
ভূমিকাঃ সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী এডয়ার্ড আলবার্ট মায়্যার (Eduard Albert Meier) — সাধারণভাবে বিলি মায়্যার “Billy Meier” নামে পরিচিত একজন বিশ্ব বিখ্যাত ইউ. এফ. ও. কন্টাক্টি। প্লেজেরিয়ান (Plejaren) নামক নক্ষত্রমন্ডলী থেকে আগত ভীন গ্রহের মানব সদৃশ প্রানীদের সাথে বাল্যকাল থেকেই, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তার সাক্ষাত ঘটে। তখন ১৯৪২ সাল। যোগাযোগের ধারা অনুসারে বিলির সাথে তথ্যের ট্রান্সমিশান শুরু হয় ১৯৭৫ থেকে। তার সংরক্ষিত কন্টাক্ট নোট সমূহ লিপিবদ্ধ আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় থেকে তাকে বলা তথ্যসমূহ টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা হয়েছে। তারই কন্টাক্ট নোটে ' সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা' -র সাতটি স্তর বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটুকু আমি আরেকটু বিশদ ভাবে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র।
ষষ্ঠ স্তরঃ আধ্যাত্মিক জীবন — শরীরের সীমানা ভেদ করে আত্মার মহাজাগতিক উন্মেষ
পঞ্চম স্তরের সৃষ্টিশক্তির শিখর অতিক্রম করে আত্মা যখন দেহের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, তখনই সে প্রবেশ করে ষষ্ঠ স্তরে। এটি এমন এক স্তর যেখানে "জীবন" শব্দটি দেহের সীমায় বাঁধা থাকে না; জীবন হয়ে ওঠে চেতনার স্পন্দন, অস্তিত্বের তরঙ্গ, নীরব মহাজাগতিক আলোর এক বিস্তৃত সাগর।
পঞ্চম স্তরে আত্মা যখন সৃষ্টিশৈলীর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়, তখন তার শরীরের সীমাবদ্ধতা থাকে না।মানুষ তখন শরীরবিহীন শুদ্ধ চেতনায় রূপান্তরিত হয়।
এই স্তর হলো — মানব আত্মার শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা, সময়ের বাঁধন ছিন্ন করে উর্ধ্ব স্তরের দিকে ধাবিত হবার অবস্থা। এ স্তরে ভৌত অবস্থা অর্থাৎ ফিজিক্যাল রিয়্যালিটি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মা নন - ফিজিক্যাল সত্তায় পরিণত হয়। এই অবস্থাকে বলা যায় আত্মার একপ্রকার 'বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব।' এখানে আত্মা সবসময় একক অবস্থায় বিরাজমান। মৃত্যু বা জীবিত — এই দুটি ধারণা একই এবং বিভেদহীন।
আধ্যাত্মিক শক্তি — সময়ের হাজার বছর অতিক্রম করার ক্ষমতা
ষষ্ঠ স্তরে আত্মা শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। ফলে — জন্ম মৃত্যুর বিভেদ না থাকায় জীবন ও মৃত্যু তার নিয়ন্ত্রাধীন হয়। ভৌত জগতে মানে ফিজিক্যাল রিয়্যালিটিতে তার বয়স হাজার বছর হতে পারে । কারণ তার শরীর ক্ষয় হয় না,আত্মার শক্তি অবিনশ্বর থাকে ।মন থাকে ধীর স্থির। এইরূপ মানসিক অবস্থা সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনাসহ সকল অনুভূতির উর্ধ্বে অবস্থান নেয়। আত্মা তখন স্থিত অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে অটলএবং অনড় অবস্থান গ্রহন করে। ষষ্ঠ স্তরে এসে সে যেন অপরিবর্তনীয়।
ধর্ম–দর্শনের তুলনা
হিন্দু — সিদ্ধ/ঋষি/যোগীদের দেহলয়
হিন্দু দর্শনে আত্মার বিবর্তনের প্রথম স্তরকে 'তামসিক' স্তর বলে। এটা অন্ধকার, অজ্ঞতা, বিভ্রান্তির স্তর। জীব আত্মা তখনো মায়ার পর্দায় ঢাকা। নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অচেতন। আর দ্বিতীয় স্তরটিকে 'রাজসিক' স্তর বলে। এ স্তরে মানুষের ভেতরের শক্তি, মানসিক চাহিদা ও চিন্তার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপ শুরু হয়। তৃতীয় স্তরে এসে কুন্ডলিনী শক্তির প্রথম জাগরণ হয়।মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে। তারপর চতুর্থ স্তরে হলো “ব্রহ্ম” উপলব্ধি। যেখানে আত্মা ও ব্রহ্ম একাকার। তখন উপলব্ধি আসে “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমি ব্রহ্ম।
পঞ্চম স্তুরে যারা বসবাস করেন তাদের বলা হয় ঋষি। প্রাচীন ঋষিরা এ স্তুরে উন্নীত হয়ে প্রাণশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা প্রকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেন। ষষ্ঠ স্তরে চৈতন্যই সত্তা।
বৌদ্ধ দর্শন — অরূপ সমাধির স্তর
বৌদ্ধধর্মে প্রথম স্তরে আত্মার অবস্থাকে বলা হয় 'অবিদ্যা' অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে পায় না। চক্রাকারে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় স্তরে এসে এটি ‘স্মৃতি ও সচেতনতা’ জন্মানোর আদি ধাপে উন্নীত হয়। অবিদ্যা এখনো প্রবল, তবে জ্ঞানতৃষ্ণার জন্ম হয়। তৃতীয় স্তরে মনের ক্ষমতার বৃদ্ধির ফলে অন্তর্দৃষ্টির সূচনা হয়। বুদ্ধ বলেছেনঃ 'মনই সব কিছুর উৎস।' ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। তবে চতুর্থ স্তরে উপনীত হওয়া হলো নির্বাণের প্রাথমিক স্তর/ আত্মা সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হয়। অতঃপর পঞ্চম স্তরে আত্মা বোধিসত্ত্বা অর্জন করে। বোধিসত্ত্বারা জীবজগতের কল্যাণে শক্তি প্রয়োগ করেন। ষষ্ঠ স্তরে চেতনাই অস্তিত্ব। এ স্তরে শরীর বিলীন হয়ে যায় ।
তাওবাদ — Immortal Sage
তাওবাদ (Taoism বা Daoism) হলো চীনের এক প্রাচীন দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ, যার মূল ভিত্তি হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা। তাওবাদে প্রথম স্তরটি এমন একটি অবস্থা যেখানে এটি 'অচেতন দাও' অর্থাৎ যেখানে মানুষ প্রকৃতির স্রোত বুঝতে পারে না। দ্বিতীয় স্তর হলো 'দাও-এর প্রথম অনুভব'— 'তাও' সবকিছু বুঝতে না পারলেও সে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।
পঞ্চম স্তরে উন্নীত হলে তাদের বলি Immortal Sage. এরা শক্তিকে সরাসরি প্রকৃতির প্রবাহে রূপ দিতে সক্ষম। সকল দর্শনে পঞ্চম স্তর “সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের” স্তর হিসেবে স্বীকৃত। ষষ্ঠ স্তরে উপনীত হলে আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা শত শত বছর বেঁচে থাকার শক্তি অর্জিত হয়।
খ্রিস্টীয় মিস্টিক — Pure Spirit
ষষ্ঠ স্তরে দেহিক অস্তিত্ব বিলীন হয়। কারণ দেহ ক্ষয়শীল, কিন্তু আত্মা ঈশ্বরের আলোয় চিরজীবী।
সব দর্শনে এই স্তরকে অতিলৌকিক না বলে অতিবাস্তব আধ্যাত্মিক সত্তার স্তর বা অতিবাস্তব চৈতন্যের স্তর বলা শ্রেয়।
বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব
ষষ্ঠ স্তরে উত্তীর্ণ হয়ে আত্মা দেহ ছাড়ে। সে হয়ে ওঠে স্বচ্ছ, আলোকিত, শক্তিরূপে সর্বদা বিরাজমান। আত্মার দেহের মত চোখ, কান নেই কিন্তু তার জ্ঞান আছে, অনুভূতি আছে। সে অতিবাস্তব জগতের অস্তিত্বশীল চেতনা। ষষ্ঠ স্তরে আত্মা এমন এক প্রশান্তি অনুভব করে, যা পৃথিবীর কোনো অনুভূতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ শান্তি সীমাহীন এবং দুর্লভ। এর জন্ম হয় আত্মার স্বচ্ছতার ভেতর থেকে। তখন তার কোনো ভয় নেই, উদ্বেগ নেই, সময়ের তাড়া নেই। কারণ এ স্তরে আত্মা বুঝে যে সে 'সময়'-এর উর্ধ্বে।
আত্মা হাজার হাজার বছরের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে কোনো বিপর্যয় ছাড়াই, শুধু তার নিজস্ব শক্তির জোরে। শরীরের প্রয়োজন বিলীন হয়ে যায় ফলে এ স্তরে দেহ আর আত্মার কেন্দ্র এক নয়। শরীর যেন একটি পুরোনো পোশাক — ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়, ম্লান হয়ে যায়, স্বচ্ছ হয়ে যায়। আত্মা বুঝতে পারেঃ “আমি দেহ নই। আমি দেহেরও ওপারে, আমি দেহের উর্ধ্বে।”
তার ইন্দ্রিয়-শক্তি তখন পার্থিব জগতে সীমাবদ্ধ নয়। তার চোখ দিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে না, কানে শোনার প্রয়োজন পড়ে না,স্পর্শ করার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ দেখতে পারা, বুঝতে পারা, উপলব্ধি করতে পারা সবই ঘটে তার চেতনার মাধ্যমে।
আধ্যাত্মিক সৃষ্টিকর্ম — শক্তির মাধ্যমে যার সৃষ্টি
এ স্তরে আত্মা অন্য আত্মাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়—তাদের শক্তি ভাগ করে, তাদের আলো ছড়িয়ে দেয় -কোনো কথার মাধ্যমে নয়, কোনো ভাষার মাধ্যমে নয়। এ যোগাযোগ হয় 'চেতনার কম্পন'-এর মাধ্যমে। এই যোগাযোগ বিশুদ্ধ, নিখাদ, অহংবর্জিত। এতে থাকে নির্দেশনা, স্নেহ, জ্ঞান। বিনিময় হয় চিন্তা ও ধারণার। এ স্তরে আত্মা আধ্যাত্মিকতা থেকে তৈরি করে নতুন ধারণা, নতুন দিক নির্দেশনা। কারণ ষষ্ঠ স্তরে আত্মা সূক্ষ্ম শক্তি দিয়ে সৃষ্টিকে রূপ দিতে পারে,পূর্বেলোব্ধ জ্ঞান দিয়ে নবজাত আত্মাকে তার চলার পথে সহায়তা করতে পারে। সে 'স্পিরিট ওয়ার্ল্ড' থেকে স্পিরিট গাইড (Spirit Guid) হিসেবে মনুষ্য সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করতে পারে। এঁরা 3D রিয়্যালিটিতে কাজ করেন বলে আমরা এঁদের দেবদূত, স্পিরিট গাইড বলি। এই ধারণাগুলোর জন্ম এভাবেই হয়ে এসেছে।
জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি
ষষ্ঠ স্তরে দেহ থেকে মুক্ত অবস্থায় আত্মা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ স্বাধীন, সম্পূর্ণ শক্তিশালী। কারন এখন আর তার কোন মৃত্যু নেই,জন্ম নেই। কারণ দেহই ছিল কষ্টের মূল উৎস; দেহই ছিল সীমাবদ্ধতা; দেহেরই মৃত্যু হতো। এই স্তরে আত্মা দেহের উর্ধ্বে, সম্পূর্ণ বন্ধনহীন এক সত্তা।
প্রকৃত মুক্তি
ষষ্ঠ স্তরের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য—“দেহের মৃত্যু আর আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না।” এখানে দেহ নেই বলেই মৃত্যু নেই।
আত্মা পুরোপুরি স্বচ্ছ—দেহের রূপ একসময় ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়। এটি প্রকৃত মুক্তি।
চেতনার সমষ্টিক অস্তিত্ব
এ স্তরে আত্মা প্রথমবার উপলব্ধি করে “আমি শরীরের মাঝে নেই। আমি চেতনা মাত্র। আমি রূপহীন, তরংগায়িত শক্তিমাত্র। এই অবস্থায় এক আত্মা অন্য আত্মার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে। এবং ষষ্ঠ স্তরের শেষ পর্যায়ে আত্মা বুঝতে পারে যে সে একা নয়। অসংখ্য আত্মা একসঙ্গে একটি বিশাল চেতনার মহাসাগরে একাত্ম হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত পরিচয় ম্লান হয়ে আসে। আত্মা হয়ে ওঠে বৃহত্তর চেতনার অংশ। এটি “সামষ্টিক বুদ্ধি” বা “কলেক্টিভ কনশাসনেস”-এর রূপ। যেখানে আলাদা করে “আমি” বলে কিছু নেই। এ স্তরে আত্মা একাকী হয় না।
ষষ্ঠ স্তরে ভৌত জগতের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মা সৃষ্টিতে লীন হয়। আত্মা সৃষ্টি-প্রবাহের সাথে একত্রিত হয়। পার্থিব অবস্থার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ সময় “বাস্তব” শব্দের অর্থ পাল্টে যায়। আর কোনো পৃথিবী নামের “জগত” নেই। আছে কেবল এক অসীম আলো, শক্তির আধারে সদা সঞ্চারণশীল প্রবাহ মাত্র ।
ষষ্ঠ স্তরের সারমর্ম
ষষ্ঠ স্তরে আত্মা দেহহীন, অমর, শক্তিশালী সমষ্টিগত চেতনার অংশ। সময়-স্থানাতীত অবস্থায় প্রোথিত। এ স্তরে মানুষের আর “মানব অস্তিত্ব থাকে না। শুদ্ধ শক্তি তে রূপান্তরিত হয়। এই স্তর তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় সপ্তম স্তরেঃ পরম সৃষ্টিমান চেতনার সঙ্গে একীভূত হওয়ার লক্ষ্যে।

এক কথায়ঃ
হিন্দু দর্শন ও উপনিষদীয় চিন্তা অনুসারে চেতনা নিজেকে প্রকাশ করে স্তর স্তরে।
উপনিষদীয় ৫টি কোষ (শরীর-চেতনার স্তর)ঃ
১. অন্নময় কোষ — শারীরিক দেহ
অন্ন অর্থ খাদ্য; এটি হল সেই স্তর, যা খাদ্য থেকে গঠিত—অর্থাৎ আমাদের শারীরিক দেহ।
বৈশিষ্ট্যঃ অন্নময় কোষ দৃশ্যমান, জড়, স্থূল শরীর নির্দেশ করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দৈহিক বৃদ্ধি, জরা, বার্ধক্য ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত।এই স্তর ছাড়া মানুষ অস্তিত্বহীন। অর্থাৎ এটি মানুষের দেহাত্মক, বস্তুগত আবরণ, যা জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়।
২. প্রাণময় কোষ — প্রাণশক্তি/শ্বাস/উদ্যম
প্রাণ অর্থ জীবনশক্তি; এটি হল সেই স্তর, যা দেহে প্রাণশক্তি বা vital energy প্রবাহিত করে। প্রাণময় কোষ শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত সঞ্চালন, বিপাক প্রভৃতি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।দেহের প্রাণশক্তি বা subtle body-র ধারক।
অর্থাৎ এই স্তর জীবনের স্পন্দন ও শক্তির প্রকাশ, যা দেহকে সচল রাখে।
৩.মনোময় কোষ — মানসিক জগৎ/কল্পনা/ভয়/বিশ্বাস
মনোময় অর্থ মন। এই স্তর মানসিক কার্যকলাপ, চিন্তা, অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার আধার। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি, ভাবনা, ইচ্ছা, স্মৃতি, কল্পনা,আত্মপরিচয় ও মানসিক অভিজ্ঞতা এ স্তরে পরিচালিত হয়।
এটি মানুষের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তর, যা মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতির জন্য দায়ী।
৪.বিজ্ঞানময় কোষ — বুদ্ধি/জ্ঞান/যুক্তি
বিজ্ঞান অর্থ জ্ঞান, বিচার-বিবেচনা ও বুদ্ধি; এই স্তরে বিচারবোধ, অন্তর্দৃষ্টি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বিকশিত হয়। বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তরে যুক্তি, বিশ্লেষণ, নৈতিকতা ও আত্ম-অন্বেষণে সচেতন হয়। মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে ও সঠিক-ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে।
এটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসচেতনতা ও আত্মবোধের আধার।
৫.আনন্দময় কোষ — পরমানন্দ/সৃষ্টিশক্তি/ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ
আনন্দ অর্থ পরম সুখ, bliss; এই স্তর হচ্ছে আত্মার নিকটতম এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম আবরণ।
বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তর গভীর সুখ, প্রশান্তি, পরম প্রশান্তিবোধের স্তর। এ স্তর ধ্যান, সমাধি ও আত্ম-অনুভবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটি চেতনার সেই স্তর, যেখানে মানুষ পরম আনন্দ অনুভব করে ও আত্মার সঙ্গে একাত্মতা অনুধাবন করে।
বৌদ্ধ দর্শন (তিব্বতী/মহাযান/থেরবাদ)
বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাঃ
অবিদ্যা/ অজ্ঞতা → যা দুঃখ আনয়ন করে → চেতনার জাগরণ হলে → আত্মা নির্বাণ লাভ করে।
এ ক্ষেত্রে চেতনাবিকাশের ধাপঃ
১ম স্তর. কুসংস্কার এবং অজ্ঞতা (অবিদ্যা)
২য় স্তর. ভ্রান্ত ধারণা
৩য় স্তর. জ্ঞান ও দৃষ্টির শুদ্ধি
৪র্থ স্তর. বিমল চেতনা
৫ম স্তর. অহং বিলীন
৬ষ্ঠ স্তর. নির্বাণ
৭ম স্তর. মহাশূন্য/ধর্মকায় (বুদ্ধত্ব)
অর্থাৎ, ১ম – ২য় স্তর = অবিদ্যা, কুসংস্কার, উপাসনার প্রাথমিক যুগ।
৩য় স্তর = জ্ঞান/সম্যক দৃষ্টি
৪র্থ স্তর = বোধি
৫ম স্তর = বোধিসত্ত্বের পথ (সৃষ্টিশীল করুণার বিকাশ)
সুফিবাদ (ইসলামী আধ্যাত্মিকতা)
সুফিবাদে মূল লক্ষ্য হলো নফসকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।
নফসের উন্নতির ৭টি স্তরঃ
১. নফস আম্মারা — প্রবৃত্তিনির্ভর, অজ্ঞতা
বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তরটি মানুষকে খারাপ কাজের প্রতি টানে এবং নৈতিক অবক্ষয়ে উৎসাহিত করে।লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, কামনা—এসব প্রবৃত্তির আধার।
সুফি সাধনায়:‘নফস আম্মারা’ দমন ও সংযম সাধনার প্রথম ধাপ।মুর্শিদ (আধ্যাত্মিক গুরু) ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।আত্মার উচ্চতর স্তরে (যেমন ‘নফস লাওয়াম্মা’, ‘নফস মুতমাইন্না’) পৌঁছাতে হলে ‘নফস আম্মারা’কে জয় করতে হয়।
অর্থাৎ এই স্তর মানুষের আত্মার সেই স্তর, যা সব থেকে নিচু এবং কুপ্রবৃত্তিতে প্রবণ। এটি ‘নফস’-এর (আত্মা/মন/সত্তা) প্রথম এবং সবচেয়ে আদিম স্তর। এটি মানুষকে খারাপ কাজের প্রতি টানে এবং নৈতিক অবক্ষয়ে উৎসাহিত করে। লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, কামনা—এসব প্রবৃত্তির আধার।
২. নফস লাওয়ামা — আত্মসমালোচনা
বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তরে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়। কেউ যখন কোনো ভুল বা পাপ করে, তখন তার মনে অনুতাপ বা অপরাধবোধ আসে। আত্মা নিজেকে দোষারোপ বা তিরস্কার করে, ফলে ব্যক্তি নিজের ভুল সংশোধন করতে উদ্বুদ্ধ হয়।এই স্তরের নফস পাপ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন এবং আত্মশুদ্ধির দিকে অগ্রসর হয়।
এই স্তরে আত্মা (নফস) খারাপ কাজের পর নিজেকে তিরস্কার বা অনুশোচনা করে এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য উপলব্ধি করতে শেখে।
আত্মশুদ্ধির পথে এগোনোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।এই স্তরে পৌঁছলে মানুষ নিজের দোষ-ত্রুটি বুঝতে শেখে এবং সংশোধনের চেষ্টা করে।আত্মার আরও উন্নত স্তরে (যেমন ‘নফস মুতমাইন্না’) পৌঁছাতে হলে এই স্তরের আত্ম-সমালোচনা ও অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নফস মুলহামা — জ্ঞান, অনুপ্রেরণা
‘মুলহামা’ শব্দের অর্থ—‘অনুপ্রাণিত’ বা ‘অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত’।
বৈশিষ্ট্যঃ ‘মুলহামা’ শব্দের অর্থ—‘অনুপ্রাণিত’ বা ‘অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত’। এই স্তরে আত্মা আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালো এবং মন্দের ফয়সালা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি বা ইলহাম (divine inspiration) পেতে শুরু করে।ব্যক্তি ভালো কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত হয় এবং মন্দ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।নৈতিক ও আত্মিক উন্নতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়, তবে মাঝে মাঝে নফস এখনও দ্বিধান্বিত হতে পারে।
এই স্তরে পৌঁছানো মানে ব্যক্তি নিজের অন্তর থেকেই ভালো ও মন্দের ফয়সালা করতে পারেন। আত্মশুদ্ধির পথে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই স্তরে সাধক আল্লাহর দিকে আরও নিবিড়ভাবে ঝুঁকেন এবং খাঁটি আত্মিক অনুপ্রেরণা লাভ করেন।এটি আত্মশুদ্ধির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
৪. নফস মুতমাইন্না — প্রশান্তি
বৈশিষ্ট্যঃ ‘মুতমাইন্না’ অর্থ—পরিপূর্ণ শান্ত, প্রশান্ত ও সন্তুষ্ট।এই স্তরে পৌঁছালে মানুষের মনে আর কোনো অস্থিরতা বা পাপের টান থাকে না।ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে এবং তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও সন্তুষ্টি পায়।সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা বলে মেনে নেয়, কোনো অভিযোগ বা হতাশা থাকে না।অন্তরে গভীর তৃপ্তি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়।
এ স্তর আত্মার (নফস) সবচেয়ে উন্নত ও শান্তিপূর্ণ স্তর। এটি আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে আত্মা পরিপূর্ণ প্রশান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আত্মবিশ্বাস লাভ করে।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর; এই পর্যায়ে পৌঁছানোই সাধকের লক্ষ্য। এই আত্মা আর কোনো পাপ বা কুপ্রবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত হয় না। ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর স্মরণে ডুবে থাকে এবং তার প্রতি নির্ভরশীল হয়।
৫. নফস রাজিয়া — সন্তুষ্টি
বৈশিষ্ট্যঃ ‘রাজিয়া’ অর্থ: সন্তুষ্ট, তুষ্ট, বা পরিতৃপ্ত।এই স্তরের আত্মা পুরোপুরি আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে—ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে মেনে নেয়।ব্যক্তির মনে কোনো অভিযোগ, হতাশা বা অনুতাপ থাকে না; বরং সে নিজের অবস্থার জন্য আন্তরিকভাবে খুশি থাকে।জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি ও পরীক্ষাকে আনন্দ ও সন্তুষ্টি নিয়ে গ্রহণ করে।
নফস রাজিয়া’ হলো সেই আত্মিক স্তর, যেখানে আত্মা আল্লাহর সব সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ও খুশি থাকে। সুফিবাদে এটি আত্মশুদ্ধির এক উন্নত ও প্রশংসিত স্তর, যা আল্লাহর নৈকট্য ও পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের নির্দেশক।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ
‘নফস রাজিয়া’তে পৌঁছানোর অর্থ হলো ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার সাথে নিজের ইচ্ছাকে পুরোপুরি মিলিয়ে নিয়েছে। আত্মা আর কিছুর জন্য লালায়িত নয়; শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজের অবস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।এটি আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পণ ও আত্মিক প্রশান্তির অবস্থা।
৬. নফস মারজিয়া — আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
বৈশিষ্ট্যঃ‘মারজিয়া’ অর্থ: যাকে সন্তুষ্ট করা হয়েছে, বা যার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে। এই স্তরের আত্মা পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।ব্যক্তি শুধু নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়, বরং তার জীবন, চরিত্র ও কর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।এই আত্মা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং আল্লাহ তার প্রতি খুশি থাকেন।
এই স্তরে আত্মা শুধু নিজেই সন্তুষ্ট নয়, বরং আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট। সুফিবাদে এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য ও কাঙ্ক্ষিত স্তর, যা আল্লাহর নৈকট্য ও চূড়ান্ত সফলতার চিহ্ন।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ
আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যতম লক্ষণ হলো এই স্তরে উন্নীত হওয়া। সাধকের আত্মা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, তখন সে সত্যিকারের সফল ও মুক্ত।এই স্তরে পৌঁছানো মানে—আত্মা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসা লাভ করেছে।
৭. নফস কামিলা — পূর্ণতা, ঐক্য
বৈশিষ্ট্যঃ‘কামিলা’ শব্দের অর্থ: পূর্ণাঙ্গ, পরিপূর্ণ, নিখুঁত। এই স্তরে আত্মা সকল মানবিক দুর্বলতা, কুপ্রবৃত্তি ও অপূর্ণতা অতিক্রম করে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসায় বিলীন হয়ে যায়।ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর স্মরণ, ভালোবাসা ও নির্দেশে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে রাখে।এই স্তরের আত্মার মধ্যে অহংকার, লোভ, হিংসা, কামনা, ক্রোধ ইত্যাদি কোনো নীচু প্রবৃত্তির স্থান থাকে না।আত্মা তখন এক গভীর প্রশান্তি, নির্ভরতা ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করে।
অর্থাৎ এ স্তর হলো আত্মার পূর্ণতা ও নিখুঁততা, যেখানে আত্মা সকল অপূর্ণতা ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর প্রেম ও সন্তুষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। সুফিবাদে এটিই আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ স্তর।
সুফিবাদে গুরুত্বঃ
‘নফস কামিলা’ হচ্ছে আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতীক।এই স্তরের সাধককে ‘ইনসান-এ-কামিল’ (পূর্ণাঙ্গ মানুষ) বলা হয়, যিনি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন।এই স্তরে পৌঁছানো মানে—আত্মা আল্লাহর সঙ্গে পরিপূর্ণ সংযুক্ত, কোনো পাপ, সংশয় বা দুষ্টপ্রবৃত্তি অবশিষ্ট নেই।
সুতরাং এ আলোচনার সাথে মিল রেখে নিম্নোক্ত ভাবে ভাগ করা যায়ঃ
১ম - ২য় স্তরঃ প্রবৃত্তি/অজ্ঞতা
৩য় স্তরঃ আত্মার জাগরণ
৪র্থ স্তরঃ শান্তি ও নিষ্পাপতা
৫ম–৬ষ্ঠ স্তরঃ সৃষ্টিশক্তির দায়িত্ব, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা
৭ম স্তরঃ একত্ববাদ—আল্লাহর সাথে চূড়ান্ত একাত্মতা
খ্রিষ্টীয় মিস্টিসিজম
তিনটি ধাপে আত্মার উত্তোরণ ঘটে। যেমনঃ
1. Purification — পাপ পরিশোধ
2. Illumination — অন্তর্জ্ঞান
3. Union — ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন
অর্থাৎ আত্মা Individual Soul থেকে Holy Spirit-এ রূপান্তরিত হয় - শেষে God-consciousness-এ পরিণতি লাভ করে।
খ্রিষ্টীয় mystic দের মতে “When the soul sees no separation, creation flows through it.”
গ্রীক দর্শন (প্লেটো/প্লটিনাস/অ্যারিস্টটল)
প্লেটোর দর্শন অনুসারে আত্মার তিনটি ধরণের সমাহার। যেমনঃ
1. Appetitive — প্রবৃত্তি
প্রবৃত্তি আত্মার সেই অংশ, যা মানুষের মৌলিক চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বৈশিষ্ট্যঃ ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনতা, বিলাসিতা, আরাম, ধন-সম্পদ ইত্যাদি ইচ্ছা প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নেয়।আনন্দ-উপভোগ ও চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেপ্রবৃত্তি পরিচালিত হয়।প্লেটোর মতে, এই অংশটি ভারসাম্যহীন হলে ব্যক্তি লোভী, ভোগবাদী ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
2. Spirited — আবেগ
আবেগ আত্মার সেই অংশ, যা সাহস, সম্মান, গৌরব, আত্মমর্যাদা ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত।
বৈশিষ্ট্যঃ রাগ, সাহস, প্রতিযোগিতা, সম্মানবোধ, আত্মগৌরব, দেশপ্রেম ইত্যাদি আবেগ থেকে উদ্ভূত।ন্যায়, সম্মান ও আদর্শ রক্ষা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় ।
প্লেটোর মতে আবেগ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হলে এটি ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার উৎস হিসাবে কাজ করে। তবে অতিরিক্ত হলে অহংকার বা হিংসার জন্ম দিতে পারে।
3. Rational — বুদ্ধি
বুদ্ধি আত্মার সবচেয়ে উচ্চতর অংশ, যা বিচার-বিবেচনা, যুক্তি, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার আধার।
বৈশিষ্ট্যঃ বুদ্ধি যুক্তিবোধ, জ্ঞান, দূরদর্শিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সত্যের অন্বেষণে সহায়তা করে।সত্য, মঙ্গল ও ন্যায়বোধের অনুসন্ধানে আত্মাকে বুদ্ধি পরিচালিত করে।
প্লেটোর মতে, এই অংশটি যদি অন্য দুই অংশকে যুক্তি ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে, তবে ব্যক্তি ও সমাজে ভারসাম্য ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ বুদ্ধি আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, আবেগ সমর্থন জোগাবে, প্রবৃত্তি যুক্তি ও নীতির অধীন থাকবে। তাহলেই আত্মার ভারসাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং মানব চরিত্র পূর্ণতা লাভ করবে।
পরবর্তীতে Neoplatonism-এ ধারণা করা হয়ঃ
1. The One
এই স্তরটি সমস্ত সৃষ্টির চূড়ান্ত মূল উৎস ও সর্বোচ্চ বাস্তবতা। এটি সমস্ত সত্তার ঊর্ধ্বে, সমস্ত গুণাবলির বাইরে, অদৃশ্য, অপরিবর্তনীয় ও নিরাকার।
বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তর সকল অস্তিত্বের মূল, যা চিন্তা, ভাষা বা উপলব্ধির বাইরে। সব কিছুর অস্তিত্ব The One থেকে নিঃসৃত (emanate) হয়।
2. Intellect
The One থেকে প্রথম নিঃসৃত বাস্তবতা হচ্ছে Intellect . এটি পরিপূর্ণ জ্ঞান, চেতনা ও ধারণার আধার।
বৈশিষ্ট্যঃ এখানে সমস্ত আদর্শ (Forms/Ideas) বিদ্যমান, যেমন প্লেটোর দর্শনের “Form of the Good.” Intellect নিজে The One-এর প্নিখুঁত প্রতিফলন। এ স্তর চিন্তা, উপলব্ধি ও আত্মসচেতনতার কেন্দ্র। এত স্তরে থাকে যুক্তি, মহাজ্ঞান বা ঈশ্বরীয় বুদ্ধি।
3. Soul
Intellect থেকে নিঃসৃত দ্বিতীয় বাস্তবতা হচ্ছে Soul (Psyche)। এটি সমস্ত জীবিত সত্তা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাণশক্তির আধার।
বৈশিষ্ট্যঃ Soul হলো সেই স্তর, যা Intellect-এর আদর্শকে বস্তুজগতে প্রতিফলিত করে।এটি জড় ও চেতনার সংযোগসূত্র—একদিকে বুদ্ধি/চেতনা (Intellect), অন্যদিকে বস্তুজগৎ।মানব আত্মা ও মহাজাগতিক আত্মা (World Soul) এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
এই স্তর জগৎ-আত্মা, প্রাণশক্তি, বা মানুষের আত্মিক পরিচয় ধারণ করে।
সারসংক্ষেপঃ
Neoplatonism-এ সমস্ত অস্তিত্বের মূল উৎস The One, যা অদ্বিতীয় ও সর্বোচ্চ। এখান থেকে নিঃসৃত হয় Intellect (জ্ঞান/বুদ্ধি), এবং Intellect থেকে উদ্ভূত হয় Soul (আত্মা/প্রাণশক্তি)।
সব কিছু The One থেকে শুরু হয়ে, Intellect ও Soul-এর মধ্য দিয়ে, অবশেষে বস্তুজগতে প্রকাশ পায়। আত্মিক মুক্তি ও উন্নতির লক্ষ্যে, Neoplatonism-এ জীবসত্তা আবার The One-এর দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে।
যা তুলনা করলে বলা যায়ঃ
১ম–২য় স্তর = প্রবৃত্তি/আবেগ
৩য় স্তর = বুদ্ধি
৪র্থ স্তর = Intellect
৫ম–৭ম স্তর = The One (সৃষ্টির উৎস)
আধুনিক বিজ্ঞান (নিউরোসায়েন্স,কসমোলজি ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব)চেতনাকে ব্যাখ্যা করে তিনটি স্তরে।
যেমনঃ
১. Primitive Brain (Reptilian Brain/রিপটিলিয়ান ব্রেইন)-মৌলিক প্রবৃত্তি ও টিকে থাকা
এটি হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে প্রাচীন অংশ, যা বিবর্তনের সূচনালগ্নে গঠিত। সরীসৃপ প্রাণীর মস্তিষ্কের সঙ্গে এর মিল থাকায় একে “Reptilian Brain” বলা হয়।
অবস্থানঃ ব্রেইনস্টেম (brainstem) ও সেরিবেলাম (cerebellum)।
বৈশিষ্ট্যঃ মৌলিক ও স্বয়ংক্রিয় শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করেঃ যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, দেহের তাপমাত্রা, ক্ষুধা, নিরাপত্তাবোধ। এই স্তরে মানুষ প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। টিকে থাকার সংগ্রামে ও আত্মরক্ষার জন্যই বেঁচে থাকার আকুতি অনুভব করে।
চেতনার স্তরঃ এখানে বুদ্ধিবৃত্তি বা আবেগ নেই—শুধু স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া দ্বারা মানুষ পরিচালিত হয়।
২. Emotional Brain (Limbic System/লিম্বিক সিস্টেম) -আবেগ, স্মৃতি ও সামাজিক আচরণ
এটি মস্তিষ্কের সেই স্তর, যা আবেগ, স্মৃতি, ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
অবস্থানঃ থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস, অ্যামিগডালা, হিপোক্যাম্পাস ইত্যাদি নিয়ে গঠিত।
বৈশিষ্ট্যঃ এর দ্বারা আবেগ (ভয়, আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভালোবাসা) সৃষ্টি হয় ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এই অঙ্গশ দ্বারা স্মৃতি সংরক্ষণ করা বা মুছে যাওয়ার কাজ ঘটে । মানুষের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক ও সহানুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
চেতনার ভূমিকাঃ এই স্তর মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে এবং আচার আচরণে বৈচিত্র্য আনে।
৩. Rational Brain (Neocortex/নিওকোর্টেক্স) -যুক্তি, চিন্তা, ভাষা ও সৃজনশীলতা
এটি সবচেয়ে আধুনিক ও উন্নত স্তরের মস্তিষ্ক, যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে।
অবস্থানঃ মস্তিষ্কের বাইরের স্তর।
বৈশিষ্ট্যঃ যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণ, চিন্তা-ভাবনা, ভাষা, পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতার নির্দেশ প্রদান করে।জটিল সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। আত্ম-পরিচিতি ও চেতনা সম্পর্কে উচ্চমাপের চিন্তা করার পথ উন্মুক্ত করে।
চেতনার ভূমিকাঃ এই স্তর মানুষের চেতনা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তোলে।
তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন তত্ত্বঃ
১। Integrated information theory: চেতনা = তথ্যের গভীর সংহতি
২০০৪ সালে গিউলিও টোনোনি (Giulio Tononi) প্রস্তাব করেন যে চেতনা হচ্ছে এমন একটি অবস্থা, যেখানে তথ্য গভীরভাবে সংযুক্ত ও সমন্বিত (integrated) হয়। কোনো সিস্টেম যত বেশি সংহত তথ্য ধারণ করতে পারে, তার চেতনার মাত্রাও তত বেশি।
কীভাবে সম্ভব?
তিনি বলেন, বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় (integration) ঘটলে চেতনা জন্ম নেয়। মানুষের মস্তিষ্কের জটিল সংযোগ ও তথ্যপ্রবাহ চেতনার গভীরতা নির্ধারণ করে। এ ধারণা আধুনিক নিউরোসায়েন্সে আলোচিত হয়ে থাকে।
২। Quantum consciousness: চেতনা = কোয়ান্টাম স্তরের ঘটনা ও সংযোগ
রজার পেনরোজ (Roger Penrose) ও স্টুয়ার্ট হামারফ (Stuart Hameroff) প্রস্তাবিত “Orchestrated Objective Reduction” (Orch-OR) মডেলে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরের মাইক্রোটিউবিউল নামক ক্ষুদ্র কাঠামোতে কোয়ান্টাম ঘটনাবলি ঘটে, যা চেতনার জন্ম দেয়।
৩। Unified field theory: চেতনা ও মহাবিশ্ব = এক অভিন্ন শক্তি বা ক্ষেত্রের বহিঃপ্রকাশ
ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি হলো পদার্থবিজ্ঞানে এমন একটি তত্ত্ব, যা মহাবিশ্বের সব মৌলিক শক্তি ও কণার আচরণকে একটি সাধারণ সূত্রে ব্যাখ্যা করতে চায়।কিছু আধুনিক গবেষক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ বলেন, চেতনা ও মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি একটি অভিন্ন (unified) ক্ষেত্রে যুক্ত। মহাবিশ্বের মৌলিক বাস্তবতা ও চেতনা একক ও অভিন্ন শক্তির প্রকাশ। মানুষের চেতনা ও মহাবিশ্বের ক্ষেত্র পরস্পর সংযুক্ত ও আন্তঃসম্পর্কিত।
গুরুত্ব বিবেচনা করলে এটি চেতনা ও মহাবিশ্বকে একীভূতভাবে বোঝার চেষ্টা করে, যেখানে চেতনা সর্বজনীন শক্তিরই এক প্রকাশ।
যা এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তুলনা করলে দাঁড়ায়ঃ
১ম–২য় স্তর = বেঁচে থাকার অনুভূতি/ভয়/প্রবৃত্তি
৩য় স্তর = যুক্তির সন্ধান
৪র্থ স্তর = উচ্চতর সংবেদনশীলতা
৫ম স্তর = সৃষ্টিশীলতা ও জিনগত ম্যানিপুলেশন (জ্ঞান,কৌশল খাটিয়ে কোন কিছুকে প্রভাবিত করা)
৬ষ্ঠ –৭ম স্তর = দেহহীন চেতনার ধারণা
নিউ এজ/মেটাফিজিক্স -এর মতে মহাবিশ্ব "কম্পন" বা vibration দিয়ে তৈরি।
ডাইমেনশন 3D–7D অনুযায়ী চেতনাস্তরঃ
১. 3D: ভৌতিক জগত (Physical Realm)
3D বা থ্রি-ডাইমেনশনাল জগত হলো দৈনন্দিন বস্তুজগৎ, যেখানে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা—এই তিনটি মাত্রা রয়েছে।
বৈশিষ্ট্যঃ বাস্তব, স্পর্শযোগ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু 3D.এখানে কারণ-পরিণতির নিয়ম, সময় ও স্থান, জীব-বস্তু, দেহ, পদার্থ নিয়েই আমাদের পরিচিতি।চেতনার স্তরে এটি হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা ও বস্তুবাদ।
২. 4D: বিশ্বাস/এনার্জেটিক সংবেদন (Belief/Energetic Perception)
4D স্তরকে অনেক সময় “Time dimension” বা “Energy dimension” বলা হয়। এখানে বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতির শক্তি ও সময়ের ধারণা প্রধান।
বৈশিষ্ট্যঃ মানসিক শক্তি, কল্পনা, বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি—এগুলো 4D জগতের লক্ষ্যণ।এখানে চেতনা জাগতিক জগৎ ছাড়িয়ে সূক্ষ্মস্তরে প্রবেশ করতে পারে।
৩. 5D: জ্ঞান-প্রজ্ঞা (Wisdom/Intuitive Knowing)
5D স্তরকে বলা হয় “Unity consciousness” বা “Higher wisdom dimension”
বৈশিষ্ট্যঃ এই স্তর গভীর উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান ও প্রেম-সহমর্মিতার স্তর।এখানে ইগো ফেলে দিয়ে সর্বজনীন ঐক্য-চেতনা অনুভব করা যায়। এ স্তরে শুদ্ধ সত্য, অন্তর্দৃষ্টি ও পরম জ্ঞানের অভিজ্ঞত লাভ করা যায়।
৪. 6D: আধ্যাত্মিক সৃষ্টিশক্তি (Spiritual Creative Power)
6D স্তরে চেতনা পূর্ণ আধ্যাত্মিক সৃজনশীলতায় প্রবেশ করে।
বৈশিষ্ট্যঃ এখানে চিন্তা ও কল্পনা বাস্তবতায় রূপ নিতে শুরু করে। এই স্তর আত্মার সৃজনশীল শক্তি, উচ্চতর দর্শন, মহাজাগতিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের স্তর। এই স্তরে আধ্যাত্মিক শক্তি ও সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার সঙ্গে আত্মার সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়।
৫. 7D: উৎস/চেতনার মূল উৎস (Source Consciousnes)
7D হলো চেতনার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ স্তর—যেখানে সমস্ত সত্তা, জ্ঞান ও শক্তি এক উৎসে মিলিত।
বৈশিষ্ট্যঃ এ স্তরকে বলে সর্বব্যাপী চেতনার স্তর, উৎস বা Source.
এখানে কোনো বিভাজন নেই, সীমারেখা দ্বারা কিছুই নির্ধারিত নয়। সব কিছু একাত্ম ও অপার।
এ স্তর পরম শান্তি, আলোক, অনন্ত ভালোবাসা ও সর্বজ্ঞতার স্তর। এটি ঈশ্বর-স্বরূপ বা ব্রহ্মা-স্বরূপ ধারণার সঙ্গে তুলনীয়।
সারসংক্ষেপঃ
3D: বস্তুজগৎ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা।
4D: বিশ্বাস, অনুভূতি, শক্তি ও সময়ের স্তর।
5D: অন্তর্দৃষ্টি, ঐক্য-চেতনা, পরম জ্ঞান।
6D: আধ্যাত্মিক সৃজনশক্তি ও মহাজাগতিক পরিকল্পনা।
7D: চেতনার মূল উৎস, পরম ঐক্য ও অনন্ততা।
ক্রমশঃ
সপ্তম স্তর
সৃষ্টি, চেতনা ও আত্মার চিরন্তন যাত্রা— পঞ্চম স্তর
চতুর্থ স্তর
তৃতীয় স্তর
দ্বিতীয় স্তর
প্রথম স্তর
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


