখিন, তাদের পছন্দের অন্যতম একটি ছিল হাতির লড়াই। আর তাই ঢাকা শহরে তখন প্রায়ই শোনা যেত হাতির ডাক। আর তাদের এই শখ মেটাতে বিভিন্ন বন্যহাতিকে ঢাকায় এনে পোষ মানানো হতো এবং এই কাজে ঢাকায় পাওয়া যেত হাতি পোষ মানানোর লোক, যাদের বলা হয় মাহুত। আর এই মাহুতদের আবাস ছিল যে এলাকায় সেটাই পুরাতন ঢাকার আজকের মাহুতটুলি। আর এই হাতিগুলোকে যে এলাকায় পোষ মানানো হত যে এলাকায় সে এলাকা আজকের পিলখানা। ফারসি ‘পিল’ শব্দের অর্থ হাতি আর ‘খানা’ শব্দের অর্থ জায়গা, দুটো মিলে পিলখানা। যার অর্থ হাতিশালা, এখানে টাকার বিনিময়ে হাতি পোষ মানানো হত। এই পিলখানা হতে ঢাকেশ্বরীর জঙ্গলে (আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন এলাকা) হাতিদের নিয়ে যাওয়া হতো হাতি চরানোর জন্য। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দক্ষিন পাশে বিরাট পুকুরের মত একটি ডিচ ছিল যেখানে নবাবদের এইসব হাতিকে গোসল করানো হত। পিলখানার এই হাতিগুলোকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত যে পথে নিয়ে যাওয়া হত সেই পথটাই আজকের এলিফ্যাণ্ট রোড। এই পথ দিয়ে শাহবাগের দিকে যেতে একটি পুল ছিল, যে পুলটি অনেক উঁচু হওয়ায় হাতিগুলো স্বচ্ছন্দে তার নীচ দিয়ে চলাচল করতে পারতো। সেই পুলটি ছিল যে এলাকাটিতে সেই এলাকাই আজকের হাতিরপুল।

হাতিরপুলের পাশের এলাকা পরীবাগ। পরীবাগ এলাকাটির নামকরণ নিয়ে দুইটি মতবাদ প্রচলিত আছে। অনেকের মতে পরীবাগ এলাকার নামকরণ হয়েছে নবাব আহসান উল্লাহর মেয়ে পরীবানুর নামানুসারে। পরীবানু ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর সৎ বোন। এটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাগান বাড়ি। তার আগে এলাকাটি হিন্দু জমিদারদের ছিল। নবাব সলিমুল্লাহ হিন্দু জমিদারদের কাছ থেকে এলাকাটি কিনে নিয়েছিলেন। পরীবানুর আবাসস্থল হিসাবে বাগানবাড়িটি পরীবাগ নামে পরিচিতি লাভ করে। আরেকটি মত হলো নবাব সলিমুল্লাহ তার পিতাকে না জানিয়ে পাটনা বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে পরী বেগমকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। পরী বেগম পরীবাগেই বসবাস করতো বলে এলাকাটির নাম পরীবাগ হয়েছে। পাশের শাহবাগ এলাকাটির নামকরণ হল কিভাবে? ১৬১০ খৃস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে মুঘল সম্রাট ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং শাহবাগের বাগান গড়ে তোলেন। মোঘল সম্রাটের অতি প্রিয় এই বাগানের নাম হয় ‘শাহবাগ’ যার অর্থ ‘রাজকীয় বাগান’। উল্লেখ্য কয়েকটি সুত্রমতে, পরীবাগ ছিল শাহবাগেরই একটি অংশ।


ব্রিটিশ শাসন আমলে ঢাকা মিউনিসিপালটির সহ-সভাপতি আবুল হাসনাত সাহেবের নামে নামকরণ করা হয় এই রাস্তাটির। ... ইতিহাসের অবস্থান মানুষের স্মৃতিতে, তাই মানুষের মুখে জয় ও মানুষের মুখেই ক্ষয় হয়ে - টিকে থাকে অবশিষ্ট অথবা সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাস।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক সাত গম্বুজ মসজিদ খৃস্টাব্দ ষোল শতকে মোঘল শাসন আমলে গড়ে উঠে। ১৬৮০ খৃস্টাব্দে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব শায়েস্তা খাঁ-এর পুত্র উমিদ খাঁ এর নির্মাতা। আর এই মসজিদের নামানুসারে মসজিদ সংলগ্ন রাস্তাটি ধানমন্ডি পর্যন্ত ‘সাত মসজিদ রোড’ বলা হয়। এর পাশেই আসাদগেট এলাকা। ঢাকা শহরের লালমাটিয়ায় অবস্থিত একটি তোরন। এই তোরনের নাম অনুযায়ী ঐ জায়গার নাম আসাদগেট হয়ে গেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খান ঢাকা এসে করে মোহাম্মদপুর এলাকার প্রথম পনেরটি বাড়ি কিছু পরিবারের জন্য বরাদ্দ করেন। সেই কারনেই মোহাম্মদপুর এলাকার প্রধান রাস্তার প্রধানগেট টির নামকরণ করা হয়েছিল আইউব গেট। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা দাবী আদায়ের গণ আন্দেলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ। আসাদের শহীদ হওয়া সেই সময়ের গণ আন্দোলনে আনে নতুন মাত্রা। তবে আসাদুজ্জামান আসাদ বর্তমান আসাদ গেটের কাছে শহীদ হন নি। সেই সময়কার আন্দোলনটি ছিল প্রেসিডেন্ট আইউব খানের বিরোদ্ধে। সেজন্যই আসাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য ঢাকাবাসী আইউব গেটের নাম পরিবর্তন করে আসাদ গেট রাখেন। এই পরিবর্তনটি পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল। ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের সাক্ষী আসাদগেট আজও আমাদের চেতনায় উজ্জ্বল।

আসাদগেটের পাশেই মোহাম্মদপুর এলাকা। দেশ বিভাগের পর পরই একটি বড় সংখ্যার অবাঙালি মুসলমান ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী এ এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে হাউজিং সেটেলমেন্ট দপ্তরের মাধ্যমে এসব লোক এ এলাকায় কিছু জমি স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামানুসারে মডেল টাউনটির নামকরণ হয় মোহাম্মদপুর। এ এলাকার বেশ কিছু রাস্তা দিলি্লর মসনদে অধিষ্ঠিত মুসলিম রাজন্যবর্গ এবং ব্রিটিশ যুগের শেষ অধ্যায়ে ভারতীয় মুসলিম জাগরণের অগ্রদূতদের নামানুসারে রাখা হয়েছিল। যেমন বাবর রোড, হুমায়ুন রোড, শাহজাহান রোড, শেরশাহ সুরী রোড, রিজিয়া সুলতানা রোড, খিলজি রোড, ইকবাল রোড, তাজমহল রোড ইত্যাদি। যা অন্যান্য এলাকার নামকরণ থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। তেমনিভাবে, মোঘল আমলে ঢাকার অনেক আভিজাত লোকের নামের আগে মীর শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ধারণা করা হয় কোন মীরের ভূ সম্পত্তির অন্তর্গত ছিল এলাকাটি, যা পরে মীরপুর বা মিরপুর নামে পরিচিতি লাভ করে।

আজকের আবাসিক এলাকা ধানমন্ডিতে ব্রিটিশ আমলে চাষাবাদ হতো। তবে সেইসময় ধানমন্ডিতে কিছু কিছু বসতিও ছিল। সেই এলাকায় ধান উৎপন্ন হতো বলেই নামকরণ ধানমন্ডি হয় নি। এলাকাটিতে ধানের এবং অন্যান্য শস্যের বীজের হাট বসতো। হাট বাজারকে ফার্সী এবং উর্দু ভাষায় মন্ডি বলা হয়। সেখান থেকেই এলাকাটির নাম ধানমন্ডি হয়। মগবাজার এলাকার নামকরণ করা হয়েছে মগ তথা বর্মী বংশোদ্ভুত ব্যক্তিদের নাম থেকে। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে মগ সাম্রাজ্য তদানিন্তন মোগল সুবা বাংলার কেন্দ্রস্থল ঢাকা শহরে আক্রমণ চালায়। মোগল সুবাদার ইসলাম খাঁ মগদের তখনকার ঘাঁটি চট্টগ্রাম এলাকা জয় করেন। সেখানকার মগ শাসক মুকুট রায় ও তাঁর অনুসারীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, এবং ইসলাম খাঁ তাদেরকে ঢাকা শহরের এই এলাকায় বসবাস করার অনুমতি প্রদান করেন। অবশ্য ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে এই ধারণা সঠিক নয়, এবং এই নামকরণ অনেক পরে ব্রিটিশ শাসনামলে তদানিন্তন বাংলায় আশ্রয় গ্রহণকারী মগ সর্দার কিং ব্রিং ও তাঁর অনুসারীদের বসবাসের কারণেই হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগ পর্যন্তও এই এলাকাটি ঘন জঙ্গলে পূর্ণ ছিল।
আজকের ফার্মগেট এলাকায় ছিল বিশাল এক খামার যার তোড়ন ছিল আজকের ফার্মগেট এলাকায়। আজও এই এলাকার নিকটবর্তী রয়েছে খামারবাড়ী। এর পাশের ইন্দিরা রোড, অনেকের ধারণা ইন্দিরা রোড ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবিষয়ে দীর্ঘদিন তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এখন ভিন্ন একটি মত প্রচলিত রয়েছে। এই মতটিই সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বর্তমানে ইন্দিরা রোডটি যে এলাকায় অবস্থিত সেই এলাকায় একসময় বেশ সংখ্যক ধনাঢ্য ব্যক্তি বসবাস করতেন। এদেরই একজন দ্বিজদাস বাবু। দ্বিজদাস বাবু মনিপুর ফার্মের কর্তা ছিলেন। খুব সম্ভবত তা ১৯৩০-এর দশকের দিকে। তার বিরাট বাড়ি ছিল বর্তমান ইন্দিরা রোডে। দ্বিজদাস বাবুর বড় মেয়ে ইন্দিরার অকাল মৃত্যু ঘটেছিল। সেই সময় ইন্দিরার সমাধি বাড়ির ভিতরেই করা হয়েছিল। দ্বিসদাস বাবুর মেয়ে ইন্দিরার নামেই সেই এলাকার রাস্তাটি ইন্দিরা রোড নামে পরিচিতি লাভ করে।

পাশের কারওয়ান বাজার, ১৭শ শতাব্দি থেকেই এখানে বাজার ছিল। ১৮শ শতাব্দির শেষের দিকে কারওয়ান সিং নামের একজন মারওয়ারী ব্যবসায়ী এখানে প্রথম মার্কেট খোলেন। তার নামেই এই বাজারের নামকরণ হয়েছে। এখান থেকে আরেকটু এগোলে আজকের নাটকপাড়া বেইলী রোড। বেইলী রোডের নামকরণ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। মহীশুরের টিপু সুলতানের সঙ্গে কর্ণেল বেইলী ও সুনাম অর্জন করেছিলেন। এজন্য তার নামানুসারে বেইলী রোডের নামকরণ করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। অন্য ধারনাটি এইচ বেইলীকে ঘিরে। ওহাবী আন্দোলন দমনকালে স্পেশাল বেঙ্গল পুলিশের ডি, আই, জি, এইচ বেইলী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তার নামানুসারেই বেইলী রোডের নামকরণ হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

ওদিকে মোগল সাম্রাজ্যের সময়কাল হতেই মতিঝিল এলাকার নাম শোনা যায়। এই এলাকাটি সেই সময় মির্জা মোহাম্মদের মহল হিসাবে গন্য হতো, যার মধ্যে ছিলো একটি পুকুর। শুরুতে সুকাকু মহলের পুকুর হিসাবে খ্যাত হলেও পরে এই পুকুরটি মতিঝিল নামে পরিচিত হয়ে উঠে, এবং এর নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয়। পাশেই পুরানো ঢাকার অভিজাত এলাকা ওয়ারী। ওয়ারী বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর গড়ে ওঠা আদি ঢাকা শহরের প্রথম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। সে সময় ওয়ারীর ছয় ভাগের পাঁচ ভাগই ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ১৮৮৪ সালে ঢাকার রাজস্ব প্রশাসক বা ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর ছিলেন ফ্রেডরিক ওয়্যার। তিনি জনবসতি স্থাপনের লক্ষ্যে পুরো এলাকাটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করে উন্নয়ন শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগে জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়। এসব ছিল লাল সুড়কি বিছানো পথ। এছাড়া রাস্তার দুপাশে তৈরি করা হয় ড্রেন। তৈরি করা হয় পানি সরবরাহের জন্য ওভারজহড পানির ট্যাংক বা রিজার্ভার। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে ফ্রেডারিক ওয়্যারের নাম অনুসারেই এ আবাসিক এলাকাটির নামকরণ হয়েছিল ওয়ারী। পাশেই রয়েছে নারিন্দা, মধ্যযুগে মোগল শাসনামল থেকেই এখানে জনবসতি রয়েছে। এই এলাকাটির নাম এসেছে নারায়ণদিয়া শব্দের অপভ্রংশ হতে, যার অর্থ হলো নারায়ণের দ্বীপ। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমনকারী পর্তুগিজ পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী সেবাস্তিয়ান মানরিকের বর্ণনায় নারিন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময় এই এলাকাটি ছিলো সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকা শহরের পূর্ব সীমান্ত। পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ইংরেজ শাসনামলে ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা যখন কমে আসে, তখন নারিন্দা প্রায় জনশূণ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে জনৈক নারায়ণ উক্ত এলাকায় একটি বিচ্ছিন্ন জনপদের গোড়াপত্তন করেন যা নারায়ণের দ্বীপ বলে পরিচিতি পায়; আর সেখান হতেই নারিন্দা নামকরণ (অসমর্থিত সূত্র মতে)।
শাঁখারিবাজার ঢাকা শহরের পুরানো ঢাকার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। এই এলাকায় বসবাসকারী শাঁখারীদের নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে। একইভাবে তাঁতিবাজার। লক্ষ্মীবাজার এর নামকরণ হয়েছিল ঐ এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের নামানুসারে।

আজকের যাত্রাবাড়ি ১৯৫০ সালে ছিল একটি নিভৃত পল্লী। যাত্রাবাড়ি এলাকাটি একসময় ব্রাক্ষ্মণচিরণ মৌজার অন্তর্ভুক্ত ছিল। যাত্রাবাড়িসহ বিরাট একটি এলাকা ব্রাক্ষ্মণচিরণ নামে পরিচিত ছিল। ব্রাক্ষ্মণচিরণ এলাকার একটি বাড়িতে যাত্রামন্ডপ ছিল। প্রায়ই সেখানে যাত্রাপালা হতো। একমাত্র যাত্রাই ছিল চিত্তবিনোদনের উৎস। তাই যাত্রার প্রতি লোকজনের আগ্রহ ছিল বেশি। যে বাড়িটিতে যাত্রামন্ডপটি অবস্থিত সেটিকে লোকজন তখন যাত্রাবাড়ি নামে ডাকতো। সেই থেকেই এলাকাটির নাম যাত্রাবাড়ি হিসাবে পরিচিত হয়।

পুরাতন ঢাকার আরমানিটোলা । অনেক পূর্বে এখানে আর্মেনিয়ার অধিবাসী বা আর্মেনিয়ানরা থাকতেন, তাই এলাকাটির নামকরণ হয়ে যায় আরমানিটোলা। বহুল আলোচিত পুরাতন ঢাকার চকবাজারের পত্তন হয় মুঘল আমলে। মুঘল আমলে সেনাপতি মানসিংহ পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন বিদ্রোহ দমন করতে। ১৬০২ সালে তিনি ভাওয়াল থেকে সদর দফতর স্থানান্তর করেছিলেন বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গায়। সেখানেই মুঘল দুর্গ স্থাপিত হয়েছিল। মুঘল দুর্গের পাশেই গড়ে উঠে চকবাজার। তবে একসময় এই চকবাজারকে বহুলোক চৌক বন্দর নামে ডাকতেন। সেখান থেকেই আজকের চকবাজার। এর পার্শ্ববর্তী এলাকা লালবাগ যা লালবাগের কেল্লার জন্য বিখ্যাত। এখানকার গোলাপ বাগান হতে এরকম নামকরণের অসমর্থিত সূত্র পাওয়া যায়। এর পার্শ্ববর্তী এলাকা আজিমপুর এর নামকরণ নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন, সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহাজাদা আজমের নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছিল এ এলাকার। শাহজাদা আজম বাংলার সুবাদার ছিলেন ১৬৭৮ থেকে ৭৯ সাল পর্যন্ত। তিনি তখন লালবাগ দুর্গের কাজ শুরু করেছিলেন। তার কর্মচারীরা বাস করতেন এই এলাকায়। তখন সেই এলাকাটি আজমপুরা নাম পরিচিত ছিল। অনেকে আবার মনে করেন, সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি শাহজাদা আজিমুশশানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল আজিমপুর। আজিমুশশান বাংলার সুবাদার ছিলেন ১৬৯৭ থেকে ১৭০৩ সাল পর্যন্ত। তার আমলে এখানে আমলাদের জন্য আবসস্থল নির্মাণ শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়।

আরেকটু উত্তরের দিকে আজকের নীলক্ষেত। বৃটিশরা এদেশে আসার পর থেকেই ইউরোপিয়ানরা বিভিন্ন এলাকায় নীল চাষ শুরু করে। সেই সময় ঢাকার নীলক্ষেত এলাকার বিরাট প্রান্তরজুড়ে নীল চাষ করা হতো। দীর্ঘকাল ধরে সেই নীল চাষ চলে। সেই এলাকাটিতে নীল উৎপন্ন হতো প্রচুর। প্রচুর নীল উৎপন্ন হতো বলেই আজও নীলক্ষেতের নামের সাথে নীল শব্দটি জড়িয়ে আছে। লোকজন এলাকাটিকে চিনছেও এ নামে। নীলক্ষেত এলাকার নামকরণ করা হয় নীলচাষের স্থান থেকে। সেব জমিতে চাষাবাদ করা হয় সেই জমিকে ক্ষেত নামে অবহিত করা হয়। এটা বেশ আগের রীতি। নীল এবং চাষাবাদের ক্ষেত এই দুয়ের মিশ্রনে নাম হয় নীলক্ষেত।

এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা শহরের নামের এই ইতিহাস নিয়ে লেখা আরও বড় হয়ে যাবে। এতক্ষনে নিশ্চয়ই পাঠক ক্লান্ত হয়ে পরেছেন। তাই আজ এখানে ইতি টানছি, যদি আরও কিছু পাই পরে জানিয়ে যাব।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩ বিকাল ৩:০৯
১২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মৃত ১১০ জনকে জীবিত ফিরিয়ে আনুন

লিখেছেন চাঙ্কু, ২১ শে জুলাই, ২০২৪ ভোর ৪:০৬



খুব সিম্পল একটা সামাজিক আন্দোলন - কোটা সিস্টেম সংস্কার করে একটা ফেয়ার কোটা সিস্টেম রাখা। আহামরি অন্য কোন দাবীও নাই যা সরকারের পক্ষে রাখা সম্ভব না। শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদালতের রায়ে কি সমাধান আসবে? কি হতে পারে বর্তমান অবস্থায়:

লিখেছেন সরলপাঠ, ২১ শে জুলাই, ২০২৪ সকাল ১১:৪৯

কোটা সংস্কার নিয়ে আজকের অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ মূলত সরকারের রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের ফল। গত কয়েকদিনে ২০০ এর অধিক মানুষকে হত্যার জন্যে সরকারই দায়ী। বর্তমান অবস্থায় সরকারের জন্যে সহজ কোন পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব কোমলমতি "কোটা পরিবর্তনের" আন্দোলন করেনি!

লিখেছেন সোনাগাজী, ২১ শে জুলাই, ২০২৪ বিকাল ৪:৩৬



**** কোর্ট কোমলমতি ফেইসবুকারদের "মোয়া" ধরায়ে দিয়েছে: কোটার ৯৩% নয়, ১৯৩% চাকুরীও যদি কোমলমতিদের দেয়া হয়, তারপরও ৪০ লাখ শিক্ষিত বেকার থাকবে; কারণ, কোটার শতকরা হার বাড়োনো হয়েছে কোমলমতিদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে ইন্টারনেট আসার আগে, এই পোষ্টটা সরিয়ে নেবো। (সাময়িক )

লিখেছেন সোনাগাজী, ২১ শে জুলাই, ২০২৪ রাত ৮:০৯



ভোলার মানুষজনের ১টা শান্ত্বনা আছে, উনারা সামান্য পয়সা দিয়েও মাঝে মাঝে ইলিশ পেয়ে থাকেন; অনেকে বিনা পয়সায়ও পেয়ে থাকেন মাঝে মাঝে; ইহা ব্যতিত অন্য কিছু তেমন নেই; ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×