প্রীতিকর ও স্নেহপূর্ণ ঐতিহ্যিক উইগুর পরিবার
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
উত্তর-পশ্চিম চীনের সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্ব শাসিত অঞ্চলে বসবাসকারী উইগুর জাতি ইসলাম ধর্মাবলম্ববী একটি সংখ্যালঘু জাতি । এই জাতির জনসংখ্যা সিনচিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যার ৪৫.৭৩ শতাংশ । তারা প্রধাণতঃ থিয়ানসান পাহাড়ের দক্ষিণাংশের বিভিন্ন সমতল ভূমিতে থাকেন । চীন আন্তর্জাতিক বেতারের সংবাদদাতা দক্ষিণ সিনচিয়াংয়ের কাশ্ শহরের একটি উইগুর বাসায় সাক্ষাত্কার নিতে গিয়েছেন । তিনি সচক্ষে উইগুর জাতির প্রীতিকর ও স্নেহপূর্ণ ঐতিহ্যিক ঘরোয়া জীবনযাপন অনুভব করেছেন ।
আবদুল জাফর ও তার পরিবার পরিজন কাশ্ শহরের পূর্ব উপকন্ঠের একটি আবাসিক এলাকায় বাস করেন । সংবাদদাতা তার বাসার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে উইগুর জাতির ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠলো । ভাস্কর্যকর্মে সাজানো দু'তলা বিশিষ্ট একটি সুন্দর দালানের বারান্দায় রঙবেরঙের কম্বল বসানো হয়েছে । অন্তরঙ্গ স্বাগতিকের সমভিব্যহারে সংবাদদাতা এই বাসা পরিদর্শন করলেন । বৈঠকখানা ঐতিহ্যিক উইগুর জাতির রীতি-নীতি অনুযায়ী সাজানো হয়েছে । মেঝের কম্বল , দেয়াল কম্বল ও সোফার চাদরের বৈচিত্র্যময় ডিজাইনে উইগুর জাতির চালচলন জীবন্ত হয়ে উঠেছে । কিন্তু সোফা , চায়ের টেবিল ও টেলিভিশন আধুনিক ফ্যাশনে ভরপুর ।
যখন সংবাদদাতা বারান্দায় বসলেন , তখন অতিথিসেবাপরায়ণ স্বাগতিক অতিথিকে উইগুর জাতির আচার ব্যবহার অনুযায়ী আংগুর , নাশপাতিসহ বিবিধ ফল খেতে দিলেন । বড় বোন পরিদান আবদুল কাদের তার পরিবার পরিজন প্রসঙ্গে বলেছেন ,
তারা পরিবারে মোট ন' ভাই বোন আছেন । এদের মধ্যে ছ'জন এই বাসায় থাকেন । ভাই বোন এক সাথে থাকা উইগুর জাতির ঐতিহ্য ।
উইগুর জাতির নিয়ম অনুযায়ী , বাবা মা মৃত্যু বরণ করার পর বড় ভাই গৃহকর্তা । পরিদান আবদুল কাদের বলেছেন , বাবা মা মৃত্যু হওয়ার পর তার বড় ভাই আবদুল জাফর এই পরিবারের গৃহকর্তা হয়েছেন । তিনি এই বড় পরিবারের জীবনযাপনের বোঝা বহন করছেন । তিনি সকল পরিবার পরিজনের পক্ষ থেকে বাড়ির যাবতীয় ব্যাপারের ব্যবস্থা করেন । সবাইকে তার কথা মানতে হয় ।
আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সংবাদদাতা জানতে পেরেছেন , উইগুর জাতির ঐতিহ্য অনুযায়ী , এক সঙ্গে বাস করলে অর্থনৈতিক দিক থেকে সকল পরিবার পরিজনের আলাদা করা যায় না । এই ব্যাপারে গৃহকর্তার দ্বারা যাবতীয় ব্যাপার স্থির করা দরকার । বড় ভাইয়ের বউ দেখতে লাবণ্যময় ও দক্ষ । এই পরিবারে কেউ কেউ ট্যাক্সি ও রেস্তরাঁর ব্যবসা করেন , কেউ কেউ বা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন , ঘরোয়া জীবনযাপনের জন্য সকলের আয় বড় ভাইয়ের কাছে জমা দেয়া হয় । পারিবারিক দৈনন্দিন ব্যয় , বাড়ির মেরামত ও বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয় । এই ক্ষেত্রে পরিবারের সকলের মধ্যে কোন বিবাদ নেই । আবদুল জাফর একজন শান্ত মানুষ , দয়ালু , বেশি কথা বলেন না । তিনি সংবাদদাতাকে জানালেন , পরিবারে সবাই তার কথা ও ব্যবস্থা মানেন ।
৪০ বছর বয়স্ক পঞ্চম ছোট বোন মিনায়ার একজন কৃতী উইগুর নারী । তিনি একটি কোম্পানি স্থাপন করেছেন । তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করেন । তার স্বামীও ব্যবসা করেন । তিনি বছরের বেশি সময় তুরস্কে থাকেন । মিনায়ার ছিলেন কাশ্ শহরের একটি সরকারী হোটেলের কর্মী । কাজের প্রয়োজনে ইংরেজী শেখার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল । কাজের জন্য তিনি বহু বিদেশী ব্যবসায়ীকে চিনেছেন । এটা তার পরবর্তী বৈদেশিক বাণিজ্যিক কাজের জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছে । ১০ বছর আগে বিদেশে ব্যবসা করতে হোটেল কর্তৃপক্ষ মিনায়ারের জন্য পাসপোর্টের ব্যবস্থা করেছে । যখন সংবাদদাতা তার সাক্ষাত্কার নিলেন , তখন তিনি ছুটি কাটানোর জন্য দেশে ফিরেছেন ।
মিনায়ার সংবাদদাতাকে বলেছেন , তিনি ও তার স্বামী বছরের বেশি সময় বাইরে চাকরি করেন । তার ভাই বোনরা তাদের দুই মেয়ের জীবনযাপন ও লেখাপড়ার দায়িত্ব বহন করেন । পুরোপরিবার প্রীতিকর ও স্নেহময় পরিবেশে ভরা । মিনায়ারের দুই মেয়ে বড় হয়েছে । বড় মেয়ে সবেমাত্র সিনচিয়াং মেডিকল্ কলেজে ভর্তি হয়েছে । লেখাপড়া করতে মেয়েকে পাঠানোর জন্য এবারে মিনায়ার বিশেষ করে বিদেশ থেকে সিনচিয়াংয়ে ফিরে এসেছেন । যখন সংবাদদাতা মিনায়ারের সাক্ষাত্কার নিলেন , তখন তার ছোট মেয়ে ও তার ছেট ভাইয়ের মেয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এল । এ থেকে বোঝা যায় , মা না থাকলেও তার ছোট মেয়ে কখনো নিঃসঙ্গ নয় ।
মিনায়ার বলেছেন , অন্যদের বোঝা কমানোর জন্য তিনি ও তার স্বামীসহ সপরিবার বাইরে থাকতে চেয়েছিলেন । কিন্তু তার ভাই বোনরা রাজী হয় নি । সবাই মর্মাহত হয়েছেন । বড় ভাই দৃঢ়ভাবে মিনায়ার ও তার পরিবার পরিজনের বাইরে থাকার কার্যক্রমের বিরোধীতা করেছেন । তিনি ছোট মেয়েকে পরিত্যাগ করতে চান না । এ প্রসঙ্গে মিনায়ার বলেছেন ,
এবারে ছুটি কাটানোর জন্য তিনি জন্মস্থানে ফিরে এসেছেন । বাড়িতে তিনি এক ঘন্টা না থাকলে তার বড় ভাইকে জিজ্ঞাসা করার জন্য টেলিফোন করতে হচ্ছে । মিনায়ার বড় ভাইয়ের স্নেহের জন্য খুব মুগ্ধ হন । তিনি তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আসেন ।
ভাই বোনদের প্রীতি ও স্নেহের প্রভাবে মিনায়ারও সব সময় ঘরোয়া জীবনযাপনের ভার ভাগাভাগি করতে বিবেচনা করেন । পারিবারিক জীবনে ব্যবহারের জন্য তিনি বৈদেশিক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত যাবতীয় আয় বড় ভাইয়ের কাছে অর্পণ করেন ।
আবদুল জাফরের পরিচালনায় এই পরিবারের ভাই বোনরা পরস্পরকে স্নেহ ও ভালবাসেন । তারা নানা ক্ষেত্রে চাকরি করেন বা ব্যবসা করেন । তারা মনে করেন যে , পরিবার সমাজের একটি অংশ । পরিবারের প্রীতি ছাড়া সমাজের সুষমতা গড়ে তোলাও অসম্ভব ।
কাশ্ শহরের একটি আবাসিক এলাকার পার্টি কমিটির সম্পাদক , উইগুর জাতির নারী ক্যাডার মাদাম কিমানগুলি টুলাক বলেছেন , উইগুর জাতির লোকেরা যাতে আরো সুষম পরিবেশে বাস করতে পারেন , সেজন্য আবাসিক এলাকার সকল কর্মী তাদের পরিসেবা ও আশাপাশের পরিবেশ উন্নত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
৫০১ নাম্বার রুম কি বিজয় নাকি লাম্পট্যর সাক্ষী।

মাওলানা মামুনুল হক নামের হেফাজত ইসলামের এক নেতা তার ফেসবুক ওয়ালে দীর্ঘ একটি পোস্ট লিখেছেন। তার এই পোস্টটি এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।
লেখাটি পড়লে মনে হয়, তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন
Good governance starts with respecting public money....

Good governance starts with respecting public money....
গত দুই দশক রাষ্ট্রীয় সফর মানেই ছিল বিশাল বহর, শত শত সঙ্গী, অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক আর জনগণের টাকায় এক শ্রেণির মানুষের বিদেশ ভ্রমণের... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন
প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....
প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....
প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন
অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে সদয় আচরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা পাবেন
১) "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে নিজ দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় আচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।