পৃথার বাবা ব্রাক্ষ্মনবাড়ীয়া তিতাস গ্যাসের কলোনী থেকে বাসা সিফট করলেন পিসিকালচার হাউজিংএ, বড় ছেলে রেসিডেন্টসিয়াল মডেলে ভর্তি হয়েছে বলে। পাঁচ বছরের পৃথা ঢাকায় এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো, কোন সমবয়সী নেই, মাঠ নেই, বাইরে হাঁটার জায়গা নেই। সারাদিন শুধু রুমের মধ্যে বসে থাকে। মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে পাঁচতলার জানালা দিয়ে দূরে শহররক্ষা বাঁধের ওপারের গাঢ় সবুজের দিকে। পৃথার বাবা আমার কাজিন। একদিন বেড়াতে গেলাম। পৃথাকে দেখে চমকে উঠলাম, কেমন মিইয়ে গেছে মেয়েটি। আমি বললাম, কি হে, পৃথু, তোমার কি হয়েছে? পৃথা কোন কথা বলে না।
কিছুদিন পরে শুনলাম সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ব্রাক্ষণবাড়ীয়াতে ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত পড়েছে; আগের সব পরীক্ষায় ফাস্ট হয়েছে, এখানেও। এই বয়সী বাচ্চাদের জন্য মায়েরা খুব কাছের কোন ইস্কুলই খুঁজে নেয়, পৃথাও তেমন একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তিনচারটা ফ্লাট মিলে স্কুল। আমি এর কয়েকদিন পরে আবার গিয়েছি ওদের বাসায়। পৃথা যেন আগের চেয়ে আরো বেশী চুপসে গেছে। রাইম শোনায় না, গল্প করে না। আমি বললাম, চল ঘুরে আসি রাস্তা দিয়ে! পৃথু চোখ বড় বড় করে বলে, আমাকে পার্কে নেবে? তার দৃষ্টি কেমন যেন ছলছল করে ওঠে। আমি বলি, অবশ্যই! চলো! পৃথুর মা তাকে সাজিয়ে দেয়, আমি তাকে নিয়ে চন্দ্রিমায় যাই।
পৃথুকে জিজ্ঞেস করি, কি হয়েছে সোনামনি? তোমার এত দুঃক্ষ কিসের?
পৃথু বলে, জানো চাচু, চারদিকে শুধু ইট আর ইট! কোথাও সবুজ নেই!
আমার বুকটা হুহু করে ওঠে। ছোট্ট পৃথুর সবুজের ক্ষুধা তৈরী হয়েছে। সে ছিল সবুজের মধ্যে। জন্ম হয়েছে সেখানে, হাঁটতে শিখেছে সবুঝ ঘাসে, বেড়ে উঠেছে বৃক্ষরাজির মধ্যে খেলতে খেলতে। এখন ঠাসা বুনটের এপার্টমেন্টের মাঝে সে খুঁজে পায় না তার অন্তরে লেগে থাকা সবুজের ছোঁপছাপ।
আমি পৃথুকে কোলে নিয়ে হাঁটি কৃষ্ণচুড়া ফুল মাড়িয়ে। পৃথু বলে, ভেবেছিলাম, স্কুলে মাঠ থাকবে, কিন্তু সেটাও বাসার মত!
পৃথু বলতে পারছে না এর বেশী। আমি বুঝতে পারছি তার চেয়েও বেশী। চারিপাশ থেকে বৃক্ষরাজি এমনভাবে অপসারিত নিজের ভেতরে সবুজ জীবনের কোন পদচিন্থ আর খুঁজে পাই না। পাঁচ বছরেরর পৃথু তার কষ্টের কথা বলতে পেরেছে - তার জীবনীশক্তি যে বৃক্ষের সাথে কত গভীরভাবে গেঁথে আছে।
আমরা একটা বৃক্ষ কেঁটে ফেলছি কত অনায়েসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বিশাল বৃক্ষ কেঁটে ফেলা হয়েছে নির্মমভাবে। বুকের ভেতর লেগেছে। একটা গাছের মৃত্যু আমাকে পৃথুর কথা মনে করিয়ে দেয়। অসংখ্য আগত শিশুদের কথা মনে করিয়ে দেয়। কত নির্দয়ভাবে আমরা আগামী প্রজন্মকে সবুজ একটা পৃথিবী থেকে বঞ্চিত করছি! কত অবলীলায়!
আমাদের পৃথুদের জন্য ফিরিয়ে দাও সবুজ নগরী। পাঁচটা বৃক্ষের হত্যার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের ফাঁসি দাবী করছি। পৃথুর আকাশ থেকে সবুজ কেড়ে নেয়ার অধিকার নেই কারো, না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, না তত্বাবধায়ক সরকারের, না কোন বিধাতার!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০০৭ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



