somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘শিকার’ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে তরুণেরা: ভাগ্য বদলের শেষ পরিণতি যখন মৃত্যুফাঁদ

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চাকরির প্রলোভনে পড়ে রাশিয়া গিয়ে নির্মাণশ্রমে যোগ দেওয়ার কথা ছিল ৩০ জন বাংলাদেশি তরুণের। তাঁদের বলা হয়েছিল, সেখানে ভালো বেতনে কাজ পাবেন। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা যে কোনো হরর সিনেমাকেও হার মানায়। রাশিয়ায় পৌঁছানো মাত্রই তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হয় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে। মাত্র ২১ দিনের নামমাত্র সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াল ফ্রন্টলাইনে!

আজ বুধবার স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-১০) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে যা জানালেন, তা শুনলে গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে এই অনভিজ্ঞ বাংলাদেশি তরুণদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হতো মূলত ‘শিকার’ বা ‘টোপ’ হিসেবে! তাঁদের ওপর যখন শত্রু পক্ষ ড্রোন হামলা চালাত, তখন সেই সুযোগে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব মেপে নিত সেনাবাহিনী।

আর এই নির্মম গেমে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করার প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান ১৭ জন বাংলাদেশি। পরবর্তীতে মারা যান আরও ৩ জন। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর তথ্য প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে এসআরবি। বাকি ১০ জনের মধ্যে দুজন পঙ্গুত্ব বরণ করে কোনোমতে দেশে ফিরেছেন, দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন এখনো সেই নরককুণ্ডে লড়াই করছেন। এই মানব পাচার চক্রের পেছনে থাকা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও রাশিয়ার ইগর এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়াদের মতো আন্তর্জাতিক চক্র এখনো সক্রিয়।

আমাদের দেশের তরুণেরা কিন্তু ভীষণ সাহসী ও অকুতোভয়। তাঁরা ভালো করেই জানেন যে পথ অনিশ্চিত, পদে পদে মৃত্যু হাতছানি দিচ্ছে। তবুও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে তাঁরা নিশ্চিন্তে সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারে উঠে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। নিজেদের জীবন বাজি রেখে উত্তাল সমুদ্র, তপ্ত মরুভূমি আর ভূমধ্যসাগরের গহীন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তারা ইতালি পৌঁছানোর চেষ্টা করে। কেউ হয়তো ভাগ্যের জোড়ে সফল হয়, কিন্তু একটা বড় অংশ দালালদের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরে, অথবা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে অচেনা কোনো দ্বীপে।

ভাগ্য পরিবর্তনের এই ভয়াল জুয়া খেলায় এখন নতুন বিভীষিকা হয়ে যুক্ত হয়েছে ‘মার্সেনারি’ বা ভাড়াটে সৈন্যের তকমা। গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা, কিংবা গাজীপুরের চরম দরিদ্র পরিবারের এই সন্তানরা সামান্য কাজের আশায় ঘর ছেড়ে আজ ভিনদেশের ড্রোন হামলার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। নিহত পরিবারগুলো আজ স্বজন হারানোর শোকে ভাসছে, এমনকি তাদের শেষবারের মতো দেখার বা মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনারও কোনো উপায় নেই।

আমরা যত বড় বড় সুশাসনের কিংবা উন্নয়নের গল্পই বলি না কেন, আসল বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে যতদিন না পর্যন্ত তরুণ সমাজের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে—ততদিন পর্যন্ত এই ভাগ্যকূল তরুণেরা গেমঘরে অপেক্ষা করতেই থাকবে। তাদের অনিশ্চিত সেই গেম কবে হবে, কবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি বা মালয়েশিয়া পৌঁছাবে, কিংবা কবে আবার কোনো দূরদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে 'টোপ' হিসেবে তাঁদের রক্ত ঝরবে—এই নির্মম প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়তো আমাদের জানা নেই!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সরকার বদলায়, স্বাধীনতার ঘোষকও বদলায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০৫


বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে অনেক কিছু হয়েছে। সরকার এসেছে, সরকার গেছে, সামরিক শাসন এসেছে, গণতন্ত্র এসেছে, আবার গণতন্ত্রও চলে গেছে। কিন্তু একটা কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৫ ফুলদল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:২৭

প্রকৃতি যখন যন্ত্রণার ভারে নুয়ে পড়ে, সূর্য ক্লান্ত অভিমানে আড়াল করে তার দীপ্ত মুখ। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসনে নিস্তব্ধ চারপাশ। জীবনের স্পন্দন নেই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘Why you come here?’ সুবিধামতো পরিচয়ের প্রবাসী

লিখেছেন মুনতাসির, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৬

কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রপ্রেমী ও রবীন্দ্রবিরোধী - কারা ভালো লেখে-মন্তব্য করে ব্লগে

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫


আখতারুজ্জামান আজাদ নামে এক লেখকের একটা লেখা দৃষ্টিগোচর হলো কাল। লেখাটা দিয়েই আমার পোস্ট শুরু করব।

স্বল্প-বাংলা-জানা এক জাপানি ভদ্রলোক কোলকাতার এক দাদাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘এই যে আপনারা নামের শেষে দা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জানের বদলে জান: ব্যাপারটায় প্রতিহিংসার ফ্লেভার মেশানো

লিখেছেন অপলক , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৩৬

ইসলামে কি বলা আছে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। দেশের আইনে কি আছে সেটাও না। ইংরেজীতে দুটো শব্দ আছে: Equality (Sameness: সমতা) এবং Equity (Fairness: নায্যতা)।




একটা অপ্রাপ্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×