চাকরির প্রলোভনে পড়ে রাশিয়া গিয়ে নির্মাণশ্রমে যোগ দেওয়ার কথা ছিল ৩০ জন বাংলাদেশি তরুণের। তাঁদের বলা হয়েছিল, সেখানে ভালো বেতনে কাজ পাবেন। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা যে কোনো হরর সিনেমাকেও হার মানায়। রাশিয়ায় পৌঁছানো মাত্রই তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হয় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে। মাত্র ২১ দিনের নামমাত্র সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াল ফ্রন্টলাইনে!
আজ বুধবার স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-১০) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে যা জানালেন, তা শুনলে গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে এই অনভিজ্ঞ বাংলাদেশি তরুণদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হতো মূলত ‘শিকার’ বা ‘টোপ’ হিসেবে! তাঁদের ওপর যখন শত্রু পক্ষ ড্রোন হামলা চালাত, তখন সেই সুযোগে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব মেপে নিত সেনাবাহিনী।
আর এই নির্মম গেমে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করার প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান ১৭ জন বাংলাদেশি। পরবর্তীতে মারা যান আরও ৩ জন। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর তথ্য প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে এসআরবি। বাকি ১০ জনের মধ্যে দুজন পঙ্গুত্ব বরণ করে কোনোমতে দেশে ফিরেছেন, দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন এখনো সেই নরককুণ্ডে লড়াই করছেন। এই মানব পাচার চক্রের পেছনে থাকা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও রাশিয়ার ইগর এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়াদের মতো আন্তর্জাতিক চক্র এখনো সক্রিয়।
আমাদের দেশের তরুণেরা কিন্তু ভীষণ সাহসী ও অকুতোভয়। তাঁরা ভালো করেই জানেন যে পথ অনিশ্চিত, পদে পদে মৃত্যু হাতছানি দিচ্ছে। তবুও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে তাঁরা নিশ্চিন্তে সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারে উঠে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। নিজেদের জীবন বাজি রেখে উত্তাল সমুদ্র, তপ্ত মরুভূমি আর ভূমধ্যসাগরের গহীন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তারা ইতালি পৌঁছানোর চেষ্টা করে। কেউ হয়তো ভাগ্যের জোড়ে সফল হয়, কিন্তু একটা বড় অংশ দালালদের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরে, অথবা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে অচেনা কোনো দ্বীপে।
ভাগ্য পরিবর্তনের এই ভয়াল জুয়া খেলায় এখন নতুন বিভীষিকা হয়ে যুক্ত হয়েছে ‘মার্সেনারি’ বা ভাড়াটে সৈন্যের তকমা। গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা, কিংবা গাজীপুরের চরম দরিদ্র পরিবারের এই সন্তানরা সামান্য কাজের আশায় ঘর ছেড়ে আজ ভিনদেশের ড্রোন হামলার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। নিহত পরিবারগুলো আজ স্বজন হারানোর শোকে ভাসছে, এমনকি তাদের শেষবারের মতো দেখার বা মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনারও কোনো উপায় নেই।
আমরা যত বড় বড় সুশাসনের কিংবা উন্নয়নের গল্পই বলি না কেন, আসল বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে যতদিন না পর্যন্ত তরুণ সমাজের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে—ততদিন পর্যন্ত এই ভাগ্যকূল তরুণেরা গেমঘরে অপেক্ষা করতেই থাকবে। তাদের অনিশ্চিত সেই গেম কবে হবে, কবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি বা মালয়েশিয়া পৌঁছাবে, কিংবা কবে আবার কোনো দূরদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে 'টোপ' হিসেবে তাঁদের রক্ত ঝরবে—এই নির্মম প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়তো আমাদের জানা নেই!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



