somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিলাপি

৩০ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জিলাপি বলতে আগে আমি মুচমুচে জিলাপিই বুঝতাম। শহরের দোকানে যেসব জিলাপি ভাজা হয়ে থাকে আরকি। অবশ্য শহর নিয়েও বোঝাবুঝির ব্যাপার আছে। অনেকে অনেকদিন ধরে ঢাকা কিংবা বড়জোর চট্টগ্রাম বা খুলনা-রাজশাহীকে শহর ভাবতে ভাবতে ভুলে গিয়ে থাকেন যে ছোটশহরও শহরই। তবে এমন মানুষও আছেন যাঁরা অন্তত মফস্বল যে শহরই সেটা মনে রাখেন। তো সেসব শহরে মিষ্টির ‘প্রচলিত বনেদী’ দোকানে জিলাপি অত সুলভ নাও হতে পারে। ফলে শহরে জিলাপি সকল সময়েই অল্প জায়গায় পাওয়া যাবে।

একবার জাফর কাকা বললেন তাঁর সঙ্গে ঝাউবাড়িয়া যেতে। মানে নেমন্তন্ন করলেন। তখন আমি নাইন বা টেনে পড়ি। তখন আমাকে নেমন্তন্ন করা মানে হলো মায়ের কাছে অনুমতিও নেয়া। জাফর কাকা আমাদের বাড়িওয়ালা ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ছিল ঝাউবাড়িয়া। মানে অবশ্যই শহরে, মানে ছোটশহরে, একখানা বাড়ি ছিল। তা না হলে তো আমরা ভাড়াটে থাকতাম না। মা অনুমতি দিলেন। বাড়িওয়ালার বাৎসল্যে মানা করেন নাই। হিসাব মতে আমার তখন একখানা নামকাওয়াস্তে সাইকেল থাকার কথা। কিন্তু সেই সাইকেলে গেছিলাম কিনা মনে নেই। যদি তিনি তাঁর সাইকেলে নিয়ে গিয়ে থাকেন, এতদিন পর ভদ্রলোকের কষ্ট মনে করে খারাপ লাগছে। ৫/৬ কিলোমিটার রাস্তা হয় কাদা নাহয় ধুলা। মেহেরপুর থেকে গ্রামগুলোতে যাবার রাস্তা তখন তাই। শুকনা থাকলে হাঁটুধুলা, বৃষ্টি পড়লে হাঁটুকাদা। হাঁটু একটু বেশি বলা হলো যদিও।

তারপর গেলাম গিয়ে মেলাতে। পরদিন সকালবেলা উঠে সাইকেল চালিয়ে, বা কাকার সাইকেলে চেপে। আমার জীবনে ওটা মহা এক ঐতিহাসিক দিন। এই প্রথম কোনো ‘গ্রামীণ মেলা’তে গেছিলাম আমি আমার জীবনে। ওটা ছিল মহররমের মেলা। তো, মেলার কোনো স্পষ্ট দৃশ্য মনে পড়ে না। কেবল মনে পড়ে আমি অনেক ঘুরেছি কাকার সঙ্গে। জাফর কাকার আম্মার রান্নায় দুপুরের খাবার খেয়েছি সম্ভবত। আর মেলাতে বিকেল সন্ধ্যার আলো পড়ে যাবার একটা অস্পষ্ট স্মৃতিও মনে পড়ে। কিন্তু মূলত জিলাপি। মাটিতে গর্ত করে বানানো চুলাতে বসে গ্রামের দোকানি জিলাপি ভাজছেন, আর আমি খাচ্ছি। অবশ্যই কাকার সৌজন্যে। গুড়ের জিলাপি। আর জিলাপিটা ভাজার পরও টাটকাতেও নরম থাকে। এটা আরেক কৌশলের জিলাপি। ঠাণ্ডা হবার পর পোতায়ে যাওয়া তো সকল খাবারেরই বৈশিষ্ট্য। এটা টাটকাও পোতানো। ঢাকার গাব্দাগোব্দা যে জিলাপিগুলোকে ‘শাহী’ জিলাপি বলে, সেটা তখন এমনিতেও চিনি না। সম্ভবত কাকা বলছিলেন ওই জিলাপিগুলো এরকম নরম হবার কারণে জিলাপি খাওয়ার প্রতিযোগিতার জন্য ওই জিলাপি সেরা। প্রতিযোগিতার জন্য নরম বানানো, নাকি নরম পাওয়া গেছে বলে প্রতিযোগিতা তা আমি জানি না অবশ্য।

তো আমার জীবনে অনেকগুলো প্রথম। প্রথম গ্রামীণ মেলা, প্রথম গুড়ের জিলাপি, প্রথম নরম জিলাপি, প্রথম মহররম, সম্ভবত বাড়িওয়ালার সঙ্গে প্রথম কোনো সফরও।

মেহেরপুর থাকতে আমি কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছি লোকজনকে মেলাটা আর হয় কিনা তা নিয়ে। তবে সেসবও তো কবেকার কথা। আমি মেহেরপুর ছেড়েছিও মোটামুটি ৩৪ বছর, আর পাকাপাকি ছেড়েছি ১৭ বছর। কিন্তু বিষয়টা কেবল মেলাটা থাকা বা না-থাকার নয়। বাংলাদেশের “গ্রামীণ মেলা”গুলো এখন নানান শিল্পপণ্য বিক্রিবাট্টার একটা অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে সেসব আলাপ আরেক প্রসঙ্গ। আজকে একটা রচনাতেই সব সেরে ফেলা যাবে না। ভাবছিলাম মহররম বা আশুরার কথা।

সেই কোন সুদূর ঝাউবাড়িয়াতে, কোন সাবেক কালে যে দিবস-স্মারকটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই স্মারকটির বাংলাদেশে কী অবস্থা! ঢাকাতে কী অবস্থা! ঢাকার আশুরার শোভাযাত্রাটি গত কয়েক বছরে নানান কারণে মলিন বা ক্ষীণকায় হয়েছে। কখনো নিরাপত্তার কারণে শোভাযাত্রাতে বিভিন্ন উপকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কখনো “তাঁদের” উপর হামলা হতে পারে এই আশঙ্কায় কমিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। কখনো “তাঁদের” উপর বোমা হামলা সত্যি সত্যি হয়ে গেছে। এসব খবর কমবেশি লোকে পান, পত্রিকায় যেহেতু এসেছে। কিন্তু আশুরার শোভাযাত্রা আর যাত্রীদের উপর নানান ধরনের প্রকাশ্য ও নীরব আক্রমণের নানান খুঁটিনাটি আমরা জানি না। আশুরা যাঁদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান “তাঁরা”ই ভাল বলতে পারবেন বাংলাদেশে নিজ-নিজ উৎসব/অনুষ্ঠান/দিবস পালনে “তাঁদের” বান্ধব-পরিবেশ বোধ হয়, নাকি নির্বান্ধব।

ধানের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, পাখির বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। এসব নিয়ে লোকে আক্ষেপও করে থাকেন। খুবই ন্যায্য সেই আক্ষেপ। মানুষের বৈচিত্র্যও কি বাংলাদেশ সুলভ থাকছে? কিংবা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য! তাছাড়া বাংলাদেশের দৃশ্যমান শিয়ারা মুখ্যত গরিব। অপেক্ষাকৃত বড়লোক শিয়ারা সম্ভবত নিজ পরিচয় “লুপ্ত” করেছেন; বা হয়তো “গুপ্ত”। গুড়ের জিলাপির মতো!


সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:১১
৭টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পথের পাচালি এক অনবদ্য সৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ দুপুর ১২:৪৮



বভিূতভিূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহত্যি জগতে একজন অপ্রতদ্বিন্দ্বী লেখক, তিনি ততকালীন বাংগালী জীবন কে যতটা গভীর ভাবে ফুটয়িে তুলতে পরেছেনে এমন করে অন্যরা পেরেছেনে বলে আমার জানা নাই। শরতচন্দ্র চেস্টা করছেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্ষণিকের দেখা-৩

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৩:২৩

২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারী, আমরা দুই বন্ধু মিলে সস্ত্রীক ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার (সম্ভবতঃ) পদ্মা তীরবর্তী মৈনট ঘাটে বেড়াতে গিয়েছিলাম। যদিও এটাকে অনেকে ঢাকার ‘মিনি কক্সবাজার’ বলে থাকেন, আমার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঘুষ ও দুর্নীতি দমনে ইসলামের ভুমিকা

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৪:২০


বাংলাদেশের মুসলমানেরা (জনসংখ্যার প্রায় ৮৫%) যদি ইসলামের বিধান মানতো তাহলে দেশে ঘুষ আর দুর্নীতি থাকত না। একবার আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তিকে রাসূল (সা.) যাকাতের কাজে নিয়োগ দেন। তার নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের সকল শিক্ষা সবার জন্যে নয়

লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৪:২৫


Image Source: The Ladders

জীবনের সকল শিক্ষা সবার জন্যে নয়। একেকজন সাকসেসফুল বা আনসেকসেসফুল ব্যাক্তি তাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যেসব বানীগুলো ছাড়েন তা ধরে রেখে আপনি সকলের জীবন মেজারমেন্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্রেন্ড, ফান, ফ্রাস্টেশন...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৪:৪০



গত ১০বছর ধরে আঠারো থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে আটকে আছি। মানে আমার শিক্ষকতার ১০বছর পূর্ণ হলো আজ! দ্বিতীয় সেমেস্টারে নির্ধারিত কোর্স পড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি ব্যাচের সাথে পরিচিতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×