somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাজার বছর ধরে ২০২৬ — প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও এক আবহমান নীরবতার আখ্যান

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত নতুন সংস্করণ)

মেঘনা তীরের গ্রামটিতে বর্ষার জল নামতে শুরু করেছে। ডিশের কেবলের তার, সোলার প্যানেল আর স্মার্টফোনের নীলচে আলো এখন গ্রামের ভিটেগুলোতে পৌঁছে গেছে ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তির আলো ঢুকলেও এই ভিটের মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারে গত হাজার বছরে এক বিন্দু আলো পৌঁছায়নি।

টুনি বারান্দার কোণে বসে নিজের কমদামী স্মার্টফোনটিতে ফেসবুক স্ক্রোল করছিল। ফেসবুকে শহরের অচেনা নারীদের স্বাধীন চলাফেরা, স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প কিংবা অন্য এক মুক্ত পৃথিবীর ছবি দেখে তার চোখের তারায় এক অচেনা আলো খেলে যায়। ফেসবুক তার কাছে কেবল বিনোদন নয়—এ যেন নিজের অবরুদ্ধ খাঁচা থেকে বাইরের জগতে উঁকি দেওয়ার একমাত্র জানালা।

পঁচাত্তর বছর বয়সী মকবুল ঘর থেকে বের হয়ে এসে টুনির হাত থেকে ফোনটা ঝটকা মেরে নিয়ে নিল।

মকবুল নিজেকে কোনো অত্যাচারী মনে করে না। চশমার ওপর দিয়ে টুনির দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর ও আন্তরিক গলায় বলল, "আমি তোর অন্যায় করতেছি না, টুনি। তোর ভালোর লাইগাই ফোনটা রাখলাম। ডিজিটাল জামানা ভালো না, অনলাইনে বেহায়াপনা ছড়ায়। এই দুনিয়ায় মেয়েমানুষের ইজ্জত রক্ষা করা সহজ না।"

নিজের স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণকে ‘সুরক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করার এই যে ভয়াবহ মানসিকতা—তাতেই টুনি প্রতিদিন শ্বাসরুদ্ধ বোধ করে। মকবুলের কাছে সে রক্তমাংসের মানুষ নয়; তার সামাজিক প্রভাব ও ঘরের নিরাপত্তার এক প্রদর্শন মাত্র।

মোবাইল মেকানিক মন্টুর সাথে টুনির সম্পর্ক হুট করে গড়ে ওঠেনি। গ্রামে মন্টুর দোকানটিই ছিল টুনির ফোন রিচার্জ বা মেমোরি কার্ডে গান ভরার একমাত্র জায়গা। স্ক্রিন ভেঙে গেলে মন্টু বিনা পয়সায় তা ঠিক করে দিত, আর সেই ছুতোয় দুজনের মাঝে বিনিময় হতো কিছু নিথর, না-বলা চোখের ভাষা।

পরদিন বিকেলে মন্টুর দোকানে গিয়ে টুনি নিচু গলায় বলল, "মন্টু ভাই, ফেসবুকের একটা পেজে দেখলাম শহরের মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ায়। আমারে একটা ছোট চাকরি খুঁজে দেওয়া যায় না?"

মন্টু কাজ থামিয়ে টুনির দিকে তাকাল। সে কয়েক মাস ধরে দালালের মাধ্যমে ওমানে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু আজই তার ভিসা রিজেক্ট হয়েছে। মন্টুর নিজের চোখেই হতাশা। সে বলল, "শহরে যাওয়া কি এত সহজ টুনি? মকবুল চাচা গ্রামের মাতব্বর, আবার ফেসবুক লাইভে অনলাইন হুজুরদের লগে ওঠাবসা। তার চোখ এড়িয়ে তুমি কই যাইবা?"

টুনির ফোন থেকে হঠাৎ টুং করে শব্দ হলো। মকবুলের মেসেজ—বাড়িতে লোক এসেছে, তাকে এখনই ফিরতে হবে।

গল্পের মূল মোড় বা টার্নিং পয়েন্টটি ঘটল সেদিন রাতেই।

টুনি নিজের মনের তীব্র যন্ত্রণা থেকে ফেসবুকের একটি গোপন নারী ফোরামের সাপোর্ট গ্রুপে নিজের নাম গোপন করে একটি লেখা ড্রাফট করেছিল—"আমি আর এই ঘরে থাকতে পারছি না। আমাকে কেউ আলো দেখান।"

কিন্তু পোস্টটি পাবলিক করার আগেই মকবুল ঘরে ঢুকে টুনির ফোনটি হাত থেকে কেড়ে নেয়। ড্রাফট লেখাটি পড়ে মকবুলের মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। সে কোনো চিত্কার-চেঁচামেচি করল না, শুধু ফোনটি নিজের পকেটে ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে দিল।

পরদিন সকাল থেকে টুনির আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। গ্রামে রটে গেল—টুনির ওপর 'ডিজিটাল জিনের আছর' হয়েছে, সে নাকি মোবাইল দেখে মাথা খারাপ করে ফেলেছে।

মকবুল নিজের ক্ষমতা বজায় রাখতে কোনো ভালো হাসপাতালে নেওয়ার বদলে খবর দিল গ্রামের এক 'অনলাইন-ঝাড়ফুঁককারী'-কে। লোকটা ফেসবুক লাইভে এসে বিকারগ্রস্ত গলায় ঝাড়ফুঁক করে, বিকাশে টাকা নেয় আর দাবি করে—"দূর থেকেই জিনের চিকিৎসা সম্ভব।"

টুনি ঘরের অন্ধকারের খাটে শুয়ে আছে। তার চোখ দুটো স্থির, মুখে কোনো শব্দ নেই। মন্টু উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কেবল তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, সে বা টুনি কেউ এই অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামোর শিকল ভাঙতে পারেনি।

টুনি কোনো কথা বলল না।

তার হাত থেকে দূরে মেঝের ওপর পড়ে থাকা ফোনটির স্ক্রিন একবার জ্বলে উঠে নিভে গেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—"No Internet Connection"।

বাইরে তখন অঝোর ধারায় বর্ষার বৃষ্টি পড়ছিল। নদীর ওপারে দূরের শহরের আলো জ্বলছিল।

আর এই ভিটের উঠোনে—
কিছুই বদলায়নি।

হাজার বছর ধরে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×