somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা— প্রথম স্তর

১১ ই নভেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভূমিকাঃ
সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ. ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান (Plejaren) নামক নক্ষত্রমন্ডলী থেকে আগত ভীন গ্রহের মানব সদৃশ প্রানীদের সাথে বাল্যকাল থেকেই, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তার সাক্ষাত ঘটে। তখন ১৯৪২ সাল। যোগাযোগের ধারা অনুসারে বিলির সাথে তথ্যের ট্রান্সমিশান শুরু হয় ১৯৭৫ থেকে। তার সংরক্ষিত কন্টাক্ট নোট সমূহ লিপিবদ্ধ আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় থেকে তাকে বলা তথ্যসমূহ টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা হয়েছে। তারই কন্টাক্ট নোটে ' সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা' -র সাতটি স্তর বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটুকু আমি আরেকটু বিশদ ভাবে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র।

সাতটি স্তরের মাঝে প্রথম স্তরঃ

এ যেন অন্ধকারের গর্ভে প্রথম আলোর জাগরণ। আত্মা এখানে যেন সদ্যজন্ম নেওয়া একটা ছোট্ট চারাগাছ। চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢেকে আছে। বাস্তবতা তার কাছে যেন কুয়াশার ভেতরে আটকে থাকা অস্পষ্ট একটি চিত্র। অভিজ্ঞতাহীন। তার কাছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নেই, আলো-অন্ধকারের সীমারেখা নেই, কোনো দিকনির্দেশনয়া নেই। এ যেন সৃষ্টির প্রথম মুহূর্ত—অব্যক্ত থেকে ব্যক্তের দিকে যাত্রার সূচনা।
হিন্দুধর্মে এই অবস্থাকে “তামসিক” স্তর বলা হয়—অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীবাত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা—নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন।
বৌদ্ধধর্মে এটি “অবিদ্যা”—যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে।
সূফি দর্শনে এটি “নাফসে আম্মারা”—আত্মার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিপক্ক অবস্থান। যেখানে প্রবৃত্তি দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত।
খ্রিস্টধর্মে এটি “spiritual infancy” বা আত্মার শৈশব অবস্থা বলে। এখানে মানুষ পাপ বা ভুলের অন্ধকারে আবদ্ধ থাকে—সত্যের আলো এখনো তার কাছে পৌঁছেনি।
তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা। তাওবাদে প্রথম স্তরটি এমন একটি অবস্থা যেখানে এটি “অচেতন দাও” অর্থাৎ যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না।
সকল দর্শনে একটি মিল লক্ষ্যণীয় আর তা হলো প্রথম স্তরে আত্মা অজ্ঞতার গভীরতায়, দিকহীনতায় অবস্থান করে।

আত্মার স্পন্দনঃ
এই অবস্থায় আত্মার গভীরতম কেন্দ্রের শক্তি প্রথমবারের মত যেন স্পন্দিত হয়। প্লেটোর দর্শনে এটি “awakening of the soul”—অপরূপ জগতে, স্মৃতির প্রথম প্রবেশ। প্লেটো বলেন, আত্মা সব জানে, শুধু স্মরণ করতে হয়।
উপনিষদে এটি “প্রথম প্রজ্ঞার অঙ্কুর” অর্থাৎ প্রাণশক্তি জাগ্রত হওয়া।
বুদ্ধের ভাষায়, এটি “স্মৃতি জাগরণ” অবস্থা।
প্রবৃত্তিনির্ভর জীবন যাপনের দিক দিয়ে প্রাথমিক স্তরে মানুষ কিভাবে বাঁচে?
সে প্রবৃত্তির উপর নির্ভর করেই বাঁচে। ভয়, ক্ষুধা, টিকে থাকার সংগ্রাম সবই সহজাত প্রবৃত্তি। যুক্তিবোধ তখনও অপরিণত। এই স্তরে জন্ম নেয় “ইচ্ছাশক্তি”। হিন্দু দর্শনে, সৃষ্টি শুরু হয় ইচ্ছা থেকে। বৌদ্ধধর্মে এটি “চেতনা”— যা কামনা সৃষ্টি করে এবং কর্মফল তৈরি করে। খ্রিস্টান ধর্মে এটিকে “free will” বলে, যা মানুষের প্রথম স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার স্তর। সূফিবাদে এটি “ইরাদা” অর্থাৎ আল্লাহর দিকে ফেরার ইচ্ছা, যদিও সে খুবই নাজুক এবং কেবল শুরুর পথে।
দিকহীনতায় আর অজ্ঞতার রাজত্ব যখন চারদিকে তখন এই স্তরে মানুষ হাতড়ে হাতড়ে এগোয়, হোঁচট খায়, থেমে যায়, আবার শুরু করে। দিশা হারায়। মনে মনে ভাবে তার সামনে কোনো নিশ্চিত পথ নেই। তবুও এই সকল অভিজ্ঞতাই পরবর্তী স্তরের পথপ্রদর্শক। এই অভিজ্ঞতাই চেতনাবিকাশের পরবর্তী ছয়টি স্তরের ভিত্তি।
এ থেকেই জন্ম নিবে যুক্তি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিকতা, সৃষ্টির বিস্তার এবং শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির সঙ্গে একাত্মতা।

এক কথায়
হিন্দু দর্শন ও উপনিষদীয় চিন্তা অনুসারে 'চেতনা' নিজেকে প্রকাশ করে স্তর স্তরে।

উপনিষদীয় ৫টি কোষ (শরীর-চেতনার স্তর)ঃ
১. অন্নময় কোষ — শারীরিক দেহ
২. প্রাণময় কোষ — প্রাণশক্তি/শ্বাস/উদ্যম
৩.মনোময় কোষ — মানসিক জগৎ/কল্পনা/ভয়/বিশ্বাস
৪.বিজ্ঞানময় কোষ — বুদ্ধি/জ্ঞান/যুক্তি
৫.আনন্দময় কোষ — পরমানন্দ/সৃষ্টিশক্তি/ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ

বৌদ্ধ দর্শন (তিব্বতী/মহাযান/থেরবাদ)
বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষা:
অবিদ্যা/ অজ্ঞতা → যা দুঃখ আনয়ন করে → অতঃপর চেতনার জাগরণ হলে → আত্মা নির্বাণ লাভ করে।
এ ক্ষেত্রে চেতনা বিকাশের ধাপঃ
১ স্তর. কুসংস্কার এবং অজ্ঞতা (অবিদ্যা)
২ স্তর. ভ্রান্ত ধারণা
৩ স্তর. জ্ঞান ও দৃষ্টির শুদ্ধি
৪ স্তর. বীমল-চেতনা
৫ স্তর. অহং বিলীন
৬ স্তর. নির্বাণ
৭ স্তর. মহাশূন্য/ধর্মকায় (বুদ্ধত্ব)

অর্থাৎ, ১–২ স্তর = অবিদ্যা, কুসংস্কার, উপাসনার প্রাথমিক যুগ।

সুফিবাদ (ইসলামী আধ্যাত্মিকতা)
সুফিবাদে মূল লক্ষ্য হলো নফসকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

নফসের উন্নতির ৭টি স্তরঃ
১. নফস আম্মারা — প্রবৃত্তিনির্ভর, অজ্ঞতা
২. নফস লাওয়ামা — আত্মসমালোচনা
৩. নফস মুলহামা — জ্ঞান, অনুপ্রেরণা
৪. নফস মুতমাইন্না — প্রশান্তি
৫. নফস রাজিয়া — সন্তুষ্টি
৬. নফস মারজিয়া — আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
৭. নফস কামিলা — পূর্ণতা, ঐক্য
সুতরাং এ আলোচনার সাথে মিল রেখে নিম্নোক্ত ভাবে ভাগ করা যায়ঃ ১ম - ২য় স্তর: প্রবৃত্তি/অজ্ঞতা

খ্রিষ্টীয় মিস্টিসিজম
তিনটি ধাপে আত্মার উত্তোরণ ঘটে। যেমনঃ
1. Purification — পাপ পরিশোধ
2. Illumination — অন্তর্জ্ঞান
3. Union — ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন
অর্থাৎ আত্মা ইন্ডিভিজুয়াল সোল থেকে Holy Spirit-এ রূপান্তর - শেষে God-consciousness-এ পরিণতি লাভ করা
খ্রিষ্টীয় mystic দের মতে “When the soul sees no separation, creation flows through it.”

গ্রীক দর্শন
প্লেটোর দর্শন অনুসারে আত্মার তিনটি ধরণের সমাহার। যেমনঃ
1. Appetitive — প্রবৃত্তি
2. Spirited — আবেগ
3. Rational — বুদ্ধি
পরবর্তীতে Neoplatonism-এ ধারণা করা হয়
1. Soul
2. Intellect
3. The One
যা তুলনা করলে বলা যায়ঃ ১–২ স্তর = প্রবৃত্তি/আবেগ

আধুনিক বিজ্ঞান (নিউরোসায়েন্স,কসমোলজি ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব)চেতনাকে ব্যাখ্যা করে তিনটি স্তরে। যেমনঃ
1. Primitive brain (Reptilian)
2. Emotional brain (Limbic)
3. Rational brain (Neocortex)

তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন তত্ত্ব:
* Integrated information theory
* Quantum consciousness
* Unified field theory
যা তুলনা করলে দাঁড়ায়ঃ ১–২ স্তর = বেঁচে থাকার অনুভূতি/ভয়/প্রবৃত্তি

নিউ এজ/মেটাফিজিক্স -এর মতে মহাবিশ্ব "কম্পন" বা vibration দিয়ে তৈরি।
ডাইমেনশন 3D–7D অনুযায়ী চেতনাস্তরঃ
3D: ভৌতিক জগত
4D: বিশ্বাস/এনার্জেটিক সংবেদন
5D: জ্ঞান-প্রজ্ঞা
6D: আধ্যাত্মিক সৃষ্টিশক্তি
7D: উৎস অর্থাৎ চেতনার মুল উৎস(Source consciousness)

ক্রমশঃ


সৃষ্টি, চেতনা আত্মার চিরন্তন যাত্রা -দ্বিতীয় স্তর
তৃতীয় স্তর
চতুর্থ স্তর
পঞ্চম স্তর
ষষ্ঠ স্তর
সপ্তম স্তর
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৩
৯টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৯



সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×