somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশু দিবস ও হিপোক্রেসি

২০ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি।
এক বিকেলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দেখি কাইয়ুম আসেনি। কাইয়ুম হচ্ছে রাশুদের কাজের ছেলে।
রাশু তখন ক্লাস টুর ছাত্র। কাইয়ুমের বয়স আমার চেয়ে বড় হলেও হতে পারে। কাজের ছেলে বলেই আর "কাইয়ুম ভাই" ডাকা হতো না।
সে খুব ভাল বোলিং করতে পারতো। 'খুব ভাল' মানে পাড়ার মাঠের হিসেবে বলছি, ম্যাকগ্রা-ওয়াসিমের সাথে তুলনা করে বসবেন না যেন।
আমাদের পাড়ার মাঠে সেই ছিল ওয়াকার ইউনুস। এমনিতে মার খেত, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎই টপাটপ একটানা কয়েকটা উইকেট নিয়ে খেলা ঘুরিয়ে দিত।
পাড়ার মাঠে এমনিতেই ভাল খেলোয়াড়ের অভাব থাকে, কাজেই কাইয়ুম না আসলে খোঁজ নিতেই হয় কেন আসেনি।
রাশু জানালো কাইয়ুম অসুস্থ।
আরাফাত রসিকতা করে বলল, "কাজের ছেলের আবার অসুস্থতা কী? ওরে বল এসে বোলিং করে চলে যেতে।"
কয়েকদিনের মধ্যে অন্য পাড়ার সাথে আমাদের একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে। আমাদের তারকা ফাস্ট বোলার শাহ আলমকে ইদানিং খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ও বলেছে ম্যাচের দিন উপস্থিত থাকবে। সেটাই স্বস্তির।
কিন্তু প্র্যাকটিসে ভাল বোলার না থাকলে ব্যাটিং প্র্যাকটিস হবে কিভাবে? শুনেছি ওরা খুবই ভাল দল। ব্যাটিং বোলিং সবক্ষেত্রেই 'উরাধুরা!'
রাশু জানালো, "আব্বা ওকে মেরেছে। তাই আজকে খেলতে পারবে না।"
ঐ বয়সটাতে কাজের লোকেদের মারধর করা আমার কাছে অদ্ভূত ঠেকতো না। ভুল করলে কাজের লোক মার খাবে, এটাইতো স্বাভাবিক।
নাসিম জিজ্ঞেস করলো, "তাই নাকি? কেন মেরেছেন?"
"আব্বার বুট পালিশ করে রাখার কথা ছিল, রাখেনি।"
ও আচ্ছা। বিরাট অন্যায় করে ফেলেছে।
আমরা তেমন কিছু মনে করলাম না। আমরা খেলায় মন দিলাম। টুটা ফুটা বোলিং চললো, হালকা পাতলা ব্যাটিং। অনেকক্ষণ ধরে ক্যাচিং প্র্যাকটিস হলো। ফিল্ডিংটা যেহেতু সবাইকেই করতে হবে, কাজেই ফিল্ডিংয়েই বেশি জোর দেয়া।
পরের দিনও কাইয়ুম এলোনা। এর পরের দিনও না।
ম্যাচের দিন ঘনিয়ে আসছে। এইবার চিন্তিত হতেই হলো।
"কী হলো রাশু? তোমার আব্বা কী কাইয়ুমের মার্ডার করে ফেলেছেন নাকি যে এতদিনেও সুস্থ্য হচ্ছে না?"
রাশু হেসে বলল, "আরেনা, মার্ডার করবেন কেন? একটু মেরেছেন আর কি। ঠিক হলেই খেলতে আসবে।"
কাইয়ুমের সাথে পরের দিন দেখা। বাবুলের দোকানে। বাবুল হচ্ছে আমাদের পাড়ার মুদির দোকানদার। তখনকার দিনে গোটা পাড়ায় তারই একা দোকান ছিল। এখন অনেক হয়ে গেছে।
"কিরে কাইয়ুম? খেলতে আসিস না কেন? ম্যাচে খেলতে হবে না?"
কাইয়ুম একটা মলিন হাসি হেসে বলল, "রাজীব ভাই! এইবার খেলা হইবো না।"
"কেন? কি হয়েছে?"
সে তার ডান হাতের আঙ্গুল দেখালো। ফুলে ঢোল হয়ে আছে। সেই সাথে রক্ত জমাট বেঁধে কোথাও কোথাও নীল, কোথাও কোথাও কালো হয়ে আছে।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, "সর্বনাশ! কিভাবে হলো?"
সে অতি স্বাভাবিকভাবে বলল, "স্যারে মারছে।"
মনে পড়লো, কেন মেরেছিলেন।
"বুট পালিশ করতে পারিস নাই বলে?"
সে উপর নিচ মাথা নাড়ে।
"পালিশ করিস নাই কেন?"
"রাইতেই পালিশ কইরা রাখোনের কথা। সকালে য্যান অপিস যাইতে দেরী না হয়। আমার জ্বর জ্বর লাগতাছিল। তাই ঘুমায়া পড়ছিলাম। সকালে উইঠা স্যারে মারছেন।"
আমার তখন একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল।
রাশুর বাবা বিরাট সরকারী কর্মকর্তা। ছোট শহর বলে তাঁর বিরাট হম্বিতম্বি।
আমি তখন রাশুরই স্কুলে পড়তাম। একদিন শুনি প্রিন্সিপাল টিচারের ঘরে বিরাট হইচই।
রাশুর বাবার কন্ঠস্বর শুনে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম কী হচ্ছে দেখতে। খুব বেশি কিছু দেখা হয়নি। স্পোর্টস টিচার আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তবে আঙ্কেলকে, যিনি কিনা পিটিয়ে একটা কাজের ছেলের আঙ্গুল ভেঙ্গে দিয়েছেন, তাকেই তখন অগ্নিশর্মা হয়ে প্রিন্সিপাল টিচারকে বলতে শুনেছিলাম, "শিশুরা একটু আধটু দুষ্টামি করবেই, তাই বলে তাদের মারধর করতে হবে কেন? তারা মানুষ না? তাদের ব্যথা লাগে না? বুঝিয়ে বললেই হয়! আরেকবার যদি আমার ছেলের গায়ে কোন টিচার হাত তোলেন, তাহলে আমি বলে দিচ্ছি, আমি আমার ছেলেকে এই স্কুলে পড়াবো না।"
আমি আবার কাইয়ুমের ডান হাতের আঙ্গুলের দিকে তাকাই। ফুলে ঢোল হয়ে আছে। বেচারা ঠিক মতন নাড়াতেও পারছে না। রক্ত জমাট বেঁধে কোথাও কোথাও নীল, কোথাও কোথাও কালো হয়ে আছে।
আজকে নাকি বিশ্ব শিশু দিবস!
সব শিশুদের শুভেচ্ছা।
তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যত কামনা করছি!
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:০৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫১

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

একজন বাবা তাঁর ছয় বছরের কন্যাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। তিনি কি কখনো কল্পনা করেছিলেন, ধর্মীয় শিক্ষকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২৯


যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলীকে ধন্যবাদ। তিনি একটি ট্যাবু ভেঙে দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জন্মদিন উপলক্ষে একটি বাউল গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এই খবর প্রচার হওয়ার পরপরই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২


আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×